চাঁদপুর, রোববার ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৫ ফাল্গুন ১৪২৭, ১৫ রজব ১৪৪২
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
বাঙালি চেতনার বাতিঘর
পীযূষ কান্তি বড়ুয়া
২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


চেতনাবিহীন কাঠামো দিয়ে প্রগতির চাকা টেনে নেয়া যায় না। চেতনা হলো প্রগতির ইঞ্জিন। চেতনার মধ্যে প্রোথিত আছে জীবনের উদ্যম আর আদর্শ। চেতনাধারী কেবল নিজের জন্যে প্রগতির আলোক বহন করেন না। তিনি তাঁর কালের জন্যে, সমাজের জন্যে বাতিঘর। আদর্শ হলো চেতনার জ্বালানি। আদর্শবিহীন চেতনার কোনো মূল্য নাই। চেতনাই আদর্শকে লালন করে ঊর্ধে তুলে ধরে। উপযুক্ত চেতনাকে উপযুক্ত কাঠামোতে ধারণ করতে হয়। তা না হলে সেই চেতনা মানবতার কোনো উপকারে লাগানো কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। চেতনাকে অবিরাম লালন করে যিনি জীবনের দ্যোতনাকে প্রগতির গতিময়তায় প্রয়োগ করেন তিনি হয়ে ওঠেন যাদুকরী এবং কুশলী। তিনি নিজের চেতনাগি্নতে প্রজ্জ্বালিত করে তোলেন অন্যসকল দীপকে। আর এর মধ্যে দিয়েই তিনি হয়ে ওঠেন সকলের বাতিঘর। বাতিঘর কেবল অাঁধারেই আলো দেয় বা পথ দেখায় তা নয়। বাতিঘরের কাজ হলো দূরদর্শী। কূলে ভেড়া তরণীকে কূল দেখানো কেবল বাতিঘরের কাজ নয়। বাতিঘরের কাজ হলো গর্জনশীল মহাসমুদ্রে দূরপথে চলমান জলযানগুলোকে তার নিজ নিজ পথের বাঁক ও বিঘ্রন নিরূপণে সহযোগিতা করা। মেধাবী চালককে বাতিঘর দেখিয়ে দেয় এগিয়ে যাওয়ার সোপান বা গন্তব্য।



 



বাঙালির সুদীর্ঘ সংগ্রাম-সমুদ্রে চেতনার একটা বাতিঘর খুব বেশি করে দরকার ছিলো। যখন থেকেই এই ব-দ্বীপ আর বঙ্গোপসাগরের জন্ম তখন থেকেই বাঙালি চলেছে আপন স্রোতে আপন আনন্দে। কিন্তু আপনা মাসে হরিণা বৈরী। এই ভূমির পাহাড়-সাগর-অরণ্য-নদীর সৌন্দর্য, তার ঐশ্বর্য সম্ভার বিদেশি বেনিয়াদের এবং লুটতরাজে অভ্যস্ত শাসকদের ক্রমশ আকর্ষণ করে টেনে এনেছে এই ভূখ-ে। ফলে এদেশ, এ মাটি হারিয়েছে স্বাধীনতা, হারিয়েছে নিজের সম্পদ নিজে ব্যবহারের জন্মজ অধিকার। পাঠান-মোগল আর ইংরেজদের লোভী হাতে পড়ে নির্যাতিত হওয়া বাঙালি জাতিকে দুঃখসমুদ্র হতে উত্তরণের দিকনির্দেশ করার জন্যে একটি সাহসী ও জাতীয়তাবাদী বাতিঘর প্রয়োজন ছিলো। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন বাঙালি জাতির সেই কাঙ্ক্ষিত এবং কার্যকর বাতিঘর। তাঁর দূরদর্শিতা এবং প্রখরতা এতো তীব্র ও দূরভেদী যে আগামী হাজার বছর পরেও তা এরকমই সমকালীন ও প্রাসঙ্গিকতায় বজায় থাকবে।



