চাঁদপুর, বুধবার ১১ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৩ রবিউস সানি ১৪৪১
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • চাঁদপুর শহরে গৃহপরিচারিকার ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৫৯-সূরা হাশ্‌র


২৪ আয়াত, ৩ রুকু, মাদানী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


 


৫। তোমরা যে খর্জুর বৃক্ষগুলি কর্তন করিয়াছ এবং যেগুলি কা-ের উপর স্থির রাখিয়া দিয়াছ, তাহা তো আল্লাহরই অনুমতিক্রমে; এবং এইজন্য যে, আল্লাহ পাপাচারীদিগকে লাঞ্ছিত করিবেন।


 


 


আকৃতি ভিন্ন ধরনের হলেও গৃহ গৃহই। -এন্ড্রি উল্যাং।


 


 


স্বদেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ।


 


 


ফটো গ্যালারি
অপসংস্কৃতির কালো থাবা
মুহাম্মদ ফরিদ হাসান
১১ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


কতগুলো ঘটনায় মন বিষণ্ন হয়ে আছে। আমরা সুন্দর সমাজ বিনির্মাণের যে স্বপ্ন দেখি_তার সমান্তরালে রয়েছে অসংখ্য শকুনের উৎপাত। যদিও দুধভাতে উৎপাত নতুন কিছু নয়, এর বিস্তার হাজার হাজার বছর। একই সাথে প্রতিবাদের ইতিহাসও সুদীর্ঘ। ভালোর সাথে মন্দের এই সংঘর্ষের মধ্য দিয়েই সভ্যতা এতদূর এসে পেঁৗছেছে। পৃথিবী অনেক বদলেছে। পরিবর্তন হয়েছে মানুষের চিন্তাধারা। তবু কখনো কখনো অসভ্যতার দুর্গন্ধ এত তীব্র হয় যে, স্থির থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে।



 



মন খারাপের প্রথম ঘটনাটি বলি। দুদিন আগে হাঁটতে বের হয়েছি। হঠাৎ দেখলাম একটা ছেলেকে বিদ্যুতের খুঁটির সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে। তার চারপাশে দশ-পনেরজন তরুণ। প্রথমে ভেবেছি ছিঁচকে চোর হবে। জামা-জুতা চুরি করে ধরা পড়েছে। কাছে আসতেই ভুল ভাঙলো। জন্মদিনের অনুষ্ঠান হচ্ছে। যে ছেলেটির জন্মদিন তাকেই বেঁধে রাখা হয়েছে! একটু পর তার গায়ে-মুখে ময়দা ঢেলে দেয়া হল। ভাঙা হল ডজনখানেক ডিম। কেক এনে মুখে মারা হল। দু-একজন কিল-ঘুষিও দিল। ওদের একজনকে ক্ষুব্ধস্বরে বললাম, এভাবে জন্মদিন পালন করে কেউ? যাকে বললাম সে হাসলো। বলল, এটা জন্মদিন পালনের নতুন স্টাইল! যার জন্মদিন পালন হচ্ছে তাকেও অখুশি দেখলাম না। সামনে এগিয়ে যেতে যেতে ভাবছি, উদ্যাপন ও উন্নাসিকতার মধ্যে তফাৎ ওদের চোখে পড়ছে না। তাই একজনকে বেঁধে, আটা-ময়দা-ডিম মেখে, গালাগালি করে জন্মদিন পালন করা হচ্ছে! এই যে অপসংস্কৃতির সূচনা তার শেষ নিশ্চয়ই আরো দীর্ঘতর হবে। এমনটা ভেবে মন ভালো থাকার কথা নয়।



 



উন্নাসিকতার প্রসঙ্গে 'রোদ্দর রায়'-এর নামটা যুক্ত করি। রবীন্দ্রনাথের একটি গান আছে 'সেদিন দুজনে দুলেছিনু বনে'। এ গানটি গেয়েছেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায় থেকে শুরু করে অনেক গুণী শিল্পী। রোদ্দুর রায় এই গানটিকে চরম বিকৃত করেই কেবল থামেননি, এরসাথে অশ্রাব্য গালি যুক্ত করে গেয়েছেন। গানটি রীতিমত ফেসবুক দুনিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। আজকের এক শ্রেণির তরুণরাই সেটা ভাইরাল করেছে। অনেকেই ভেবেছে গানটি রোদ্দুর রায়েরই লেখা। কিন্তু ওরা রবীন্দ্রনাথ পড়েনি, গানও শোনেনি। তাই এই চরম উন্নাসিকতার বিষয়টি তারা ধরতেই পারেনি। রোদ্দুর রায়ের গানটি শুনে শেয়ার করে তারা আনন্দ পাচ্ছে। কিন্তু বুঝতে পারছে না যে, এ আনন্দটা বিকৃত আনন্দ। যা ভব্যতা ও শুদ্ধতার পরিপন্থী। এখন ইউটিউবে গানটির কথা লিখে সার্চ দিলে আগে রবীন্দ্রনাথ নন, রোদ্দুর রায়ের ভিডিও পাওয়া যায়! বিকৃত আনন্দের ধারকদের কাছে রোদ্দুর রায় মুখ্য এবং রবীন্দ্রনাথ গৌণ হবে এটা অস্বাভাবিক নয়। অতীতে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ কম হয়নি। এই কালো মেঘের দল কেউ টিকেনি। ইতিহাস তাদের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করেছে। রোদ্দুর রায়ও হারিয়ে যাবেন। কিন্তু চিন্তাটা আমাদের প্রজন্ম নিয়ে। যারা বিকৃতি ও শুদ্ধতার পার্থক্য বুঝে না। উন্নাসিকতাকে যারা ভাবে আনন্দ_তাদের হাতে বাংলাদেশ কেমন থাকবে?



