চাঁদপুর, বুধবার ৩০ অক্টোবর ২০১৯, ১৪ কার্তিক ১৪২৬, ১ রবিউল আউয়াল ১৪৪১
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৫৭-সূরা হাদীদ


২৯ আয়াত, ৪ রুকু, মাদানী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


১৪। মুনাফিকরা মু'মিনদিগকে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিবে, 'আমরা কি তোমাদের সঙ্গে ছিলাম না? তাহারা বলিবে, 'হ্যাঁ, কিন্তু তোমরা নিজেরাই নিজদিগকে বিপদগ্রস্ত করিয়াছ। তোমরা প্রতীক্ষা করিয়াছিলে, সন্দেহ পোষণ করিয়া ছিলে এবং অলীক আকাঙ্ক্ষা তোমাদিগকে মোহাচ্ছন্ন করিয়া রাখিয়াছিল, অবশেষে আল্লাহর হুকুম আসিল। আর মহাপ্রতারক তোমাদিগকে প্রতারিত করিয়াছিল আল্লাহ সম্পর্কে।'


 


 


 


নিজের হাত ও পায়ের উপর যে ভরসা করে সে ঠকে না। -জন গে।


 


 


যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে চড়ুই পাখির ন্যায় একটি ছোট্ট পাখিকেও হত্যা করে, আল্লাহ সেই হত্যা সম্বন্ধে তাকে প্রশ্ন করবেন।


 


 


ফটো গ্যালারি
মানবসেবায় সিস্টার নিবেদিতা
রহিমা আক্তার মৌ
৩০ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


বাংলার মহিলাদের ভাগ্য উন্নয়নের কাজে যে কজন নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন তাদের মাঝে সিস্টার নিবেদিতা একজন। ১৮৬৭ সালের ২৮ অক্টোবর উত্তর আয়ারল্যান্ডর ডানগ্যানন শহরে জন্মগ্রহণ করেন মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেল। যাকে এখন সবাই সিস্টার নিবেদিতা বলে জানে চিনে। পিতার নাম স্যামুয়েল রিচমন্ড নোবেল। পিতার নিকট শিক্ষা পান যে মানব সেবাই ঈশ্বর সেবা। পিতার কথা তাঁর পরবর্তী জীবনেও গভীর প্রভাব বিস্তার করে। মার্গারেট সঙ্গীত ও শিল্পকলার বোদ্ধা ছিলেন। মাত্র ১০ বছর বয়সে তিনি পিতৃহীন হন। মায়ের নাম ছিল মেরি ইসাবেলা। মার্গারেটের বাবা মারা যাওয়ার পর তাঁর দাদামশাই তথা আয়ারল্যান্ডের বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী হ্যামিলটন তাঁকে লালনপালন করেন। লন্ডনের স্কুলে মার্গারেটের বিদ্যাশিক্ষা।



পিতা-পিতামহ ছিলেন বংশানুক্রমিকভাবে ধর্মযাজক। সুতরাং ঈশ্বর বন্দনা এবং ধমের্র গুরুত্বের মধ্যেই মার্গারেটের জন্ম, শৈশব- কৈশোর অতিক্রান্ত। ১৭ বছর বয়সে শিক্ষা জীবন শেষ করে কর্ম জীবনে প্রবেশ করতে হয় তাকে। ১৮৮৪ সাল থেকে ১৮৯৪ সাল পর্যন্ত দশ বছর তিনি শিক্ষকতা করেন। দুবছরের জন্যে কেসউইকের একটি প্রাইভেট স্কুলে পড়ান। এরপরে একে একে রেঙ্হ্যামে, চেস্টারে এবং লন্ডনের উইম্বলডনে তিনি শিক্ষকতা করেন। ছোটদের পড়িয়ে বড় আনন্দ পান। শুধু পড়াশোনা নয়, তাঁর মনে হল, শিশুমনের সর্বাঙ্গীণ বিকাশে অঙ্কনশিল্পেরও প্রয়োজনীয়তা আছে। তাই রং-তুলি নিয়ে ছোটদের সঙ্গে ছবি আঁকাতেও মেতে ওঠেন তিনি। স্কুলের কার্য পরিচালনা ও পড়াশোনার পাশাপাশি মার্গারেট চালিয়ে যাচ্ছিলেন শিল্প ও সাহিত্যচর্চাও। লন্ডনের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তাঁর রচনা প্রকাশিত হতে থাকে। শিক্ষা সম্বন্ধে সংবাদপত্রে প্রবন্ধ লিখলেন তিনি, সকলকে শিক্ষার আদর্শ বিষয়ে অবহিত করার জন্য। লেখার সঙ্গে সমান তালে চলছিল বক্তৃতাও। ১৮৯৫ সালে উইম্বলডনে নিজে 'রাস্কিন স্কুল' উদ্বোধন করেন। তিনি এই স্কুলে নতুন শিক্ষাপদ্ধতি ব্যবহার করেন। শিক্ষিকা হিসেবে তিনি বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। এ সময় তিনি একজন ওয়েলশ যুবকের কাছে বিবাহের প্রতিশ্রুতি পান, কিন্তু অচিরে সে যুবক মারা যান।



