চাঁদপুর, বুধবার ১৫ মে ২০১৯, ১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬, ৯ রমজান ১৪৪০
jibon dip
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৫০-সূরা কাফ্


৪৫ আয়াত, ৩ রুকু, মক্কী


১৯। মৃত্যু যন্ত্রণা সত্যই আসিবে; ইহা হইতেই তোমরা অব্যাহতি চাহিয়া আসিয়াছ।


২০। আর শিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়া হইবে, উহাই শাস্তির দিন।


 


 


assets/data_files/web

মনের যাতনা দেহের যাতনার চেয়ে বেশি। -উইলিয়াম হ্যাজলিট।


 


ঝগড়াটে ব্যক্তি আল্লাহর নিকট অধিক ক্রোধের পাত্র।


 


 


ফটো গ্যালারি
আসুন আমরা প্রকৃত রোজা রাখি
অমৃত ফরহাদ
১৫ মে, ২০১৯ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


আমরা এক আজব দেশে বাস করছি। আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, আজব দেশ নাকি দেশের মানুষ আজব। সে যাই হোক-এ কথা ঠিক, আমরা যা করার কথা নয় তা করছি। আবার যা করার কথা, তা করছি না। আমাদের নিজস্ব একটা ব্রান্ড আছে, আমরা 'হুজুগে বাঙালি'। আমরা নিজেরা চিন্তা করি না, অন্যের চিন্তাকে ধারণ করি এবং লালন করি। আমরা কোনো কিছু করার আগে চিন্তা করি না, করার পর চিন্তা করি। আমাদের বেঁচে থাকার জন্যে খাওয়া দরকার কিন্তু আমরা তা না করে খাওয়ার জন্যে বেঁচে থাকি। এ যেন বাঁচার জন্যে না খেয়ে, খাওয়ার জন্যে বাঁচা। শিল্পীর ভাষায় আমরা হলাম, 'কোন এক উল্টো দেশে উল্টো বুঝলি প্রজার দেশে। চলে সব উল্টোপথে, উল্টো বেশে। সোজা পথে কেউ চলে না। বাঁকা পথ জ্যাম হরদম, জমজমাট ভিড় কমে না।'



শিল্পী ঠিকই বলেছেন, আমরা সোজা পথে না চলে বাঁকা পথে সুখ খুঁজি। নিষিদ্ধ বিষয়ে জমজমাট ভিড় থাকে। আমরা আমাদের ধর্মকে খুব ভালোবাসি কিন্তু কেউই আমরা ধর্মকে ধর্মের মতো করে ভালোবাসি না, পালনও করি না। অনেক ক্ষেত্রে আমরা ধর্মের ঠিক বিপরীতে অবস্থান করি। কেউ একজন ধর্ম নিয়ে একটা কিছু বলেছেতো তার আর রক্ষা নেই। অথচ আমরা আমাদের অজান্তে ধর্মের যে বারটা বাজাচ্ছি সেদিকে কারোরই খবর নেই! একটি গল্প বললে বিষয়টি পরিষ্কার হবে।



মসজিদের সামনে এক অস্থায়ী টুপি ব্যবসায়ী তার পণ্য সাজিয়ে বেচা-বিক্রি করছেন। খুব বিক্রি হচ্ছে। দোকানের তিন পাশে প্রচুর ক্রেতা। এ সময় মোয়াজ্জিন আজান দিতে শুরু করলেন। কিছু মানুষ আজান শুনে দোকান থেকে মসজিদের দিকে রওয়ানা দিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে দোকানদার মোয়াজ্জিনের অথবা সময়ের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে বলে উঠলেন 'হালায় আজান পড়ে গেল'। দোকানের পাশে থাকা ক্রেতারা দোকানির উপর ক্ষিপ্ত হয়ে গেলো। তারা দোকানদারের সাথে তর্কে জড়িয়ে পড়লো। দীর্ঘ তর্কের পর এক পর্যায়ে হাতাহাতি এবং মারামারিতে গড়ালো। অন্যদিকে মুসলি্লরা জামায়াতে নামাজ শেষ করে এসে তাদের ঝগড়া মিটিয়ে দিতে দিতে বললেন 'কী হয়েছে?' প্রতিবাদকারীদের একজন বলে উঠলেন 'আ-রে কইয়েন না, লোকটা আজানরে হালা কইছে।'



