চাঁদপুর, বৃহস্পতিবার ২ জুলাই ২০২০, ১৮ আষাঢ় ১৪২৭, ১০ জিলকদ ১৪৪১
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৭২-সূরা জিন্ন্


২৮ আয়াত, ২ রুকু, মক্কী


২৪। যখন উহারা প্রতিশ্রুত শাস্তি প্রত্যক্ষ করিবে, বুঝিতে পারিবে, কে সাহায্যকারীর দিক দিয়া দুর্বল এবং কে সংখ্যায় স্বল্প।


২৫। বল, 'আমি জানি না তোমাদিগকে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হইয়াছে তাহা কি আসন্ন, না আমার প্রতিপালক ইহার জন্য কোন দীর্ঘ মেয়াদ স্থির করিবেন।'


 


 


assets/data_files/web

ভিক্ষাবৃত্তি পতিতাবৃত্তির চেয়েও খারাপ।


-লেলিন।


 


দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত জ্ঞানচর্চায় নিজেকে উৎসর্গ করো।


 


 


গ্রামের স্মৃতি : স্বাস্থ্য
সরকার আবদুল মান্নান
০২ জুলাই, ২০২০ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


সত্তর ও আশির দশকের কথা। তখন গ্রামের মানুষের খাদ্য, পুষ্টি, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসার অবস্থা কেমন ছিল? আমরা জানি, সব কিছুই অর্থের সঙ্গে জড়িত, শিক্ষার সঙ্গে জড়িত। কিন্তু তখন মানুষের আর্থিক অবস্থা কেমন ছিল, শিক্ষা-দীক্ষার অবস্থা কেমন ছিল সেটি অনেক বড় ব্যাপার। সেজন্য ওই প্রসঙ্গ এখানে উত্থাপন করব না। আমার স্মৃতিতে আমাদের গ্রামের মানুষের এবং আমাদের খাদ্য, পুষ্টি, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসার অবস্থা কেমন ছিল তার একটি স্মৃতিনির্ভর পরিচয় দেব।



 



আমাদের গ্রামের নাম জহিরাবাদ। চাঁদপুর জেলার মতলব উত্তরের এই গ্রামটি ছিল মেঘনার তীরে। অবশ্য মেঘনার একদম তীরে ছিল এখলাসপুর, জয়পুর, নাওভাঙ্গা। তার পাশেই ছিল জহিরাবাদ। নদী-তীরস্থ অন্যান্য যে কোনো গ্রামের মতই এই গ্রামটি ছিল সমৃদ্ধ। গ্রামের তিরিশ থেকে চলি্লশ ভাগ পরিবারের ছেলে-মেয়েরা স্কুলে যেতো, পড়াশোনা করতো। আর্থিক অবস্থাও খুব খারাপ ছিল না। কিন্তু গোলাভরা ধান, গোয়ালভরা গরু এবং পুকুরভরা মাছ আমি কখনই দেখিনি, কোনো পরিবারেই না। অধিকন্তু যাদের অবস্থা ভালো মনে করা হতো, তারাও টানাটানির মধ্যে স্বচ্ছলতা বজায় রাখার চেষ্টা করতো।



 



চাকরি বা ব্যবসার বিরল কিছু নজির বাদ দিলে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সবাই ছিল ভূমিনির্ভর। কেউ জমির মালিক, কেউ বর্গাচাষি এবং কেউ শ্রমিক। অধিকাংশ ক্ষেত্রে যে জমির মালিক বা বর্গাচাষি তাকেও অন্যের জমিতে কাজ করতে দেখেছি। যে মাঝি সেও ফসলের মাঠে কাজ করে। যে জেলে সেও ভূমিশ্রমিক। কাঠুরে, নাপিত, ধোপা, মিস্তিরি, কুটিরশিল্পী সবাই আবার সুবিধা মতো কৃষিকাজে শ্রম দিতো। এমন কি যে চাকরি করে কিংবা ব্যবসা করে সেও কৃষিবিচ্ছিন্ন ছিল না। ব্যবসা থেকে এসে কিংবা চাকরি থেকে ছুটিছাটায় এসে তাদেরকেও কৃষি জমিতে কাজ করেতে দেখেছি।



 