 



১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দ স্বামী বিবেকানন্দ লন্ডনে বেদান্ত প্রচারে ব্যস্ত। সে সময় মার্গারেট নোবলও এসেছেন লন্ডনে শিক্ষিকার চাকরি নিয়ে। নভেম্বর মাসে লন্ডনের এক পরিবারের পারিবারিক আসরে মার্গারেট স্বামী বিবেকানন্দের বেদান্ত দর্শন ব্যাখ্যা শোনেন। বিবেকানন্দের ধর্মব্যাখ্যা ও ব্যক্তিত্বে তিনি মুগ্ধ হন। ব্যক্তিক জীবনের নানা টানাপোড়েনের দুঃসময় চলছিল মার্গারেটের।



বিবেকানন্দের আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব এবং ভারতের আধ্যাত্ম দর্শনের মর্মবাণী এই আইরিশ মহিলাকে এতই উদ্বুদ্ধ এবং অনুপ্রাণিত করে যা তাকে মাতৃভূমি থেকে সুূদূূর ভারতবর্ষ পর্যন্ত টেনে নিয়ে আসে। বিবেকানন্দের বাণী তাঁর জীবনে এতটাই গভীর প্রভাব বিস্তার করে যে তিনি ভারতকে তাঁর কর্মক্ষেত্ররূপে বেছে নেন। তিনিই প্রথম পাশ্চাত্য নারী যিনি ভারতীয় সন্ন্যাসিনীর ব্রত গ্রহণ করেছিলেন। ১৮৯৮ সালে ২৮ জানুয়ারি মার্গারেট ভারতে আসেন। ঐ বছর ২৫ মার্চ মার্গারেট ব্রহ্মচর্য গ্রহণ করলে স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর নামকরণ করেন 'নিবেদিতা'। নিবেদিতা হয়ে ওঠার অনেক আগেই সুশিক্ষিত, মার্জিত রুচির মার্গারেট আপন অন্তরে অনুভব করেছিলেন যে, প্রকৃত শিক্ষার ভিত্তি হল ত্যাগ ও সেবা। বিশ্বমানবের জন্য আশৈশব তাঁর আকুল আকুতি। এমনকী গির্জার সঙ্গেও মার্গারেট যুক্ত হয়েছিলেন মানব সেবার জন্যই।



 



১৮৯৮ সালের নভেম্বর মাসে তিনি কলকাতায় একটি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন। ১৮৯৯ সালের জুলাই মাসে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে যান এবং সেখানে এক বছর ধরে গণসংযোগের মাধ্যমে বিদ্যালয়ের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেন। এর সঙ্গে সঙ্গে তিনি নানা মানবকল্যাণমূলক কাজের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। সকল বণের্র ভারতীয় নারীর জীবনযাত্রার উন্নতির লক্ষ্যে তিনি কাজ শুরু করেন। এই সময় বিবেকানন্দের কাছে ভারতের ইতিহাস, দর্শন, সাহিত্য, জনজীবন, সমাজতত্ত্ব, প্রাচীন ও আধুনিক মহাপুরুষদের জীবনকথা শুনে মার্গারেট ভারতকে চিনে নেন। ভারতে আসার কয়েক দিন পর রামকৃষ্ণ পরমহংসের স্ত্রী সারদা দেবীর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জগদীশচন্দ্র বসু ও তাঁর স্ত্রী অবলা বসু, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ওকাকুরা কাকুজো প্রমুখ তৎকালীন সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ছিলেন নিবেদিতার বন্ধুস্থানীয়। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে 'লোকমাতা' আখ্যা দেন।



