চাঁদপুর । বুধবার ২৫ জুলাই ২০১৮ । ১০ শ্রাবণ ১৪২৫ । ১১ জিলকদ ১৪৩৯
redcricent
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৩৯-সূরা আয্-যুমার

৭৫ আয়াত, ৮ রুকু, মক্কী

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।

৭২। বলা হবে, তোমরা জাহান্নামের দরজা দিয়ে প্রবেশ কর, সেখানে চিরকাল অস্থানের জন্যে। কত নিকৃষ্ট অহংকারীদের আবাসস্থল।

৭৩। যারা তাদের পালনকর্র্তার ভয় করত তাদেরকে দলে দলে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। যখন তারা উন্মুক্ত দরজা দিয়ে জান্নাতে পৌছাবে এবং জান্নাতের রক্ষীরা তাদেরকে বলবে, তোমাদের প্রতি সালাম, তোমরা সুখে থাক, অতঃপর সদাসর্বদা বসবাসের জন্যে তোমরা জান্নাতে প্রবেশ কর।   

দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন


অনেক সময় ভালোকে ভালো বলার জন্য সৎসাহসের প্রয়োজন হয়।            


-দাস্তে।


সাবধান‘‘ ধর্ম সম্বন্ধে বাড়াবাড়ি কোরো না। ঁ(ধর্মের) বাড়াবাড়ির জন্য তোমাদের পূর্ববর্তী বহু জাতি  ধ্বংস হয়ে গেছে।



 


ফটো গ্যালারি
স্মৃতির বেড়াজালে বীর মুক্তিযোদ্ধা সুবেদার সিরাজুল হক
ইউসুফ পাটোয়ারী লিংকন, কাতার
২৫ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


প্রিয় পাঠক, ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে একজন শহীদ পরিবারের বীর মুক্তিযোদ্ধার অবদানের কথা তুলে ধরলাম। এই বীর মুক্তিযোদ্ধার ছোট ভাই জাফর আহমদ হানাদার বাহিনীর হাতে শহীদ হন।



মুক্তিযোদ্ধা সুবেদার সিরাজুল হক পাটোয়ারী। চাঁদপুর জেলার অন্তর্গত শাহরাস্তি থানা তদানীন্তন হাজীগঞ্জ থানার পাথৈর গ্রাম। মুক্তিযোদ্ধা সুবেদার সিরাজুল হক আমার পরিবারের সদস্য হওয়াতে আমি নিজেকে গর্বিত মনে করি। কারণ আমি হলাম মুক্তিযোদ্ধা সুবেদার সিরাজুল হকের ভাতিজা, তিনি হলেন আমার জেঠা। তাঁর কাছ থেকে আমি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি শুনতাম এবং তিনিও সুযোগ পেলে আমাদেরকে শোনাতেন। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে সেই রণাঙ্গনের দৃশ্য আমি দেখিনি, তবে তিনি সবসময় সেই যুদ্ধের মুহূর্তগুলো স্মৃতিচারণ করতেন। সুবেদার সিরাজুল হক পাটোয়ারী তৎকালীন ইপিআর বর্তমান বিজিবিতে চাকুরিরত অবস্থায় ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে ছুটিতে ছিলেন। ৭ই মার্চ যখন বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করলেন "এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম............আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাক"। তখন তিনি আর চাকুরিতে ফেরৎ না গিয়ে স্থানীয় ভাবে ভাই, ছেলে, আত্মীয় স্বজন এলাকাবাসীদেরকে ট্রেনিং দেয়া শুরু করেন এবং মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন-যে কোনো মুহূর্তে যুদ্ধ লেগে যেতে পারে। ২৫ মার্চ দিবাগত রাতেই অপারেশন চার্চলাইট নামে পকিস্তানী সৈন্য বাহিনী ঘুমন্ত বাঙালিদের গণহত্যা শুরু করে এবং ২৬ মার্চ সারা বংলায় বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা ছড়িয়ে পড়ে।