খাদ্য গ্রহণের চিত্রটা প্রায় একই রকম। সকালে পান্তা ভাত কিংবা শীতের সকালে আগের দিনের বাসি ভাত। তার সঙ্গে লবণ, পোড়া মরিচ ও পেঁয়াজ ।



 



শুকনো মরিচ ভেজে কাচের বোতলে রাখা হতো। যার দরকার সে বোতল ঝেকে ঝেকে মরিচ বের করে নিতে পারতো। বোতলের মুখ বন্ধ থাকতো মোটা পাটকাঠি দিয়ে। মুখ খোলা রেখে মার বকা খেয়েছি বহুবার। বোতলের মুখ খোলা থাকলে মরিচ নেতিয়ে যায়। মচমচে থাকে না। খাওয়া যায় না। এছাড়া ছিল বিচিত্র ভর্তা। কাঁচা মরিচের ভর্তা, শুকনো মরিচের ভর্তা, লাল মরিচের ভর্তা, গোল আলুর ভর্তা, বাসি তরকারির ভর্তা, শাকালুর ভর্তা, শুঁটকি ভর্তা, ডাল ভর্তা, কলা ভর্তা, বেগুন ভর্তা, মিষ্টি আলুর ভর্তা।



 



ভর্তা ছাড়া ছিল বাসি তরকারি, বাসি ডাল। এছাড়া কখনো কখনো হতো খিচুরি। সঙ্গে ওইসব ভর্তা। সত্তরের দশকে এসে আটা রুটির প্রচলন হয়। মাটির তাওয়ায় মা রুটি ভাজতেন আর আমরা তাওয়া থেকে ছোঁ মেরে রুটি নিয়ে খেতে শুরু করতাম। ভাজি, ডাল বা বাসি তরকারির অপেক্ষা করতাম না।



 



খুব ভোরে অবশ্য মুড়ি, চিড়ে ভাজা, কাউনের মোয়া, চাল ভাজা, সিম ভাজা, মটরশুঁটি ভাজা এইসব ভাজাপোড়া খাবারের ব্যবস্থা থাকতো কখনো কখনো। বিশেষ করে শীতকালে কোছড় ভর্তি মুড়ি নিয়ে দলেবলে বসতাম গিয়ে সকালের মিষ্টি রোদে।



 



দুপুরে গরম ভাত এবং সঙ্গে শাক, মাছের তরকারি, ডাল, ভর্তা, বিচিত্র রকমের টক ঝোল, সাধারণ ঝোল। ঝোল রান্না করা হতো পানি দিয়ে কিংবা ভাতের মাড় বা ফেন দিয়ে।



হাস-মুরগীর মাংস বা গরু-খাসির মাংস ছিল বিরল ঘটনা। মসলা সবই ছিল পাটায় বাটা। মরিচ, হলুদ, জিরা, ধনে, আদা সবই পাটায় বেটে নিতে হতো। প্রচুর ঝাল এবং প্রচুর মসলা দিয়ে রান্না করা হতো তরকারি। রাতেও প্রায় ওই একই রকম খাবারের প্রচলন ছিল। আমাদের ঘরে প্রায় সারা বছর দুধের ব্যবস্থা ছিল। আমরা কখনোই গরু-ছাগল পোষতাম না। দরিদ্র পাড়াপ্রতিবেশী, যাদের দুধেল গাভী থাকতো তারা সারা মাস এক সের করে দুধ দিতো প্রতিদিন। মাস শেষে টাকা নিতো। একে বলা হতো দুধ রোজ করা।



 



মাছের মৌসুম ছাড়া মাছ পাওয়া যেতো না বললেই চলে। আর অধিকাংশ মানুষের হাতে নগদ টাকা থাকতো না। ফলে বাজার থেকে মাছ কিনে খাওয়ার সামর্থ্য খুব কম লোকেরই ছিল। ভর্তাবার্তি, পেঁয়াজ-মরিচ আর শাকপাতা দিয়ে ভাত খেয়ে দিন গুজরান করতে দেখেছি অধিকাংশ পাড়া-প্রতিবেশীকে।



 



