চাঁদপুর, মঙ্গলবার ৮ অক্টোবর ২০১৯, ২৩ আশ্বিন ১৪২৬, ৮ সফর ১৪৪১
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৫৭-সূরা হাদীদ


২৯ আয়াত, ৪ রুকু, মাদানী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


২৭। অতঃপর আমি তাহাদের পশ্চাতে অনুগামী করিয়াছিলাম আমার রাসূলগণকে এবং অনুগামী করিয়াছিলাম মারইয়াম তনয় ঈসাকে, আর তাহাকে দিয়াছিলাম ইঞ্জীল এবং তাহার অনুসারীদের অন্তরে দিয়াছিলাম করুণা ও দয়া। আর সন্নাসবাদ-ইহা তো উহারা নিজেরাই আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য প্রত্যাবর্তন করিয়াছিল। আমি উহাদের ইহার বিধান দেই নাই; অথচ ইহাও উহারা যথাযথভাবে পালন করে নাই। উহাদের মধ্যে যাহারা ঈমান আনিয়াছিল, উহাদিগকে আমি দিয়াছিলাম পুরস্কার এবং উহাদের অধিকাংশই সত্যত্যাগী।


 


 


assets/data_files/web

অপ্রয়োজনে প্রকৃতি কিছুই সৃষ্টি করে না। -শংকর।


 


 


কবর এবং গোসলখানা ব্যতীত সমগ্র দুনিয়াই নামাজের স্থান।


 


 


 


ফটো গ্যালারি
সম্প্রীতির শারদীয়া ও বাঙালির সম্প্রীতি
পীযূষ কান্তি বড়ুয়া
০৮ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


'মা' শব্দটি বিশ্বজনীন এবং সার্বজনীনও বটে। মা মানেই পরম পবিত্র। মা মানেই পরম মমতাময়ী। দুর্গা যতটা না দেবী তার অধিক মা। দুর্গাকে দেবীরূপের চেয়ে মাতৃরূপে ফুটিয়ে তোলে অধিক তার চারধারের চরিত্রগুলো। 'পূজা' বিষয়টি অনেকেই সাদা চোখে দেখে নেতিবাচক মন্তব্যের ঝড় তোলেন। পূজা মূলত তা নয়। পূজা মানে হলো অনন্য শ্রদ্ধা যাতে পবিত্রতার শতভাগ পূর্ণ থাকে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীকে ক্ষমতায়িত করে বিশ্বকল্যাণের মূলবিন্দুরূপে চিন্তা করা ও প্রতিষ্ঠা করাই হলো শারদীয়ার পূজায় মুখ্য বিষয়। কারও সমকক্ষ করে তোলার জন্যেই নারীরূপে শারদীয়ার আগমন নয়। শারদীয়ার আগমন সে কোন রক্ত ক্ষরণের জন্যও নয়। শারদীয়া সবাইকে অভয় দিয়ে 'মা'রূপেই আসেন। যিনি প্রকৃত মা তিনি সন্তানদের মধ্যে ভেদবুদ্ধি কখনো করেন না। আগেকার দিনে বাঙালি যৌথ পরিবারে কোন মা বড় এক থালায় খাবার নিয়ে নিজের সন্তানদের পাশাপাশি ছোট ছোট সন্তানতুল্য দেবরপুত্র ও ভাসুরপুত্রদের নিজের হাতে অন্ন তুলে দিয়ে লালন-পালন করেছেন। শরৎ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাসে খুব চমৎকারভাবে এই সমপ্রীতির ছবিগুলো ফুটে উঠেছে। সেইসব মায়েরা



একাধারে দেবী ও স্নেহশীলা মমতাময়ী । মায়ের কাছে তাঁর সন্তানের বর্ণ নেই। মার কাছে তাঁর সন্তানের জাতও নেই। মায়ের পায়ের নীচে সন্তানের স্বর্গ। মা তাই পরমারাধ্যা। দুর্গাও পরমারাধ্যা। দুর্গা যেমন দুর্গতি নাশেন তেমনি প্রতিটি মা-ও তাঁর সামর্থ্য অনুযায়ী তাঁর সন্তানের দুর্গতি নাশের চেষ্টা করেন। দুর্গা তাই কোন সমপ্রদায়ের মা নন। তিনি সকলের কাছেই মা, তিনি সকলের জন্যেই সন্তান বৎসল।