সুবেদার সিরাজুল হক স্থানীয়দের সাথে নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং দুই নম্বর সেক্টরের আওতায় যুক্ত হন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে ব্যাপক ও জোরদার করার উদ্দেশ্যে মুজিবনগর সরকার রণাঙ্গনকে ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করেছিলো। প্রতিটি সেক্টরে একজন করে অধিনায়ক নিযুক্ত করে যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিলো। তবে যুদ্ধের মৌলিক নীতি-নির্ধারণ ও সার্বিক দায়িত্ব ছিলো মুজিবনগর সরকারের। নোয়াখালী জেলা, কুমিল্লা জেলার আখাউড়া-ভৈরব রেললাইন পর্যন্ত এবং ঢাকা ও ফরিদপুর জেলার অংশ নিয়ে গঠিত হয় দুই নম্বর সেক্টর। দুই নাম্বার সেক্টরের দায়িত্বে ছিলেন ১. মেজর খালেদ মোশাররফ (এপ্রিল-জুন) এবং ২. ব্রিগেডিয়ার নুরুজ্জামান (সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর)। মুজিবনগর প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ মুক্তিযুদ্ধকে আরও জোরদার করার জন্যে ১১টি সেক্টর ও টাঙ্গাইলের অতিরিক্ত সেক্টর ছাড়াও জুন মাস নাগাদ ব্রিগেড আকারে তিনটি ফোর্স গঠনের সিদ্ধান্ত নেন। তিনজন শ্রেষ্ঠ কমান্ডারের নাম অনুসারে নামকরণ করা হয় 'জেড ফোর্স' 'এস ফোর্স' এবং 'কে' ফোর্স'। তিনজন কমান্ডার হচ্ছেন যথাক্রমে জিয়াউর রহমান, কেএম শফিউল্লাহ এবং খালেদ মোশাররফ। ১১টি সেক্টরের মধ্যে চাঁদপুরের দুজন কৃতী সন্তান ছিলেন, তাঁরা হলেন 'এক' নাম্বার সেক্টরে মেজর রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম এবং 'আট' নাম্বার সেক্টরের দায়িত্বে ছিলেন কর্নেল আবু ওসমান চৌধুরী বীর উত্তম। সুবেদার সিরাজ পরবর্তীতে 'কে' ফোর্সের আওতায় মরণপণ যুদ্ধ চালিয়ে বাংলার বুকে লালসবুজের পতাকা ছিনিয়ে এনেছেন।



'বাংলাকা আদ্মিনেহি চাইয়ে! বাংলাকা মাটি চাইয়ে! দু হাপ্তামে পূর্ব বাংলাকো তামা বানায়গা'। পাকিস্তানের সামরিক জান্তা ইয়াহিয়া খান ভেবেছিলেন, দুই সপ্তাহ লড়াইয়ের পর যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে। বাঙালিদের হত্যা করার জন্যে পাকিস্তান সৈন্যবাহিনীতে টাইগার বলে পরিচিত লেঃ জেনারেল আমীর আব্দুল্লহ খান নিয়াজী, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে বীরত্বসূচক মিলিটারী ক্রস বিজয়ী মেজর জেনারেল জমসেদ, ধূর্ত মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী এবং নৌ-বাহিনীর আঞ্চলিক প্রধান বিয়ার অ্যাডমিরাল শরীফ, ইয়াহিয়া খানের বিশ্বস্ত মেজর জেনারেল রহিম খান যথেষ্ট। লড়াইয়ের ময়দানের জন্যে খুব দক্ষ অফিসারদের নির্দেশ দিয়ে পাঠিয়েছেন যে, বাংলার কোনো মানুষ জীবিত থাকুক সেটা দরকার নাই, শুধু বাংলার মাটি চাই। কিন্ত বিধাতার কী পরিহাস, যদিও ৩০ লাখ শহীদ আর ২ লাখ ৬৫ হাজার মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে, তবে ৯৮ হাজার সৈন্য নিয়ে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে বীরত্বসূচক মিলিটারি ক্রস বিজয়ী সেই টাইগার নামধারী কমান্ডারসহ হানাদারবাহিনীকে মাত্র ৯ মাস ৯ দিনের মাথায় ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে বাংলার দামাল ছেলেদের সামনে মাথা নিচু করে আত্মসমর্পণ করতে হয়েছে।



