চাঁদপুর। মঙ্গলবার ১ মে ২০১৮। ১৮ বৈশাখ ১৪২৫। ১৪ শাবান ১৪৩৯
redcricent
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • --
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৩৭- সূরা সাফ্ফাত

১৮২ আয়াত, ৫ রুকু, মক্কী

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।

৯৩। অতঃপর সে প্রবল আঘাতে তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।

৯৪। তখন লোকজন তার দিকে ছুটে এলো ভীত সন্ত্রস্ত পদে।

৯৫। সে বলল, তোমরা স্বহস্ত নির্মিত পাথরের পূজা কর কেন?

৯৬। অথচ আল্লাহ তোমাদেরকে এবং তোমরা যা নির্মাণ করছ সবাইকে সৃষ্টি করেছেন।  

দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন


কাহারো স্বভাব-চরিত্র জানতে হলে কোনো ব্যাপারে তার পরামর্শ চাও।        


-প্লেটো।


ধন থাকলেই ধনী হয় না। ওই ব্যক্তিই প্রকৃত ধনী যাহার হৃদয় প্রশস্ত


ফটো গ্যালারি
কুরআন, হাদীস, ইজমা ও কিয়াসের আলোকে শব-ই-বরা'আত সুন্নাত
মুফতী মুহাম্মদ ফজলুল কাদের বাগদাদী
০১ মে, ২০১৮ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


শবে বরা'আত নামটি ফার্সি এবং আরবি মিশ্রিত বহুল পরিচিত একটি নাম। সাদামাটা ভাষায় শবে বরা'আত; একটি বিশেষ ইবাদত এবং বরকতের রাত। মুসলমান মাত্রই এ রাতটিকে ভাগ্যরজনী বলে জানে। এই ফার্সি ভাষার শব্দটি বাংলা ভাষায় আরবি, ফার্সী, উর্দু ভাষার ন্যায় প্রবেশ করেছে। এ ধরনের অসংখ্য বিদেশি ভাষার অনুপ্রবেশ বাংলা ভাষায় বিদ্যমান। আমাদের সমাজে সালাত শব্দের চেয়ে নামাজ, সিয়াম শব্দের চেয়ে রোযা শব্দের ব্যবহার হাজার হাজার গুণে বেশি। এখনো খাবার-দাবার স্থলে খানা-পিনা ব্যবহার হচ্ছে। বরকতময় এ ভাগ্যরজনীর (শব-ই বরাআতের ) একাধিক নাম রয়েছে : ১। লাইলাতুল মুবারাকাহ, ২। লাইলাতুন-নিসফে মিন শা'বান, ৩। লাইলাতুর রাহমাহ, ৪। লাইলাতুস-সাক, ৫। লাইলাতুল -জায়িযা, ৬। লাইলাতুল ঈ'দিল মালাইকাহ, ৭। লাইলাতুত তাকফীর, ৮। লাইলাতুল ইতকি মিনান্নার, ৯। লাইলাতুশ শাফায়াহ এবং ১০। লাইলাতুত্ তাযীম।



 



শবে বরাত নামটি অনেক নামের মধ্যে অধিক ব্যবহৃত একটি নাম। পবিত্র কুরআন বা হাদীসে নামাজ এবং রোযা শব্দের মতো শবে বরাত শব্দটিও সরাসরি পাওয়া না গেলেও "শবে বরা'আত শব্দটি কুরআন-হাদীসে নেই বলে শবে বরা'আত কে বিদ'আত বলা একটি জঘন্যতম অপরাধ এবং এটি জ্ঞানশূন্য মানুষের কথা।



 



নিম্নে শবে বরা' আত পালন করা সুন্্নাত বিষয়টির ওপরে পবিত্র কুরআন , হাদীস এবং ফিকহের দলিল সমূহ পেশ করা গেলো :



 



পবিত্র কুরআনের দলিল :