এই হলাম আমরা। আজানরে হালা কাইছে এটার প্রতিবাদ করতে গিয়ে নিজেরা বিরাট গুনাহগার হয়ে গেলাম ফরজ নামাজ ত্যাগ করার কারণে। অথচ সেদিকে কারোরই খেয়াল নেই। এবার আসি আমার মূল বিষয়ে। আরবি মাসগুলোর মধ্যে গুরুত্ব বিবেচনায় রমজান হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং মর্যাদাপূর্ণ মাস। মুসলমানদের সবচেয়ে পবিত্র মাস। রমজান মাস তাকওয়ার মাস। রমজান রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস। আত্মশুদ্ধির মাস। সহমর্মিতা এবং সংযমের মাস। 'আত্মশুদ্ধি' কঠিন এবং অতীব গুরুত্বপূর্ণ ও ভারী একটি শব্দ। আমি পর্যায়ক্রমে সব ক'টি বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ।



তাকওয়া : তাক্ওয়া আরবি শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ বিরত থাকা, ভয় করা, রক্ষা করা, আত্মশুদ্ধি। নিজেকে কোনো বিপদ ও অকল্যাণ থেকে সম্ভাব্য সকল উপায়ে বাঁচিয়ে রাখা বা কোনো অনিষ্ট হতে নিজেকে দূরে রাখাও তাকওয়া। আল্লাহতাআলা বলেন, "যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করে চলতে থাক, তাহলে তিনি তোমাদেরকে ভালো মন্দের মধ্যে পার্থক্য করার মানদ- বা যোগ্যতা ও শক্তি দান করবেন। তোমাদের গুনাহ মাফ করে দিবেন। কেননা, আল্লাহ বড়ই অনুগ্রহশীল"। (সুরা- আনফাল-২৯)



তাক্ওয়া হচ্ছে ইবাদত বন্দেগির মূল বস্তু। ইবাদতের আনুষ্ঠানিকতার কোনো মূল্য নেই, যদি সেখানে তাকওয়া বা আল্লাহর ভয় না থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন, "আল্লাহর কাছে তোমাদের কুরবানির গোস্ত, রক্ত কিছুই পেঁৗছে না, পেঁৗছে শুধু তাক্ওয়া"। (সুরা- হজ্জ-৩৭)



সৎ গুণাবলির মধ্যে তাক্ওয়া হচ্ছে অন্যতম। যার মধ্যে তাক্ওয়া থাকে, সে পার্থিব জীবনের লোভে কোনো খারাপ কাজ করে না। সে পরকালীন জীবনের কল্যাণ ও মঙ্গলের কাজে সব সময় নিজেকে নিয়োজিত রাখে। মুত্তাকী ব্যক্তি সততা, আমানতদারি, ধৈর্য, শোকর, আদল-ইনসাফ ইত্যাদি ধরনের গুণে গুণান্বিত হয়ে থাকে।



রহমত : রহমত মানে করুণা, দয়া ও কৃপা। রমজান মাসের প্রথম দশ দিনকে রহমত হিসেবে ধরা হয়।



মাগফিরাত : মাগফিরাত মানে ক্ষমা। রমজান মাসের দ্বিতীয় দশ দিনকে মাগফিরাত হিসেবে ধরা হয়।



নাজাত : নাজাত মানে মুক্তি। রমজান মাসের শেষ দশক যেহেতু নাজাত বা মুক্তির, সুতরাং এই ১০ দিন আমাদের করণীয় হবে দুনিয়ার সবকিছুর আকর্ষণ ও মোহ থেকে মুক্ত হয়ে প্রভুপ্রেমে বিভোর হওয়া। বিশেষ করে সব ধরনের অন্যায় অপরাধ, পাপ ও গুনাহ, যা জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হয়, যথা : অবৈধ সম্পদ, অন্যায় ক্ষমতা লিপ্সা ও পাপাচার, এগুলো থেকে নিজের মন ও মানসকে সম্পূর্ণ মুক্ত করা এবং সেসবের আকর্ষণ থেকে পরিপূর্ণরূপে মোহমুক্ত হওয়া।



