চাঁদপুর, মঙ্গলবার ৪ জুন ২০১৯, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬, ২৯ রমজান ১৪৪০
redcricent
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৫০-সূরা কাফ্


৪৫ আয়াত, ৩ রুকু, মক্কী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


২৯। তখন তাহার স্ত্রী চিৎকার করিতে করিতে সম্মুখে আসিল এবং গাল চাপড়াইয়া বলিল, 'এই বৃদ্ধা-বন্ধ্যার সন্তান হইবে?'


৩০। তাহারা বলিল, 'তোমার প্রতিপালক এই রূপই বলিয়াছেন; তিনি প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ।


 


 


 


assets/data_files/web

খ্যাতিমান লোকের ভালোবাসা অনেক ক্ষেত্রে গোপন থাকে। -বেন জনসন।


 


 


যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে (অর্থাৎ মুসলমান বলে দাবি করে) সে ব্যক্তি যেনো তার প্রতিবেশীর কোনো প্রকার অনিষ্ট না করে।


 


ফটো গ্যালারি
ঈদুল ফিতর : বৈষম্যের প্রাচীর ভাঙার প্রেরণা
এসএম আনওয়ারুল করীম
০৪ জুন, ২০১৯ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের সিঁড়ি বেয়ে আবার সমাগত পবিত্র ঈদুল ফিতর। 'ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ/তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন আসমানি তাগিদ' বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের মনকাড়া এ ঈদসংগীত সত্যিই দীর্ঘ একমাসের সিয়াম সাধনাশেষে মুসলিম মনকে নাড়া দেয়।



বছর ঘুরে আনন্দের সওগাত নিয়ে আবার এসেছে পবিত্র ঈদুল ফিতর। 'ঈদ' আরবি শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ খুশি, আনন্দ, উৎসব, উৎসাহ, বিনোদন। মানবজীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রেই তারা বিভিন্ন আনন্দের আতিশয্যে উদ্বেলিত হয়। এ সকল আনন্দময় মুহূর্তকেই ঈদ বলে আখ্যায়িত করা যেতে পারে। কিন্তু সমগ্র বিশ্ববাসী ঈদ বলতে মুসলিম উম্মাহর দুটি বিশেষ উৎসবকেই বুঝে থাকেন। অন্যভাবে একে মুসলমানদের জাতীয় উৎসব বলা হয়ে থাকে। ঈদ শব্দের আরেকটি অর্থ হলো ফিরে আসা, বার বার হাজির হওয়া। এ হিসেবে বলা যায়, যেই খুশি ও আনন্দ বার বার ফিরে আসে তা-ই ঈদ। তাইতো ইসলামি সংস্কৃতির মূর্তপ্রতীক ঈদ আনন্দের বারতা নিয়ে প্রতি বছর আমাদের হৃদয়ের দরোজায় করাঘাত করতে হাজির হয়।



দ্বিতীয় হিজরীর ঘটনা। নবি করিম (সাঃ) দেখতে পেলেন যে, নবীন মুসলমানগণ 'নওরোজ' ও 'মেহেরজান' নামক দুটি বিশেষ দিবসে লাগামহীন আনন্দোৎসবে মেতে আছেন। প্রিয়নবি (সাঃ) তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, এটি কিসের উৎসব? তারা জানালো, আমরা জাহেলি যুগে এ দুটি দিবসে উৎসব করতাম। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সরাসরি নিষেধ না করে তাৎপর্যহীন এ খেল-তামাশা সম্পর্কে তাদেরকে বললেন, আল্লাহতায়ালা তোমাদেরকে এ দুটি দিনের পরিবর্তে আরও দুটি আনন্দের দিন ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা দান করেছেন। ঈদুল ফিতর একাধারে দীর্ঘ এক মাসের একনিষ্ঠ সিয়াম সাধনা ও কৃচ্ছতা সাধনের পর তা অবসানের আনন্দোৎসব। আর ঈদুল আযহা হজ আদায় করার পর আল্লাহতায়ালার উদ্দেশ্যে পশু কোরবানি করার অনুষ্ঠান।



