চাঁদপুর। রোববার ৪ জুন ২০১৭। ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪। ৮ রমজান ১৪৩৮
ckdf

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

২৮-সূরা কাসাস 


৮৮ আয়াত, ৯ রুকু, ‘মক্কী’


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


৪৪। মূসাকে যখন আমি বিধান দিয়াছিলাম তখন তুমি পশ্চিম প্রান্তে উপস্থিত ছিলে না এবং তুমি প্রত্যক্ষদর্শীও ছিলে না। 


দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন


সংসার আনন্দময় পরিবেশ ভালো কিছু করার প্রেরণা যোগায়।                      


 -জন মেসাভন্তু।

যারা এক মুখে দু’কথা বলে তারা মানুষের মধ্যে সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট ব্যক্তি।


নীলকমল-এক জেনারেলের স্বপ্ন
হাসান আলী
০৪ জুন, ২০১৭ ২০:৩৮:০৯
প্রিন্টঅ-অ+
নীলকমল মেঘানার বুকে হারিয়ে যাওয়া এক জনপদের নাম। চাঁদপুর জেলার হাইমচর উপজেলায় নীলকমল ইউনিয়নটি অবস্থিত। মেঘনার বুকে বিলীন হওয়া নীলকমল নতুন চর হিসেবে জেগে উঠেছে। নতুন করে গজিয়ে উঠা এই চরকে নীলকমল বলে গ্রহণ করেছে মানুষ। বাপ-দাদার ভিটে মাটির জন্যে মানুষের আকুতি চিরদিনের। নীলকমল ইউনিয়নটি শিক্ষা দীক্ষায় তুলনামূলকভাবে এগিয়ে ছিলো। অগ্রসরমান মানুষের সংখ্যা ছিলো উল্লেখযোগ্য। চাষাবাদ, জীবনযাপন, জীবিকা ছিলো আকর্ষণীয়। তবে মহাজন, জোতদারদের নির্মমতাও ছিলো। নদীভাঙ্গনের কবলে পড়ে অনেকেই ঢাকা-গাজীপুরসহ বিভিন্ন স্থানে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। যখনই হাইমচর উপজেলার প্রসঙ্গ আসে তখনই তারা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। 

আমি নিজে এক সময় হাইমচরের গণমানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে একজন কর্মী হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। হাইমচরকে আমি মনেপ্রাণে ভালোবাসি। হাইমচরের মানুষ আমাকে অনেক বেশি ভালোবাসে। প্রবীণ বিষয়ে কাজের সুবাদে আমার সাথে পরিচয় হয় মেজর জেনারেল জীবন কানাই দাস (অবঃ) স্যারের। আমি তাঁর নাম শুনেছি অনেক, কিন্তু দেখা হয়নি। হাইমচরের এই কৃতী সন্তান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ৩৭ বছর সুনামের সাথে কাজ করেছেন। তিনি সেনাবাহিনীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ছাত্রজীবনে বৃত্তি পেয়েছেন। ডিএন স্কুল থেকে এসএসসি, ঢাকা কলেজ থেকে আইএসসি পাস করেন। ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের মেধা তালিকায় স্থান পেয়েছেন। ভর্তি হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। 

জেনারেল জীবন কানাই দাস সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করে অসহায় প্রবীণদের পাশে দাঁড়ান। গড়ে তোলেন স্যার উইলিয়াম বেভারিজ ফাউন্ডেশন। এই প্রতিষ্ঠানের মূল কাজ হলো অসহায় দুঃস্থ প্রবীণদের সেবা দেয়া। তিনি ঢাকাস্থ হাইমচর সমিতির সহ-সভাপতি। তাঁর অফিসে প্রায় হাইমচর সমিতির মিটিং হয়। মাঝে মধ্যে আমি নিজেও মিটিংয়ে থাকি। জীবন স্যার সবসময়ই বলেন, মানুষের কল্যাণে কাজ করতে না পারলে প্রকৃত আনন্দ পাওয়া যায় না। তিনি আমাকে প্রবীণ বিষয়ে লেখালেখিতে প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করেন। তাঁর সান্নিধ্য আমাকে আনন্দ দেয়। হাইমচরের মানুষদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য জীবন স্যার ভাবতেন। তাঁকে আমি জিজ্ঞেস করলাম ‘আপনি কখনও চরে গিয়েছেন কিনা?’ তিনি বললেন, ‘না, আমি কখনও যাইনি। বাজাপ্তী নদী ভাঙ্গনে বিলীন হয়ে গেছে। আমাদের বাড়ি দুইবার নদীতে নিয়ে গেছে। ভাবছি একবার চরে যাবো’। অবশেষে নভেম্বর ২০১৬ আমরা মনস্থির করলাম চরে যাবো। ঢাকা থেকে আমি ও জীবন স্যার, চাঁদপুর থেকে বন্ধু কাজী শাহাদাত (প্রধান সম্পাদক, দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ) ও তমাল কুমার ঘোষ (সহ-সভাপতি, চাঁদপুর চেম্বার অব কমার্স), হাইমচর থেকে প্রাক্তন উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান চুন্নু ভাইসহ চরে যাবার সিদ্ধান্ত হলো। ঢাকায় জরুরি কাজ থাকায় কাজী শাহাদাত আমাদের সাথে যেতে পারেন নি। আমরা চরে গেলাম। 