সহমর্মিতা : ইসলাম সহজাত প্রকৃতির ধর্ম; ইসলাম সাম্য ও মৈত্রীর ধর্ম। মৈত্রীর জন্যে প্রয়োজন সাম্য, সাম্যের জন্যে প্রয়োজন সহমর্মিতা ও সমবেদনা বা সম-অনুভব। রমজান মাস সাম্য-মৈত্রী তৈরিতে, সমবেদনা ও সহমর্মিতা সৃষ্টিতে বিশেষ অবদান রাখে। হাদিস শরিফে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেন : 'রমজান হলো সমবেদনা ও সহমর্মিতার মাস।' (বায়হাকি)



রমজান মাসে ধনীরা গরিবের দুঃখ বুঝবে, ক্ষুধায় জঠরজ্বালা অনুভব করবে। ইফতারে অনুভব করবে ক্ষুধা-পিপাসায় কাতর অসহায় মানুষের খাবারের প্রতি কী দুর্নিবার আকর্ষণ। সম্মান করতে শিখবে খাদ্যকে, মর্যাদা দিতে শিখবে ক্ষুধার্ত মানুষকে। বুঝবে কেন অসহায় গরিব মানুষ দু'মুঠো অন্নের জন্যে অন্যের ঘরে গৃহকর্মীর কাজ করে। কেন প্রসূতি মা তাঁর নাড়িছেঁড়া বুকের ধন মানিককে কয়েকটি টাকার বিনিময়ে অচেনা কারও হাতে অজানার উদ্দেশ্যে বিক্রি করে দেন। ফুটপাতে ফেলে রাখা বর্জ্য থেকে পচা খাবার কেন সে তুলে মুখে দেয়। কেন গরিব মা তাকে খেতে দিলে নিজে না খেয়ে অাঁচলে বেঁধে নেন তাঁর অভুক্ত সন্তানের জন্যে। অনুভব করবে ক্ষুধায় কাতর মানুষ কীভাবে তার আত্মসম্মান বিসর্জন দেয়, মর্যাদা ভুলে যায়, মান-ইজ্জত বিকিয়ে দেয় খাবারের জন্যে। তাদেরকে ঘৃণা ও উপেক্ষা নয়, তাদের জন্যে ভালোবাসা ও সহযোগিতার হাত বাড়াতে হবে। এটুকু অনুভূতি যদি জাগ্রত না হয়, তাহলে রোজা ও রমজান উপবাস ছাড়া আর কিছুই নয়।



আত্মশুদ্ধি : আত্মশুদ্ধি শব্দের অর্থ হলো, নিজের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করা। যদি ভেঙ্গে বলি, আত্মা অর্থ হলো অন্তর আর শুদ্ধি অর্থ পরিষ্কার। তার মানে পুরা অর্থ হলো অন্তর পরিষ্কার। এটা ইসলামের একটা মৌলিক বিষয় যা আমাদের আত্মিক পরিবর্তন ঘটায়। এটা না থাকলে ইবাদাতে স্বাদ পাওয়া যেত না। আল্লাহ তা'আলা মানব জাতিকে দেহ ও আত্মা এ দুয়ের সমন্বয়ে সৃষ্টি করেছেন। দেহের রয়েছে দুটি অবস্থা : সুস্থতা ও অসুস্থতা। ঠিক তেমনি আত্মারও রয়েছে সুস্থতা ও অসুস্থতা। দেহ অসুস্থ হলে যেমনি চিকিৎসার মাধ্যমে তাকে সুস্থ করার চেষ্টা চালাতে হয়, তেমনিভাবে আত্মা রোগাক্রান্ত হলে আত্মিক চিকিৎসার মাধ্যমে তাকে সুস্থ বা শুদ্ধ করে তুলতে হয়। আর একেই বলে আত্মশুদ্ধি। মহান আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কোরআনের সূরা শামসের ৯নং আয়াতে ঘোষণা করেন 'যে নিজের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে সে সফলকাম'।