বাজার থেকে মাছ, শাকসবজি ও তরিতরকারি কেনার প্রচলন কবে হয়েছে জানি না। তবে শৈশবে খুব কম মানুষকেই বাজার থেকে মাছ, শাকসবজি ও তরিতরকারি কিনে আনতে দেখেছি। সবারই ক্ষেতে বা বাড়ির আনাচে-কানাচে শাকসবজি হতো। ওই দিয়েই চলে যেত কোনো রকমে।



 



খুব মনে পড়ে, বামের বাজারে, আমিরা বাজারে কিংবা দাসের বাজারে আমি কোনো ফলের দোকান দেখিনি। গরিব লোকেরা নিজের গাছের আম, জাম, কাঁঠাল, তাল, বেল, ডেউয়া এইসব মৌসুমি ফল ওড়ায় বা ডালায় নিয়ে বাজারের কোনাকাঞ্চিতে বসতো। দরদামে মিললে কেউ কেউ কিনে নিয়ে যেতো।



 



এছাড়া মৌসুমি ফল, বিশেষ করে আম, জাম, বরুই বা কুল, পেয়ারা, লটকন, কামরাঙ্গা, খুঁদিজাম, পেঁপে, তেঁতুল এইসব ফল যখন ধরত তখন সেই কড়া থেকে শিশুরা খাওয়া শুরু করতো। ডিল ছুড়ে, ছিপ দিয়ে কিংবা গাছে উঠে পারা হতো এসব ফল। প্রচুর মরিচের গুড়া, লবণ, কখনো বিচি কলা, আঞ্চলিক নাম আইট্টা কলা এবং তার সঙ্গে তেঁতুল মিশিয়ে কাঁচা আমের ভর্তা, কাঁচা কলার ভর্তা, বরুইয়ের ভর্তা, চালতার ভর্তা এরকম নানান ফলের ভর্তা প্রায় সারা বছর খাওয়া হতো।



 



আমের দিনে প্রায় সকল শিশুর হাতে থাকতো ছুরি বা ঝিনুকের কাটারি আর লবণ ও মরিচের গুঁড়ার মিশ্রণ। ছুরি বা কাটারি না থাকলে পরনের লুঙ্গি খুলে লুঙ্গির ভেতর আম রেখে গাছের সঙ্গে জোরসে আঘাত করা হতো। এতে আম ফাটতো, লুঙ্গিও ফাটতো। সেই ফাটা লুঙ্গি পরে পাছা দেখিয়ে হাঁটলে কপালে দুর্গতি ছিল। সুতরাং ওই ফাটা লুঙ্গি পরার কায়দা ছিল ভিন্ন। কিন্তু লুকিয়ে রাখা যায় কতক্ষণ? একসময় মা দেখতেন নতুন লুঙ্গী ছিঁড়ে খান খান। মা বলতেন, 'এই কালকুট্টা, করছচ কি লুঙ্গিরে! আওক তোর ঠায়ুর। দেহামু অনে। লুঙ্গি ছিড়ার মজা বুঝবি অনে।'



 



ওই ছিঁড়া লুঙ্গি বাবাকে কিন্তু কখনোই দেখাতেন না মা। বরং কখন যে লুঙ্গি সেলাই করে রেখে দিতেন টেরও পেতাম না। ছেঁড়াটা আড়াল করে পড়তে গিয়ে আর খুঁজে পেতাম না। লাল-সবুজের ডোরা কাটা লুঙ্গি লাল অথবা সবুজ সুতা দিয়ে এমনভাবে মা সেলাই করে দিতেন, কিছুতেই দেখা যেতো না। আর বাবা যদি কখনো দেখে ফেলতেন তা হলে ওই আমের সিজনে লুঙ্গি পরা বন্ধ, পরতে হবে হাফ প্যান্ট।



 



বরুইর দিনে প্যান্টের পকেটভর্তি কিংবা লুঙ্গির কোছরভর্তি থাকতো বরুই। আজকের মতো এমন বড় বড় কুল তখন ছিল না। দেশি বরুই। চুকা কিংবা মিষ্টি। ছাগলের মতো কুট কুট কামড় দিয়ে বরুইর মাংস খেয়ে বিচি ফেলে দিয়ে বরি খাওয়ার চেয়ে না খাওয়া ভালো। বিচিসমেত কটকট কটকট শব্দ করে শিশুরা যখন বরুই খেতে খেতে হাঁটত তখন গ্রামের বৃদ্ধরা হা করে তাকিয়ে থাকতো। এক দাদা বলতেন, 'ওগ বিচি হালানোর সময় নাই। ব্যস্ত।' জেঠা বলতেন, 'বিচি হালাইলে খাইয়া মজা পায় না। এট্টু কম পইড়া যায়।'