"হা' মীম ! সস্পষ্ট কিতাবের শপথ । নিশ্চয়ই আমি এই সুস্পষ্ট কিতাবকে বরকতময় রাতে নাযিল করেছি। নিশ্চয়ই আমি ভীতি প্রদর্শনকারী। এই মুবারক রাতে প্রত্যেকটি গুরুত্বপূর্ণ-হিকমতপূর্ণ কাজের ফয়সালা হয়ে থাকে।" (সূরা দুখান: ১-৪) আলোচ্য আয়াতে "লাইলাতুল মুবারাকাহ"-ব্যাখ্যায় হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, "হা'মীম" অর্থ 'আল্লাহর ফয়সালা, যা কিয়ামত পর্যন্ত সংঘটিত হবে।" আল-কিতাবুল মুবীন" অর্থ আল কুরআন' আর "লাইলাতুল মুবারাকাহ" হলো 'শা'বান মাসের অর্ধেক রাত (শা'বান মাসের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাত) । এ রাতটি হলো লাইলাতুল বারা'ত বা শবে বরা'আত। ২৭টি তাফসীর কিতাবে আলোচ্য আয়াতে বর্ণিত লাইলাতুম মুবারাকাহ " এবং "ফীহা ইফরাকু কুল্লু আমরিন হাকীম" দ্বারা লাইলাতুল বরা'আত বা শবে বরাআত কে বুঝানো হয়েছে ।



 



হযরত ইকরামা (রাঃ) এবং হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ)-সহ বহু সংখ্যক সাহাবী হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর সাথে সমমত ব্যক্ত করেছেন । নিম্নে তার কিয়দাংশ তুলে ধরা হলো : তাফসীরে কুরতুবীতে এসেছে "লাইলাতুল মুবারাকাহ" বলতে লাইলাতুল ক্বাদরকে বুঝানো হয়ে ে। আর কারো কারো মতে , এর দ্বারা "লাইলাতুল নিসফে মিন শ'বান " কে বুঝানো হয়েছে। আর এই "লাইলাতুম মুবারাকাহ" এর চার টি নাম যথা : ১) আলাইলাতুল মুবারাকাহ ২) লাইলতুল বারাআত ৩) লাইলাতুস্সাক এবং ৪) লাইলাতুল ক্বাদর। এ রাতটিকে এ কারণে "লাইলাতুম মুবারাকাহ" নামে অভিহিত করা হয়েছে যেহেতু আল্লাহ তা'আলা এ রাতে বান্দাদের উপরে তার বিশেষ রহমত, বরকত, কল্যাণ নাযিল করেন এবং সওয়াব দান করেন।" (তাফসীরে কুরতুবী, খ. ১৬, পৃ:১২৬)।



 



তাফসীরে কুরতুবীতে আরো এসেছে "কিতাবুল আরুসের গ্রন্থাকার হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর হাদীস উল্লেখ করেছে এ কথা গ্রহণ করেছেন যে, এ রাতে প্রতিটি বস্তুর হিকমতপূর্ণ ফায়সালা হয়ে থাকে।" এ রাত দ্বারা বলতে শবে বরা'আত-কে বুঝানো হয়েছে। আর কারো মতে লৌহে মাহফুজ থেকেই লাইলাতুল বরা'তে সিদ্বান্ত হয় এবং তা বাস্তবায়নের জন্যে লাইলাতুল কাদরে ফিরিশতাদের হাতে অর্পণ করা হয়। রিযিকের কপি হযরত মিকাঈেেলর কাছে দেয়া হয় । যুদ্ধ-বিগ্রহের কপি হযরত জিব্রাঈলের নিকট দেয়া হয়। অনুরুপভাবে ভূমিকম্প বিদ্যুৎ চমকানো এবং ভুমি ধ্বসের কপি এবং আমলের কপি ইসমাঈল ফিরিশতার হাতে দেয়া হয় । এই ফিরিশতা হলো পৃথিবীর আকাশের দায়িত্বে নিয়োজিত ফিরিশতা । তিনি অনেক বড় মাপের দায়িত্বশীল ফিরিশতা। আর বিপদাপদ - বালা- মুসীবতের কপি মলাকুল মাউত হযরত আযরাঈল (আঃ)-এর নিকট অর্পণ করা হয় ।" (তাফসীরে রাযী, খ. ১, পৃ.৪০০৯, তাফসীরে সিরাজুম মুনীর, খ.৩, পৃ. ৪৫৯, তাফসীরে আলুসী, খ.১৮, পৃ.৪২৭, তাফসীরে মাফাতীহুল গাইব, খ. ৩২. পৃ-৩৫, তাফসীরে রুহুল আ'আনী, খ.২৫, পৃ-৩১২, ৩১৩, তাফসীরে রুহুল বয়ান, খ.৮পৃ.৩১১, ৩১৩)