 



মন খারাপের তৃতীয় ঘটনাটি বলি। ২৮ নভেম্বর কালের কণ্ঠসহ কয়েকটি পত্রিকায় শহীদ মিনারে ইংরেজি গান বাজিয়ে একদল তরুণীর নাচের সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। তারা ফ্লাশ মব তৈরি করছে। ফেসবুকে ওই ভিডিওটিও দেখলাম। আশেপাশে অনেক মানুষ তরুণীদের নাচ দেখছে। কেউ কেউ ভিডিও করছে। অথচ তাদেরকে শহীদ মিনারে ইংরেজি গান বন্ধ করতে কেউ বলেনি। তাহলে বিষয়টি কি দাঁড়াল? প্রথমত, আমাদের ওই তরুণীরা জানে না অথবা ভুলে গেছে ভাষা আন্দোলন। ভুলে গেছে বাংলা ভাষা এমনি এমনি পাওয়া নয়। শহীদ মিনারের ইতিহাস তারা জানে না। আর জানলেও এর তাৎপর্য অনুধাবন করতে পারেনি। আবার শহীদ মিনারে শত শত মানুষ থাকলেও কেউ তাদের নিরস্ত করলোও না! একজনও ছিল না? অন্যদিকে শহীদ মিনারে অনুষ্ঠান করতে কর্তৃপক্ষের অনুমতির প্রয়োজন হয়। উচ্চশব্দে শহীদ মিনারে যখন ইংরেজি গান চালিয়ে নাচ হচ্ছে তখন কর্তৃপক্ষ কোথায় ছিলেন? আমরা জানি না।



 



২০১৬ সালে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের স্মৃতি রক্ষার্থে তাঁর পৈত্রিক ভিটা গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় একটি ম্যুরাল নির্মাণ করা হয়। কিন্তু যথাযথ তত্ত্ববধানের অভাবে ম্যুরালটি আজ ধ্বংস হবার পথে। দুঃখজনক বিষয় হল কবির ম্যুরাল হয়ে উঠেছে গবাদি পশুর বিচরণস্থল। ১ ডিসেম্বর যুগান্তরে প্রকাশিত একটি সংবাদে এসব তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। শুধু সুকান্তের নয়, আমাদের অনেক গুণীজনের সমাধিস্থল, স্মৃতিচিহ্ন প্রতিনিয়ত অযত্ন-অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য, শহীদ মিনারের প্রতিও আমরা যত্নবান নই। ডিসেম্বর বা ফেব্রুয়ারি এলে ভাস্কর্য আর শহীদ মিনার তত্ত্বাবধানের হিড়িক পড়ে। বাকি এগার মাস যেন অভিভাবকহীন। দিন যত যাচ্ছে ঐতিহ্য রক্ষা ও ইতিহাস সংরক্ষণে আমাদের অনীহা তীব্রতর হচ্ছে। একদিকে অপসংস্কৃতির দিকে প্রজন্ম ঝুঁকছে, অন্যদিকে শুদ্ধতা থেকে আমরা দূরে সরছি। এর ফল কেমন হবে?



 



যতদূর অনুধাবন করতে পারছি_খুব ধীরে ধীরে আমাদের সংস্কৃতির শেকড় আলগা হচ্ছে। বিকৃতির দিকে নিজেরাই সচেতন কিংবা অচেতনভাবে নিজেদের নিয়ে যাচ্ছি। অথচ আমাদের খুব ভালো করে মনে রাখা দরকার, যে জাতি তার সংস্কৃতিকে ভুলে যায়, সে জাতির পতন নিশ্চিত। আমরা পতনের দিকে যাচ্ছি। এসব ঘটনা তারই আগমনি সঙ্কেত দিচ্ছে।



 



তবু আমরা আশাবাদি। সচেতন মানুষের আন্তরিকতা থাকলে সভ্যতার নামে অসভ্যতা, উদ্যাপনের নামে উন্নাসিকতা রোধ করা সম্ভব। মোতাহের হোসেন চৌধুরীকে স্মরণ করে লেখাটি শেষ করছি। তিনি 'সংস্কৃতি-কথা' প্রবন্ধে বলেছেন, ' সংস্কৃতি মানে সুন্দরভাবে, বিচিত্রভাবে, মহৎভাবে বাঁচা।...বিচিত্র দেশ ও বিচিত্র জাতির অন্তরঙ্গ সঙ্গী হয়ে বাঁচা; ইতিহাসের মারফতে মানবসভ্যতার ক্রমবিকাশে বাঁচা; জীবন কাহিনীর মারফতে দুঃখীজনের দুঃখ নিবারণের অঙ্গীকারে বাঁচা। বাঁচা, বাঁচা, বাঁচা। প্রচুরভাবে, গভীরভাবে বাঁচা। বিশ্বের বুকে বুক মিলিয়ে বাঁচা।'



 



আসুন আমরা সংস্কৃতির সাথে গভীরভাবে বাঁচি। আমাদের সভ্যতার বিকৃতি নয়, বিবর্তন হোক। উন্নাসিকতা নয়, যাপন হোক অনাবিল আনন্দের, শুভ্রতার...।



 



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৫৭৫৭৮৮
পুরোন সংখ্যা