চাঁদপুর, শনিবার ২৫ মে ২০১৯, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬, ১৯ রমজান ১৪৪০
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৫০-সূরা কাফ্

৪৫ আয়াত, ৩ রুকু, মক্কী

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।



৪৩। আমিই জীবন দান করি; মৃত্যু ঘটাই এবং সকলের প্রত্যাবর্তন আমারই দিকে।

৪৪। যেদিন তাহাদের উপরস্থ জমিন বিদীর্ণ হইবে এবং মানুষ ত্রস্ত্র-ব্যস্ত হইয়া ছুটাছুটি করিবে, এই সমবেত সমাবেশকরণ আমার জন্য সহজ।

৪৫। উহারা যাহা বলে তাহা আমি জানি, তুমি উহাদের উপর জবরদস্তিকারী নহ; সুতরাং যে আমার শাস্তিকে ভয় করে তাহাকে উপদেশ দান কর কুরআনের সাহায্যে।

 


assets/data_files/web

একজন ভাগ্যবান ব্যক্তি সাদা কাকের মতোই দুর্লভ। -জুভেনাল।


 


 


মানুষ যে সমস্ত পাপ করে আল্লাহতায়ালা তার কতকগুলো মাপ করে থাকেন, কিন্তু যে ব্যক্তি মাতা-পিতার অবাধ্যতাপূর্ণ আচরণ করে, তার পাপ কখনো ক্ষমা করেন না।


 


 


ফটো গ্যালারি
কঠিন মাটির কোমল কুসুম
পীযূষ কান্তি বড়ুয়া
২৫ মে, ২০১৯ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


মাটি উপাদানগতভাবে কঠিন হতে পারে আবার ভূমি অর্থে প্রতিকূল সময়ের কারণে কঠিন হয়ে যায়। এই উভয় অর্থেই পশ্চিমবঙ্গের আসানসোলের চুরুলিয়া গ্রামের মাটি ছিলো কঠিন। বিশেষত যখন কবি কাজী নজরুল জন্মগ্রহণ করেন এবং যে সময়টাতে বড় হয়ে ওঠেন সে সময়টাতে। আঠারোশ নিরানব্বই সালে বাংলা সাহিত্যের দুজন খ্যাতিমান কবির জন্ম। এর একজন কাজী নজরুল যাঁর জন্মভিটা ছিলো লাল ঊষর শক্ত শিলার মাটিতে, যেখানে মূলত ছিলো কয়লা খনির প্রাচুর্য। অন্যদিকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামামায় আর পরাধীনতার জিঞ্জিরে আটক মানুষের কাছে এ ভূমি কেবল কঠিনই নয় কষ্টকরও ছিল বটে। নিজের মায়ের দাসীবৃত্তি স্বচক্ষে ঠায় দাঁড়িয়ে অবলোকন করার মতোই বেদনাদায়ক। এ মাটি কঠিন তার জন্যে একারণেও যে, মাটিই তাকে বার বার কঠিন বেদনায় বিরহী বা বিবাগী করে তুলেছে। পাশায় আসক্ত পিতার দ্বিতীয় বিবাহে মা জাহেদা খাতুন নজরুলের জননী হলেও পিতার মৃত্যুতে চাচার সাথে মায়ের দ্বিতীয় দ্বিতীয় বিবাহে তার বড়ো অভিমান জাগে। অভিমানী পুত্র মায়ের জীবিত অবস্থায় আর মাকে দেখতে চাননি কখনো। এভাবে পুত্রের কাছে জননীর জীবন হয়ে দাঁড়ায় কঠিন ভূমির মতো, যেখানে স্নেহ-ভালোবাসা নয় মুখ্য হয়ে দাঁড়ায় মায়ের নতুন রূপে নতুন পরিচয়। পিতৃহারা কিশোর যার মাতা অন্যের ঘরণী, তার কাছে জীবন হয়ে উঠে নির্মম, যখন ক্ষুণি্নবৃত্তির জন্যে তাকে আগুনের চুলি্লর স্নেহে থেকে ঘর্মাক্ত দেহে বানাতে হয় রুটি। এতো কাঠিন্যের পরও তার কোমল মন তৈরি হয়ে যায় সাহিত্য আর সংস্কৃতির সময়মত পরিচর্যায়। দারোগা রফিজউল্লাহর পারিবারিক স্নেহে অজয় পাড়ের নজর আলী খুঁজে পায় গ্রন্থির বন্ধন যেন। তবুও তারে ডাক দেয় কঠিন ভূমির কান্নার ডাক। যে মাটিতে তার ছোট দুটি পা কেবল রুক্ষতার ঘায়ে হয় বিক্ষত, সে মাটির ডাক আসে করুণ আর্তিতে। নজরুল ছুটে যায় সৈনিক বেশে পল্টনে। কঠিন ভূমিকে কোমল মায়ের মুখরূপে দেখে নজরুল জ্বলে ওঠে অগি্নবীণায়। সে আগুনে জ্বলে ওঠে বৃটিশের গদি। 'আনন্দময়ীর আগমনে' তাদের জন্যে নিয়ে আসে বিদ্রোহের সুর, বিপ্লবের বাণী। পরিণতিতে কারাগারে আটক হয়ে যায় বিংশ শতকের তূর্য বাদক।