আসলে মানুষের ঈমান বা তাদের বিশ্বাস ও চিন্তা-চেতনার পরিশুদ্ধিই হলো আত্মশুদ্ধি। আর এ চিন্তার বিশুদ্ধি বা ঈমানের অনিবার্য দাবিই হচ্ছে তা মানুষের কর্মধারাকে আখেরাতমুখী করে দেবে, আল্লাহ'র হুকুম পালনে, স্রষ্টার সামনে নিজেকে সোপর্দকরণে, তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করতে উদ্বুদ্ধ করবে। তখন নফসের গোলামী, লোভ, হিংসা, সংকীর্ণতা, স্বার্থপরতা, মানুষের কাছে খুবই জঘন্য, হীন ও ইতরতা বলে মনে হবে। নফসের তাড়নায় কখনো কোনো ভুল করে ফেললেও এ ঈমানই আবার তাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনবে এবং নফসের গোলামী ও পাপের জন্য সে অনুতপ্ত হবে। এজন্য বার বার সে প্রভুর কাছে লজ্জিত হবে, ক্ষমা ভিক্ষা করবে। এ প্রসঙ্গে মহানবী বলেছেন-'ঈমানদার ব্যক্তি ও ঈমানের দৃষ্টান্ত হচ্ছে খুঁটির সাথে (দড়িবাঁধা) ঘোড়া, সে চতুর্দিকে ঘুরতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত খুঁটির দিকেই ফিরে আসে। অনুরূপভাবে ঈমানদার ব্যক্তিও ভুল করে থাকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে ঈমানের দিকেই ফিরে আসে। অতএব তোমরা মুত্তাকী লোকদেরকে তোমাদের খাদ্য খাওয়াও এবং ঈমানদার লোকদের সাথে ভাল ব্যবহার কর।' [বায়হাকী]



সংযম : সংযম অর্থ হলো সংযতকরণ, নিয়ন্ত্রণ। আমার লেখার মূল বিষয়ই হলো সংযম। রমজান যেমন সংযমের মাস, তেমনি সহমর্মিতার মাসও। যাতে গরিবের কষ্ট অনুভবের মাধ্যমে তাদের প্রতি সমবেদনা জানানো যায়। এ জন্যেই রমজান মাসে কম খাওয়া মানে খাওয়ার উপর সংযম অবলম্বন করা জরুরি। বছরের এগারটি মাস আমরা নিয়মিত তিন বেলা, কখনো কখনো চার বেলা খেয়ে থাকি। রমজান মাসে প্রধানত খাওয়াদাওয়া হলো দুই বেলা। সুতরাং অন্য মাসের খাদ্যব্যয় যা হতো, রমজান মাসে তার চেয়ে অনেক কম ব্যয় হওয়ার কথা। কিন্তু আমাদের সমাজের চিত্র ভিন্ন। রমজান মাসে আমাদের খাওয়ার পরিমাণ যেন আরও বেড়ে যায়। এই মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য ও খাদ্যসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি পাওয়ার কোনোই কারণ থাকতে পারে না। কিন্তু দেখা যায়, রমজান মাসে ও এর আগেই নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম অনেক বেড়ে যায়। কারণ, আমরা সংযমের পরিবর্তে ভোজনের কাজে বেশি মনোযোগী হয়ে পড়ি। রোজাদাররা যদি সত্যিই রোজার শিক্ষা ও উদ্দেশ্যের প্রতি মনোযোগী হন, তাহলে রমজান মাসে দ্রব্যমূল্য ঊর্ধ্বগতি না হয়ে তা স্থিতিশীল বা নিম্নগতি হওয়ার কথা।