হাইমচর উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের মধ্যে ৩টি ইউনিয়ন মূলত মেঘনার মাঝখানে। আমরা ৭টি চরে গেলাম। বাজারে চরের মানুষের সাথে বৈঠক করলাম। তাঁদের সমস্যা এবং সম্ভাবনার কথা শুনলাম। মাছের আড়ত, ফসলের মাঠ, স্কুল, হাট-বাজার আমাদের মুগ্ধ করেছে। স্কুলগুলোতে ছেলেদের চাইতে মেয়েদের উপস্থিতি বেশি। মাছধরা এবং কৃষি কাজই প্রধান পেশা। চরে তরকারি, শাক-সবজি উৎপাদন সন্তোষজনক। চরে দুইদিন একরাত থেকে ঢাকায় ফিরে আসলাম। ঢাকায় ফেরার পথে জীবন স্যার চরের মানুষ এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রশংসা করতে লাগলেন। কয়েকদিন পর ঢাকাস্থ হাইমচর সমিতির বৈঠক হলো। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হলো পিকনিক হবে নীলকমল চরে। গতানুগতিক পিকনিক হবে না। চরের মানুষের জন্যে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প, শীতবস্ত্র বিতরণ ও ঔষধ বিতরণ করা হবে। ঢাকা থেকে বড় একটি লঞ্চে প্রায় দুশো যাত্রী নিয়ে চরে আসলাম। বেশিরভাগই কোনো দিন চরে আসেন নি। সবাই খুশি এবং আনন্দিত। এই পিকনিকের মধ্যে জীবন স্যার সাধারণ মানুষের সাথে বৈঠক করলেন। চরে বিষমুক্ত শাক-সবজি উৎপাদনের বিষয়ে কথা বললেন। তিনি স্থানীয় কৃষকদের আশ্বস্ত করলেন এই বলে যে, যদি বিষমুক্ত প্রাকৃতিক শাক-সবজি উৎপাদন করতে পারেন তবে উৎপাদিত ফসল বাজারজাত করার দায়িত্ব আমরা নিবো। তিনি প্রাকৃতিক উপায়ে উৎপাদিত ফসল শরীরের এবং পরিবেশের জন্য কতটা উপকারী তা বোঝালেন। উন্নতমানের বীজ, প্রশিক্ষণ, মূলধন, বাজারজাতকরণ ইত্যাদি বিষয়ে বিস্তারিত বললেন। 

ঢাকায় ফিরে আমরা টাঙ্গাইলের যেসব জায়গায় প্রাকৃতিক উপায়ে বিষমুক্ত খাবার উৎপাদন হয়, সেসব প্রকল্প ঘুরে দেখলাম। বিষমুক্ত ফসল উৎপাদনকারী একটি জাপানী প্রতিষ্ঠানের সাথে আমাদের আলাপ হলো। তারা বিনামূল্যে আমাদের কৃষকদের প্রাকৃতিক উপায়ে শাক-সবজি উৎপাদনের প্রশিক্ষণ দিতে রাজি হয়েছেন। বাংলাদেশের একটি বৃহৎ পণ্য বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান আমাদের নিশ্চয়তা দিয়েছে নীলকমলের চরে উৎপাদিত বিষমুক্ত শাক-সবজি বাজারজাত করবে। কৃষকদের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যে উৎপাদিত ফসল কিনবে। আমরা পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)-এর সাথে দেখা করেছি। তারা আমাদের কৃষকদের স্বল্প সুদে ঋণ দিবেন বলে আমাদের আশ্বস্ত করেছেন। আমরা এলাকার জনপ্রতিনিধিদের সাথে দীর্ঘ বৈঠক করেছি। তাঁরা সর্বাত্মক সাহায্য সহযোগিতা করবেন বলে আশা দিয়েছেন। নীলকমলের চরে শাক-সবজি উৎপাদনের সম্ভাবনা নিয়ে আমরা কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়েছি, তাঁরাও আমাদের ভরসা দিয়েছেন। আমরা এখন  প্রকৃত কৃষকদের খুঁজছি যাঁরা নীলকমল চরে শাস-সবজি উৎপাদন করবেন। আমরা চাঁদপুরের জেলা প্রশাসন, বিশিষ্ট নাগরিকবৃন্দ এবং আগ্রহী ব্যক্তিদের সমর্থন ও সহযোগিতা আশা করছি। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নীলকমল চরে বিষমুক্ত এবং রাসায়নিক সার মুক্ত শাক-সবজি উৎপাদনে সক্ষম হবো। এখন সময় হয়েছে নিজেদের এবং প্রিয়জনদের বিষমুক্ত ও রাসায়নিক সার মুক্ত খাদ্য নিশ্চিত করা। আমরা চাঁদপুরবাসীর কাছে সহযোগিতা এবং সমর্থন কামনা করছি।

 

লেখক : বার্ধক্য বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক। ই-মেইল : hasanali63@gmail.com

 

এই পাতার আরো খবর -
    আজকের পাঠকসংখ্যা
    ১৫৯২৩১০
    পুরোন সংখ্যা