চাঁদপুর। রোববার ২৬ মার্চ ২০১৭। ১২ চৈত্র ১৪২৩। ২৬ জমাদিউস সানি ১৪৩৮

বিজ্ঞাপন দিন

বিজ্ঞাপন দিন

সর্বশেষ খবর :

  • ---------
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

২৭-সূরা নাম্ল 


৯৩ আয়াত, ৭ রুকু, ‘মক্কী’


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


৬২। বরং তিনি, যিনি আর্তের আহ্বানে সাড়া দেন, যখন সে তাঁহাকে ডাকে এবং বিপদ-আপদ দূরীভূত করেন এবং তোমাদিগকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি করেন। আল্লাহর সহিত অন্য কোন ইলাহ আছে কি? তোমরা উপদেশ অতি সামান্যই গ্রহণ করিয়া থাক। 


দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন


 


একজন পীড়িত ব্যক্তি তার রোগের কথা ছাড়া আর কিছু বলতে ভালোবাসে না। 


                 -স্যামুয়েল জনসন।

যে লোক কম কথা বলে বা চুপ করে থাকে সে অনেক বিপদ আপদ থেকে বেঁচে যায়।


২৫ মার্চের বিভীষিকাময় রাত ও বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা
হাশিম প্রধানিয়া
২৬ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+

১৯৭১ সালের ৭ মার্চে ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে দাঁড়িয়ে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করলেন.......আমি পরিষ্কার বলে দিতে চাই যে, আজ থেকে এই বাংলাদেশে কোর্ট-কাচারি, আদালত-ফৌজদারি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ থাকবে। ২৮ তারিখ কর্মচারীরা গিয়ে বেতন নিয়ে আসবেন। আমি যা বলি তা মানতে হবে। যে পর্যন্ত আমার এদেশের মুক্তি না হবে, খাজনা, ট্যাঙ্ বন্ধ করে দেওয়া হলো, কেউ তা দেবেন না। প্রকৃতপক্ষে দেশের কর্তৃত্ব শাসনভার এক রকম বঙ্গবন্ধুর হাতে চলে এসেছিল। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সারা দেশের মানুষ সাড়া দিয়ে তাঁরই পতাকাতলে এসে দাঁড়িয়েছিল। অসহযোগ আন্দোলন এবং লাগাতার হরতালে দেশ অচল হয়ে গিয়েছিল।

পাকিস্তানি সামরিক জান্তা বুঝে গিয়েছিল, পূর্ব পাকিস্তান তাদের হাত ছাড়া হয়ে গেছে। তাই তারা মরিয়া হয়ে শেষ কামড় মারে ২৫ মার্চ রাতে। স্ট্যানগান, মর্টার, মেশিন গান নিয়ে নিরস্ত্র বাঙালির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। সামরিক জান্তা বাঙালিদের নিশ্চিহ্ন করে দিতে চেয়েছিল। এই রাতে ৫০ হাজারেরও বেশি নাগরিককে হত্যা করেছিল তারা।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে বাংলাদেশে বাঙালির বুকে নেমে এসেছিল এক পৈশাচিক মৃত্যুর ভয়াল অন্ধকার। রাতের ঘন অন্ধকারে পাকিস্তান সেনাবাহিনী দানবীয় শক্তিতে বলীয়ান হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ঢাকার ঘুমন্ত নিরস্ত্র অসহায় মানুষের উপরে। সেই রাতে মেশিন গান, মর্টার, ট্যাংক নিয়ে অতর্কিত আক্রমণ করে ইয়াহিয়া বাহিনী। নির্মমভাবে হত্যা করে হাজার হাজার ঘুমন্ত নাগরিককে। নিরাপরাধ বাঙালির উপর কাপুরুষোচিত সশস্ত্র হামলার নির্দেশ দিয়ে জল্লাদ ইয়াহিয়া খান রাতের অন্ধকারে শেষ বারের মতো ঢাকা ত্যাগ করেন।

