চাঁদপুর। মঙ্গলবার ১ মে ২০১৮। ১৮ বৈশাখ ১৪২৫। ১৪ শাবান ১৪৩৯
redcricent
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • --
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৩৭- সূরা সাফ্ফাত

১৮২ আয়াত, ৫ রুকু, মক্কী

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।

৯৩। অতঃপর সে প্রবল আঘাতে তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।

৯৪। তখন লোকজন তার দিকে ছুটে এলো ভীত সন্ত্রস্ত পদে।

৯৫। সে বলল, তোমরা স্বহস্ত নির্মিত পাথরের পূজা কর কেন?

৯৬। অথচ আল্লাহ তোমাদেরকে এবং তোমরা যা নির্মাণ করছ সবাইকে সৃষ্টি করেছেন।  

দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন


কাহারো স্বভাব-চরিত্র জানতে হলে কোনো ব্যাপারে তার পরামর্শ চাও।        


-প্লেটো।


ধন থাকলেই ধনী হয় না। ওই ব্যক্তিই প্রকৃত ধনী যাহার হৃদয় প্রশস্ত


ফটো গ্যালারি
শবে বরাত : বরকতময় একটি রাত
ড. মোঃ আব্দুল গাফ্ফার
০১ মে, ২০১৮ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


আরবি চন্দ্র বর্ষের অষ্টম মাস হলো শাবান মাস। এ মাসের পনর তারিখ রাতটি শবে বরাত নামে পরিচিত একটি বরকতময় রাত। শব ফার্সি শব্দ, যার অর্থ রাত আর বরাত আরবি শব্দ যার অর্থ নাজাত, মুক্তি, পবিত্রতা। শবে বরাতে আল্লাহ অগণিত মানুষকে ক্ষমা করে দেন ও জাহান্নামীদের মুক্তি দেন বলে রাতটি শবে বরাত যা মুক্তির রাত বা সৌভাগ্যের রাত হিসেবে পরিচিত। মহানবী (সাঃ) অন্যান্য মাসের চেয়ে এই মাসেই বেশি নফল রোযা রাখতেন। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে রমজান ছাড়া অন্য সময় পূর্ণমাস রোযা রাখতে দেখি নাই এবং শাবান মাসের মতো অধিক পরিমাণে নফল রোযা অন্য কোনো মাসে রাখতেও দেখি নাই। (বুখারী-মুসলিম, নাসায়ী) নাজাতের এই রাতে মানুষ যেনো ইবাদাত-বন্দেগী করতে উদাসীন না থাকেন সে ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) সতর্ক করেছেন। এ প্রসঙ্গে হযরত উসামা বিন যায়েদ (রাঃ) বলেন, একদা আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমি তো আপনাকে শাবান মাসের মতো অন্য কোনো মাসে এতো অধিক রোযা রাখতে দেখি নাই। উত্তরে মহানবী (সাঃ) বলেন, এ মাসটির ব্যাপারে মানুষ বড়ই উদাসীন থাকে। অথচ এ মাসেই মানুষের আমলসমূহ আল্লাহর দরবারে উপস্থিত করা হয়। আমি চাই, আমার আমলগুলো এমন অবস্থায় পেশ করা হোক যখন আমি রোযাদার (নাসায়ী, বায়হাকী)। এই রাতের ইবাদাত করার জন্যে মহানবী (সাঃ)-এর অসংখ্য সহীহ হাদীস রয়েছে, যাতে এ রাতের বরকত ও ফযিলতের কথা বলা হয়েছে।



