চাঁদপুর, বুধবার ৩০ অক্টোবর ২০১৯, ১৪ কার্তিক ১৪২৬, ১ রবিউল আউয়াল ১৪৪১
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৫৭-সূরা হাদীদ


২৯ আয়াত, ৪ রুকু, মাদানী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


১৪। মুনাফিকরা মু'মিনদিগকে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিবে, 'আমরা কি তোমাদের সঙ্গে ছিলাম না? তাহারা বলিবে, 'হ্যাঁ, কিন্তু তোমরা নিজেরাই নিজদিগকে বিপদগ্রস্ত করিয়াছ। তোমরা প্রতীক্ষা করিয়াছিলে, সন্দেহ পোষণ করিয়া ছিলে এবং অলীক আকাঙ্ক্ষা তোমাদিগকে মোহাচ্ছন্ন করিয়া রাখিয়াছিল, অবশেষে আল্লাহর হুকুম আসিল। আর মহাপ্রতারক তোমাদিগকে প্রতারিত করিয়াছিল আল্লাহ সম্পর্কে।'


 


 


 


নিজের হাত ও পায়ের উপর যে ভরসা করে সে ঠকে না। -জন গে।


 


 


যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে চড়ুই পাখির ন্যায় একটি ছোট্ট পাখিকেও হত্যা করে, আল্লাহ সেই হত্যা সম্বন্ধে তাকে প্রশ্ন করবেন।


 


 


ফটো গ্যালারি
বঙ্গবন্ধুর সাংস্কৃতিক মানস
পীযূষ কান্তি বড়ুয়া
৩০ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


মানুষের মনন-মানস নির্মাণে কৃষ্টি ও সংস্কৃতির অবদান অসামান্য। উন্নত কৃষ্টি ও সংস্কৃতির বলে নির্মিত চেতনার মানুষ অন্য অনেকের জন্যে আলোর দিশারী হয়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেই রকম এক বিশ্বজয়ী আলোক দিশারী যাঁর মানস-চেতনা নির্মিত হয়েছিলো এদেশের সোঁদা মাটির গন্ধ আর কোলকাতার আধুনিক নাগরিক সংস্কৃতির অপূর্ব মিশেলে। ছোটবেলায় বঙ্গবন্ধু গুরুসদয় দত্তের দেশপ্রেম নির্মাণকারী ব্রতচারী নৃত্যের কুশলতা অর্জন করেন। ঊনিশশো বত্রিশ সালে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনকে বেগবান করা ও বাঙালির মধ্যে জ্ঞান, শ্রম, একতা ও দেশপ্রেমের দীক্ষা দানের জন্যে উদ্ভাবিত এই ব্রতচারী নৃত্যই পরবর্তীতে শেখ মুজিবের চেতনায় রোপন করে বাঙালি সংস্কৃতির বীজ। গুরুসদয় দত্তের বাঙালিয়ানার মন্ত্র :



 



''ষোল আনা বাঙ্গালি হ'



বিশ্ব মানব হবি যদি



শাশ্বত বাঙ্গালি হ'।''



 



শোণিতে ধারণ করেই শেখ মুজিব হয়ে উঠেছেন বঙ্গবন্ধু।



 



বঙ্গবন্ধুর প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাজীবন কাটে গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুর জেলার আলো-বায়ু-জলে। ফলে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ-কাব্যে উঠে এসেছে মৃত্তিকালগ্ন শেকড়ের শব্দ। নাগরিক শব্দের আয়োজনে সেইসব শেকড়ের সোঁদা-মাটির ঘ্রাণমাখা শব্দ যখন মিশে যায় একাত্ম হয়ে তখন মনে হয় কে যেন প্রাণের গভীরে ডাক দিয়ে গেলো। তাঁর সেই গভীর ডাকে ফুটে ওঠে তাঁর চরিত্রের অসামান্য নেতৃত্বগুণ, অবিসংবাদিত হৃদ্-নৈকট্য। ফলে যে একবার তাঁর কাছে এসেছে, সানি্নধ্য পেয়েছে, তার পক্ষে দূরে সরে যাওয়া প্রায় অসম্ভব ছিলো। 'দাওয়াল'দের বেদনাকে কাছ থেকে দেখে শেখ মুজিব অনুধাবন করেছিলেন বাঙালির সাংস্কৃতিক মুক্তির। ফলে তাদের হয়ে অধিকার আদায়ে তিনি দৃঢ়তায় অটল ছিলেন তারুণ্যে।