২৫ মার্চ রাতে পাক বাহিনীর পৈশাচিক জুলুম, লুণ্ঠন, হত্যা ও নির্মম হিংস্র থাবায় ধ্বংস হয়েছিল বাংলার বাড়ি ঘর, সম্পদ ও জনপদ। পুড়িয়ে ছারখার করে দেয় বসতবাড়ি সহ হাজার স্থাপনা। পাক প্রেসিডেন্ট জল্লাদ জেনারেল ইয়াহিয়ার নির্দেশে রাত ১টায় ২২ বেলুচ রেজিমেন্ট সর্বশক্তি নিয়ে আধুনিক অস্ত্রেশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল পিলখানার ইপিআর সদর দপ্তর, রাজারবাগ পুলিশ লাইন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস, শাঁখারি বাজারসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুমন্ত মানুষের উপর। তাদের নারকীয় হত্যাকা-ের শিকার হয় নারী, পুরুষ, শিশু-কিশোর, ছাত্র, যুবক সহ সর্বস্তরের নিরীহ মানুষ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয় শত শত ছাত্রকে। জ্বালিয়ে পুড়িয়ে গুলি করে হত্যা করা হয় হল সংলগ্ন পলাশী, নীলক্ষেত ও কাটাবন বস্তির হাজার হাজার নিরস্ত্র নারী পুরুষ ও শিশুকে। শিক্ষকদের আবাসিক ভবনে হিংস্র শ্বাপদের মতো আক্রমণ চালিয়ে হত্যা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, দার্শনিক, অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা ও মনিরুজ্জামান, ফজলুর রহমান, অনুপ দ্বৈপয়ান ভট্টাচার্য, মুহাম্মদ আব্দুল মুক্তাদির, শরাফত আলী, মোহাম্মদ সাদেক, আনিসুর রহমানসহ আরো অনেককে। হত্যা করার পাশাপাশি চলতে থাকে লুটপাট, নারী নির্যাতন ও অগি্নসংযোগ।

পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী এই সঙ্গে হত্যাযজ্ঞ চালানো হয় অন্যান্য শহরেও। ঘুমন্ত নিরাপরাধ মানুষের উপর এমন বিকৃত মানসিকতার রক্ত পিপাসার কলঙ্কজনক নজির বিশ্বে আর দ্বিতীয়টি নেই। অপারেশন সার্চ লাইট নামে বিশ্বমানবতার ইতিহাসের এই জঘন্যতম হত্যাকা- ঘটিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী সমগ্র মানব জাতির কাছে ধিকৃত হয়। ইতিহাসে স্থান হয় তাদের আস্তাকুঁড়ে।

স্বাধীনতার অগি্নমন্ত্রে দীক্ষিত গোটা জাতি এমন মানবতা বিরোধী হামলায় কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়েও ঘুম ভাঙা চোখে মৃত্যুকে তুচ্ছ জ্ঞান করে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে সর্বত্র। অগি্ন স্ফুলিঙ্গের মতো তারা মৃত্যুর মিছিলে ঝাঁপিয়ে পড়ে দলে দলে, শুরু হয়ে যায় সশস্ত্র সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ। বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক আহ্বান 'যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ো'। বঙ্গবন্ধুর রণমন্ত্র বুকে ধারণ করে মাতৃভূমির স্বাধিকারের অদম্য আকাঙ্ক্ষায় বাবা-মা, স্ত্রী, পুত্র পরিবার ছেড়ে মুক্তিযুদ্ধে শরীক হয় বাংলার অকুতোভয় সূর্য সন্তানরা। যুগের পর যুগ পরেও এই ঐতিহাসিক দিনটিতে পাকিস্তান বাহিনীর সেই বীভৎস পৈশাচিকতায় বেদনা বিধূর স্মৃতি বাংলার মানুষ ঘৃণা, ক্ষোভ ও ধিক্কারের মধ্য দিয়ে স্মরণ করে। দিনটি যেমন অভিশপ্ত, তেমনি অবিস্মরণীয়, উজ্জ্বল, ইতিহাসের মাইল ফলকও।