 



নদীমাতৃক বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতির মতোই উর্বর এবং উদ্যমী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এই শস্য-শ্যামলা প্রকৃতি আর ছুটে চলা নদী মিলেই নির্মাণ করে তুলেছে বঙ্গবন্ধুর কালজয়ী চেতনাকে। তিনি নিজেই তাঁর 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী' গ্রন্থে লাহোর ভ্রমণকালে উল্লেখ করেছেন পাকিস্তানের ঊষর ও মরুময় ভূপ্রকৃতির। পশ্চিম পাকিস্তানীদের মমতাহীন, মানবিকতাহীন মনুষ্যত্বের মূল কারণ তিনি নির্দেশ করেছেন তাদের জলহীন, সবুজহীন প্রকৃতির নির্মাণকে। গরমে প্রচ- গরম আর শীতে অসহ্য ঠা-াকে নির্দেশ করে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, তিনি বাংলাদেশ তথা পূর্ব বাংলায় একটি চাদর গায়ে শীত মোকাবেলা করতে পারতেন কিন্তু লাহোরে এসে তাঁর ফুল সোয়েটার এর সাথে কম্বলেও কুলিয়ে পারছে না শীত ঠেকাতে। এমন প্রকৃতির মানুষগুলো মনুষ্যত্ববোধহীন যে হবেই সে ব্যাপারে কোন ভুল ছিল না। বঙ্গবন্ধু জানতেন, সবুজই প্রাণের উচ্ছ্বলতা, দৃষ্টির শক্তিমত্তা। লায়ালপুর কারাগারে আটক থাকাকালীন তিনি কেবল চারদিকে কালো আর কালো দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন তাঁর দৃষ্টি নিয়প। তাইতো তাকে খেতে দেওয়া খাবার হতে বীজ ফেলে তিনি তাঁর কারা-প্রকোষ্ঠের বাইরে জন্মিয়েছিলেন সবুজ চারা। ঐ সবুজ চারাই ছিল মৃত্যুর দিন গুণতে থাকা একটি জাতির জনকের জীবনী শক্তি। তাঁর এই গুণ পূর্বের কারাজীবনেও তিনি বজায় রেখেছিলেন। একদিকে যেমন বই তাঁর মননকে রেখেছিল সজীব করে তেমনি অন্যদিকে ফুলের বাগান করে কারাজীবনের অাঁধারকে তিনি তাড়িয়েছিলেন তাঁর মন হতে। একজন বন্দী একদিকে বই আর অন্যদিকে ফুলের সৌন্দর্যে আত্মনিবেদনে নিজেকে নিবদ্ধ রেখেছেন নির্মাণ-কুশলতায়।



 



যে বংশের ঝা-া উড়িয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এসেছেন মর্ত্যধামে সেই বংশের রক্তে আছে প্রতিবাদ আর দেশপ্রেম। বোরহান উদ্দিন শেখের প্রবর্তিত বংশে কদু শেখের মতো সাহসী আর দেশপ্রেমী মানুষের শোণিতধারার উত্তরাধিকার নিয়ে জন্মেছেন বঙ্গবন্ধু। ইংরেজ মিস্টার রাইনকে যে বংশের মানুষ আধা পয়সা জরিমানা করে অপমানে নীল করে তোলেন নিজেদের নৌকা ও লোকদের আটকে রাখার প্রতিবাদে, সেই বংশে একজন বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হওয়াই ছিল বিস্ময়ের।



 



