চাঁদপুর, বুধবার ৭ আগস্ট ২০১৯, ২৩ শ্রাবণ ১৪২৬, ৫ জিলহজ ১৪৪০
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৫৪-সূরা কামার


৬২ আয়াত, ৩ রুকু, মক্কী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


২১। কী কঠোর আমার শাস্তি ও সতর্কবাণী!


২২। কুরআন আমি সহজ করিয়া দিয়াছি উপদেশ গ্রহণের জন্য; অতএব উপদেশ গ্রহণকারী কেহ আছে কি?


২৩। ছামূদ সম্প্রদায় সতর্ককারীদিগকে অস্বীকার করিয়াছিল,


 


বৃক্ষ ভূপতিত হলে পরেই তার উপযুক্ত পরিমাপ সম্ভব।


-কাল স্যান্ড বর্গ।


 


 


যে মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞ নয়, সে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ নয়।


 


ফটো গ্যালারি
১৫ আগস্ট দিনটিকে নিয়ে কিছু কথা
তছলিম হোসেন হাওলাদার
০৭ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের দিন আমি ছিলাম ঢাকায়। বেকার মানুষ, কাজকর্ম নেই। ঘুরছি ফিরছি আর খাচ্ছি, এভাবেই ঢাকায় বেশ কিছুদিন পড়েছিলাম। কাজের মধ্যে ছিলো কিছুক্ষণের জন্যে এক জায়গায় টাইপ শিখা আর সারাদিন এখানে-ওখানে ঘুরে ঘুরে পত্রিকা পড়া। আমার জানামতে ঢাকায় তখন অর্থাৎ ১৫ আগস্টের আগে একটি সামরিক অভ্যুত্থান হতে পারে এমনটি কেউ আলাপ করেনি। আমরা ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের সময়কাল দেখেছি। একটা সরকারের বিরুদ্ধে প্রবল চাপ সৃষ্টি হচ্ছে ছাত্র-জনতার পক্ষ থেকে, এ রকম একটা পরিস্থিতি ছিলো। ১/১১ ২০০৬-এর পূর্বাবস্থার কথাও এখানে স্মরণ করা যেতে পারে। সরকারি এবং বিরোধী দল_উভয় পক্ষ থেকেই একটা সাংঘর্ষিক অবস্থা বিরাজমান ছিলো। এই পরিস্থিতিতে ধারণা করা গেছে যে, হয়তো একটা কিছু ওলট-পালট হয়েও যেতে পারে এবং কার্যত হয়েছেও তাই। কিন্তু '৭৫-এ ছিলো সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থা। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত একটা সরকার ক্ষমতায় আছে। তারা একটা বিশেষ পরিস্থিতিতে (ধারণা করা যায় যে ৭৪-এর দুর্ভিক্ষই ছিলো ও রকম সিদ্ধান্ত নেয়ার পেছনের কারণ) দেশবাসীকে ডাক দিয়েছে যেনো সবাই মিলে একসাথে কাজ করে । এখানে দলমত বলে কোনো কিছু থাকবে না, থাকবে কেবল দেশের উন্নয়ন-ভাবনা। বঙ্গবন্ধুর ভাষায় এ ছিলো দ্বিতীয় বিপ্লবের ডাক। এ বিপ্ল্লবে শরিক হতে তিনি কৃষক-শ্রমিক-চাকুরিজীবী-ব্যবসায়ী-বুদ্ধিজীবী-সাংবাদিক সবাইকে আহ্বান জানিয়েছিলেন। এজন্যে তিনি তাঁর নিজের দলের নাম বদলিয়ে ফেললেন। সবার অংশগ্রহণের সুবিধার্থে নতুন নাম দিলেন 'বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ। সংক্ষেপে 'বাকশাল'।