 



বাড়ির আনাচে-কানাচে, বাগানে বা জঙ্গলে বিভিন্ন সময় নানা রকম ফল ফলতো। বৈঁচি, গাব, কাউ, খুঁদিজাম, বেতফল, বিলিম্বি, চালতা, ডুমুর_এইসব। বনে-বাদাড়ে ঘুরে ঘুরে সারাক্ষণ এইসব খেতাম আমরা। বিশেষ করে ডুমুর, কাউ, পাকা গাব ছিল আমাদের খুবই প্রিয়। আর বেতুম বা বেতফল ছিল সবচেয়ে বাজে। একটি ফলের গায়ে মাংস এতো কম নিয়ে কী করে এটি ফল হলো তাই আশ্চর্য।



 



ছিপটির ডাল দিয়ে যে মসজিদে, মাদ্রাসায় ও স্কুলে শুধু পিটুনি দেয়া হতো তা নয়, এই গাছে খুঁদি জামের মতো ফলও হতো। ওই ফল আমরা খেতাম। আরও একটি গাছের নাম ভুলে গেছি। ছোট গাছ, গুল্মজাতীয়। দাঁত মাজার জন্যে ওই গাছের ডাল ব্যবহার করা হতো। ওতেও খুব ছোট ফল ধরতো। টক আর মিষ্টির মাঝামাঝি চমৎকার স্বাদ ছিল।



 



বর্ষাকালে নৌকা করে আমিরাবাজার বা দাসেরবাজার থেকে বাবা ও চাচারা যখন ইলিশ মাছ এবং কাঁঠাল নিয়ে সন্ধ্যায় বাড়িতে আসতেন তখন উৎসব শুরু হতো বাড়িতে। মতলব নিম্নাঞ্চল বিধায় কাঁঠাল হতো না এবং চাঁদপুর ইলিশের জন্যে বিখ্যাত হলেও গ্রামীণ জীবনে ইলিশ ছিল দুষ্প্রাপ্য মাছ। সুতরাং পুরো সিজনে আমরা আট-দশটি কাঁঠাল খাওয়ার সুযোগ পেতাম।



 



এছাড়া সারা বছর চাল ভাজা, খুদ ভাজা, ডাল ভাজা, মুড়ি বা উরুম, মুড়ির মোয়া, চিড়া ভাজা, চিড়ার মোয়া, কাউন ভাজা, কাউনের মোয়া, সিম ভাজা, গম ভাজা, মটর ভাজা ইত্যাদি চলতো।



 



মাকে দেখতাম প্রতিদিন রান্নার চাল নেয়ার সময় একমুঠ চাল পানি ভরা মাটির হাড়িতে ফেলে দিতেন। বেশ কয়েক দিন পরে ওই চাল দিয়ে জাউ রান্না করতেন। ওর নাম ছিল কাঞ্জির সিনি্ন। স্বাদ চুকা। লাল মরিচের ভর্তা কিংবা শুটকি ভর্তা ছাড়া কাঞ্জির সিনি্ন খাওয়া যায় না। শুনেছি গায়ে ব্যথা থাকলে কাঞ্জির সিনি্ন খেলে ভালো হয়ে যায়। আমরা যেসব ব্যথা পেতাম_পড়ে গিয়ে ব্যথা, মারামারি করে ব্যথা, ধরতে গিয়ে ব্যথা, ছাড়তে গিয়ে ব্যথা, আনতে গিয়ে ব্যথা, নিতে গিয়ে ব্যথা, টানাটানি করতে গিয়ে ব্যথা, উঠতে গিয়ে ব্যথা, নামতে গিয়ে ব্যথা ওইসব ব্যথা ভালো হতো বলে মনে হয় না। ভালো না হলেও কিছু যেতো-আসতো না।



 