তন্মধ্যে হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে তিনি বলেন, এক রাতে আমি মহানবী (সাঃ)কে শয্যাপাশে না পেয়ে খুঁজতে বের হলাম এবং তাঁকে জান্নাতুল বাকীতে পেলাম। আমাকে দেখে তিনি বললেন, হে আয়েশা! তুমি কি এই আশঙ্কা করছো যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তোমার ওপর অবিচার করবেন? আমি বললাম হে আল্লাহর রাসুল (সাঃ) আমি ভেবেছিলাম আপনি অন্য কোনো বিবির ঘরে গমন করেছেন। অতঃপর হুজুর (সাঃ) বললেন, ১৫ শাবানের রাতে আল্লাহ তা'য়ালা প্রথম আকাশে অবতরণ করেন এবং বনু কালব গোত্রের পালিত ছাগলের পালের শরীরের পশমের চেয়েও অধিক সংখ্যক বান্দাকে ক্ষমা করে দেন। (তিরমিযী, ইবনে মাজাহ ও মুসনাদে আহমদ) একটি বকরীর শরীরের অসংখ্য পশম থাকে যা গণনা করা প্রায় অসম্ভব। আর এক পাল বকরীর শরীরের পশমতো গণনা করা অসম্ভব। এর দ্বারা আল্লাহ তা'য়ালা এ রাতের চেয়ে আরো অধিক সংখ্যক গুনাহগার মানুষকে ক্ষমা করে থাকেন। তবে মুশরিক ও পরস্পর বিদ্বেষ পোষণকারীকে ক্ষমা করা হয় না। এ ব্যাপারে হযরত মুয়ায ইবনে জাবাল (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, মহান আল্লাহ তা'য়ালা শাবানের ১৫ তারিখ রাতে তার বান্দদের প্রতি মনোনিবেশ করেন এবং মুশরিক ও পরস্পর বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যতীত সকলকে ক্ষমা করে দেন। (ইবনে হিব্বান, আততারগীব) অপর একটি হাদীসে হযরত আতা ইবনে ইয়াসার (রহঃ) হতে বর্ণিত লাইলাতুল কদরের পর শাবানের ১৫ তারিখ রাতের চেয়ে উত্তম কোনো রাত নাই। এই রাতে আল্লাহ তায়ালা প্রথম আকাশে অবতরণ করেন এবং তার সকল মু'মিন বান্দাদের ক্ষমা করে দেন।



মুশরিক, পরশ্রীকাতর এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারী ছাড়া। (মাসাবাতা বিস সুনান) এই বরকতময় রাতে দু'আ কবুল হয় এ প্রসঙ্গে বেশ ক'টি প্রসিদ্ধ হাদীস রয়েছে। হযরত মুয়ায ইবনে জাবাল (রাঃ) হতে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সালাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি পাঁচটি রাত জাগ্রত খেকে ইবাদাত করে তার জন্যে জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যায়। যিলহাজ মাসের আট তারিখ, আরাফাতের রাত, যিলহাজ মাসের দশ তারিখ তথা কোরবানীর ঈদের রাত, ঈদুল ফিতরের রাত, শাবান মাসের মধ্য রাত তথা বরাতের রাত। (আততারগীব ওয়াত তারহীব, ইলাউস সুনান) হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, পাঁচটি রাত এমন রয়েছে, যাতে বান্দার কোনো দু'আ ফেরৎ দেয়া হয় না। জুমার রাত, রজব মাসের প্রথম রাত, শাবানের মধ্য রাত, দুই ঈদের দুই রাত। (মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক) এই রাতে বেশি করে তাওবা ইস্তিগফার ও মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করতে হবে। হযরত ওসমান ইবনে আবিল আস্ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, শাবান মাসের পনর তারিখ রাতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এই বলে ডাকতে থাকেন, তোমাদের মাঝে আছে কি কোনো ক্ষমাপ্রার্থী, আমি তাকে ক্ষমা করে দেবো? আছে কি তোমাদের মাঝে কিছু চাইবার মতো কেউ, আমি তার সকল চাহিদা পূরণ করে দেবো?



অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, এভাবে সকল প্রার্থনাকারীর সকল প্রকার বৈধ মনোবাসনা পূর্ণ করে দেয়া হয়। কিন্তু ব্যভিচারিণী এবং মুশরিকদের প্রার্থনা কবুল করা হয় না (আদ্দুরুল মানসুর)। শাবানের পনরতম রাতে ইবাদাত করার এবং দিনে নফল রোযা রাখার নির্দেশ রয়েছে। হযরত আলী (রাঃ) বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, যখন শাবানের পনরতম রাত তোমাদের সামনে এসে যায় তখন তোমরা সে রাতে নামাজ পড়ো এবং পরবর্তী দিনটিতে রোযা রাখ। কারণ, সেদিন সূর্যাস্তের পর আল্লাহপাক প্রথম আকাশে অবতরণ করেন এবং বান্দাদের ডেকে বলতে থাকেন আছ কি কোনো ক্ষমাপ্রার্থী যাকে আমি ক্ষমা করে দেবো? আছ কি কোনো রিযিক প্রার্থী যাকে আমি রিযিকের ব্যবস্থা করে দেবো? আছ কি কোনো বিপদগ্রস্ত যাকে আমি বিপদমুক্ত করে দেবো? এভাবে সুবহে সাদিক পর্যন্ত বলতেই থাকেন, আছ কি কেউ অমুক বস্তুর প্রার্থী? আছ কি কেউ অমুক বস্তুরপ্রার্থী? আমি যার সকল মনোবাসনা পূর্ণ করে দেবো (ইবনে মাযাহ)। তাই সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ী, তাবে-তাবেয়ীগণ এ রাতে জাগ্রত থেকে বিভিন্ন প্রকার মাসনুন আমলে লিপ্ত থাকতেন। যা বিভিন্ন প্রকার নির্ভরযোগ্য বর্ণনা দ্বারা সুপ্রমাণিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত। শবে বরাতের আমল সম্পর্কে মাযহাব চতুষ্টয়ের ইমামগণও সুন্নাত, কেউ মুস্তাহাব বলেছেন।



 



এ রাতের মহত্ব ও ফযিলতের কারণে ইসলামের সোনালী যুগ থেকেই মানুষ এ রাতের ইবাদাতের প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্ব প্রদান করে আসছেন। এ বরকতময় রাতে বোমা, পটকা ফুটানো, আতশবাজী করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এ রাতে মুখ্য হচ্ছে ইবাদত। ইবাদতের বিঘ্ন ঘটিয়ে অন্য কিছু করা মোটেই ঠিক নয়। গরিব-মিসকীনদের মাঝে খাবার, তবররুক বিতরণ করা যেতে পারে। এমনকি প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজনকেও আপ্যায়ন করানো যেতে পারে। তবে এসব করতে গিয়ে কোনোভাবেই যেনো ইবাদতের বিঘ্ন না হয়। মসজিদে হৈচৈ করা, কবরস্থানে মেলার আয়োজন করা, অযথা ঘুরা-ফেরা করা, বিভিন্ন প্রকার রং তামাশা দেখে এ মূল্যবান সময় নষ্ট করা, তাছাড়া সারা বছরে মসজিদে যে আগরবাতী ও মোমবাতি জমা হয় শবে বরাতের রাতে তা সারা রাত মসজিদে জ্বালিয়ে নিঃশেষ করা। এসবই গুনাহর কাজ। প্রত্যেক মুসলিমের তা পরিহার করা উচিত। উপরোক্ত হাদীসের আলোকে আমরা জানতে পারি যে, এই সম্মানিত ও মহিমান্বিত বরকতময় এ রাতে মসজিদে বা বাসা-বাড়িতে বেশি করে ইবাদাত-বন্দেগী, নফল সালাত আদায়, কবর জিয়ারত, মৃত আত্মীয়স্বজন ব্যক্তিদের জন্যে দু'আ করা, দান-সাদকা, খানা পাক করে গরিব মিসকীনদের মাঝে বিতরণ করা, কুরআন তেলাওয়াত, বিভিন্ন দু'আ-দূরূদ, তাসবীহ-তাহলীল পাঠ করে অতিবাহিত করা প্রত্যেক মুসলিমের চেষ্টা করা উচিত। আল্লাহ তা'য়ালা বিশ্ব মুসলিম উম্মাহকে লাইলাতুল বরাআতের ফযিলত ও তাৎপর্য অনুধাবন করে রাতে আল্লাহর ইবাদাত ও রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর প্রতি দূরূদও সালাম পেশ করার তাওফীক দান করুন। আমিন।



 



লেখক : প্রিন্সিপাল ইনচার্জ, চাঁদপুর



আল-আমিন একাডেমী স্কুল এন্ড কলেজ।



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৭৪৭০৪
পুরোন সংখ্যা