বিশ্বের প্রতিটি জাতির জীবনেই বছরে এমন দু-চারটি দিন আসে, যাকে তারা তাদের কোনো না কোনো জাতীয় উৎসবের স্মরণীয় দিন হিসেবে অত্যন্ত প্রিয় মনে করে। সেদিনের আগমন জাতির প্রত্যেকটি মানুষের জন্যে উন্মুক্ত করে দেয় আনন্দোৎসবের নতুন ধারা। অন্যান্য জাতির আনন্দোৎসব হচ্ছে এই ক্ষণস্থায়ী জগতের সুখ-সম্ভোগ অর্জন এবং ইন্দ্রিয়জ কামনা-বাসনা পূরণ। কিন্তু মুসলমানদের কামনা-বাসনা একমাত্র আল্লাহতায়ালার ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। তাদের আকাঙ্ক্ষা আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টির অধীন। তাদের সবচেয়ে বড় উৎসব হচ্ছে আল্লাহতায়ালার আনুগত্যে মাথা নত করা।



ঈদুল ফিতর বাংলার প্রাচীন উৎসবগুলোর অন্যতম। কিন্তু প্রাচীনকালে উৎসব হিসেবে বাংলার মানুষ ঈদের দিনটি কীভাবে পালন করতো সে সম্পর্কে বেশি কিছু জানা যায়নি। ১৭শ' শতকের দিকে বাংলার নবাবরা এবং শুধু বিত্তবানরা ঈদ উৎসব জাঁকজমকভাবে পালন করতেন। মোঘল আমলে মোঘলরা ঈদ উৎসব পালন করতেন। এ সময় গ্রামের মুসলমানরা ছিলো দরিদ্র। তাদের ইসলাম সম্পর্কে বিশুদ্ধ জ্ঞানও ছিলো না। ফরায়েজী আন্দোলনের পর থেকে ইসলাম সম্পর্কে সাধারণ মুসলমানরা জানতে শেখে। আজ আমরা যে ঈদের জন্যে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করি, প্রধান ধর্মীয় উৎসব বলে জানি এবং বড় উৎসব হিসেবে পালন হতে দেখি, সে ঈদ উৎসবের ইতিহাস মাত্র ৮০/১০০ বছরের পুরানো। বিশ শতকের শুরুর দিকে রাজনৈতিকভাবে মুসলিম স্বাতন্ত্র্য আন্দোলন শুরু হলে ঈদ উৎসব নতুন গুরুত্ব লাভ করে।



১৯৪৮ সালে পাক-ভারত বিভক্ত হওয়ার পর বাংলাদেশে দুটি ঈদই জাতীয় ধর্মোৎসবে রূপান্তরিত হয় এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে। বাংলাদেশে সর্বত্র ঈদ উদ্যাপিত হয়। এ উপলক্ষে সাধারণত ৩ থেকে ৪ দিন সরকারি ছুটি থাকে। বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন ঈদ উপলক্ষে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। পত্র-পত্রিকায় ঈদ উপলক্ষে থাকে বিশেষ আয়োজন। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর জীবন দর্শন, ঈদের তাৎপর্য, ইসলামের আদর্শভিত্তিক মূল্যবান প্রবন্ধসহ ঈদসংখ্যা প্রকাশ করে বিভিন্ন পত্রপত্রিকা। ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াগুলোও ঈদ অনুষ্ঠান নিয়ে কম মাতামাতি করে না। কে কার চেয়ে মানসম্মত অনুষ্ঠান দেখাতে পারে তার প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়।



বর্তমানে ঈদ উৎসবে টিভি পর্দার অনুষ্ঠানগুলো বেশ আনন্দের সঙ্গে উপভোগ করে সব ধর্মের লোকজন। নাটকপাড়ায় নাটক তৈরির হিড়িক পড়ে যায়। এফডিসিতেও অন্যত্র ঈদ উপলক্ষে নতুন ছবি নির্মাণ করা হয়। ফ্যাশন হাউস, টেঙ্াইল মিলগুলো নতুন পোশাক তৈরিতে ব্যস্ত থাকে। ঈদের বাজারে মার্কেটগুলোতে থাকে প্রচ- ভিড়। ঈদ উপলক্ষে মেহেদি উৎসব হয়। ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবার মনে থাকে খুশির আমেজ। ঈদের দিন সকালে দু রাকাত ঈদের নামাজ পড়েই একে অপরের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়, কুশলাদি জিজ্ঞেস করা, কোলাকুলিসহ সালাম বিনিময় করে থাকে। জাতীয় ঈদগাহ মাঠ, বায়তুল মোকাররমসহ দেশের সব মসজিদ ও প্রাঙ্গণে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। দেশের সর্ববৃহৎ ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয় কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ময়দানে।