এ ভূমি যেমন তার জন্যে কঠিন তেমনি সময়ের গর্ভটাও তার জন্যে ছিল প্রতিকূলে। একারণে প্রথম বিয়ের রাতেই হয় বিচ্ছেদ, যেমন বিচ্ছেদ হয় প্রথম দুই সন্তানের সাথে অকালে। পত্নীর অকালে রোগশয্যা কঠিন করে তোলে নজরুলের সাংসারিক জীবন আর আর্থিক অনটন কঠিন করে তোলে তার স্বাভাবিক সৃষ্টিশীলতা। তবুও নজরুল মনে কোমল, মননে কোমল। তার এ কোমল মনের খোঁজ পেয়েছে পেয়ারা প্রত্যাশী খুকু কিংবা সেই যুবক যে পেয়েছে অবেলার ডাক। নজরুলের কোমল মনের কুঠুরীতে কখন যে ঢুকে যায় গণিতের মতো কঠিন বিষয়ের বিদুষী ফজিলত তা কেবল টের পায় আরেক গণিতবিদ কাজী মোতাহার হোসেন। কঠিন শিলার মতো মনের অধিকারী ফজিলতের প্রত্যাখ্যানে কোমল কবির মনে দুঃখ হয়ে যায় বাদল রাতের মিতা যা কেবল নিরালায় শ্রাবণ বরিষণের মতো ঝরিয়ে যায় লবণ-জলের অশ্রু। যে অশ্রু ঝরিয়ে যায় মনের গোপন ব্যথা, সেই অশ্রুতে মিশে আছে শতকণা রক্তের ঘ্রাণ যা বিদীর্ণ হৃদয়ের অবিচল কোমলতার নিদর্শন।



কোমল বিরহী কবি তার মনের এই বেদনাকে বন্ধু মোতাহার ছাড়াও আর এক জনের কাছে তুলে ধরেন। সে জন হলো কর্ণফুলির জলে সিক্ত হওয়া গর্জনে ক্রন্দনে বিরহী সিন্ধু। অকপটে তারে ডেকে কবি বলেন, 'হে সিন্ধু, বন্ধু মোর, তুমিও বিরহী আমিও বিরহী।' সীতাকু-ের যে পাহাড় আকাশে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে থাকে, কিংবা জানালার পাশে যে গুবাক তরুরা সারি বেঁধে চেয়ে থাকে কবির দিকে তাদের সাথেও কোমল মনের কবির কথা হয়। বিরহী কবি যেন তাদের কাছে তারই মনের ভাব ও বেদনার আশ্রয় চান। কবিকে মাঝে মাঝে শান্তি দেয় এবং সঙ্গ দেয় চাঁদনী রাত। তবে সব চাঁদনীতে কবির স্বস্তি হয় না, কবি স্বস্তি পেয়েছেন জয়দেবপুরের পথে নির্বাচনী চাঁদনী রাতে যখন তার মনের জানালা ছিল খোলা, চোখের দূরবীনে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল জোছনার কোমল পেলবতা।



কবিকে কোমল করে তোলে আরও বাংলাদেশের শ্যামল সবুজ প্রকৃতি যাকে দেখে কবির মনে জেগে ওঠে শস্তিবাক্য, 'নমো নমো নমো, বাংলাদেশ মম, চির মনোরম, চির মধুর'।