রাত ৮টায় বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে উপস্থিত কর্নেল এম এ জি ওসমানি, ছাত্রলীগ নেতা সিরাজুল ইসলাম সহ আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে তিনি একটি বৈঠকে মিলিত হন। বঙ্গবন্ধু উপস্থিত সবাইকে বিভিন্ন নির্দেশ দিয়ে বিভিন্ন স্থানে পাঠান। দলের বিভিন্ন শ্রেণির নেতারাও আসতে থাকেন বঙ্গভবনে। এরই মধ্যে রাত ১২টা ২০ মিনিটের দিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। যা নিম্নরূপ- সম্ভবত এটাই আমার শেষ বার্তা। আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের জনসাধারণকে আহ্বান জানাচ্ছি, তোমরা যে যেখানেই আছ এবং যা-ই তোমাদের আছে তার দ্বারাই শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধ করতে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত হানাদার বাহিনীর শেষ ব্যক্তি বাংলাদেশের মাটি থেকে বিতাড়িত হবে, তোমাদের লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। এই সঙ্গে তিনি নিম্নবর্ণিত ঘোষণাটি পাঠান :-

পাকিস্তান সেনাবাহিনী অতর্কিত পিলখানা, ইপিআর ঘাঁটি ও রাজারবাগ পুলিশ লাইন আক্রমণ করে এবং শহরের লোকদের হত্যা করেছে। আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা বীরত্বের সাথে মাতৃভূমি রক্ষা করার জন্য শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করছে। আমি বিশ্বের জাতি সমূহের কাছে সাহায্যের আবেদন করছি। সর্বশক্তিমান আল্লাহর নামে আপনাদের কাছে আমার আবেদন ও আদেশ; দেশকে স্বাধীন করার জন্য পুলিশ, ইপিআর, বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও আনসারদের সাহায্য চান, সকল দেশপ্রেমিক স্বাধীনতা প্রিয় লোকদের এ সংবাদ পেঁৗছে দিন। জয় বাংলা। শেখ মুজিবুর রহমান, ২৬ মার্চ '৭১।

রাত দেড়টায় পাকিস্তান বাহিনী তাদের কর্মকর্তা জেডএ খানের নেতৃত্বে গুলি ছুড়তে ছুড়তে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে হাজির হন এবং বঙ্গবন্ধুকে বন্দী করে ট্যাংক কামান সহ কড়া প্রহড়ায় নিয়ে যান।

২৫ মার্চ রাত দ্বিপ্রহরে অর্থাৎ ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরেই বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা, নির্বাচিত নেতা, নির্বাচিত প্রতিনিধি ও সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা, মুক্তি সংগ্রামের মহানায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়েছিলেন। তাঁকে বন্দী করার খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে যেতে থাকে দৃশ্যপট। ঢাকা শহর সহ গোটা দেশেই শুরু হয়ে যায় প্রতিরোধ সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ। এরপর বাঙালিকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ৯ মাসে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে এক সাগর রক্তের ঢেউ পেরিয়ে ৩০ লক্ষ শহীদের বিনিময়ে অভ্যুদয় ঘটে বাঙালির হাজার বছরের স্বপ্ন-সাধ ও আকাঙ্ক্ষার ফসল একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ, সোনার বাংলা, লাল সবুজের পতাকায় আচ্ছাদিত প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ।

লেখক পরিচিতি : একাত্তরের মহান সংগ্রাম পরিষদের স্থানীয় সেক্রেটারী, মুক্তিযোদ্ধা, লেখক, সমালোচক ও সংস্কৃতি সংগঠক, অধ্যাপক পাড়া, চাঁদপুর।

আজকের পাঠকসংখ্যা
৫৮১১০৮
পুরোন সংখ্যা