শরৎ বাংলার প্রকৃতিতে আনে সমপ্রীতির বন্ধন। শরতে গরম যেমন প্রকট তেমনি বৃষ্টিও প্রতাপম-িত। ভোরের ঘাসের গায়ে শিশিরের পরশ শীতের আমেজ যেমন আনে তেমনি মনে মনে বাসন্তী প্রশান্তির প্রবাহ বিরাজ করে। শরৎ ষড়ঋতুর একটা সমপ্রীতি তৈরির উপায় বলেই অনুমিত হয় প্রকৃতির কাছে।



শরৎ সমপ্রীতিকে নিছক নিসগের্র সৌন্দর্য দিয়েই ধারণ করে না। শরৎ সমপ্রীতিকে সংস্কার দিয়েও সমুন্নত রাখে। এখনও লোকায়ত বাঙালির ঘরে ঘরে নায়-নাতকুর নিয়ে বিবাহিতা মেয়ে বাপের বাড়িতে নায়র আসে শরৎকালে। বর্ষার বন্যার প্রকোপ এসময় থাকে না। থাকে না হেমন্তের নতুন ধানের চাপ। তাই শরতেই কন্যা আসে পিতৃগৃহে বাৎসরিক ভ্রমণানন্দে। মেয়েকে নতুন শাড়ির উপহার দিয়ে বাবা শ্বশুরবাড়ি পাঠান। এই সংস্কার আজও চর্চিত হয় শারদীয়ার আগমনকে কেন্দ্র করে।



শরৎ কেবল প্রকৃতিকে সংস্কার ও সমপ্রীতির সমাবেশে আপ্লুত করে না। মানুষকেও শরৎ সমপ্রীতির সম্মিলনে চমকিত করে। শরৎ তার ঋতুর বাহনে নিয়ে আসে শারদীয়াকে। শারদীয়া মানে কেবল ঢাকের বাদ্য আর বেলপাতার অঞ্জলি নয়। শারদীয়া মানেই সমপ্রীতির সমাবেশ। শারদীয়ার দশ হাতের সমাবেশ যেন দশদিকের আয়োজন। দশদিক হতে দশ রকমের লোকজন এসে সম্মিলন ঘটায় শারদীয়ার উৎসবে। নবকন্যার ঘরের মাটি না হলে গড়া যায় না প্রতিমা। আর এ নবকন্যার মধ্যে সম্মিলন হয়েছে রূপোপজীবীনি, ব্রাহ্মণী, শূদ্রানী, নাপতানী এঁদের। অর্থাৎ সকল বণের্র মানুষের সমপ্রীতিকে সুনিশ্চিত করেই শারদীয়া আসেন বাঙালির মা হয়ে। এখানে কুমোর, কামার, ঢাকী, ব্রাহ্মণ, বৈশ্য, শূদ্র সকলেরই সমান অংশগ্রহণ জড়িয়ে আছে।



