চাঁদপুর, শনিবার ১৫ আগস্ট ২০২০, ৩১ শ্রাবণ ১৪২৭, ২৪ জিলহজ ১৪৪১
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৭৪-সূরা মুদ্দাছ্ছির


৫৬ আয়াত, ২ রুকু, মক্কী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


৫। পৌত্তলিকতা পরিহার করিয়া চল,


৬। অধিক পাওয়ার প্রত্যাশায় দান করিও না।


৭। এবং তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে ধৈর্য ধারণ কর।


৮। যেদিন শিংগায় ফুৎকার দেওয়া হইবে


 


মানুষের সর্বোৎকৃষ্ট শিক্ষকই হল মহৎ ব্যক্তিদের আত্মজীবনী।


-ওরসন স্কোয়ার ফাউলার।


 


 


যার দ্বারা মানবতা উপকৃত হয়, তিনিই মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ।


 


 


ফটো গ্যালারি
বঙ্গবন্ধুর চেতনাই সভ্যতার আবাহন ও সভ্যতার পথরেখা
জাহাঙ্গীর হোসেন
১৫ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


বঙ্গবন্ধু কেবল বাঙালিরই নয়, যেকোনো মানবিক জনপদের মানুষের হতে পারে। বঙ্গবন্ধুর চেতনা সভ্য সমাজের স্মারক। এ চেতনা জাগানিয়া চেতনা। অর্থাৎ তাঁর কাজ বাণী ভাষণ সবকিছুই আলোক দিশারী। তিনি পথচলার আইকন। যিনি শিকার হলেন একাত্তরের পরাজিত সৈনিকদের লালন পালনকারীদের হাতে। তাঁর এ নৃশংস মৃত্যু কোনো সমাজই মেনে নিতে পারে না। যদি এ হত্যা সমর্থন হয়, কখনও বুঝে নিতে হবে মানুষ প্রজাতি বিলুপ্ত হলো। এ সংসার নতুন প্রজাতি নতুন কোনো শাস্ত্র কিংবা মতবাদ নিয়ে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুুজিবর রহমানের মৃত্যুদিবসকে স্মরণ করে এ নিবন্ধে কিছু জীবনকর্ম অবতারণা করি যাতে এ জনমে একটু ধন্য হতে পারি



(১) বঙ্গবন্ধু এমন এক মহান ব্যক্তি যিনি বাংলাদেশকে স্বাধীন করার ক্ষেত্রে অনবদ্য ভূমিকা রেখেছেন এবং 'বাংলাদেশ' নামক দেশটিকে উপহার দিয়েছেন তিনিসহ মুক্তিকামী বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ। তাই তার গোটা জীবনটাই আমার কাছে 'রাজনৈতিক জীবনের রেলগাড়ি' মনে হচ্ছে। তাঁর বলিষ্ঠ রাজনীতির প্রশংসা করে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট ফিদেল ক্যাস্ত্রো বলেছেন, 'আমি হিমালয় দেখিনি-বঙ্গবন্ধুকে দেখেছি'। তিনি মানুষ থেকে বড় মানুষ, নায়ক থেকে মহানায়ক, কবি থেকে মহাকবি বনে গেছেন। মানুষের উক্তিতে তিনিই স্বাধীন বাংলার 'প্রাণভোমরা' বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন আলোচনায় অনেক প্রসঙ্গই স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলে আসছে। যা আলোচনার নহর বইয়ে দিতে চাচ্ছে। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে উঠে এসেছে বঙ্গবন্ধুর পরিবারের নেপথ্যের কিছু কাহিনী। তাই বঙ্গবন্ধুর শেখ পরিবারের উপর ঘাত-প্রতিঘাতের তিনটি ঘটনা বর্ণনা করবো।



শেখ বোরহান উদ্দিনের ছেলের দুই পুত্র ছিল। একজনের নাম কুদরত উল্যাহ। অপর জনের নাম শেখ একরাম উল্যাহ। বঙ্গবন্ধুর পরিবার এ দুই ভাইয়ের বংশধর। এ দুই ভাই প্রাচুর্যে সমৃদ্ধ ছিল। শেখ কুদরত উল্যাহ ছিলেন সংসারী ও ব্যবসায়ী। শেখ একরাম উল্যাহ এলাকায় সালিসি করতেন। এ পরিবারটি রাণী রাসমনির সাথে বিবাদে জড়িয়ে যায়। রাণী রাসমনি জমিদারি পাওয়ার পর শেখদের সাথে জমিদারি নিয়ে কোন্দল ও দাঙ্গার সৃষ্টি হয়। শেখ পরিবারের সম্পত্তি দেখাশোনা করতেন শেখ অছিমুদ্দিন। শেখ বাড়ি থেকে অন্তত তিন মাইল দূরে অবস্থান করতো তমিজউদ্দিন নামে এক দুর্ধর্ষ ডাকাত। তমিজ উদ্দিন বাস করতেন শ্রীরামকান্দি নামক গ্রামে। তমিজউদ্দিন রাণী রাসমনির লোক। শেখ পরিবার ও রাণী রাসমনির পেয়াদা ডাকাত তমিজউদ্দিনের মাঝে তুমুল বিবাদ হলে রাসমনি পরাজিত হন। এ ঘটনায় ডাকাত তমিজউদ্দিন মারা যায়। পরে মামলা হলে শেখদের সবাই গ্রেফতার হন। কিছুদিন কারাভোগ করে তারা হাইকোর্ট থেকে মুক্তি পান।