ঈদুল ফিতর উপলক্ষে মাথাপিছু নির্দিষ্ট হারে গরিবদের ফিতরা বা অনুদান বিতরণ ধর্মীয় দিক থেকে বাধ্যতামূলক। এছাড়া সামর্থ্যবানরা জাকাত, সাধ্যমতো খাদ্য ও বস্ত্র বিতরণ করে থাকেন। সবাই সাধ্যানুযায়ী ভালো কাপড় পরিধান করে, আত্মীয়স্বজন পাড়া-প্রতিবেশীদের বাসায় যায়। এদিন সব বাসায় বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা থাকে। গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, নেতা-নেত্রী, রাজনীতিবিদসহ অন্যান্য সময় সহজে যাওয়া না গেলেও এদিন তাদের সঙ্গে অবলীলায় দেখা করা যায়। তারাও এদিন জনগণের কাছে আসেন।



সারাবিশ্ব জুড়ে ঈদ সর্বজনীন উৎসব হিসেবে পালিত হয় প্রতি বছর দু'বার। এর মধ্যে ঈদুল ফিতরকে বলা হয় মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব। সাধারণভাবে ঈদুল ফিতরকে রোজার ঈদ আর ঈদুল আজহাকে কুরবানির ঈদ বলেই সকলে জানে। এ দুটি ঈদ সামাজিক উৎসব হিসেবে প্রতি বছর বিশ্বের অন্যান্য স্থানের মতো বাংলাদেশেও ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। বিশেষ করে বাংলাদেশসহ অন্যান্য মুসলিম প্রধান দেশগুলোতে ঈদ উৎসবকে ঘিরে সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হয় অনির্বচনীয় এক প্রাণচাঞ্চল্য।



কালের বিবর্তনে আমাদের ঈদ উৎসবে যান্ত্রিকতার প্রলেপ লাগলেও নিকট অতীতেও ঈদ উৎসবের একটা ব্যাপকতা ছিল। এক সময় গ্রামেগঞ্জে ঈদের আগের দিন অর্থাৎ যেদিন আকাশে চাঁদ দেখা যাবে, সেদিন গ্রামের মানুষ স্থানীয় মসজিদে একত্রিত হতো। গ্রামের সম্ভ্রান্ত লোকেরা আসতেন এবং সাধারণ মানুষও এসে জড়ো হতো। সন্ধ্যার আগ থেকেই লোকজন জড়ো হয়ে পশ্চিম আকাশের দিগবলয়ের দিকে তাকিয়ে থাকতো। পর্যবেক্ষণ করে যখন চাঁদ দেখা যেতো, তখন সেই চাঁদকে নিয়ে তাদের উৎসাহের অন্ত থাকতো না। একে অন্যের সঙ্গে কোলাকুলি করতো, বড়দের ছোটরা সালাম করতো। ছোটদেরকে কোলে করে আঙ্গুলি উঁচিয়ে চাঁদ দেখানো হতো। সব মানুষ ওই সরু বাঁকা চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকতো। কেউবা দু হাত তুলে মোনাজাত করে মুখে হাত বুলিয়ে নিতো। এখনকার দিনে আর চাঁদ দেখার সে রকম আগ্রহ নেই। এখন সরকারিভাবে চাঁদ দেখা হয়। মিডিয়ার বদৌলতে চাঁদ দেখার ঘোষণা শুনেই সকলে সন্তুষ্ট হয়। অবশ্য এর পেছনে কারণও আছে। এখন আর পশ্চিম আকাশ খুঁজে পাওয়া যায় না। পশ্চিম আকাশের দিকে তাকানো সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। বিশাল বিশাল সুরম্য অট্টালিকার ভিড়ে ক্রমেই এক ফালি হাসি দিয়ে পশ্চিমাকাশে ওঠা ঈদের চাঁদ দেখা হারিয়ে যেতে বসেছে।