মুক্তিযুদ্বের সময় তৎকালীন মেজর খালেদ মোশারফের নাম হানাদার বাহিনীর শিবিরে ভীতির সঙ্গে উচ্চারিত হতো। তাঁর সেক্টরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পূর্ব-দক্ষিণ রণাঙ্গনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ছিলো চাঁদপুর-হাজীগঞ্জ- মুদাফ্ফগঞ্জ- কুমিল্লা এবং লাকসাম-কুমিল্লা সড়ক। স্থলপথে সম্ভাব্য হামলার হাত থেকে রাজধানী ঢাকাকে রক্ষার জন্যে চাঁদপুরের কাছে হানাদার বাহিনীর ৩৯ ডিভিশনের হেড কোয়ার্টার স্থাপন করা হয়েছিলো। এর দায়িত্বে ছিলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ডেপুটি চীফ মার্শাল ল' এডমিনিস্ট্রেটর এবং ইয়াহিয়া খানের সবচেয়ে দুর্ধর্ষ সুদক্ষ কমান্ডার মেজর জেনারেল রহিম খান। জেনারেল খান লড়াইয়ের সুবিধার জন্যে কুমিল্লা ১১৭ ব্রিগেড এবং লাকসাম ৫৩ ব্রিগেডকে রেখেছিলেন। তার ধারণা ছিলো যে, এই পথ দিয়ে মুক্তিবাহিনী ঢাকার দিকে অগ্রসর হবার প্রচেষ্টা করলে সাঁড়াশি আক্রমণ করে নিশ্চিহ্ন করা হবে। এজন্যে কুমিল্লা এবং লাকসাম এই দুটি জায়গাতে যথাক্রমে ১১৭ এবং ৫৩ ব্রিগেড দুর্ভেদ্য দুর্গ স্থাপন করে অবস্থান করছিলো। কিন্তু নভেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন হলো। লাকসামের দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা মুক্তিবাহিনীর দখলে আসার পর চেনা-অচেনা সব রাস্তা দিয়ে দুই নম্বর সেক্টরের এবং 'কে' ফোর্সের গেরিলারা প্রচ- গতিতে অগ্রসর হলে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়।



এই প্রেক্ষপটে চাঁদপুর-হাজীগঞ্জ-মুদাফ্ফরগঞ্জ-কুমিল্লা সড়কের উপর মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী একযোগে আঘাত হানলো। এতদঞ্চলের ঝোঁপ-জংগল, গ্রাম-বন্দর, লোকালয় সর্বত্র মুক্তিবাহিনী 'পজিশন' গ্রহণ করলো। এদের হিসাব ছিলো যে, চাঁদপুর- কুমিল্লা সড়ক বিচ্ছিন্ন করতে সক্ষম হলে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টকে একপাশে রেখে দাউদকান্দির কাছে মেঘনা নদী অতিক্রম করে রাজধানী ঢাকা নগরী আক্রমণ সুবিধাজনক হবে। কোনো অবস্থাতেই পলায়নরত পাকিস্তানী সৈন্যরা কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরুতে সাহসী হবে না। অন্যদিকে চাঁদপুরে অবস্থানরত জেনারেল রহিম খানও তাঁর বাহিনী নিয়ে ঢাকার দিকে পালাবার প্রচেষ্টায় লিপ্ত হবে। তাই যুদ্ধের 'ট্রাজেডির' দিক থেকে চাঁদপুর-কুমিল্লা সড়কের গুরুত্ব ছিলো সবচেয়ে বেশি।