 



তাফসীরে কাশ্শাফে এসেছে, "আর লাইলাতুম মুবারাকাহ বলতে লাইলাতুল ক্বদরকে বুঝানো হয়েছে । কারো কারো মতে, শা'বান মাসের অধ তথা পনেরতম রাতকে বুঝানো হয়েছে । আলোচ্য আয়াতে 'লাইলাতুম মুবারাকাহ' বলতে চারটি নামের কথা বলা হয়েছে।" যথা : ১। লাইলাতুল বারা'আত, ২। লাইলাতুস সাক, ৩। আল লাইলাতুল মুবারাকাহ এবং ৪। লাইলাতুর রাহ্মাহ। লাইলাতুল বারা' আত এবং লাইলাতুল কাদরের মধ্যের সময় হলো চলি্লশ রাতের ব্যবধান। কারো কারো মতে এ রাতের নাম হলো, লাইলাতুল বারা'আত বা লাইলাতুচ্চেক। ব্যক্তি যখন তার কর আদায় করে তখন তার সম্পর্কে সার্টিফিকেট দেয়া হয় যে , সে দায়িত্ব থেকে মুক্ত। অনুরূপভাবে শা'বানের পনেরতম রাতের ইবাদতকারীর জন্যে আল্লাহর পক্ষ থেকে বারা'আতের ঘোষণা দেয়া হয় যে , সে যাবতীয় অপরাধ থেকে মুক্ত । মহান আল্লাহ তার মু'মিন বান্দাহদের জন্যে এ রাতে বারা'আত বা মুক্তির ফায়সলা করে থাকেন।



 



আর কারো কারো মতে এ রাতটি পাঁচটি বৈশিষ্ট্যের সাথে সম্পৃক্ত । যার ভিত্তিতে মহান আল্লাহ বান্দাহদের ফায়সালা করে থাকেন এবং এ রাতে ইবাদতকারী বান্দাহদের সওয়াব ও ফযিলত দিয়ে থাকেন। নবী কারীম (সাঃ) বলেছেন , যে ব্যক্তি শবে বরা'আতের রাতে একশত রাকা'আত নামাজ পড়বে আল্লাহ পাক তার মাগফিরাতের জন্যে একশতজন ফিরিশতা নিয়োজিত করবেন। (তাফসীরে রাযী, খ.১. পৃ-৪০০৯, তাফসীরে সিরাজুন মনীর, খ.৩ পৃ-৪৫৯, তাফসীরে আলুসী, খ.১৮, পৃ-৪২৭, তাফসীরে মা ফাতীহুল গাইব, খ.৩২, পৃ.৩৫, তাফসীরে রুহুল মা'আনী খ.২৭, পৃ.৩১২, ৩১৩, তাফসীরে রুহুল বয়ান, খ.৮, পৃ-৩১১, ৩১৩, তাফসীরে হাক্কী খ.১৩, পৃ:২২৪)।



 



পবিত্র হাদীস থেকে দলিল নং-১



ইমাম তিরমিযি (রহঃ) লাইলাতুন নিসফে মিন-শ'বান" সম্পর্কে স্বতন্ত্রভাবে অধ্যায় উল্লেখ করে এ পর্যায়ে হাদীস এনেছেন, "হযরত মা আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত । তিনি বলেন, এক রাতে আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে হারালাম, কোথাও তাঁকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। ঘর থেকে বের হয়ে দেখলাম যে তিনি জান্নাতুল বাকী (মদীনায়) কবরস্থানে অবস্থান করছেন। তিনি আমাকে বললেন, হে আয়েশা ! তুমি কি ভয় পাচ্ছ যে আল্লাহ এবং তার রাসূল তোমার ওপরে অন্যায় করবেন? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি ধারণা করেছিলাম যে, আপনি আপনার কোনো স্ত্রীর ঘরে অবস্থান করেছেন অতঃপর তিনি বলেন নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'লার রহমত ও ফেরেশতা অর্ধ শা'বানের রাতে (শবে বরা'আতে) পৃৃথিবীর আকাশে অবতীর্ণ হন এবং বনু কালবের মেষপালের পশম পরিমাণের চেয়েও অধিক পরিমাণে তার বান্দাদেরকে ক্ষমা করে দেন। (তিরমিযী খ. ১, পৃ:১২৫৬, ইবনে মাজাহ, পৃ:৯৯, মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, খ.১০, পৃ:৪৩৭ ও ৪৩৮, হাদীস নং- ৯৯০৭, মুসনাদে আহমদ, খ, ৬, পৃ:২৩৮) হানাফী ও অন্যান্য আলিমগণের নিকট এই হাদীসখানা হাসান। এর প্রত্যোক বর্ণনাকারী নির্ভরযোগ্য। (শবে বরাতের তত্ত্ব কথা, জাস্টিস তক্বী ওসমানী, পৃ:২১)