কবির জন্যে ধর্মবৈষম্যে আসক্ত এ ভূমি কঠিন হয়ে ওঠে ক্রমশ। কেউ তারে যবন বলে ঠেলে দেয় দূরে আর কেউ তারে কাফের বলে নিতে চায় মস্তক। কিন্তু কবির কোমল মনে কেবল গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করার মহান আকাঙ্ক্ষাই জেগে ওঠে। কবিকে একদিকে শনিবারের চিঠির আঘাত আর অন্যদিকে কবিতায় শব্দের খুনোখুনি বলে ক্রমাগত আহত করার অপপ্রয়াসে কোমল মনে জেগে ওঠে বেদনার বাষ্প-বিথার। কবি তাই কষ্টে বড়র পীড়িতির সাথে বালির বাঁধের অস্থায়ীত্বের কোনো ব্যবধান খুঁজে পান না। দেশবন্ধুর প্রয়াণে ইন্দ্রপতনের কবিতায় কবিকে স্বধর্মবিরোধী আখ্যা দিয়ে অপমানের কঠিন ভূমিতে আছড়ে ফেলা হয়েছে বারংবার। কেমল কবি তবু উঠে দাঁড়িয়ে বলেছেন, তারে নয় তার গান হলেও যেন লোকে ভালোবাসে।



চারপাশে মানুষের অসাম্য দেখে, ধনী-নির্ধনে ব্যবধানের এই কঠিন ভূমিতে কবি রেলগাড়ি হতে কুলির পতনে বিমর্ষ হয়ে উঠেন। নারী-পুরুষে ব্যবধানে কষ্টে তার পুড়ে যায় মন। পূজারীর কাছে ক্ষুধাতের্র অপমানে হৃদয়ে হয় রক্তক্ষরণ। একসময় তিনি তাই বলতে বাধ্য হন, পৃথিবী একটি পাপস্থান যার অর্ধেক শয়তান আর অর্ধেক ভগবান। কোমল মনের কোমল ভাবনায় কবি একসময় আধ্যাত্মিকতার চর্চায় নিজেকে সঁপে দেন। ধ্যানের চর্চায় নিজেকে নিমগ্ন রেখে পার্থিব কষ্ট হতে মুক্তি পেতে চেয়ে কবি নিজের মনে নিজেই পুড়ে গন্ধবিধূর ধূপ হতে চেয়েছেন।



কবি কাজী নজরুল এক বিরাট এবং কোমল কুসুম। তার এই কোমলতা মনে, ভাবনায় ও সৃজনশীলতায়। তিনি তার অভিভাষণে নিজেই বলেছেন, কেউ কেউ তাকে বিদ্রোহী বলে ভয় ধরিয়ে দিয়েছে অন্যের মনে। তার অভিভাষণে তিনি বলেছেন, 'আমাকে বিদ্রোহী বলে খামোখা লোকের মনে ভয় ধরিয়ে দিয়েছেন কেউ কেউ। এই নিরীহ জাতটাকে আছড়ে-কামড়ে তেড়ে নিয়ে বেড়াবার ইচ্ছা আমার কোনদিনই নেই। আমি বিদ্রোহ করেছি বিদ্রোহের গান গেয়েছি অন্যায়ের বিরুদ্ধে অত্যাচারের বিরুদ্ধে।'



তিনি কবি হতে চাননি। এই কঠিন রুক্ষ ভূমির ধূলিতে তিনি এসেছিলেন প্রেম বিলাতে আর প্রেম পেতে। কিন্তু সেই প্রেম পেলেন না বলেই তিনি চিরতরে বিদায় নিলেন। আসলে তিনি একজন নরম মনের বিরহী পথিক যে এই পৃথিবীতে এসেছিলো আপন খেয়ালে সুন্দরের নৈবেদ্য নিবেদনে। তার ভাষায় না তিনি বর্তমানের কবি, না তিনি ভবিষ্যতের নবী। তিনি বিংশ শতাব্দীর অসম্ভবের সম্ভাবনার যুগে জন্মগ্রহণ করেছেন। এরই অভিযান সেনাদলের তুর্য বাদকের একজন কাজী নজরুল, এই হোক তার সবচেয়ে বড় পরিচয়। তিনি কঠিন সময়ের অর্ফিয়ুসের বাঁশি, তিনি এই কঠিন ভূমির কোমল কুসুম কবি কাজী নজরুল ইসলাম।



 


এই পাতার আরো খবর -
    আজকের পাঠকসংখ্যা
    ৯১০০২২
    পুরোন সংখ্যা