যে সময় বঙ্গবন্ধু মা সায়েরার কোল মাত্র আলো করেছেন সে সময়ে ব্রতচারী নৃত্যই ছিল দেশপ্রেমে জাগ্রত করার এক অনন্য বাহন। গুরু সদয় দত্তের এই শিক্ষা বঙ্গবন্ধুও পেয়েছিলেন তাঁর শৈশবে। যার কারণে তাঁর নির্মাণের ভিতে গেঁথে আছে দেশপ্রেম। পাশাপাশি কারাগারে আটক থাকার দিনগুলোতে শেখ মুজিব প্রচুর বই পড়েছেন। প্রায় চৌদ্দ বছরের কারাজীবনে, চার হাজার ছয়শ বিরাশি দিনের কারান্তরীণ দিনগুলোতে তিনি বার্ট্রা- রাসেল, রবীন্দ্রনাথ প্রমুখের বই যেমন পড়েছেন, তেমনি পড়েছেন রিডার্স ডাইজেস্ট, নিউজ উইক ইত্যাদি সাময়িকীগুলো। তাঁর ভাষ্যে আমরা জানতে পাই, কারাগারে তাঁর বই পড়ার উপরও এক সময় সেন্সরশিপ আরোপিত হয়। তাঁকে নভেল বা প্রেমের উপন্যাস পড়তে দেয়ায় কারা কর্তৃপক্ষের কোন বাধা ছিল না, কিন্তু তাঁকে বাধা দেওয়া হতো রাজনীতি আর দর্শনের বইগুলো পড়তে। কেননা, কারা কর্তৃপক্ষ জানতো, এইসব মননশীল বইগুলোই বঙ্গবন্ধুর আত্ম চেতনাকে রাখে সঞ্জীবিত, ক্ষুরধার এবং বাতিঘরের সমতুল্য প্রখর। বঙ্গবন্ধু একদিকে যেমন নজরুলের প্রতিবাদ-বিদ্রোহের লেখার নির্যাস পান করেছেন, তেমনি রবীন্দ্রনাথের দর্শন ও দেশপ্রেমের অমৃতধারায় করেছেন অবগাহন। তিনি চীনে গিয়ে তুরস্কের নির্বাসিত কবি নাজিম হিকমত ও রাশিয়ান লেখক আইজ্যাক অ্যাসিমভের সংস্পর্শে এসেছেন। তাই তাঁর নির্মাণে, তাঁর শক্তিমানতায় প্রগতির প্রতিষ্ঠা ছিল সর্বদা।



আঠারোশ ছিয়াশি সালে জন্ম নেয়া একজন বাঙালি সমাজবিজ্ঞানী স্বামী স্বরূপানন্দ ঊনিশ্শো চৌদ্দ সালে এসে চাঁদপুরের ঘোড়ামারা মাঠে প্রচলন করেন চরিত্রগঠন আন্দোলন। অভিক্ষা মন্ত্রে উজ্জ্বীবিত করে, দেশপ্রেম ও সততায় তিনি জাগাতে চেয়েছিলেন তরুণ সমাজকে স্বাধীনতার সুফল আনার জন্যে। স্বামী স্বরূপানন্দের মতোই সততার এবং দেশপ্রেমের মন্ত্র বুকে ধারণ করে এগিয়ে এসেছেন বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতিসত্তার জাগরণে। সুদূর চীনে গিয়ে তিনি যে সততার নিদর্শন দেখেছেন তা স্বদেশে বাস্তবায়নের জন্যে তিনি ছিলেন সদা তৎপর। রিকশাওয়ালার হাজার টাকার নোট ফেরৎ দিতে আসাটা তাঁর কাছে বিস্ময়কর লেগেছে, কেননা, তখন পাকিস্তানজুড়ে কেবল ঠগবাজি আর অসততার প্রচলন। চীনারা দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজেরা বেস্নড তৈরি না করা পর্যন্ত বেস্নডসহ অন্যান্য বিদেশি পণ্য ব্যবহার থেকে দূরে ছিলো। তিনি খেদ সহকারে বলেন, ঠিক সে সময় পাকিস্তানে জাপান আর কোরিয়ার পুতুল কেনার হিড়িক পড়ে যেত।



 