আলোচ্য হাদীসে অবস্থিত "লাইলাতুণন নিসফে মিন শা'বান"-এর ব্যাখ্যায় লক্ষ লক্ষ দেওবন্দী আলিমের ওস্তায শাইখুল হাদীস ্আল্লামা সাইয়্যেদ আনওয়ার শাহ কাশ্মিরী (রহঃ) তদ্বীয় কিতাব "আল আরফুশ-শাজী" কিতাবে লিখেছেন "লাইলাতুন নিসফে মিন শা'বান" অধ্যায়ে বর্ণিত, এ রাতটি হলো লাইলাতুল-বারা আত (শবে বরা'আত)। শবে বরা 'আত র ফযীলত সম্পর্কিত সমস্ত হাদীস সহীহ। আর বিভিন্ন পুস্তকের লেখকবৃন্দ যারা "বরা 'আত-সংক্রান্ত হাদীসকে যয়ীফ বা মুনকার বলেছেন, এদের কথার কোনো মূল ভিত্তি নেই। (তিরমিজী খ.১, পৃ. ১৫৬, প্র. টীকা নং-২)



 



দলিল নং -২



"হযরত আলী (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, যখন অর্ধ শা'বানের রাত আসবে তখন তোমরা রাত জেগে ইবাদত করো এবং দিনের বেলায় রোযা রাখ। কেননা, আল্লাহ তা'আলার রহমত ও ফেরেশতা এ রাতে সূর্যাস্তের পর পরই পৃথিবীর আসমানে (দুনিয়ার আকাশে) আসেন এবং তিনি আহ্বান জানাতে থাকেন। কোনো ক্ষমা প্রার্থী নেই কী? আমি তাকে ক্ষমা করে দেবো। কোনো অভাবগ্রস্ত নেই কী ? আমি তাকে রিযিক দান করব। কোনো বিপদগ্রস্ত নেই কি? আমি তাকে বিপদ থেকে রক্ষা করব। এভাবে বরা'আতের ভোর রাত পর্যন্ত মহান আল্লাহর আহ্বান চলতে থাকবে। " (ইবনে মাযাহ পৃ. ৯৯)



 



দলিল নং -৩



 



"হযরত আব্দুল্লাহ ইবন আমর ইবনুল আস থেকে বর্ণিত : রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, অর্ধ শা'বান রাতে আল্লাহ তা'আলা তার বান্দাদের প্রতি রহমতের নজর দান করেন এবং দু শ্রেণির লোক ছাড়া সবাইকে তিনি ক্ষমা করে দেন । এক শ্রেণি হলো : মুসলমানদের ক্ষতি সাধনকারী শত্রু, আর দ্বিতীয় শ্রেণি হলো : মানব হত্যাকারী।" (মুসনাদি আহমদ)।



 



দলিল নং -৪



 



"হযরত আবূ মূসা আল আশ'আরী (রাঃ) আল্লাহর রাসূল (সাঃ)-এর বরা'আতে বর্ণনা করেন যে, তিনি (নবী) বলেছেন নিশ্চয়ই আল্লাহ অর্ধ শা'বানের রাতে দুনিয়াবাসীর প্রতি কৃপাদৃষ্টি দান করেন । তিনি মুশরিক এবং মুসলমানদেন মধ্যে ফ্যাসাদ সৃষ্টিকারী ব্যক্তি ছাড়া সকল বান্দাহকে মা'ফ করে দেন।" (ইবনে মাজাহ, পৃ: ৯৯)



