logo
এ জার্নি টু চাঁদপুর জেলা ব্র্যান্ডিং ফেস্টিভ্যাল
কাজী শাহাদাত
০৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ২০:৩১:০৫
(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
॥ দশ ॥
সীমানা পেরিয়ে
০২ ডিসেম্বর ২০১৬ কচুয়া প্রেসক্লাবের সহ-সভাপতি রাকিবুল হাসানের সাথে ফোনে আলোচনার সময় বললাম, আচ্ছা, আমরা আগামীকাল সাহার পাড় দিঘি দেখে পালগিরি যাবো এবং সেখান থেকে উজানী যাবো। পথিমধ্যে একটু কৈলাইন যেতে চাই। খুব বেশি কি সময় লাগবে? রাকিবুল হাসান বললেন, না, আমরা যে পথে উজানী যাবো, তার পাশেই কৈলাইন। তিনি হাসতে হাসতে বললেন, বুঝছি, বোনের বাড়ি যাবেন। মূল রাস্তা থেকে আপনার বোনের বাড়ি ৩-৪ মিনিটের পথ। ভেবে দেখলাম, ব্র্যান্ডিংয়ের প্রকাশনার জন্যে বেরিয়ে বোনের বাড়ির নিকট দিয়ে যাবার সময় সে বাড়িতে একটু ডু মারলে খুব বড় ধরনের অনিয়ম হবে না। এমনটি ভেবে আমার সেজো বোন রৌশন আপাকে ফোন করলাম। তাকে বললাম, আপা! কাল একটি কাজে পালগিরি আসবো। আপনাদের বাড়িতে চাঁদপুর শহরের তিনটি বিখ্যাত কলেজের অধ্যক্ষসহ আসবো। পিঠা বানাতে না পারেন, আপনাদের অনেক নারকেল গাছ আছে, একটু ডাব খাওয়াতে পারবেন তো? আপা স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বললেন, তুই বেশি কথা কস্। আমাদের বাড়ির রাস্তা তো তুই ভুলেই গেছিস্। তোর আসা তুই আস্বি, কী খাওয়াবো না খাওয়াবো সেটা আমার ব্যাপার। তবে পালগিরি থেকে রওনা দেবার আগে একটু ফোন করিস্। 
৩ ডিসেম্বর সকালে সাহার পাড়ের দিঘি, পালগিরি মসজিদ ও দুলাল রাজার দিঘি দেখার পরই আমি সঙ্গীয় তিন অধ্যক্ষ মহোদয়সহ অন্যদের জানালাম, পরবর্তী গন্তব্য উজানী যাবার পূর্বে আপনাদেরকে নিয়ে একটু সীমানা পেরিয়ে আমার বোনের বাড়ি যেতে চাই। পথেই পড়বে সে বাড়ি। আপনারা সম্মত থাকলেই তবে যাবো। সবাই একবাক্যে বললেন, কোনো অসুবিধা নেই। অবশ্যই যাবো। 
আমার বোনের বাড়ি (কৈলাইন মিয়া বাড়ি)-এর অবস্থান চাঁদপুর জেলায় নয়। তবে চাঁদপুর জেলার সীমানা ঘেঁষে কচুয়া উপজেলার পার্শ্ববর্তী চান্দিনা উপজেলায়। রহিমানগর থেকে যে সড়কটি মাধাইয়া গিয়ে ফোরলেনের ঢাকা-চট্টগ্রাম জাতীয় মহাসড়কে গিয়ে মিলিত হয়েছে, এই সড়কের এক পাশে চান্দিনার কৈলাইন গ্রাম, আর অন্যপাশে কচুয়ার বিখ্যাত উজানী গ্রাম। আমরা পালগিরি থেকে উজানী যাবার পথে চাঁদপুর জেলার সীমানা পেরিয়ে কুমিল্লা জেলার সীমানায় প্রবেশ করলাম এবং এ জেলার চান্দিনার সেই কৈলাইন গ্রামে গেলাম। 
 
অনন্য কিছু সময় কাটালাম
গত দশ বছরেও বোনের বাড়ি কৈলাইনে গিয়েছি কিনা মনে পড়ছে না। আজ তিনজন বিখ্যাত অধ্যক্ষ, একজন অধ্যাপক, কচুয়ার প্রবীণ সাংবাদিক আবুল হোসেন, অনুজপ্রতিম রাকিবুল হাসান ও হাসান খান মিসুকে নিয়ে আসতে পেরে আমি যেনো আমার জীবনের অনন্য কিছু সময়ের সন্ধান পেলাম। সহোদরের জন্যে সহোদরার যে মমতা তা বিশেষভাবে প্রত্যক্ষ করলাম। আপা শুধু ডাব নয়, পিঠাসহ অতিথি আপ্যায়নের যথাযথ ব্যবস্থাই গ্রহণ করেছেন। আমাদের দলপ্রধান অধ্যক্ষ ড. দেলওয়ার হোসেন আপাদের বাড়ির সামনে স্থাপিত শিশু বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সাথে