মুজিবীয় চেতনার সবচেয়ে বড় পতাকা ছিল তাঁর অসামপ্রদায়িকতা। তিনি ছোটবেলার হিন্দু ধর্মাবলম্বী বন্ধুদের যেমন ভালোবাসতেন তেমনি কেউ তাকে মুসলমান বলে বাড়ি যেতে না দিলে তিনি তারও প্রতিবাদ করেছেন। তিনি কৈশোরে নমশূদ্র হিন্দু ছাত্রদের নিয়ে হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দীকে সংবর্ধনা জানিয়েছিলেন যখন হিন্দু নেতারা অন্যান্য হিন্দু ছেলেদের আসতে বারণ করেছিলেন। কোলকাতায় দাঙ্গায় মুসলমানদের মৃত্যুতে তিনি যেমন মর্মাহত তেমনি বাংলাদেশের হিন্দুদের দেশত্যাগী হয়ে ভারতে আসার পক্ষেও তিনি নন। তিনি তাঁর আত্মজীবনীতে স্পষ্টই বলেছেন, পাশের দেশে সামপ্রদায়িতকতার চর্চা হলে তা আমাদের দেশেও করতে হবে এমন কোন কথা নেই। বরং তিনি নিজে অনেক হিন্দু সংখ্যালঘুকে উদ্ধারও করেছেন। তাঁর আদর্শ ছিলো একসময় নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু। সুতরাং শেখ মুজিবের এই অসামপ্রদায়িক চেতনার কুসুম প্রস্ফুটিত হয়েছিল তাঁর শৈশবেই।



 



বঙ্গবন্ধু নিজে কমিউনিজমের লাল ঝা-াধারী না হলেও সমাজতন্ত্রের নিবিড় সমর্থক ছিলেন। তাঁর কাছে শোষিতের মুক্তিতে সমাজতন্ত্র ছিলো বিকল্পহীন। শোষিতের মুক্তির এই চেতনাই লক্ষজনের অন্তরের দীপ হয়ে জ্বলে উঠেছে। তাঁর মধ্যে সমাজতান্ত্রিক কর্মবীরের দেখা পেয়ে তাঁর মৃত্যুতে ইরাকের রাষ্ট্রপতি সাদ্দাম হোসেন বলেছিলেন, বঙ্গবন্ধুই সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় প্রথম শহিদ। ঠিক সেই কারণেই শোষক ও শোষিতের মাঝে তাঁকে হিমালয়ের মতোই অটল মনে হয় কিউবার ক্যাস্ট্রোর কাছে।



 



মুজিবের যাদুকরী কথা আর যাদুকরী নেতৃত্বদান সাধারণ মানুষের কাছে তাঁকে সাধারণই করে তুলেছিল। তাইতো নির্বাচনে তাঁকে গ্রামের বৃদ্ধা ভোটার মা-য়ে বাটি ভরে দুধ খেতে দেয়, পান খেতে দেয় আরও সাথে দেয় চার আনা পয়সা তাঁর নির্বাচনের খরচ হিসেবে। অথচ তার প্রতিদ্বন্ধীর জামানত খোয়া যায়। মানুষের সাথে মুজিবের আচরণে তাঁর গায়ে সোঁদা মাটির গন্ধ ভেসে ওঠে। মানুষ তাঁর মধ্যে খুঁজে পায় মৃত্তিকা রস, মমতার ঘ্রাণ। মুজিব তাদের কাছে কখনোই শিল্প মন্ত্রী হয়ে ওঠেননি বরং তিনি ছিলেন অনেকের মিয়াভাই। এতো বড় নেতা হয়েও মুজিব রাজনীতি হতে দু'পয়সা নেননি বা পাননি। বরং বাবার পয়সা খরচ করে, সহধর্মিনী রেণুর দেওয়া পয়সায় তিনি দিন কাটিয়েছেন আর পরের ভালোর জন্যে নিজে চষে বেড়িয়েছেন দেশের আনাচে কানাচে। মন্ত্রীত্ব যখন চলে যায় মুজিব তখন গ্রেপ্তার হয়ে জেলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন আর তাঁর প্রিয় রেণুকে বলেছেন যে আশা করে তিনি ছেলেমেয়েদের পড়াশুনার জন্যে ঢাকা এসেছেন সে আশায় গুড়ে বালি। অথচ এখনকার মন্ত্রীর ছেলেমেয়েরা পাশ্চাত্যের বড় বড় দেশগুলোতেই পড়ে বড় হয়। তাঁকে গরম কাপড় কিনে দেন তাঁর রাজনৈতিক গুরু সোহরাওয়ার্দী, তাঁকে খেতে দেন পার্টি অফিসের শওকত ভাই, কিন্তু তিনি রয়ে যান কপর্দকহীন, নির্লোভ। পাকিস্তানের অগণতান্ত্রিক সরকার বার বার তাঁকে মিথ্যে মামলায় আটকাতে চেয়েছে। কিন্তু দুর্নীতিহীন মুজিব বেরিয়ে এসেছেন জেলারের সমীহ জাগানো ব্যবহারে।