 



দলিল নং -৫



 



"হযরত ইকরামা (রাঃ) বলেন , লাইলাতুম মুবারাকা-এর অর্থ হলো : লালাতুন নিসফে মিন শা'বান মাসের পনরতম রাত । এ রাতে সারা বছরের বাজেট ঘোষণা করা হয় । জীবিতদের মধ্য থেকে মৃতদের তালিকা প্রস্তুত করা হয় এবং ওই রাতে হাজীদের তালিকাও তৈরি হয় । ওই লিস্ট থেকে একজনও কম বা বেশি হয় না "। ( তাফসীরে রুহুল মায়ানী, খ.২৫, পৃ. ১৭৪, তাফসীরে কুবতুবী, খ.১৬, পৃ: ১২৭)



 



দলিল নং - ৬



 



"হযরত আবু সা'লাবা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ১৫ শা'বানের রাতে মহান আল্লাহ স্বীয় বান্দাগণের দিকে মনোনিবেশ করেন এবং মু'মিন বান্দাদের ক্ষমা করে দেন । কিন্তু পরষ্পরে হিংসা-বিদ্বেষ পোষণকারীদের ক্ষমা করেন না। (বায়হাকী, শু'আবুল ঈমান, খ.৩, পৃ:৩৮১, ৩৮২, হাদিস নং- ৩৮৩২)



এ হাদীসখানার অসংখ্য সমার্থক হাদীস রয়েছে এবং এই হাদীসখানা "হাসান "। এর বর্ণনাকারীগণ নির্ভরযোগ্য । এটি তাকরীব নামক কিতাবের প্রথম খ-ের ৪৯ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে । আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহঃ) তার তাফসীরে দুররে মানসূরের ৬ষ্ঠ খন্ডের ২৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন ।



 



দলিল নং _ ৭



 



"হযরত মূয়ায ইবনে জাবাল (রাঃ) নবী কারীম (সাঃ) থেকে বর্ণনা করেন। নবী (সাঃ) বলেছেন, মহান আল্লাহ শা'বানের ১৫ তম রাতে বান্দাদের দিকে মনোনিবেশ করেন এবং মুশরিক ও পরষ্পর বিদ্বেষকারী ব্যক্তি ব্যতিত সকলকে ক্ষমা করে দেন।" (সহীহ ইবনে হিব্বান, খ.৩, পৃ: ৩৮২)।



 



আলোচ্য হাদীস সমুহের আলোকে এ কথা দিবালোকের ন্যায় সত্য হলো যে, ১৫ই শাবান বলতে শবে বরা'আতকেই বুঝানো হয়েছে । আর ২০৭ টি কিতাবে শবে বরা'আতের হাদীসখানা বর্ণিত হয়েছে।



সারকথা, লাইলাতুন নিসফে মিন শা'বান বলতে শবে বারা'আতকেই বুঝানো হয়েছে। সনদের দিক থেকে এবং সমর্থনের দিক থেকে এর প্রত্যেকটি হাদীস অতীব মজবুত এবং শক্তিশালী। অতএব, শবে বারা'আত পালন করা বৈধ এবং জায়িয । যারা এর বিরোধিতা করে উপরের দলীল প্রমাণের ্আলোকে সকলে মিলে তাদের প্রতিবাদ করা উচিত। কারণ, এরা বিভ্রান্ত এবং ওলামায়ে সূ। এদের ইত্তেবা বা অনুসরণ করা জায়িয নেই ।



 



 



ফিকাহ থেকে প্রমাণাদি



হানাফী মতে :



ফাতাওয়া গ্রন্থ আলমগীরীতে আছে,



 



"কবর যিয়ারতের জন্য চারটি দিন উত্তম। যথা : সোমবার, বৃহস্পতিবার, জুমাবার (শুক্রবার) এবং শনিবার। জুমুয়াবারে নামাজের পরে জিয়ারত করা খুবই ভাল একটি সময় । শনিবারে সূযর্োদয়ের সময় কবর জিয়ারত করা এবং বৃহস্পতিবারে বেলা দশটায় অথবা আসরের পরে জিয়ারত করা উত্তম । অনুরূপভাবে বরকতময় রাত সমূহে বিশেষ করে শবে বরা'আতে জিয়ারত করা নেহায়েত উপকারী।" (আল ফাতাওয়া আল হিন্দিয়া খ.৫ পৃ: ৩৫০)