ভগিনী নিবেদিতা শুধু সমাজ কর্মেই নিবেদিত ছিলেন না সৃষ্টিশীল আঙ্গিনায়ও তার বিচরণ ছিল উল্লেখ করার মতো। তার সিংহভাগ লেখা স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে। 'স্বামীজীকে যেরূপ দেখিয়াছি, স্বামীজীর সঙ্গে হিমালয়ে, মাতৃরূপা কালী' তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের অন্যতম। তাঁর লেখা উল্লেখযোগ্য বইগুলি হল কালী দ্য মাদার, ওয়েব অফ ইন্ডিয়ান লাইফ, ক্রেডল টেলস অফ হিন্দুইজম, দ্য মাস্টার অ্যাজ আই শ হিম ইত্যাদি। এসবের পাশাপাশি নিবেদিতা মডার্ন রিভিউ, দ্য স্টেটসম্যান, অমৃতবাজার পত্রিকা, ডন, প্রবুদ্ধ ভারত, বালভারতী প্রভৃতি পত্রিকায় ধর্ম, সাহিত্য, রাজনীতি, সমাজতত্ত্ব, শিল্প ইত্যাদি বিষয়ে প্রবন্ধ লিখতেন।



ভগিনী নিবেদিতা ভারতের সবচেয়ে প্রভাবশালী মহিলাদের মধ্যে অন্যতম। তাঁর বই মাতৃরূপা কালী পড়ে অনুপ্রাণিত হয়ে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর 'ভারতমাতা' ছবিটি অাঁকেন। বিধাননগরে অবস্থিত পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের ২০১০ সালে নির্মিত ভবনটি নিবেদিতার নামে নামাঙ্কিত। তামিলনাড়ুর চেন্নাইতে ভগিনী নিবেদিতার প্রতিষ্ঠিত অ্যাকাডেমিটির নাম রাখা হয়েছে সিস্টার নিবেদিতা অ্যাকাডেমি। তাঁর নামে একাধিক বিদ্যালয় ও কলেজের নামকরণ করা হয়েছে। ১৯৬৮ সালে ভারত সরকার তাঁর স্মৃতিরক্ষার্থে ৪.০৬/২.২৮ সেন্টিমিটারের একটি ডাকটিকিট প্রকাশ করে।



১৯০২ সালের জুলাই মাসে বিবেকানন্দের মৃত্যুর পর নিবেদিতা রামকৃষ্ণ মতাদর্শ পরিত্যাগ করেন এবং আধ্যাত্মিক চিন্তা-ভাবনা ছেড়ে তিনি ভারতের বিট্রিশ বিরোধী আন্দোলনে আত্মনিয়োগ করেন। ১৯০৫ সালে রবীন্দ্রনাথ বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনে সবাইকে আহ্বান করলে ভগিনী নিবেদিতাও এর অংশীদার হয়ে পড়েন। নানা উপায়ে এই আন্দোলনের বিপ্লবীদের তিনি সাহায্য- সহযোগিতাও করতেন। ১৯০৭ থেকে ১৯০৯ সাল পর্যন্ত ইংল্যান্ডে অবস্থানকালে তিনি একই লক্ষ্যে কাজ করেন। ১৯০৯ সালের জুলাই মাসে তিনি ভারতে প্রত্যাবর্তন করেন। এ দেশের সমাজ-সভ্যতা-সংস্কৃতি-দর্শনের মধ্যে নিজেকে বিলিয়ে দিলেও এখানকার ঝলবায়ু, ভৌগোলিক এবং প্রাকৃতিক প্রতিবেশ তার জন্য খুবই বেশি অনুকূলে ছিল না। ভারতের গ্রীষ্মপ্রধান আবহাওয়ায় অতিরিক্ত পরিশ্রম করার ফলে কয়েক বছরের মধ্যেই অসুস্থ হয়ে পড়েন নিবেদিতা। হাওয়া বদলের জন্য জগদীশচন্দ্র বসু ও তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে দার্জিলিঙে বেড়াতে যায়। ১৯১১ সালের ১৩ অক্টোবর মাত্র ৪৪ বছর বয়সে দার্জিলিঙে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন সিস্টার নিবেদিতা।



 



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
১৩৫২৯৫
পুরোন সংখ্যা