 



বাঙালি কখনো কখনো খেই হারিয়ে ফেলেছিল তার সংগ্রামে, সংকটে। কিন্তু বার বার মুজিবই বাঙালিকে পথ দেখিয়ে এনেছে স্বাধীনতায়। অনেকে অনেকভাবে প্ররোচিত করেছিল মুজিবকে। কিন্তু মুজিব তাঁর বিবেচনা হারাননি। তিনি রাতারাতি স্বাধীনতা আসবে না জানতেন।তাই তাঁর গগনচুম্বী জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও মুজিব সময়ের আগে কখনো স্বাধীনতার ডাক দেননি। তিনি চূড়ান্ত লগ্নে এসে বলেছেন, 'দিস মে বি মাই লাস্ট মেসেজ, ফ্রম টু ডে বাংলাদেশ ইজ ই-িপে-েন্ট...।' পঁচিশে মার্চ রাতে বারটা কুড়ি মিনিটে বেতার মেসেজে গ্রেপ্তার হওয়ার আগে মুজিবের দেওয়া স্বাধীনতার ঘোষণা ছিল একদম সময়মত। নচেৎ বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রাম বিদ্রোহের তকমা পেয়ে মারা যেতো সামরিক বিচারে। তাঁর মূল অস্ত্র ছিলো ছয়দফা। এই ছয়দফাই হজম করতে পারেনি পাকিস্তান। এরই বদৌলতে মুজিবের নেতৃত্ব হয়ে ওঠে নিরঙ্কুশ। মুজিব হয়ে ওঠে বাঙালির হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা। মুজিব এক পর্যায়ে বাঙালির কাছে যা বলেন তাই-ই কবিতা হয়ে যায়। একটা মানুষ যখন পুরো জাতির সমস্ত আশা-আকাঙ্ক্ষার ধারক-বাহক হয়ে যায় তখন তিনি আর ব্যক্তি নন, তিনি হয়ে যান জনতা। মুজিবীয় চেতনা এখানেই মহান, এখানেই গগনচুম্বি।



 