 



দুররে মুখতার কিতাবে আছে, "দু ঈদের রাতে এবং শবে বরাতে জেগে থেকে ইবাদত করা, রামজানের শেষ দশ রাত , পহেলা জিলহাজ্বের রাত ইবাদত করা মুস্তাহাব। (আব্দুরল মুখতার, খ.২, পৃ:২৫)



 



মারাক্কিল ফালাহ কিতাবে আছে " শা'বানের পনেরতম রাতে জেগে থেকে ইবাদত করা মুস্তাহাব। কেননা এতে পুরো বছরের গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হয়। "(মারাকিল ফালাহ,খ.১, পৃ: ১৭৪)



 



শাইখ আব্দুল হক্ব মুহাদ্দিস দেহলভী (রহঃ) বলেছেন, তিনি তার মা সাবাতা বিস সুন্নাহ 'কিতাকে এই রাতের ফযীলত সম্পর্কে কতিপয় হাদীস উল্লেখ করার পরে ক'জন তাবেয়ীয় বাণী ও তাদের আমলসমূহ উল্লেখ করেছেন। আর তা হলো যে, পূর্বের হাদীসসমূহের অনুসরণে শবে বরাআতে জাগ্রত থেকে ইবাদত করা মুস্তাহাব। আর ফাযাইলে ক্ষেত্রে এমন হাদীসসমূহ আমলে দোষের কিছুই নেই। ইমাম আওযায়ী ও এমন মত পোষণ করেছেন ।" শবে বরাতের তত্ত্ব কথা, জাস্টিজ মুফতী ত্বকী ওসমানী, পৃ: ১৪৪)



 



ফিক্বহে শাফেয়ী ঈমাম শাফেয়ী (রহঃ) বলেন, আমাদের নিকট এই মর্মে হাদীস পেঁৗছেছে যে, পাঁচটি রাতে দু'আ কবুল করা হয়। ১) জুমুআর রাতে (বৃহষ্পতিবার দিবাগত রাত) ২) ঈদুল আযহার রাত ৩) ঈদুল ফিতরের রাত ৪) রজবের প্রথম রাত এবং ৫) পনের শা'বানের রাত (বরাআতের রাত) (কিতাবুল উম্ম লিশ শাফেয়ী, খ.১, পৃ. ২৩১)



 



রাদ্দুল মুহতার কিতাবে আছে, শাফেয়ী মাযহাবের কেউ কেউ বলেছেন যে, রাত সমূহের মধ্যে সবর্োত্তম রাত হলো নবী কারীম (সাঃ)-এর পবিত্র বেলাদাত (জন্ম) শরীফার রাত অতঃপর লাইলাতুল কাদ্রের রাত, তারপর পর্যায়ক্রমে নবী (সাঃ)-এর ঊর্ধ্বাকাশ ভ্রমণের পবিত্র মি'রাজের রাত, আরাফাতের রাত, জুমু'আর রাত, শা'বানের পনরতম রাত এবং ঈদের রাত। (রাদ্দুল মুহতার, খ.৮, পৃ: ২৮৫)



 



ফিক্বহে হাম্বলী :



 



 



''শাইখ ইবনুল মুফলিহ হাম্বলী (রহঃ) বলেন, মাগরিব ও ইশার মধ্যবর্তী সময়ে জেগে থেকে নফল ইবাদত করা মুস্তাহাব। এক দল আলেম বলেছেন, আশুরার রাত, পহেলা রজবের রাত এবং শা'বানের পনেরতম রাতে নফল ইবাদত করা মুস্তাহাব। (আল মাবদা লি ইবনে মুফলিহ আল হাম্বলী, খ. ২, পৃ:২৭)।



আল্লামা মানসূর আল বাহুতী আল হাম্বলী রচিত ''কাশশাফুল কিনা মিন মাতনিল ইকনা " কিতাবে বলা আছে- "শা 'বানের পনেরতম রাতে জেগে থেকে ইবাদত করা দু' ঈদের রাতের ইবাদতের অনুরূপ। (শবে বরাতের তত্ত্ব কথা, জাস্টিজ মুফতী তক্বী ওসমানী, পৃ: ৪৮)