ঈদুল ফিতর মূলত ফিতরা আদায়কে কেন্দ্র করে। দীর্ঘ এক মাসের সিয়াম সাধনার পর বিত্তবানরা আনন্দোৎসব পালন করবে অথচ দীনহীন মানুষ ক্ষুধাক্লিষ্ট দেহ নিয়ে জ্বলেপুড়ে মরবে, তা হয় না। এজন্যেই ইসলামি শরিয়তের পক্ষ হতে দুঃখী মানুষের মুখেও হাসি ফুটাতে ফিতরা ও জাকাতের বিধান রয়েছে। 'কেউ খাবে আর কেউ খাবে না, তা হবে না' সূত্রেই সাম্যমৈত্রীর ধর্ম ইসলামে বিত্তবানদের জন্যে জাকাত ফিতরা আদায়ের নিয়ম প্রবর্তিত হয়েছে। ঈদুল ফিতরের দিন সুবহে সাদিকের সময় জীবিকা নির্বাহের অত্যাবশকীয় সামগ্রী ছাড়া নিসাব পরিমাণ টাকা বা অন্য কোনো মালের মালিক থাকলেই তার ওপর নিজের ও নিজের নাবালক সন্তানসন্ততির পক্ষ হতে ফিতরা আদায় করা আবশ্যক।



এখানে একটি কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, কোনো ব্যক্তির ওপর জাকাত ওয়াজিব হওয়ার জন্য তার অত্যাবশ্যকীয় সামগ্রী ছাড়া নিসাব পরিমাণ টাকা বা অন্য মাল বর্ষ অতিক্রম করা প্রয়োজন। পক্ষান্তরে ফিতরা ওয়াজিব হওয়ার জন্য শুধুমাত্র ঈদুল ফিতরের দিবসের প্রত্যুষে নিসাবের মালিক হলেই ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব হয়ে যায়। একই সাথে ফিতরা ওয়াজিবের জন্য মাল ব্যবসার জন্য হওয়াও শর্ত নয়।



মাথাপিছু পৌনে দু'সের গম কিংবা ময়দা অথবা তার মূল্য ফিতরা হিসেবে গরিব-মিসকিনকে দিতে হবে। চাল বা অন্য কিছু দিতে চাইলে ঐ পরিমাণ ময়দার মূল্যসম দ্রব্য দিতে হবে।



প্রতি বছরই যেহেতু পৌনে দু'সের গমের মূল্য বাজারদর অনুযায়ী পরিবর্তন হয়ে থাকে। এজন্য জনগণের সুবিধার জন্যে দেশের প্রখ্যাত ওলামায়ে কেরাম ওই বছরের ফিতরার পরিমাণ টাকার হিসেবে ধার্য করে প্রচার করে থাকেন। এতে রেশন দর ও বাজার দরের পার্থক্যের কারণে অনেক সময় বিভিন্ন পরিমাণ ঘোষিত হতে থাকে। এ হিসেবে এবারকার ফিতরা নির্ধারণ করা হয়েছে মাথাপিছু সর্বনিম্ন ৭০ আর সর্বোচ্চ ১৯৮০ টাকা। বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পক্ষ হতে ইতোমধ্যেই এ সংক্রান্ত ঘোষণা প্রচারিত হয়েছে। এ ফিতরা প্রদানকে কেন্দ্র করেই মূলত রমজানোত্তর ঈদকে ঈদুল ফিতর বলা হয়ে থাকে।