মুজিবের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বাঙালি জাতীয়তাবাদ প্রবহমান ছিল জীবন-তরল হয়ে। বাংলা ভাষার জন্যে তিনি একুশে ফেব্রুয়ারি রাজপথে নামতে না পারলেও কারায় অন্তরীণ থেকেও ভাষা আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন বিভিন্ন পর্যায়ে। কারামুক্তির পর বায়ান্ন সালের মার্চে তিনি ঐতিহাসিক আমতলার সভায় সভাপতিত্ব করেন। পাকিস্তানী শাসক বাহিনী যখন মহান ভাষা আন্দোলনকে সীমান্ত পার হয়ে আসা হিন্দুদের পায়জামা পরা নাশকতা বলে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার পাঁয়তারা করছিলো তখন মুজিবই তার জবাব দিয়ে বলেছিলেন, একুশে ফেব্রুয়ারি যারা মরেছে তারা মুসলমান। যারা আটক হয়েছে তাদের নব্বইভাগ মুসলমান। সুতরাং সরকারের পেটোয়া বাহিনী মিথ্যা অভিযোগ তৈরি করে বাংলা ভাষা আন্দোলনকে নস্যাৎ করে দিতে চাইলেও তা সম্ভব হবে না। মুজিবের মতো নেতৃত্ব যদি ভাষা আন্দোলনের শক্তি হিসেবে কাজ না করতো তবে বাংলা পূর্ব বাংলার রাষ্ট্র ভাষার স্বীকৃতি পাওয়া অত্যন্ত দুরূহ হয়ে যেত। এই মুজিবই পরবর্তীকালে বাঙালি চেতনার অথরিটি হিসেবে পাকিস্তানের প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসাবে গণচীনের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে বাংলায় তাঁর বক্তব্য প্রদান করেছিলেন এবং তা দোভাষীর মাধ্যমে চীনা ভাষায় রূপান্তরিত হয়েছিল। একই সভায় উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মনোজ বসু যিনি ভারতের প্রতিনিধি দলে ছিলেন। তিনিও মুজিবকে দেখে বাংলায় তার বক্তব্য রেখেছিলেন এবং সভা শেষে মুজিবকে জড়িয়ে ধরে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিলেন। কেবল চীনেই নয়, রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদেও বাংলায় তাঁর বক্তব্য প্রদান করেন। বঙ্গবন্ধুর এই অমর কীর্তিই বলে দেয় তিনি কেন বাঙালি চেতনার বাতিঘর।



 



পাকিস্তানের মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ ছিলেন ভারতবর্ষের লোক। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সময় দ্বিজাতিতত্বের উদগাতা হয়ে নিজে সদ্যোজাত পাকিস্তানের জাতির পিতা হয়ে যান। অথচ ক্ষমতার ননী ছাড়া তিনি জীবনে আর কিছু খেয়েছেন বলে মনে হয় না। অহিংস আন্দোলনের জনক, ভারতের জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধী জীবনের সোনালি সময় কাটিয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকায়। তাই তাঁর মধ্যেও ভারতের হৃদয়ের স্বর তেমন করে বেজে ওঠেনি। কিন্তু বাঙালি জাতির জনকের বজ্র কণ্ঠেই কেবল প্রতিনিয়ত প্রতিফলিত হয়েছে, 'আমাদের আর দাবায়া রাখতে পারবা না।' এই অমোঘ বচনের মধ্যেই দীপ্যমান হয়ে আছে বাঙালির সংগ্রামী চেতনার বাতিঘর। সঙ্কটে-সন্তাপে, শোকে-শক্তিতে বঙ্গবন্ধুই আমাদের চিরকালের অমস্নান বাতিঘর, এ বাতিঘর চেতনার, এ বাতিঘর প্রণোদনার। মুজিবকে তাঁর জন্মশতবর্ষে তাই মূল্যায়ন করতে হয় হাজার বছরের ক্যানভাসে। কেননা হাজার বছর ধরে চলমান পরাধীনতার জিঞ্জির মুজিবই ছিন্ন করে দেখিয়েছেন ভবিষ্যতের আরো হাজার বছরের আলো। তাই মুজিবকে নিয়ে কয়েক পংক্তিতে অর্ঘ্য জানিয়ে বলতে ইচ্ছে করে,



'সাগরের সীমানা জয়ে স্বপ্নের বেড়েছে বিস্তার



পৃথিবীর প্রতি প্রান্তরে আজ বিস্ময় মুজিবের দেশ



ফিদেলের হিমালয় মুজিব নিজেকে ছাড়ায় নিজে



জ্যোতির্ময় জনক শতবর্ষে তাঁর স্বপ্নের চেয়ে বড়।'