আবহমান কাল হতে বাঙালির পরিবারে যেমন ছেলেমেয়ের সমন্বয়ে পরিবার আদর্শ ও পূর্ণ হয়ে ওঠে ঠিক তেমনি মা-ও কৈলাশ হতে দু'মেয়ে আর দু'ছেলের সমন্বয়ে বেড়াতে আসেন মর্ত্যে। এ আগমনে শাশ্বত বাঙালি পরিবারের বন্ধনকে সমপ্রীতি বিনির্মাণে রূপায়িত করে তোলা হয়েছে। দুর্গার সাথে তা্র পুত্র-কন্যারূপে যাঁরা আসেন তাদের কেউ সিদ্ধিদাতা, কেউ বরদাতা, কেউ ধনের দেবী আর কেউ বিদ্যামাতা। অর্থাৎ জীবনে সকল কিছুর সমন্বয় না হলে জীবন পরিপূর্ণ হয় না। জীবন হচ্ছে বিদ্যা ও ধন এবং সংগ্রাম ও সিদ্ধির সমপ্রীতি। মায়ের ললাটে তৃতীয় যে নয়ন আছে তা-ও সমপ্রীতির সম্মেলনের বিষয়। কেননা, কেবল চর্ম চক্ষু দিয়ে জগৎ চলে না। দিব্যচক্ষু না থাকলে পার্থিব জগতে কেবল চর্মচক্ষু দিয়ে অপ্রমাদে জীবন চালানো যায় না। তাই দেবী দুর্গার মধ্যে পার্থিব জ্ঞান আর দিব্য জ্ঞানের সমন্বয়ের মাধ্যমে স্বর্গ-মত্যের্র সমপ্রীতি টানা হয়েছে।



কেবল যে পেশা, ধর্ম ও বর্ণের সমপ্রীতি নয়, শারদীয়া এলে বয়সেরও সমপ্রীতি হয়। তিনি নিজে তাঁর বিভিন্ন বয়সের লীলা নিয়ে জনমানসে তৈরি করেন এক স্নেহ-শ্রদ্ধার সমপ্রীতি। ছোট্ট শিশুর তিনি যেমন মা তেমনি নবতিপর বৃদ্ধেরও তিনি মা। অর্থাৎ তিনি এলে সবার মনে আসে আনন্দদোলা। আবার তিনি যেমন দুষ্টের দমন করেন তেমনি দুষ্ট তার ভুল বুঝে ক্ষমা চািলেও তিনি ক্ষমা করে দেন। যে অসুর মানুষ ও দেবের ক্ষতি করেছে, সে অসুরকেই তিনি নিজ পায়ে ঠাঁই দিয়ে যজ্ঞভাগ দিয়েছেন। তিনি তাঁর সন্তানদের বলেননি, অসুরের প্রতিমাকে পাথরাঘাত করতে। তিনি তাঁর সন্তানদের শিখিয়েছেন ক্ষমা আর উদারতা। ফলে একদা অরি অসুরও মায়ের কৃপায় বরিত হয় পূজার বেদীতে। অসামপ্রদায়িকতার এ এক অনন্য নিদর্শন।



বাঙালির সমপ্রীতি শুধু আজকের নয়। আবহমান কালের। এই কারণে এখানে এসেছেন চ-ীদাস, এখানে এসেছেন লালন। এখানে এসেছেন হাজার বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। শারদীয়ার আগমন আমাদের সেই সমপ্রীতিকে নবায়ন করিয়ে দেয় মাত্র। যুগে যুগে অসুর বা অসুরের মতো লোকের অভাব ছিল না। তারা মানুষের সমপ্রীতিতে আঘাত করে গেছে। কিন্তু শারদীয়ার আগমন সে আঘাতকে তুচ্ছ করে মানুষের মনে ও আচরণে সমপ্রীতির সেতু বিনির্মাণ করে গেছে। বাঙালির সমপ্রীতির শেকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। এ শেকড় সহজে উপড়াবার নয়। কালে কালে ফরাসী, ইংরেজ, ওলন্দাজ, তুর্কী ও আরবীয়রা চেষ্টা করে গেছে বাঙালির বাঙালিয়ানাকে ধ্বংস করে দিতে। পশ্চিম পাকিস্তানীরাও চেয়েছিল বাঙালিকে ভাষাহীন করে, সমপ্রীতিহীন করে রক্তক্ষরণকারী এক জাতিতে পরিণত করতে। কিন্তু বাঙালির হাজার বছরের সমপ্রীতির টান সে অপপ্রয়াসে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাঙালি শাশ্বত সুন্দরকে লালন করে বলেই শারদীয়ায় ধর্মকে নয় উৎসবকে বড় করে তোলে। এ উৎসব বাঙালির, এ উৎসব মর্ত্যবাসী অমর্ত্য প্রাণের।



 



 



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৩৮৯৩৪৪
পুরোন সংখ্যা