 



বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঊনিশশো বিয়ালি্লশ সালের দিকে কলকাতা এসে ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন। অচেনা এক ভিনদেশী রচিত স্মৃতিকথা হতে পাওয়া যায়-তখন মধ্য চলি্লশের দিকে কলকাতার সাংস্কৃতিক সমুদ্র অত্যন্ত সমৃদ্ধ ছিলো। সেই সাংস্কৃতিক সমুদ্রে যারাই অবগাহন করেছেন-তারাই হয়ে উঠেছেন বিশাল মাপের মানুষ। তখন কলকাতা মাতাতেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ, অহীন্দ্র চৌধুরী, কানন বালা, শিশির ভাদুড়ী, জগন্ময় মিত্র এবং পরে কাজী নজরুল ইসলাম প্রমুখ। শেখ মুজিব এ রকম একটা সাংস্কৃতিক সমুদ্রের উত্তরাধিকারে এসে নিজের অন্তর-সত্তার নির্মাণকে আরো মার্জিত এবং দৃঢ় করে নিলেন। এরই মধ্যে তার রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক দীক্ষা নেয়া হয়ে গেছে। তাঁর রাজনৈতিক গুরু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। আবার মাঝে মাঝে শেখ মুজিব বামপন্থী তাত্তি্বক আবুল হাশিমের রাজনৈতিক ক্লাসেরও ছাত্র ছিলেন। আবুল হাশিমের জবানিতে পাওয়া যায়-শেখ মুজিব তাত্তি্বক ক্লাস অপেক্ষা কর্মকে প্রাধান্য দিতেন বেশি।



 



অচেনা ভিনদেশী লেখকের স্মৃতি কথায় পাওয়া যায়, তখন চাঁদপুর ঘাট হয়ে গোয়ালন্দ দিয়ে কলকাতা যেতে হতো তাঁকে প্রায়শই। সে লেখক চট্টগ্রামের পড়ালেখার পাট চুকিয়ে কলকাতার ইংরেজি স্কুলে ভর্তি হলেন। যাত্রা পথে চাঁদপুর ঘাটে থেমে মিষ্টি কিনে নিয়ে যেতেন। চাঁদপুর ঘাট তখন অত্যন্ত প্রাণবন্ত ছিলো। সে তুলনায় গোয়ালন্দ ঘাট অত্যন্ত সাদামাটা ছিলো। যে সময়ের কথা অবতারণা করা হচ্ছে সে সময় শেখ মুজিব লিকলিকে হাল্কা পাতলা গড়নের ছিলেন। পরনে কালো শেরওয়ানী আর পাঞ্জাবী। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে শেখ মুজিব মহাত্মা গান্ধীর অহিংসনীতির সমর্থক এবং নেতাজী সুভাষ বসুর অসামপ্রদায়িক চেতনার অনুসারী ছিলেন। যদিও এ দুটি ছিল বিপরীত ধারা, তবুও শেখ মুজিবের মধ্যে অত্যন্ত সুযতভাবে ও সুসংহতভাবে অহিংসা আর অসামপ্রদায়িক সহিংস আন্দোলন শিকড় গেঁড়ে বসে। ফলশ্রুতিতে শেখ মুজিব একদিকে যেমন অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়ে তৎকালীন পাকিস্তানকে অচল করার দূরদর্শিতা দেখান তেমনি অন্যদিকে যার যা কিছু আছে তা নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি প্রয়োজনে যে রক্ত বাঙালি বিসর্জন দিয়েছে তার চেয়ে আরো অধিক রক্ত বিসর্জনের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। এতে শেখ মুজিবের চেতনা ও চরিত্রের দৃঢ়তা অত্যন্ত নিপুণভাবে পরিস্ফূটিত হয়।



 