এখন অবশ্য 'বাকশাল' নিয়ে অনেকেই অনেক মুখরোচক কথাবার্তা বলেন। বলে সুখ পান এবং এক ধরনের অাঁতেল সাজারও চেষ্টা করেন। কিন্তু ১৯৭৫-এ রকম অাঁতেল বা দাঁতেল বলে কেউ তেমন ছিলো না। ১৫ আগস্টের বর্বর হত্যাকা- যারা ঘটিয়েছিলেন তারা কোনো রকম অাঁতলামি জাহিরের উদ্দেশ্যে অর্থাৎ বাকশালের বিরোধিতার জন্যে উক্ত হত্যাকা- ঘটায়নি। তারা ১৯৭২ সাল থেকেই প্রস্তুতি শুরু করেছিলেন বঙ্গবন্ধু সরকারকে উৎখাতের জন্যে। দৈনিক প্রথম আলো ১১ আগস্ট '০৯ সংখায় এ সম্পর্কে একটি চাঞ্চল্যকর সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিলো। এতে বলা হয়, 'ইতিহাসের পর্দা ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে, সত্য উন্মোচিত হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সরকারের অগোচরে ১৯৭২ সালেই মেজর ফারুক রহমান ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসে গিয়েছিলেন অস্ত্র সরবরাহের ব্যাপারে আলোচনা করতে। ১৯৭৩ সালের ১১ জুলাই মার্কিন দূতাবাসে নাটকীয়ভাবে তিনি হাজির হন। তিনি তথ্য দেন যে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জন্যে অস্ত্র কিনতে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটির নাম 'আরমেন্ট প্রকিউরমেন্ট কমিটি'। কমিটির চেয়ারম্যান সেনাবাহিনীর ডেপুটি চীফ অব স্টাফ ব্রিগেডিয়ার জিয়াউর রহমান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকা-ের ৩৪ বছর পর মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের অবমুক্ত করা দলিল থেকে এ ধরনের তথ্য এ প্রথম জানা গেলো। এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে ওই সময়ের সেনাবাহিনীর প্রধান মেজর জেনারেল কেএম শফি উল্ল্যাহ বিস্ময় প্রকাশ করে প্রথম আলোকে বলেন, ১৯৭৩ সালে সেনাবাহিনীর অস্ত্র সংক্রান্ত কমিটির সভাপতি তিনিই ছিলেন, জিয়াউর রহমান নন। এবং ফারুক রশিদকে সমরাস্ত্র কেনাকাটা নিয়ে কথা বলতে মার্কিন দূতাবাসে পাঠানোর প্রশ্নই উঠে না।



সত্য যা তা হলো এই, বাকশাল ছিলো সমাজতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণা প্রসূত একটি ব্যবস্থা। যেজন্যে সিপিবি বা ন্যাপের মতো দলগুলো এ প্রক্রিয়ায় শরিক হয়। যারা বাকশালকে একদলীয় ব্যবস্থা বলে গাল দেয় তাদের জানা দরকার যে, কোনো সামাজতান্ত্রিক দেশেই দ্বিদল ত্রি-দল বলে কিছু থাকে না। সবচাইতে বড় কথা হলো, বঙ্গবন্ধুর প্রতি মানুষের অগাধ বিশ্বাস ছিলো যে, তিনি দেশ ও দশের ক্ষতিকর কিছু করবেন না। সে কারণেই এ ব্যবস্থার তখন তেমন কোনো বিরোধিতা হয়নি। আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যদের মধ্যে মাত্র দুজন_ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন এবং এম.এ.জি. ওসমানী এ উদ্যোগের বিরোধিতা করে পদত্যাগ করেন। রাজনৈতিক দলের মধ্যে 'জাসদ'-এর বিরোধিতা করলেও জনমনে বা মাঠে তার ছাপ তেমন লক্ষ্য করা যায়নি। বস্তুত এ অবস্থার সার্বিক প্রতিফলন দেখা গেলো তখন সর্বত্র। সারাদেশ থেকে সাড়া পাওয়া গেলো বঙ্গবন্ধুর আহ্বানের। দলে দলে লোক বাকশালে যোগদান করতে থাকেন। শ্রমিক-কৃষক-চাকুরিজীবী সবাই। সারাদেশ তখন এ প্রক্রিয়ার সমর্থনে উদ্বেলিত। ঢাকা শহরসহ সারাদেশ শ্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠলো। তৈরি হলো অসংখ্য তোরণ। এ যেনো আরেক গণঅভ্যুত্থান। এ অভ্যুত্থানে ভয় পেয়ে গিয়েছিলো কি আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদী চক্র ও তাদের এদেশীয় দোসর চক্র? তারই প্রতিফলন কি ঘটেছিলো ১৫ আগস্টের নির্মম হত্যাকা-ে?