৪ ডিসেম্বর নাগাদ চাঁদপুর-কুমিল্লা সড়কের নিকটে অবস্থানরত হানাদার বাহিনীর ৫৩ ব্রিগেডের অধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার আসলাম নিয়াজি বুঝতে পারলেন যে, পরিস্থিতি বিশেষ সুবিধাজনক নয়।



প্রথমত, স্থানীয় জনসাধারণের সামান্য সহযোগিতা থেকে পাকিস্তানী বাহিনী ছিলো বঞ্চিত। দ্বিতীয়ত, আশপাশে সর্বত্র মুক্তিবাহিনী সাধারণ মানুষের সক্রিয় সহযোগিতায় অবস্থান সুদৃঢ় করছে এবং মিত্র বাহিনী দ্রুত এগিয়ে আসছে। তৃতীয়ত, 'ইপকাফ' ও রাজাকার সদস্যরা প্রতিদিনই ভেগে চলে যাচ্ছে। চতুর্থত, পাকিস্তানী সৈন্যদের মনোবল বলতে আর কিছুই



অবশিষ্ট নেই। এই অবস্থায় কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট থেকে পশ্চাদপসরণ করা কিংবা চাঁদপুরে জেনারেল রহিমের সঙ্গে মিলিত হওয়ার আর সম্ভাবনা নেই। তাই ব্রিগেডিয়ার নিয়াজী তার অধীনস্থ সমস্ত বাহিনীকে লাকসামে জমায়েত হওয়ার নির্দেশ দিলেন। চাঁদপুর- কুমিল্লা সড়ক থেকে এর দূরত্ব প্রায় আট মাইলের মতো। ব্রিগেডিয়ার নিয়াজীর নির্দেশে ১৫ বালুচ এবং ৩৯ বালুচ মুদাফ্ফরগঞ্জ থেকে দ্রুত লাকসামে গিয়ে হাজির হলো। এখানে ডাকাতিয়া নদী এলাকা থেকে পরাজিত ও বিধ্বস্ত অবস্থায় ২৩ পাঞ্জাব অবস্থান করছিলো। হাজীগঞ্জ এলাকা থেকে লেঃ কর্নেল জায়েদী ২১ আজাদ কাশ্মীর নিয়ে রাতের অন্ধকারে লাকসামে এসে হাজির হলো। ফলে গুরুত্বপূর্ণ চাঁদপুর-হাজীগঞ্জ-লাকসাম-কুমিল্লা সড়ক সম্পূর্ণভাবে অরক্ষিত হয়ে পড়লো। এই সময় লাকসামে খবর এলো যে, ৩৯ ডিভিশনের অধিনায়ক জেনারেল রহিম খান স্বয়ং চাঁদপুর-লাকসামে সরজমিনে হাজির হবেন।



পরদিন জেনারেল রহিম একটা জীপে লাকসামের দিকে রওয়ানা হলেন। কিন্তু হাজীগঞ্জের পরেই একটা মর্টার শেলের আঘাতে তার পাইলট জীপসহ বিধ্বস্ত হলে তিনি আবার চাঁদপুরে ফিরে এলেন। তখন মুক্তি বাহিনী সর্বত্র ওঁৎপেতে রয়েছে। হানাদার বাহিনীর ৩৯ ডিভিশনের তিনটা অংশ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লো। ব্রিগেডিয়ার আতিফের নেতৃত্বে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে অবস্থানরত ১১৭ ব্রিগেড তাদের সুদৃঢ় অবস্থান থেকে বেরুতে রাজি নয় কিংবা কোনো যুদ্ধে লিপ্ত হতে সাহসী নয়। লাকসামে ব্রিগেডিয়ার নিয়াজীর অধীনে ৫৩ ব্রিগেড রণক্লান্ত এবং ভীত-সন্ত্রস্ত। আর চাঁদপুরে জেনারেল রহিম খানের অধীনে ৩৯ ডিভিশনের হেড কোয়ার্টারের সৈন্য ঢাকায় পলায়নের চিন্তায় অস্থির। এটা হচ্ছে ৫/৬ ডিসেম্বরের অবস্থা। তখন হানাদার বাহিনীর তাঁবুতে শুধু মুক্তি বাহিনীর বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ের আলোচনা।