সত্তর-আশির দশকে গ্রামীণ জীবনে শিশুদের যে খাবারের কথা উল্লেখ করা হলো তাকে পর্যাপ্ত ও পরিমিত ভাবার কোনো কারণ নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত খাবার ছিল না এবং যেসব খাবার পর্যাপ্ত ছিল সেগুলো পরিমিত পরিমাণ খাওয়া হতো না। এর সঙ্গে ছিল প্রচুর পরিমাণ ঝাল ও টক খাওয়ার বিষয়। আবার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা রক্ষিত হতো না। ফলে অধিকাংশ সময় শিশুদের পেট খারাপ থাকতো।



 



খুব ছোটবেলায় গ্রামে টিউবওয়েল দেখিনি। আমাদের বাড়িতে টিউবওয়েল বসানো হয় আশির দশকে। বাড়ির দক্ষিণ দিক দিয়ে বয়ে যাওয়া রাস্তার পাশে ছিল ওই টিউবওয়েল। পাঁচ-ছয়টি বাড়ির রান্না ও খাবারের পানির সংস্থান হতো ওই একমাত্র টিউবওয়েলের জলে। আর যারা ওই রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতো, টিউবওয়েলটার কাছে এলেই তাদের হাত-মুখ ও পা ধোয়ার কথা মনে হতো। বিচিত্র মানুষের বিচিত্র কায়দায় কল চাপতে হতো বিধায় অধিকাংশ সময় কলটি নষ্ট থাকতো। কখনো কখনো পানি দিয়ে পানি বের করতে হতো। এই দিগদারি সহ্য হতো না বলে পুকুরে পানি এবং খালের পানিই ছিল খাবার ও রান্নাবান্নার পানি। ফলে সত্তর ও আশির দশকে দেখেছি ছোট-বড়, শিশু, কিশোর, জুয়ান, বৃদ্ধ সবারই নানা রকম পেটের অসুখ। কখনো কখনো ডায়রিয়া, কখনো আমাশয় লেগেই থাকতো।



 



সব বাড়ির পেছনে একাধিক খোলা টয়লেট ছিল। আমাদের এলাকায় বলতো টাটকি। বাঁশ কুপে আড়াআড়ি বেঁধে আর একটি বাঁশ দিয়ে সাঁকোর মতো টয়লেট। নিচে সম্পূর্ণ খোলা। কলার ডগা, সুপারির ডগা, ধানের নাড়া কিংবা চট দিয়ে বেড়ার কাজ সাড়া হতো। দরজা হিসেবে ব্যবহৃত হতো পাটের চট বা ছালা। সাধারণত খালে, বিলে, পুকুরে, ডোবায় গিয়ে পড়তো মনুষ্য বিষ্টা। এই ধরনের ফর্মাল ও চিরস্থায়ী টয়লেট ছাড়াও অনেক স্থায়ী ও আস্থাী টয়লেট তৈরি হয়ে যেতো যেখানে-সেখানে।



 



খুব ভোরে জঙ্গলে, খালে, বিলে, নর্দমায়, ডোবায়, ক্ষেতে, খামারে, একটু আড়ালে-আবডালে চলতো প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেয়ার কাজ। বর্ষাকালে পুরুষেরা এবং ছেলেছোকড়ারা নৌকা নিয়ে চলে যেতো প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে। শিশু-কিশোররা গাছের ডালে বসে মজা করে কাজ সাড়তো। অনেক সময় একজনে নয়, কয়েকজনে একসঙ্গে বসে গল্প করতে করতে কাজ শেষ করতো এবং ওই পানিতেই ঝাঁপিয়ে পড়তো। আর শিশু-কিশোররা প্রায় যেখানে-সেখানে কাজ সেড়ে ফেলতো। বিশেষ করে গাছের শিকড়ে বসে, গোড়ায় বসে, গর্তের কিনারে বসে, রাস্তায়, রাস্তার পাশে, এককথায় যত্রতত্র। ফলে মনুষ্য বিষ্টায় পা নষ্ট হওয়া ছিলো নিত্যনৈমত্তিক ব্যাপার।



 