 



মুজিবের বাঙালিয়ানা ছিল নিখাদ, রক্তস্রোতে আজন্ম বহমান। শৈশবে বাবাকে গায়ে জড়িয়ে ধরে ঘুমুতে অভ্যস্ত মুজিবের প্রিয় খাবার মাছভাত যা ছিল আর দশটি সাধারণ বাঙালির মতোই। কিন্তু দিনের পর দিন পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে রুটি-মাংস খেতে খেতে তাঁর পরাণে আকুলি-বিকুলি করছিলো দুটো ভাতের জন্যে। বাঙালি মুজিবের আচার-আচরণে বাঙালি সামাজিক সৌজন্য ফুটে উঠেছিল সুদূর চীনে গিয়েও। তাইতো মাত্র ক'মাসের বিবাহিত চীনা শ্রমিক দম্পতির সদ্য নিকায়িতা বধুকে উপহার স্বরূপ খুলে দিয়েছিলেন নিজের হাতের আংটি। বাঙালি চেতনার ধারক-বাহক মুজিবের মনেও এতো কারা নির্যাতন পেরিয়ে জাগ্রত হয়েছিল স্নেহকাতর সন্তানের প্রাণ। কারাবদ্ধ মুজিবের একসময় মনে হতে থাকে কেবল মায়ের মুখ আর বাবার স্নেহের কথা। বাবার রুগ্নতার কথা শুনে মুজিব উদ্বেগ নিয়ে পাড়ি দিয়েছিলেন নৌকায় মধুমতী। মুজিব নিজেও একসময় হাচু-কামাল কিংবা ছোট্ট রাসেলের মমতায় পিতৃত্বকে অনুভব করেছেন অন্তরে ফল্গুধারার মতো।



 



বাঙালির রক্তে রক্তে জীবন্ত হয়ে আছে প্রতিবাদ। মুজিবের রক্তে প্রতিবাদ ছিল বংশগত। তিনি একদিকে যেমন প্রতিবাদ করেছেন পশ্চিমা জুলুমের, তেমনি প্রতিবাদ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের পক্ষ নিয়েও। এই প্রতিবাদ তাকে বেশ বড় ক্ষতির সম্মুখীন করেছিল। তিনি বহিষ্কৃত হয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে। কিন্তু তাতেও দমে যাননি শেখ মুজিব। তিনি প্রতিবাদ করেছেন প্রতিটি অন্যায়ের।



লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও কথাসাহিত্যিক।



 



 


হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৯৮-সূরা বায়্যিনাঃ


০৮ আয়াত, ১ রুকু, মাদানী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


 


৩। যাহাতে আছে সঠিক বিধান।


৪। যাহাদিগকে কিতাব দেওয়া হইয়াছিল তাহারা তো বিভক্ত হইল তাহাদের নিকট সুস্পষ্ট প্রমান আসার পর।


 


 


মাত্রাধিক নম্রতার অর্থই হল কর্কশতা।


_জাপানি প্রবাদ।


 


 


 


 


নফস্কে দমন করাই সর্বপ্রথম জেহাদ।


 


 


ফটো গ্যালারি
করোনা পরিস্থিতি
বাংলাদেশ বিশ্ব
আক্রান্ত ৬,৪৪,৪৩৯ ১৩,২১,৯৪,৪৪৭
সুস্থ ৫,৫৫,৪১৪ ১০,৬৪,২৬,৮২২
মৃত্যু ৯,৩১৮ ২৮,৬৯,৩৬৯
দেশ ২১৩
সূত্র: আইইডিসিআর ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
আজকের পাঠকসংখ্যা
১৩৬৭৭৭৯
পুরোন সংখ্যা