রমজান মাসে যে দুটি ইবাদত অর্থ ও খাদ্যের সাথে সম্পর্কযুক্ত তা হলো সাহরী খাওয়া ও ইফতার করা। সাহরী একটি সুন্নত ইবাদত। নবী করিম (সাঃ) বলেন, তোমরা সাহরী খাও, কারণ ইহুদিরা রোজা রাখে কিন্তু সাহরী খায় না।' অর্থাৎ মুসলমানদের রোজা আর ইহুদিদের রোজার মধ্যে পার্থক্য হলো সাহরী খাওয়া আর না খাওয়া। ইফতার সম্পর্কে রাসুল (সাঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, আল্লাহ তাআলা তাকে ওই রোজাদারের সমান সওয়াব দান করবেন। সাহাবায়ে কিরাম জানতে চাইলেন, কী দিয়ে ইফতার করাতে হবে? নবী করিম (সাঃ) বলেন, একটি খেজুর দিয়ে হলেও, এক গ্লাস দুধ বা শরবত দিয়ে হলেও সমান সওয়াব পাওয়া যাবে। এই হাদিস দ্বারা বোঝা যায়, ইফতার খুবই সাধারণ ও এর পরিমাণ খুবই সামান্য হবে। আজকাল আমরা সহজ ইফতারের সুন্নতকে ভুরিভোজের আয়োজনে রূপান্তরিত করে ফেলেছি। এটি খুব গর্হিত কাজ। মনে রাখতে হবে, রমজান মাস ভোগের নয়, ত্যাগের মাস। আবার দেখা যায়, অনিয়ন্ত্রিত খাবার খেয়ে আমরা দেহের উপর জুলুম করে বসি। সেটা কিভাবে করছি তার আলোচনা পরে করছি। রমজান মাস দান-খয়রাতের মাধ্যমে আখিরাত অর্জনের মাস, অধিক মুনাফার মাধ্যমে দুনিয়া অর্জনের মাস নয়। যদি কোনো ব্যক্তি বৈধ পন্থায় হালালভাবে ব্যবসা করেন, তবে আল্লাহ তাতেই বরকত দেবেন। অন্যায়ভাবে দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে দ্বীনদার পরহেজগার রোজাদারদের কষ্ট দিলে, ওই অর্থ ও সম্পদ তাঁর উপকারে নাও আসতে পারে। আবারও বলছি, রোজার অন্যতম শিক্ষা হলো সংযম। আসলেই কি আমরা আমাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছি? নাকি শুধু শুধু উপবাসই? মানে সারাদিন না খেয়ে থাকা। উপবাস এবং রোজা এক নয়। এর মধ্যে বিশাল পার্থক্য। আমরা যদি একটু আত্মসমালোচনা করি তাহলে আমরাই বুঝতে পারবো সারাদিন আমরা কি না খেয়েই কাটিয়েছি, নাকি রোজা রেখেছি। রোজা আমাদেরকে শিক্ষা দিচ্ছে সংযমী হতে; অথচ একটু চিন্তা করে দেখেন, আমরা কতটুকু সংযমী হতে পেরেছি? বিশেষ করে খাবারের ব্যাপারটাই দেখেন। বিগত এগারো মাসের চেয়ে আমরা রমজান মাসে মুদি পণ্য থেকে শুরু করে অন্যান্য পণ্য গাণিতিক হারে বেশি ক্রয় করছি। অন্য সময় পেঁয়াজ যদি কিনি ১০ কেজি, এ সময় কিনি ২০ কেজি। উদাহরণ দিয়ে লেখার দৈর্ঘ্য বড় করতে চাই না। এভাবে প্রতিটি পণ্যই আমরা বেশি বেশি করে ক্রয় করছি। যা রোজার শিক্ষার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। অপর দিকে ব্যবসায়ীরা কী করছে দেখেন! আমরা জানি, বিক্রি বেশি হলে লাভ কম করলেও চলে। অথচ দেখেন প্রতি বছর রমজান আসলেই অধিকাংশ ব্যবসায়ী পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছি। পৃথিবীর কোনো দেশে এ অনিয়ম আছে কিনা আমার জানা নেই। বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বে এটা থাকার প্রশ্নই আসে না। যেহেতু এ অনিয়ম আমাদেশে দেশে নিয়মিত হচ্ছে, অতএব এ অসাধু মুনাফাখোরদের উচিত শিক্ষা দিতে সাধারণ মানুষকে রোজার আসল শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। সেটা হলো অন্যান্য মাস থেকে এ মাসে অথবা এক সপ্তাহ আগে থেকে যে বাজারটা করা হয়, তা আর করবো না। বরং তার তুলনায় কয়েক গুণ কম পণ্য ক্রয় করবো। যদি সব মানুষ এক সপ্তাহ পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে এ সংযমটা করতে পারে তাহলে দেখবেন পরের সপ্তাহে পণ্যের দাম কিভাবে নিচের দিকে নামতে থাকে।