বড্ড আপন করে খানিকটা সময় কাটালেন। অধ্যক্ষ রতন মজুমদার (রতন দা) ডাবের ভেতরের নরম নারকেল (‘লেপা’) খেলেন খুব মজা করে। ১৫-২০ মিনিটের মাথায় আপা ও দুলাভাইয়ের কাছ থেকে বিদায় নিতে গেলাম। আপা বললেন, এতো তাড়াহুড়া করছিস্ ক্যান? আমি বললাম, আজতো অনেক জায়গায় যেতে হবে। পরে আবার সপরিবারে আসবো। আপা বললেন, তোর এই ‘পর’ কতোদিন পর আল্লাহ মাবুদই জানে। কথা না বাড়িয়ে ভেতর বাড়ি থেকে বেরিয়ে বাড়ির সামনে গিয়ে আমরা সুদৃশ্য পোশাক পরিহিত শিশু শিক্ষার্থী এবং তাদের শিক্ষকদের সাথে ছবি তুললাম। ওরা ভীষণ আনন্দিত হলো। তারপর গাড়িতে উঠলাম।
 
ট্রাক্টরে ক্ষত বিক্ষত সড়ক
আমরা দু মিনিটের মধ্যে রহিমানগর-মাধইয়া সড়কে উঠে যাই। কিছু দূর যেতেই হাতের বাম পাশে লক্ষ্য করলাম একটি সাইনবোর্ড। এতে লিখা আছে ‘জামিয়া ইসলামিয়া ইব্রাহীমিয়া উজানী, কচুয়া, চাঁদপুর।’ গাইড বললেন, এ পথেই যেতে হবে উজানী মাদ্রাসায় এবং এ মাদ্রাসার সাথেই রয়েছে ‘ঐতিহাসিক বখতিয়ার খাঁ শাহী মসজিদ।’ কিন্তু আমাদের গাড়িটি এগুতেই পারছিলো না। কারণ, এ সড়কটি একেবারেই ক্ষত-বিক্ষত। সড়কটিকে বিধ্বস্ত বললেও অত্যুক্তি হবে না। জানা গেলো ও দেখা দেলো, এ সড়কে নিষিদ্ধ ট্রাক্টর নির্বিঘেœ চলছে এবং সে কারণে সড়কটি চলাচল অযোগ্য হয়ে পড়েছে।
 
মাদ্রাসা ক্যাম্পাসে কিছুক্ষণ
কষ্টকর পথ পাড়ি দিয়ে কিছুদূর গিয়ে দেখা গেলো জামিয়া ইসলামিয়া ইব্রাহিমিয়া অর্থাৎ উজানী মাদ্রাসার বিশাল ক্যাম্পাস। ১৩২১ হিজরী মোতাবেক ১৯০১ খ্রিস্টাব্দে প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও সংস্কারক আলহাজ্ব হযরত মাওলানা ক্বারী মোহাম্মদ ইব্রাহীম (রহঃ) দেশখ্যাত এই মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠা করেন। দেশের শ্রেষ্ঠ ক্বিরাত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে মাদ্রাসাটি স্বীকৃত। মাদ্রাসার নাজেমে তা’লিমাত ও শায়খুল হাদিস আলহাজ্ব মাওলানা আব্দুর রহমান সাহেব আমাদেরকে মাদ্রাসাটি এবং নিকটবর্তী ঐতিহাসিক মসজিদটি সম্পর্কে ধারণা দেন। প্রতি বছর শীতকালে এ মাদ্রাসার বার্ষিক মাহফিলে লক্ষ লক্ষ লোকের সমাগম হয়। এলাকাবাসী এদেরকে যে আন্তরিক আতিথেয়তা প্রদর্শন করেন ও আপ্যায়নের ব্যবস্থা করেন, তা অন্যত্র বিরলদৃষ্ট।
মূলত নোয়াখালী জেলার সুধারাম উপজেলার নলুয়া গ্রামের সুশিক্ষিত প্রতাপশালী জমিদার পানা মিয়া ভূঁইয়ার সন্তান হচ্ছেন ক্বারী ইব্রাহীম (রঃ)। তিনি কলকাতা ও মক্কা নগরীতে দ্বীনী শিক্ষা লাভ করেন। তিনি সৌদি আরবের বাদশাহ শরীফ হাসানের রাজ দরবারে কোরআন তেলাওয়াত প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করে বাদশাহ কর্তৃক একাধিক পুরস্কার লাভ করেন এবং ওখানকার বিখ্যাত মাদ্রাসায় শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন। তিনি তাঁর পীরের নির্দেশে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন এবং সার্বিক ধর্মীয় কর্মকা-ে ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি ১৩২১ হিজরিতে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্যে উজানীতে ২২ কানি (২৬৪০ শতাংশ) অনাবাদী জমি খরিদ করে এখানে চলে আসেন।  