ঈদের দিনে বিত্তবানদের আনন্দের সাথে অনাথ দুঃস্থদেরকেও শরিক করার নজির রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর জীবনে বহু ঘটেছে বলে প্রমাণ মিলে। বিশেষত একটি ঘটনাই তন্মধ্যে হৃদয়গ্রাহী হিসেবে আমাদের মাঝে প্রসিদ্ধি লাভ করে আছে। প্রিয়নবী (সাঃ) ঈদগাহে নামাজ পড়ে সকলের সাথে কুশল বিনিময় করতেন। একবার তিনি ঈদগাহের এক কোণে কান্নারত এক বালককে পেয়ে তাকে বাড়িতে নিয়ে গোসল করিয়ে নতুন জামাকাপড় পরিয়ে ভালো খাবার খাইয়ে দেন। মহানবীর (সাঃ) আদরে অনাথ বালকটি পেয়েছিল ঈদ আনন্দ। আজ আমাদের চারপাশে অসংখ্য শিশু-কিশোর। ডাস্টবিন থেকে কুকুরের উচ্ছিষ্ট খাবার খেয়ে টোকাই নাম ধারণ করে আছে অনেকে। ঈদ তাদের জন্য আদৌ কোনো আনন্দ বয়ে আনে বলে মনে হয় না। যেই ঈদ একদা মুসলমানের জীবনে সফলতা ও খুশি-আনন্দের ঢেউ এনেছিল, আজ সেই ঈদ আসে শত প্রশ্ন নিয়ে-শত বেদনা নিয়ে। দার্শনিক মাওলানা আবুল কালাম আজাদ তাইতো বলেছেন, 'ঈদ এসে বাড়িয়ে দেয় গরিবের আরও দুশ্চিন্তা, ঈদের আগমনে বৃদ্ধি পায় দুঃস্থদের করুণ আর্তনাদ।'



ঈদুল ফিতর একদিকে যেমন আনন্দের দিন, তেমনি সেটি চিন্তার দিন। ঈদ কেন খুশির দিন, তা' আগেই আলোচনা করা হয়েছে। পক্ষান্তরে এটি মহাচিন্তার দিন এজন্যে যে, মাহে রমজান ছিল একটি মহাগুরুত্বপূর্ণ মাস। রমজানের পরই আসল ঈদ। ঈদের চাঁদ উঁকি দেয়া মানেই রমজানের মতো একটি মহাপুণ্যবান মাসের বিদায়। তাইতো হযরত আবু বকর (রাঃ) একদা ঈদের দিনে বসে কাঁদছিলেন। অন্যান্য সাহাবী তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, জনাব! আপনি কাঁদছেন? আজকের খুশির দিনেও ক্রন্দন? জবাবে তিনি বললেন, ঈদ দিবসের তোমাদের উপলব্ধি অনুভূতি ঠিক আছে বটে; কিন্তু আমি এর অর্থ বুঝেছি অন্যভাবে। তা হলো এতদিন আল্লাহ তায়ালার পক্ষ হতে রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের পয়গাম সম্বলিত রমজান আমাদের কাছে ছিল। ঈদের আগমনের সাথে সাথে সেই মহিমান্বিত মাসের ইতি ঘটেছে। আবার এক বছর পর এর আগমন ঘটবে। কিন্তু আমার তো জানা নেই, আগামী বছর বাঁচব কিনা। হয়তো বা এটিই আমার জীবনের প্রাপ্ত শেষ রোজার মাস। সে চিন্তায় আমি কাঁদছি।



ঈদ আমাদের জন্যে এক বিরাট নেয়ামত। এদিন চারদিকে খুশি আর আনন্দের ঢেউ বয়ে যায়। সবার মুখে থাকে হাসি। ফিরনি, সেমাই, পায়েশের ঘ্রাণে বাতাস হয় মুখরিত। সবার মন থাকে প্রফুল্ল। মনে থাকে না হিংসা-বিদ্বেষ। ঈদের দিনে আমরা ঈদগাহে গমন করি, সুন্দর সুন্দর পোশাক পরি। আতর মেখে মাথায় টুপি দেই। আহ! কতো সুন্দর এক বেহেশতি দৃশ্যের অবতারণা। আমাদের সারাদেহ থেকে যেন নূরের রশ্মি ঠিকরে পড়ে। ঈদের জামাতে আমরা আমাদের ইহকাল ও পরকালের মুক্তির জন্যে আল্লাহর দরবারে প্রাণভরে মোনাজাত করি। তামাম বিশ্বের শান্তি কামনা করি। ঈদের জামাতে ধনী-গরিব, মনিব-দাস-এর মধ্যে কোনো ভেদাভেদ থাকে না। একমাত্র মুসলিম ছাড়া অন্য কোনো জাতির মাঝে এমন নজির পাওয়া যায় না। আর এজন্যেই ঈদ আমাদের জন্যে মহানেয়ামত স্বরূপ।