পায়খানা শেষে পরিষ্কার হওয়ার জন্যে পর্যাপ্ত পানি সহজলভ্য ছিল না। এক বদনা মানে এক লিটারও নয়। ওই পানি দিয়ে স্বাস্থ্যসম্মতভাবে পরিষ্কার হওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। তারপর ভালো করে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা ও সচেতনতাও ছিল না। আর শিশু-কিশোররা পরিষ্কার হওয়ার জন্যে নেমে যেত খালে, বিলে, পুকুরে, ডোবায়। কিন্তু সেই সুযোগ সবসময় থাকতো না। তখন ব্যবহার করত মাটির ডিলা, শুকনো কচুরিপানার শিকড়-বাকর কিংবা তারও যদি ব্যবস্থা না থাকতো তা হলে গাছের সঙ্গে বা জমির আলের সঙ্গে কিংবা উঁচু মাটির মসৃণ জায়গাটুকুতে একটু লেছুড় দিয়ে নিতো।



 



আমার মনে হয় শুধু সত্তর-আশির দশক নয়, শত শত বছর এদেশের মানুষের মূত্র ত্যাগ ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয় এমনই ছিলো। আর যদি শুধু প্রস্রাব করার বিষয় বিবেচনা করা হয়, তা হলে সেখানে কোনো বিবেচনার বিষয় ছিল না বললেই চলে। বিশেষ করে ছেলেদের প্রস্রাব করার জন্যে নির্দিষ্ট কোনো স্থান ছিল না। ঘর থেকে বের হয়ে যেখানে-সেখানে তারা প্রস্রাব করার অধিকার রাখতো। আর রাতের বেলা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে এই অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়ে যেতো।



 



সেই সময় দেখেছি, চাল, ডাল, মাছ, তরিতরকারি, শাকসবজি সবকিছু ধোয়া হতো পুকুর, খাল, বিল ও ডোবার জলে। ওই জল খাওয়াও হতো। শত শত বছর ধরে এদেশের মানুষ এমন অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করে এসেছে। ফলে গ্রীষ্মম-লীয় কতগুলো রোগ কোনো দিনই এদেশের মানুষের পিছু ছাড়েনি।



 



ছোটবেলায় দেখেছি, ডায়রিয়া লেগেই থাকতো। ছোটবড় সবারই ডায়রিয়া হতো। কেউ কেউ মারাও যেতো। মতলবে আইসিডিডিআরবি আছে। বর্ষকালে ওই অফিসের স্পিডবোটগুলো বামের বাজারে ভিরানো থাকতো। কোনো বাড়িতে ডায়রিয়ার রোগী আছে জানতে পারলে স্পিডবোটে করে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতো। একবার হাসপাতালে পেঁৗছাতে পারলে আর কেউ মারা গেছে বলে শুনিনি। আমাকেও একবার হাসপাতালে নেয়া হয়েছিল। স্পিডবোটে উঠে আমি এতো মজা পেয়েছিলাম যে, মাঝেমধ্যে মনে হতো আবার কেনো ডায়রিয়া হয় না। কিন্তু ডায়রিয়া হয়ে আমার এক জেঠা আমাদের চোখের সামনে মারা গিয়েছেন। রাজ্যের মানুষ দেখলো। মুখে এক ফোঁটা পানি দিতে দেয়নি কেউ। অনেক কষ্ট পেয়ে জেঠা মারা গেলেন। তারপর থেকে আর ডায়রিয়া হয়ে স্পিডবোটে উঠার ইচ্ছা হয়নি।



 



আমাশয়ও ছিল ঘরে ঘরে। ছিল জলবসন্ত, ইনফ্লুয়েঞ্জা, ডিপথেরিয়া, ম্যালেরিয়া আর হুপিংকাশি। আরও ছিল পোলিও, টাইফয়েড, প্যারাটাইফয়েড।



(আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)



 


করোনা পরিস্থিতি
বাংলাদেশ বিশ্ব
আক্রান্ত ২,২৩,৪৫৩ ১,৬২,২০,৯০০
সুস্থ ১,২৩,৮৮২ ৯৯,২৩,৬৪৩
মৃত্যু ২,৯২৮ ৬,৪৮,৭৫৪
দেশ ২১৩
সূত্র: আইইডিসিআর ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
আজকের পাঠকসংখ্যা
৫১৪৮৬৯৩
পুরোন সংখ্যা