এখানে ছোট দুটি তথ্যের কথা অবশ্য আমি বলতে চাই। এর সাথে ১৫ আগস্টের ঘটনার যোগসূত্র আছে কি নেই তাও আমি জানি না। আমি তখন ঢাকার বাসাবোতে এক দোকানে রাত কাটাতাম। একদিন ভোরে দরজা খুলে দেখি দোকানের ভেতরে দরজার কাছে কতগুলো লিফলেট পড়ে আছে। রাতে দরজার ফাঁক দিয়ে কেউ ফেলে গেছে সম্ভবত। লিফলেটের ভাষা ছিলো এ রকম, গণবাহিনী আপনার আশপাশেই আছে। আপনি তাকে সাহায্য করুন। একদলীয় বাকশাল সরকারকে উৎখাত করুন। এটি খুব সম্ভব ১৫ আগস্টের একমাস কি দেড় মাস আগের ঘটনা। দ্বিতীয় বিষয়টি ছিলো এই, ১৫ আগস্টের বেশ কিছুদিন আগে থেকেই আমরা প্রতিরাতে গোলাগুলির আওয়াজ শুনতাম। পরের দিন এর ব্যাখ্যা জানতে চাইলে লোকজন বলতো যে, সামরিক বাহিনীতে নাইট প্যারেড হচ্ছে। কেউ কেউ অবশ্য এমনও বলত যে, গণবাহিনীর সশস্ত্র ক্যাডারদের সাথে পুলিশের বিক্ষিপ্ত গোলাগুলির কারণেই এমনটি হচ্ছে। উপস্থিত এসব ব্যাখ্যাকে সে সময় সত্য বলে মনে হলেও পরে বুঝেছি যে ওসবই ছিলো পরিকল্পিত। ১৫ আগস্টের রাতে গোলাগুলি হলে যেনো মানুষ তাকে স্বাভাবিক বলে মনে করে সেজন্যেই তৈরি করা হয়েছিলো ওই নাটক।



অনেক পরে, বিশেষ করে দৈনিক আজকের কাগজ বের হওয়ার পর আমরা ১৫ অগস্ট সম্পর্কে অনেক সাহসী লেখা পড়ার সুযোগ পাই। এর আগে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অথবা ১৫ আগস্ট সম্পর্কে কথা বলা ছিলো এক রকম নিষিদ্ধ। আমার এখনো মনে পড়ে লেঃ কর্নেল এম এ হামিদের (স্টেশন কমান্ডার) লেখা 'পনেরই আগস্ট যা দেখেছি' এবং কর্নেল জাফায়াত জামিলের '১৫ আগস্টের কিছু কথা' শিরোনামের লেখা দুটির কথা। এই দুটি লেখা আজকের কাগজের ৯১/৯২ সালের আগস্ট মাসে প্রকাশিত হয়। আমি লেখা দুটো বহুবার পড়েছি এবং বলা যায় পড়তে পড়তে মুখস্থই করে ফেলি প্রায়। লেখা দুটোর দুই জায়গায় আমার চোখ আটকে যায়। লেঃ কর্নেল (অবঃ) হামিদ লিখেন, 'অতঃপর ডালিম চীফ অপ স্টাফের কামরায় ঢুকে তাকে জোরের মুখে নিয়ে যায় ক্যান্টনম্যান্টে। পেছনে জিয়া। জিয়া বললেন, ঈড়সব ড়হ উধষরস রহ সু পধৎ. অপরদিকে কর্নেল (অবঃ) শাফায়াত জামিল লিখেন, ব্রিগেডে যাওয়ার পথে আমি জিয়াউর রহমানের বাসভবনে যাই। মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকেই আমরা অনেক দিন একসাথে ছিলাম। আমাকে দেখে জিয়া অর্ধেক শেভরত অবস্থায় বললেন, 'প্রেসিডেন্ট ইজ ডেড। সো হোয়াট, ভাইস প্রেসিডেন্ট ইজ দেয়ার। ইউ সুড আফ হোল্ড দি কনস্টিটিউশন। গেট ইউর ট্রুপ্স রেডি।' '৭৫-এর এ দুজন সেনা কর্মকর্তার উপরোক্ত বক্তব্য ছিলো খুবই ইঙ্গিতপূর্ণ, বলাই বাহুল্য।