যারা রোজার যাবতীয় হক আদায় করেছে তাদের জন্য ঈদুল ফিতরের দিনটি মহাসম্মানের, আনন্দের, অভিনন্দনের, শান্তির, ক্ষমার এবং মহাপুরস্কারের দিন। পক্ষান্তরে যারা রোজা ছেড়ে দিয়েছে, তাদের জন্য এ দিবসটি অপমানের, নিরানন্দের, লাঞ্ছনার এবং অশান্তির। ঈদের দিনের আনন্দ বর্ণনা করতে গিয়ে নবি করিম (সাঃ) ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি দু'ঈদের রাতে জেগে সাওয়াবের উদ্দেশ্যে ইবাদত করবে, তার আত্মা কখনও মারা যাবে না; যে দিন মানুষের আত্মাসমূহ মারা যাবে। অর্থাৎ ইবাদতকারীর আত্মাসমূহ আল্ল্লাহর অসীম নেয়ামতের অধিকারী হয়ে পরকালে পরিতৃপ্তি লাভ করবে।



রাসূলে কারীম (সাঃ) ইরশাদ করেন, ঈদুল ফিতরের দিন ফেরেশতারা রাস্তার মুখে মুখে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলতে থাকেন, হে মুসলিম! নেক কাজের ক্ষমতাদাতা ও সাওয়াবের আধিক্যদাতা আল্ল্লাহর কাছে অতি শিগগির চল। তোমাদেরকে রাতে ইবাদত করার হকুম করা হয়েছিল, তোমরা তা করেছ, দিবসে রোজা রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল, তোমরা তা পালন করেছ। তোমরা তোমাদের সৃষ্টিকর্তাকে খাইয়েছ (অর্থাৎ গরিব-দুখিদের আহার দিয়েছ) আজ তার পুরস্কার গ্রহণ কর। অতঃপর মুসলমানরা যখন ঈদের নামাজ পড়ে তখন একজন ফেরেশতা উচ্চৈঃস্বরে ঘোষণা করেন, তোমাদেরকে তোমাদের সৃষ্টিকর্তা ক্ষমা করে দিয়েছেন। এখন তোমরা তোমাদের পুণ্যময় দেহ-মন নিয়ে নিজ নিজ গৃহে প্রত্যাবর্তন কর। এদিনটি পুরস্কারের দিন, আকাশে এই দিবসের নাম 'উপহার দিবস' নামে নামকরণ করা হয়েছে। (তিবরানী)



ঈদের দিনে করণীয় : ঈদের দিন আমাদের অনেক কিছু করণীয় রয়েছে। প্রথমত ঈদের রাতে জাগ্রত থেকে ইবাদত-বন্দেগি ছাড়াও ঈদের দিন যে কাজগুলো আমাদের করণীয় তা বিশুদ্ধ হাদিস ও ফিকহের আলোকে তুলে ধরা হলো_ ১. হজরত ইবনে ওমর (রা) দু'ঈদে উত্তম পোশাক পরিধান করতেন। (বায়হাকি) ২. প্রখ্যাত সাহাবি হজরত আবদুল্ল্লাহ ইবনে ওমর (রা) ঈদুল ফিতরের দিন ঈদগাহে রওনা হওয়ার আগে উত্তমরূপে গোসল করতেন। (বায়হাকি) ৩. হজরত আনাস (রা) হতে বর্ণিত রাসূল (সাঃ) ঈদুল ফিতরের দিন খেজুর আহার না করে ঈদগাহের দিকে বের হতেন না (অর্থাৎ ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বে অবশ্যই কিছু খেতেন)। (বুখারি) ৪. হজরত ইবনে ওমর (রা) দু'ঈদের দিন প্রত্যুষে ঈদগাহে পেঁৗছা পর্যন্ত প্রকাশ্যভাবে তাকবির পাঠ করতেন। (বায়হাকি) ৫. হজরত জাবের (রা) হতে বর্ণিত, হজরত নবি করিম (সা) এক পথ দিয়ে ঈদগাহে যেতেন এবং অন্য পথ দিয়ে প্রত্যাবর্তন করতেন। (বুখারি) ৬. হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা) থেকে বর্ণিত, নবি করিম (সাঃ) ঈদের নামাজের আগে কোনও নামাজ (নফল) আদায় করেননি। ঈদের নামাজ শেষে গৃহে ফিরে দু'রাকাত নামাজ আদায় করতেন। (বুখারি মুসলিম)