বঙ্গবন্ধুর সাংস্কৃতিক মানস অত্যন্ত সুদৃঢ় ও উন্নত ছিলো বলেই ঊনিশশো ছাপ্পান্ন সালে তাঁর স্বল্পায়ু মন্ত্রীত্বের কালে তিনি ঢাকায় চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর এ সিদ্ধান্ত এতোটাই দূরদর্শী ছিলো যে-এ প্রতিষ্ঠানটি পরবর্তীতে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের বিকাশে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে। পাশাপাশি স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের নাটক মঞ্চায়নে বাধা অপসারণের জন্যে তিনি বিনোদন কর সম্পর্কিত জটিলতা দূর করেন। বঙ্গবন্ধুর এ বদান্যতা তৈরি হয় তাঁর সাংস্কৃতিক মানসের নির্মাণ সুদৃঢ় ছিলো বলেই। মুক্তিযুদ্ধের পূর্বের উত্তাল দিনগুলোতে যখন সত্তরের দশকে আইয়ুব শাহী রবীন্দ্রসঙ্গীত চর্চাকে নিষিদ্ধ করেছিলো সামপ্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তখন বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে রবীন্দ্রসঙ্গীত চর্চার পক্ষে জোরালো অবস্থান ব্যক্ত করেন এবং নিজেই বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে রবীন্দ্রনাথের গানকে নির্বাচিত করেন।



 



রাজনীতির ক্ষেত্রে বাঙালি সংস্কৃতি ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ তাঁকে এতোটাই আচ্ছন্ন করেছিলো যে, তিনি স্বাধীনতার অনেক আগে ১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর স্মরণ সভায় প্রকাশ্যে বলেন-এ পূর্ব বাংলা ভূখ-ের নাম হবে বাংলাদেশ। এই চেতনার বীজ উপ্ত হয়েছিল ভাষা আন্দোলনের প্রথম পর্বে ঊনিশশো আটচলি্লশ সালের দিকে। এসময় উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার প্রতিবাদে বাঙালি সংস্কৃতির আপাদমস্তক তরুণ শেখ মুজিবুর রহমান নেমে পড়েন আন্দোলনে। এই প্রগাঢ় বাঙালি সংস্কৃতির চেতনাই তাঁকে উদ্বুদ্ধ করেছিল চীন সফর ও জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ প্রদানের মাধ্যমে ভাষা হিসেবে বাংলার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায়।



 



বঙ্গবন্ধুর প্রিয় খাদ্যের তালিকায় বাঙালি ও গ্রামীণ খাদ্যের সমারোহ যেমন বেশি ছিল তেমনি তিনি আবহমান বাঙালি পরিবারের মমত্ববোধ ও মূল্যবোধকে ধারণ ও লালন করে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে একসাথে খাবার গ্রহণে অভ্যস্ত ছিলেন। পাশাপাশি ইসলামিয়া কলেজে পড়াকালীন কলকাতার সাংস্কৃতিক সমুদ্রে তাঁর অবগাহন তাকে একজন প্রকৃত অসামপ্রদায়িক চেতনাধারী হিসেবে গড়ে তোলে।



এর ফলশ্রুতিতে ঊনিশশো তেষট্টি সালে তিনি আওয়ামী মুসলিম লীগকে আওয়ামী লীগে পরিণত করেন।



 



বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিকাশে তাঁর সাংস্কৃতিক মানস-চেতনার নির্মাণ এতোটাই সহায়ক ছিলো যে, তিনি স্বপ্ন দেখেছেন অসামপ্রদায়িক, বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রে প্রতিষ্ঠিত এক স্বাধীন ভূ-খ- 'বাংলাদেশ' এর। তাই উপরোক্ত চারটি নিয়ামকের আদর্শকে বলা হয় মুজিববাদ।



 



বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব একজন আদর্শ ভাষণ-বক্তা এবং কুশল-কাব্যের পারদর্শী নির্মাতা। তাঁর শব্দ চয়ন, প্রক্ষেপিত শব্দের আবেগ ও ধ্বনিময়তা এবং সর্বোপরি তাঁর অনুপম ব্যক্তিত্বে তাঁর মধ্য চলি্লশের বিশাল সাংস্কৃতিক সমুদ্রের অতল নির্যাসে সিক্ত হওয়ার সৌভাগ্য তাঁকে পরিণত করেছে এক কিংবদন্তীর অসামান্য ঐন্দ্রজালিক ইতিহাসের নির্মাতারূপে। বাঙালির মানস-চেতনায় সঙ্গত কারণেই শেখ মুজিব চির বিস্ময়, চির অমস্নান।



 



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
১৪৪২৬২
পুরোন সংখ্যা