কিন্তু এসবতো হলো পরের কথা। পরবর্তী ভাষ্য। আমি ফিরে যাচ্ছি আবারও পুরানো কথামালায়। উপরে আমি নিজস্ব পর্যবেক্ষণের যে দুটি ঘটনার কথা বললাম তাকে জড়িয়ে ১৫ আগস্টের পট পরিবর্তনের চিন্তা আমাদের মাথায় আসেনি। আগেই বলেছি ঢাকা শহর তখন ছিলো আনন্দমুখর। যতোটুকু স্মরণে আসে তাতে বলতে পারি যে, ১৫ আগস্টের আনন্দ-আয়োজনের ব্যাপ্তি ছিলো খুবই ব্যাপক। ১৬ তারিখ বঙ্গবন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবেন এ জন্যে জোর প্রস্তুতি ছিলো সর্বত্র। পত্রিকাগুলো বৃহৎ কলেবরে লেখা প্রকাশ করে। আমরা তা পড়েছি। অতঃপর দিনশেষে রাত হয়েছে। আমরা ছিলাম ঘুমের ঘোরে। সকালে একজন জোরে জোরে দরজায় ধাক্কা দিতে থাকলো। উঠেন, শেখ সাহেবকে মেরে ফেলেছে, ওঠেন। আবার ধাক্কা। ধাক্কার পর ধাক্কা। আরে ওঠেন, শুনেন রেডিওতে কি বলছে, উঠেন। হ্যাঁ উঠেছি। ধড়মড় করে উঠেই শুনেছি রেডিওর সেই অবিশ্বাস্য ঘোষণা। 'স্বৈরাচারী শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে' ইত্যাদি ইত্যাদি। শুনে মনে হয়েছে, হঠাৎ উদয় হওয়া কোনো পাগল যেনো একটানা প্রলাপ বকে চলেছে আশপাশে কোথাও। প্রবলভাবে কানে বিধছে কার প্রলাপ-ধ্বনি।



সারাদিন গেছে আশঙ্কায়, অবিশ্বাসে। সত্যিই কি মারা গেছেন শেখ মুজিব? এ-ও কি সম্ভব? কিছুতেই বিশ্বাস হতে চাইছিলো না যে, বঙ্গবন্ধু মারা গেছেন। একসময় সব জল্পনা-কল্পনার অবসান হলো। জানা গেলো, স্পরিবারেই নিহত হয়েছেন বঙ্গবন্ধু। দেখতে দেখতে সারা ঢাকা শহর প্রপাগা-ায় ভরে গেলো। জানেন, আজই শেখ মুজিবের রাজা হওয়ার কথা ছিলো। তার বাসায় ইয়া বড় এক মুকুট পাওয়া গেছে। তার ছেলে শেখ জামালকে সিএনসি ঘোষণা দেয়ার কথা ছিলোতো আজই। এদেশকে ভারতের অঙ্গরাজ্য ঘোষণা দেয়ার কথা ছিলো আজ দুপুর ১২টার দিকে। জানেন, এজন্যে ৪০টা ভারতীয় বিমান এসে ঢাকা বিমানবন্দরে নামার কথা ছিলো আজই সকাল ৯টায়। এ রকম আশ্চর্য সব প্রপাগান্ডায় কান ঝালাপালা হওয়ার উপক্রম হলো আমার। মনে হলো, এই দেশে হঠাৎই যেনো আমি নতুন এসে পড়েছি, আগে থেকে যে দেশ সম্পর্কে আমার কোনোই ধারণা ছিলো না। কারা ছড়িয়েছিলো ওইসব প্রপাগান্ডা? কেনো ছড়িয়েছিলো? তবে কি সামরিক বাহিনীর সাথে বিশেষ কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠীরও যোগসূত্র ছিলো, যারা বাহির থেকে জনগণের দৃষ্টিকে দ্রুত ও পরিকল্পিতভাবে অন্যদিকে সরিয়ে দেয়ার জন্যে কাজ করছিলো? এই প্রশ্নের উত্তর তাৎক্ষণিকভাবে সেদিন যেমন পাইনি, তেমনি আজ এতো বছর পরও তা পাওয়া সম্ভব হয়ে ওঠেনি আর।



 



 



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৪৯৪০২৮
পুরোন সংখ্যা