উপরোলি্লখিত হাদিস ও অন্যান্য হাদিসসমূহের ভিত্তিতে ঈদুল ফিতরের দিনে নিম্নোক্ত ১৩টি কাজ পালন করা উত্তম ও সুন্নাত_ ১. মিসওয়াক করা, ২. খুব প্রত্যুষে শয্যা ত্যাগ করা, ৩. গোসল করা, ৪. যথাসাধ্য উত্তম পোশাক পরিধান করা, ৫. সুগন্ধি ব্যবহার করা, ৬. যথাসাধ্য সুসজ্জিত হওয়া, ৭. ঈদের মাঠে যাওয়ার আগে খুরমা বা মিষ্টান্নদ্রব্য আহার করা, ৮. সময় হওয়া মাত্র ঈদগাহে যাওয়া, ৯. ঈদগাহে যাওয়ার আগে সদকায়ে ফিতর আদায় করা, ১০. যথাসম্ভব মসজিদে ঈদের নামাজ না পড়ে ঈদগাহে আদায় করা, ১১. পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া, ১২. ঈদগাহে এক পথে যাওয়া ও অন্য পথে ফিরে আসা, ১৩. ঈদগাহে যাওয়ার সময় নিচু স্বরে এই তাকবির পাঠ করা_আল্ল্লাহু আকবার আল্ল্লাহু আকবার লা-ইলাহা ইল্ল্লাল্লাহু আল্ল্লাহু আকবার ওয়াআল্ল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ।



একটি ব্যাপার আমাদের স্মরণ রাখতে হবে যে, দীর্ঘ এক মাসের সিয়াম সাধনার মাধ্যমে আমরা যে আদর্শ অর্জন করেছি, আল্লাহ তায়ালার যতটুকু নৈকট্য লাভ করেছি, তা যেন ঈদের আনন্দের মাঝে হারিয়ে না যায়। রোজার আদর্শ ভুলে গিয়ে আমরা যদি ঈদের আনন্দকেই মুখ্য বলে গ্রহণ করি, তাহলে এ আনন্দের কোনো সার্থকতা থাকবে না। বিশেষত মাহে রমজানে আল্লাহ তায়ালা শয়তানকে বন্দী করে রাখেন। রোজাশেষেই তাকে আবার ছেড়ে দেয়া হয়। আমরা স্বাভাবিকভাবেই বুঝি যে, কোনও দুষ্কৃতকারীকে দীর্ঘদিন বন্দী করে রাখলে সে জেলের মধ্যে বসে নিরিবিলি আরও সূক্ষ্ম ফন্দি অাঁটতে থাকে কীভাবে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা যাবে। ঠিক তেমনি মাহে রমজানে গ্রেফতার হওয়া শয়তান চিন্তাভাবনা করে নতুন কৌশল আয়ত্তে আনে কিভাবে তার প্রতিপক্ষ মানুষকে কুমন্ত্রণা দিয়ে রমজানে অর্জিত সকল পুণ্য বরবাদ করে দেয়া যায়। তাই রোজার পর অর্থাৎ ঈদ দিবস থেকেই আমাদের সতর্ক হতে হবে, যেন আনন্দের আতিশয্যে ফেলে শয়তান আমাদের অর্জিত পুণ্য ছিনতাই করে নিতে না পারে। এ জন্যই ঈদের আনন্দ খুব সাবধানে পালন করতে হবে। কারণ, আমাদের অসতর্কতার ফাঁকে শয়তান আমাদের ঘাড়ে চড়ে বসতে পারে। এজন্যই পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, 'নিশ্চয় শয়তান তোমাদের জন্যে প্রকাশ্য শত্রু।



লেখক : আলোচক, বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশন; বিভাগীয় প্রধান (হাদিস), আল ফাতাহ পাবলিকেশন্স



ধহধিৎঁষশধৎরস৭৩@মসধরষ.পড়স



 



 



 


এই পাতার আরো খবর -
    আজকের পাঠকসংখ্যা
    ৬১১৯৮১
    পুরোন সংখ্যা