অবস্থা বেগতিক দেখে ব্রিগেডিয়ার নিয়াজী এ মর্মে সিদ্ধান্ত নিলেন যে, লাকসামে এভাবে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় বেশিদিন অবস্থান করা সম্ভব নয়। তাই চাঁদপুরে জেনারেল রহিমের বাহিনীর সঙ্গে মিলিত হয়ে চেষ্টা করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। এই সিদ্ধান্ত অনুসারে লেঃ কর্নেল আশফাক সৈয়দ এবং লেঃ কর্নেল জায়েদীর নেতৃত্বে দুটো গ্রুপ তৈরি করা হলো। ২১ আজাদ কাশ্মীর, ১৫ বালুচ এবং ২৩ পাঞ্জাব থেকে তিনটি কোম্পানিকে পৃথক করে দুটি গ্রুপ তৈরি করা হলো। এদের কাজ হলো মুদাফ্ফরগঞ্জে অবস্থানরত মুক্তি বাহিনী ও মিত্রবাহিনীকে হটিয়ে চাঁদপুরে যাওয়ার রাস্তাকে বিপদমুক্ত করা। পরিকল্পনা মতো এদের প্রথম আক্রমণ হলে বেশ কিছু সংখ্যক হতাহতের মধ্যে তা ব্যর্থ হলো। লেঃ কর্নেল আশফাক ও লেঃ কর্নেল জায়েদী এবার সিদ্ধান্ত নিলেন যে, মূল সড়ক দিয়ে অগ্রসর হবার চেষ্টা না করে গ্রামের বিকল্প পথে যেয়ে আকস্মিক ভাবে হাজীগঞ্জ আক্রমণ করা। ক্রমাগত ৩৬ ঘণ্টা ধরে তারা হাজীগঞ্জের দিকে বিকল্প পথে এগিয়ে গেলেন। কিন্তু পথে যে অবর্ণনীয় কষ্টের সম্মুখীন হলেন তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। কোথাও এরা খাদ্য ও পানি পর্যন্ত পেলো না। সব সময়েই এদের মনে হলো যে, প্রেতাত্মার মতো মুক্তি বাহিনী এদের নিঃশব্দে অনুসরণ করছে। দূর গ্রামের কোনো লণ্ঠনের আলো দেখলে কিংবা কোনো আওয়াজ হলেই এদের মনে হতো, নিশ্চয়ই মুক্তিবাহিনী এদের উপর নজর রেখে পাশাপাশি এগিয়ে চলেছে। এদের পেটে তখন প্রচ- ক্ষুধা, বুকে পানির তৃষ্ণা আর বিশ্রামের অভাবে শরীর শক্তিহীন। কিন্তু মুক্তিবাহিনীর হাতে পড়লে একজনও প্রাণে রক্ষা পাবে না। ৯ ডিসেম্বর এরা হাজীগঞ্জের উপকণ্ঠে মিত্রবাহিনীর তাঁবুর সন্ধান পেলো। আর কালক্ষেপণ না করে সাদা পতাকা উত্তোলন করে ১৫ বালুচ, ২৩ পাঞ্জাব ও ২১ আজাদ কাশ্মীর আত্মসমর্পণ করলো। পিছনে মুদাফ্ফরগঞ্জের কাছে তখনও খোলা মাঠে পড়ে রয়েছে তাদের কিছু সৈন্য।



পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হলে ১৫ই ডিসেম্বর আহত মেজর জেনারেল রহিম খানকে একটা হেলিকপ্টারে বার্মার আকিয়াবে পাঠিয়ে দেয়া হলো। ৪নং এভিয়েশন স্কোয়াড্রনের কমান্ডিং অফিসার লেঃ কর্নেল লিয়াকত বোখারী এই হেলিকপ্টারে আরও কয়েকজন গোয়েন্দা বিভাগীয় কর্মচারীকে নিয়ে গেলেন। অথচ জেনারেল নিয়াজী মিলিটারী হাসপাতালে কর্মরত আটজন নার্সকে কথা দিয়েছিলেন যে, শেষ মুহূর্তে তাদের হেলিকপ্টারে বার্মায় পাঠিয়ে দেয়া হবে। মুক্তি বাহিনীর হাত থেকে নার্সদের রক্ষা করার জন্যে এই হেলিকপ্টারকে 'স্ট্যান্ড বাই' রাখা হয়েছিলো। পনরই ডিসেম্বর বিকেলের দিকে যখন নার্সরা জানতে পারলেন যে, তাদের উদ্ধারের জন্য কোনো হেলিকপ্টার নেই তখন ডুকরে কেঁদে উঠলো আর বললো, "ইয়ে তো গাদ্দারী হ্যায়"।



বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল হক পাটোয়ারী লোভের ঊধর্ে্ব ছিলেন। তিনি বলেন, আমার নেতৃত্বে যে ক্যাম্পগুলো ছিলো সেখানে বহু টাকা-পয়সা স্বর্ণালঙ্কার জমা পড়েছে কিন্তু আমি কাউকে স্বার্থ হাসিলের সুযোগ দেইনি। বর্তমানে এই মুক্তিযোদ্ধা সাধারণভাবে জীবনযাপন করছেন। অর্থের লোভ কোনো দিন করেন নি। চাকুরি জীবনেও যথেষ্ট সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করছেন। টাকা পয়সার লোভ করলে অনেক ধনী হতে পারতেন। তাঁর ছোট ভাই জাফর আহমদ হানাদার বাহিনীর হাতে শহীদ হন। সেও তৎকালীন ইপিআর-এ চাকুরি করতেন। এই বীর মুক্তিযোদ্ধার চাওয়া পাওয়ার কিছুই নেই, দেশের জন্যে যুদ্ধ করেছেন জীবনবাজি রেখে। তিনি বলেন, একটি ফুলকে বাঁচানোর জন্যে যুদ্ধ করেছি, একটি ফুলের হাসির জন্য অস্ত্র ধরেছি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে, এখন শুধু সুশাসন দেখে যেতে চান।



মাত্র ৯ মাস ৯ দিন আগে যেই রেসকোর্স ময়দানে বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাঙালি জাতির নয়নমণি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ মার্চ তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে বলেছিলেন "এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম"। ১৬ ডিসেম্বর ঠিক সেই বিশাল ময়দানে প্রায় দশ লক্ষ জনতা আর শতাধিক দেশ-বিদেশী সাংবাদিক পশ্চিম পাকিস্তানের হানাদার বাহিনীর সৈন্যদের বাঙালি জাতির সামনে মাথা নিচু করে আত্মসমর্পণ করার অনুষ্ঠান নিজের চোখে দেখলেন।



১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মাধ্যমে বাংলার স্বাধীনতার যে সূর্য অস্ত গিয়েছিলো ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর সেই লাল সূর্য আবার স্বাধীন বাংলাদেশের আকাশে উদিত হলো। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বিশ্বের মাবচিত্রে স্থান লাভ করলো একটা দেশ, যার নাম বাংলাদেশ।



 



লেখক পরিচিতি :



ইউসুফ পাটোয়ারী লিংকন, কাতার প্রবাসী লেখক ও সাংবাদিক।



 


এই পাতার আরো খবর -
    আজকের পাঠকসংখ্যা
    ৬৪৫৬২১
    পুরোন সংখ্যা