জঙ্গলে পরিপূর্ণ এই জমি পরিষ্কারের সময় তিনি এক গম্বুজ বিশিষ্ট একটি মসজিদ আবিষ্কার করেন। মসজিদের মেহরাবে প্রাপ্ত খোদাইকৃত শিলালিপি থেকে জানা যায়, বাদশাহ বাহাদুর শাহের আমলে ফৌজদার বখতিয়ার খাঁ কর্তৃক ১১১৭ হিজরিতে ২১ ফুট প্রস্থ ও ২৩ ফুট দৈর্ঘ্যরে এ মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। যে শিলালিপিটি উজানী মাদ্রাসার অফিসে সযতেœ সংরক্ষিত আছে। 
এ মসজিদটি আবিষ্কারের সময় হযরত ক্বারী ইব্রাহীম ছাহেব দক্ষিণ পাশের জানালা দিয়ে দেখতে পান, মসজিদের ভেতরে একটি বাঘ তার বাচ্চাদের দুধ খাওয়াচ্ছে। তখন ক্বারী ছাহেব বলেন, “হে জংলার বাঘ! এখানে এখন মানুষের বসতি এসেছে। কাজেই তুমি তোমার বাচ্চাদেরকে নিয়ে অন্য জঙ্গলে চলে যাও। এখানে আর তোমার থাকা সম্ভব হবে না।” এ কথা শুনে বাঘটি তার বাচ্চাদের ঘাড় কামড়ে ধরে পূর্ব দিকে লালমাই পাহাড়ের দিকে চলে যায়।
মসজিদটির পুরানো অবয়ব খুঁজে পেতে আমাদের একটু কষ্ট করতে হয়েছে। কারণ পূর্ব-উত্তর দিকে ৭৫ ফুট প্রস্থ ও ১১৬ ফুট দৈর্ঘ্যে মসজিদটি সম্প্রসারণ করে ক্রমবর্ধমান মুসল্লিদের স্থান সঙ্কুলানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। দক্ষিণ পাশ দিয়ে পেছনে গেলেই গম্বুজটির দেখা পাই এবং প্রাচীনত্ব আন্দাজ করতে পারি। 
আমাদের পরবতী গন্তব্য ছিলো শাহরাস্তি উপজেলা। সেজন্যে রাকিবুল হাসান উজানী মাদ্রাসা থেকে বিদায় নেন, আর আবুল হোসেন বিদায় নেন রহিমানগরে এসে।
 
শাহরাস্তি থেকে দ্রুত হাজীগঞ্জে
দোয়াভাঙ্গা দিয়ে শাহরাস্তি উপজেলা সদরে ঢুকে প্রথমে মেহের কালীবাড়ি, তারপর শাহরাস্তি (রঃ)-এর মাজার এবং নাওড়ার মঠ দেখতে যাই। পূর্ব অবগতি সাপেক্ষে আমাদেরকে গাইড হিসেবে সাহচর্য দেন শাহরাস্তি প্রেসক্লাবের সহ-সভাপতি মঈনুল ইসলাম কাজল। খুব দূরে বলে চিতোষী ও রাগৈ যাইনি। প্রাচীন রাগৈ মসজিদের ছবি কাজলকে তুলে পাঠিয়ে দেয়ার জন্যে অনুরোধ করি। খবর পেয়ে আমার ছোট বোন শাহজাদী তার কর্মস্থল শাহরাস্তি বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে তার সহকর্মী নাজমা বেগমসহ শাহরাস্তি (রঃ) মাজারের পুকুরের ঘাটলায় দেখা করতে আসে। কিন্তু তাকে সময় দিতে পারিনি। হাজীগঞ্জ গিয়ে দুপুরের খাবার খেতে হবে বলে তার ও কাজলের কোনো অনুরোধ রক্ষা করতে পারিনি।
সরকারের প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তর পুরাকীর্তি হিসেবে নাওড়ার মঠটিকে এক সময় সংরক্ষণ করলেও এখন মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। বর্তমানে জঙ্গলাকীর্ণ মঠটি সাপের বাসস্থানে পরিণত হয়েছে। আর শাহরাস্তি (রঃ)-এর মাজার ও মেহের কালীবাড়ির বাহ্যিক দৃশ্যপটকে পূর্বের চেয়ে কিছুটা ম্লান রূপে দেখা গেলো। সাধক সর্বানন্দ ঠাকুরবাড়ির জরাজীর্ণ যে অবস্থা অরক্ষিত দেখলাম, তাতে এটি যেনো ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ার অপেক্ষায় রয়েছে বলে আমাদের সকলের ধারণা হলো। আমাদের এমন পর্যবেক্ষণ নিয়ে গাড়িতে বসে আলোচনা করতে করতেই অত্যল্প সময়ে হাজীগঞ্জ উপজেলার সীমানায় প্রবেশ করে ফেললাম। (চলবে)