 



ফিক্হে মালেকী :



 



''ইমাম মুহাম্মদ ইবনুলহাজ্ব আল মালেকী রহ, মাদখাল" গ্রন্থে তাঁর নিজস্ব আমল এভাবে লিখেছেন, তিনি বলেন, এ রাতটি যদিও লাইলাতুল কাদর নয় তথাপিও তা অধিক পরিমাণে সম্মানিত এবং অত্যাধিক বরকতময়। সালফে সালেহীন এ রাতটিকে অনেক সম্মান করতেন এবং এই রাতটি তাঁদের নিকট উপস্থিত হতো। দ্বীন এবং শরীয়াতের নিদর্শনাবলীর এটাই হচ্ছে এই রাতের প্রতি শারীয়াহ বিধিত সম্মান প্রদর্শন।" (আল মাদখাল, খ.১, পৃ: ২৯২, ২৯৩)



 



এ রাতে কবর জিয়ারত করা :



 



শবে-বরা'আতে কবরস্থান জিয়ারত করা মুস্তাহাব। কেননা নবী (সাঃ)কে এই রাতে মদীনা মুনাওয়ারার প্রসিদ্ধ কবরস্থান জান্নাতুল বাকীতে পাওয়া গেছে। নবী (সাঃ) এই কবরস্থানের ভেতরে বসে উম্মতের জন্যে দু'আ করেছিলেন। এই রাতে ঈসালে সওয়াবের উদ্দেশ্যে মা-বাবার কবরের পাশর্ে্ব যাওয়া নেহায়েত উপকার এবং সওয়াবের কাজ। এই মুবারক রাতে কবরের অসহায় ব্যক্তিদের জন্যে জীবিত ব্যক্তিদের প্রাণ খুলে মহান আল্লাহর দরবারে দু'আ করা এবং তাদের জন্যে মাগফিরাত কামনা করা উচিৎ।



 



দেওবন্দী আলেমদের দৃষ্টিতে শবে বরা'আতে কবর জিয়ারত :



 



 



মাওলানা আশরাফ আলী থানভী সাহেব লিখেছেন যে, ''শবে বরা'আতে কবর জিয়ারত করা মুস্তাহাব।" (যাওয়ালুস সুন্নাহ, পৃ. ১০)



মুফতী শফী (রহঃ) লিখেছেন, ''শবে-বরা'আতে কবর জিয়ারত করা সুন্নাত আমলের অন্তর্ভুক্ত।" (শবেবরাত, পৃ. ১৫)



শবে বরাত দু'য়া এবং আমলের রাত : মক্কাবাসীর আমল, ''আল্লামা ফাকেহী বর্ণনা করেছেন যে, শা'বানের পনরতম রাতের (শবে বরাতের রাতের) ফযিলতের কারণে মক্কাবাসীগণের আমল এবং প্রচ- ইবাদতের প্রতি তাদের আগ্রহ আলোচনা করার মতো। বর্তমান সময় পর্যন্ত মক্কাবাসীগণ শা'বানের পনরতম রাতের আমলকে চালিয়ে আসছেন। এই রাতে সাধারণত পুরুষ-মহিলা সকলে ঘর থেকে বের হয়ে মসজিদে হারামে আসেন, কা'বার সামনে নামাজ পড়েন, সাধ্যমত তাওয়াফ করেন এবং তারা ফজর পর্যন্ত কুরআন তেলাওতের মধ্য দিয়ে মসজিদে হারামে পুরো রাত কাটান। এ রাতে এমনকি তারা কেউ কেউ পবিত্র কুরআন খতমও করে থাকেন। আদিকাল থেকেই আহলে মক্কা বা মক্কাবাসী বরা'আতের এই রাতে তাদের যতটুকু সুযোগ হয় তারা নামাজ পড়েন এবং ইবাদত বন্দেগী করতে থাকেন। আর যে ব্যক্তি এই রাতে একশত রাকা'আত নামাজ পড়বে, প্রত্যেক রাকায়াতে একবার আল হামদুলিল্লাহ এবং দশবার করে সূরা ইখলাস ''কূল হুআল্লাহু আহাদ'' পাঠ করবে অতঃপর ওইরাতে যমযমের পানি পান করবে এবং তা দিয়ে গোসল করবে, অসুস্থ রোগীর জন্যে এই যমযম পানি সংগ্রহ করে নেবে এবং এই রাতের বরকত তালাশ করবে আল্লাহপাক তার সকল আশা পূরণ করে দেবেন। এ প্রসঙ্গে অসংখ্য হাদীস বর্ণিত হয়েছে।" (আখবারু মাক্কা লিল ফাকেহী, খ. ৫, পৃ: ২৩)