সাধারণ চোখে দেখলে রোজা মানে হলো একটা নির্দিষ্ট সময় পানাহার থেকে বিরত থাকা। কিন্তু এই সংযমটা হলো প্রতীকী। আসল সংযম নিজের জীবনাচরণের মধ্যে নিহিত । যেমন : বিভিন্ন প্রকার পার্থিব/অপার্থিব লোভ থেকে নিজেকে সংযত করা, কামনা বাসনা থেকে নিজেকে বিরত রাখা, অসংযত আচরণ থেকে নিজেকে বিরত রাখা, ফেতনা-ফ্যাসাদ থেকে নিজেকে বিরত রাখা। নিজের ক্রোধকে দমন করে অপরকে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকার নামও কি সংযম নয়? অথবা ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে তা হতে পারে মজুতদারি তথা অতি মুনাফার লোভে ক্রেতাদের ঠকানো থেকে বিরত রাখা। অথবা খুব কামুক একজন ব্যক্তি যখন শুধুমাত্র রমজানকে উপলক্ষ করে নিজের সেঙ্ুয়াল চাহিদাকে নিয়ন্ত্রণ করেন, এর নামও কি সংযম নয় ? অর্থাৎ সংযম শুধুমাত্র পানাহার থেকে বিরত থাকা নয় , আসল সংযম জীবনাচরণের প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজেকে নেতিবাচক কার্যকলাপ থেকে বিরত রাখা । কিন্তু আমরা শুধু একটা জায়গায়ই ফোকাস করি। আর তা হলো না খেয়ে থাকা। সবচেয়ে বড় কথা হলো সারাদিন রোজা রেখে ইফতারির সময় এমন খাবারের আয়োজন করছি যা বিয়ে বাড়ির খানাকেও হার মানায়! অর্থাৎ সারাদিনের সংযমের কবর রচনা করলাম ইফতারীতে। আশপাশের গরীব-অসহায়-অভুক্ত মানুষগুলোর কোনো খবরই আমরা রাখি না।



এবার আসি, কী দিয়ে আমরা ইফতার করবো? বৈচিত্র্যহীন জীবন কখনোই সুখকর হতে পারে না। রোজা দেহযন্ত্রের কর্মকা-ে বৈচিত্র্যের প্রভাব ফেলে গতিশীলতা, লাবণ্য ও নতুন ছন্দের হাওয়া লাগায়। অনবরত একই ধারায় কাজ করতে করতে দেহতন্ত্রের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কর্মকা-ে ভাটা পড়ে। মাসব্যাপী রোজাতে দেহের প্রতিটি গঠন একক বিশ্রামাগারে থেকে নতুন আঙ্গিকে কর্ম সম্পাদন করে। গাড়ি যেমন মাঝে মধ্যে ওয়ার্কশপে রাখতে হয়, তারপর নতুন গতিতে চলতে থাকে। ঠিক তেমনি দেহযন্ত্র এক মাস ওয়ার্কশপে থেকে নতুন শক্তি লাভ করে। সারা বছর শরীরে যে জৈব বিষ (টঙ্নি) জমা হয়, রোজায় তা জ্বলে-পুড়ে নিঃশেষ হয়ে রক্ত পরিশুদ্ধ হয়। রোজার সময় খাওয়া-দাওয়ার সাথে দেহের ভালো-মন্দ বেশ সম্পর্কযুক্ত। রোজার মূল আকর্ষণ ইফতার। আর ইফতার মানেই রকমারি খাবারের আয়োজন। সারা দিন রোজা রাখার ফলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা হ্রাস পায়, আর এ কারণেই আসরের আগে-পরে মাথা থাকে গরম, মেজাজ থাকে চড়া। মস্তিষ্ক বা ব্রেনের খাবার গ্লুকোজ। সুতরাং ইফতারের প্রথম ও প্রধান উপাদান হওয়া প্রয়োজন কাগজি লেবু, কমলা, তেঁতুল, বেল, তোকমা, গুড়, ইসুবগুলের ভুষি, চিঁড়ার শরবত। তুলসি জুসও চমৎকার পানীয়। সারা দিন রোজা থাকার পর পেট বা পরিপাকতন্ত্র এমনি থাকে ঝাঁঝালো, তারপর ভাজা-পোড়া বা ঝালযুক্ত খাদ্য পাকস্থলীতে অস্বস্তির সৃষ্টির করে। অধিক ও অনিয়মিত খাওয়ার ফলে নানারকম রোগের সৃষ্টি হয়। কথায় বলে, 'অতিভোজন রোগের কারণ।' রমজানে মুখের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকে বলে স্বাস্থ্য ভালো থাকে। এক মাস রোজা রাখার ফলে পরিপাকতন্ত্র বিশ্রাম পায়।



লেখক পরিচিতি : লেখক ও সাংবাদিক।



 



 



 


এই পাতার আরো খবর -
    আজকের পাঠকসংখ্যা
    ৭৯৭৯৭৯
    পুরোন সংখ্যা