 



সাহাবা-ই কিরামের বাণী, ''হযরত আবূ ইয়াহইয়া তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, আমার নিকট ৩৩ জনের বেশি নবী কারীম (সাঃ)-এর সাহাবী হাদীস বর্ণনা করেছেন, তারা সকলে বলেছেন, ''যে ব্যক্তি পনর শা'বানের পনরতম রাতে (শবে বরা'আতের) নামাজ পড়লো।" হযরত ইবন আবী সালমা তাঁর হাদীসে বর্ণনা করেন যে, ''যে ব্যক্তি শা'বানের পনরতম রাতে একশত রাকা'আত নামাজ পড়লো এবং একশত বার করে সূরা ইখলাস 'কুলহু ওয়াল্লাহু আহাদ' পাঠ করলো। এর নিয়ম এভাবে, প্রত্যেক রাকায়াতে দশবার করে ''সূরা ইখলাস'' পাঠ করে মোট দশ রাকাতে ১০০ বার পাঠ করলো, এমন ব্যক্তির মৃত্যু হবে না যতক্ষণ না আল্লাহপাক তার নিকট একশতজন ফেরেশতা প্রেরণ করেন। তৎমধ্যে ত্রিশজন ফিরিশতা তাকে জান্নাতের শুভসংবাদ প্রদান করবেন, ত্রিশজন ফিরিশতা মহান আল্লাহর দরবারে তার জন্যে দোযখের আগুনের থেকে নিষ্পাপ করে দেয়ার জন্যে আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করতে থাকবেন এবং অবশিষ্ট দশজন ফেরেশতা তাকে তার শত্রুর হাত থেকে রক্ষার করার ব্যবস্থা করবেন।" (আখবারু মাক্কা লিল ফাকেহী, খ, ৫, পৃ: ২৭)



 



শবে বরা'আত দু'য়া কবুলের রাত :



 



''যখন শা'বানের পনরতম রাত আসে তখন আহব্বানকারী এই বলে আহ্বান জানাতে থাকে যে, কোনো ক্ষমাপ্রার্থী আছো কি? আমি তার আবেদন কবুল করে নেবো। এ মুহূর্তে যে যা চাবে তাকে তিনি তাই দান করবেন। তবে ব্যভিচারী এবং মুশরিক ক্ষমা পাবে না।" (জামিউল আহাদীস খ. ১, পৃ: ২৫) এই রাতে দু'আ কবুল হয়।



অনুরূপভাবে শারহুত তাহযীব কিতাবে আছে, ''পাঁচটি রাতে দু'আ কবুল হয়। যথা : জুমু'আ রাত, ঈদুল আযহার রাত, ঈদুল ফিতরের রাত, পহেলা রজবের রাত এবং শা'বানের পনরতম রাত।'' (আল মাজমুয়, শারহুত তাহযীব, খ. ৫, পৃ: ৪৫)



অতএব, কুরআন, হাদীস, ইজমা, কিয়াসের আলোকে চার মাযহাবের বিশ্বনন্দিত ইমামগণের তারিকা হলো শবে বরা'তের মহাপবিত্র বরকতময় রাতটিতে রাতভর ইবাদত করা। যারা এই রাতে মসজিদ বন্ধ করে রাখে তারা ইবাদত এবং ইবাদতকারীদের শত্রু। এদেরকে সম্মিলিতভাবে বর্জন করা উচিৎ।



 



লেখক : খতিব, হযরত মাদ্দাহখাঁ (রঃ) জামে মসজিদ, আলীগঞ্জ, হাজীগঞ্জ, চাঁদপুর।



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৮৯৪২৭
পুরোন সংখ্যা