এ ঘটনার আগে আরেকটি চমকপ্রদ ঘটনা ঘটে যায় শেখদের সাথে ইংরেজ কুঠিয়ালদের। যখন এদেশে নীল চাষ হতো, তখন একটি কুঠি তৈরি হয়। শেখদের একটি নৌকার বহর ছিল বাণিজ্য করার জন্য। নৌকা কলকাতায় যেত। একদিন মি. রাইন শেখদের নৌকা আটকে দেয় এবং অতর্কিত হামলা চালায়। মি. রাইনের লোকদের সাথে কয়েক দফা দাঙ্গা-হাঙ্গামা হলে মামলা হয়। মামলায় কোর্ট মি. রাইনকে দোষারোপ করে এবং কোর্ট বলে যে, 'ইচ্ছে করলে শেখ পরিবার মি. রাইনকে জরিমানা করতে পারে'। পরে শেখ কুদরত উল্যাহ মি. রাইনকে অপমান করার জন্য আধা পয়সা জরিমানা করলেন। রাইন প্রতিউত্তরে বলেছিল "যত টাকা চান দিতে রাজি আছি, আমাকে অপমান করবেন না। তাহলে ইংরেজ সমাজ আমাকে গ্রহণ করবে না।" কুদরত উল্যাহ এ প্রেক্ষিতে বলেন "টাকা আমি গুণি না, মেপে রাখি। আমি প্রতিশোধ নিলাম আমার লোকের উপর অত্যাচার করেছ বলে।" আর একটি কাহিনী ছোট করে উল্লেখ করা যেতে পারে। শেখ ও কাজী পরিবারের সাথে সর্বদাই বিবাদ লেগে থাকতো। কাজী বংশ শেখ বংশকে দমিয়ে রাখতে তিন ছেলে বৃদ্ধ বাবা কাজী সেরাজুতুল্লাকে হত্যা করে শেখ পরিবারের ঘরের চালার উপর ফেলে রাখে। এ ঘটনায় মামলা হয়। ষড়যন্ত্রের এ মামলা হলে শেখ পরিবারের অনেকের জেল হয়। পরিবারটি জমিদারিত্ব হারায় এবং অর্থনৈতিকভাবে সর্বস্বান্ত হয়। অবশ্য পরবর্তীতে মামলার সত্যতা উন্মোচিত হলে শেখ পরিবার নিষ্কৃতি পেলে কাজী পরিবার ফেঁসে যায় এবং তাদের যাবজ্জীবন জেল হয়। এভাবেই ঘাত-প্রতিঘাতে কোনোমতে টিকে ছিল শেখ পরিবার।



গোপালগঞ্জের টুঙ্গী পাড়ার শেখ বংশের নাম ওই অঞ্চলে পরিচিত ছিল। শেখ বংশ ছিল বিরাট সম্পদের মালিক। ধীরে ধীরে ধ্বংস হতে লাগলো প্রভাব প্রতিপত্তি। শেখ বোরহানউদ্দিন এ বংশের গোড়াপত্তন করেন। মধুমতি তীরে তার অবস্থা সম্পর্কে কেউই এ পর্যন্ত বলতে পারেনি।



(২) বঙ্গবন্ধুর বাবা চাকরির সুবাদে মাদারীপুরে অবস্থান নেয়ায় তাকে সেখানেই লেখাপড়া করতে হয়েছে। মা সায়রা খাতুন থাকতেন গ্রামের বাড়িতে। তিনি জমিজমা দেখাশুনা করতেন। বঙ্গবন্ধুর ছোট চাচা 'খান সাহেব' উপাধি পান। ১৯৩৬ সালে বঙ্গবন্ধুর বাবা শেখ লুৎফুর রহমান মাদারীপুর মহকুমার সেরেস্তাদার হয়ে বদলি হন। ওই সময় বঙ্গবন্ধু চোখের গ্লুকোমা রোগে আবারও আক্রান্ত হন। ১৬ বছর বয়সে আবার চোখ নষ্ট হতে চলছিলো। পরে কোলকাতায় নিয়ে যাওয়া হয়। ১০ দিনের মধ্যে দুটো চোখই অপারেশন করতে হয়েছে।



বঙ্গবন্ধুর গৃহ শিক্ষকের নাম আব্দুল হামিদ। তিনি এমএসসি পাস করা শিক্ষিত লোক। ওই শিক্ষক 'মুসলিম সেবা সমিতি' গঠন করেন। গরিব ছেলেদের সাহায্য করতে মুষ্টিভিক্ষা করে চালসহ অন্যান্য জিনিসপত্র তুলতেন। এগুলো বিক্রি করে দিয়ে গরিব ছেলেমেয়েদের বই কিনে দিতেন এবং পরীক্ষার অন্যান্য খরচও দিতেন। কেউ চাল না দিলে বঙ্গবন্ধুসহ সাথের বন্ধুরা মিলে ঘরের চালে ঢিল মারতেন। কষ্টের খায়েশ মেটাতেন। সময় গড়াতে গড়াতে ওই শিক্ষক যক্ষ্মায় মারা যান। এরপর সংগঠনটির সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন শেখ মুজিব। এভাবেই এগিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। এটাই রাজনীতিতে তাঁর প্রথম সোপান। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ নেতা-কর্মীরা ধারণ করছে কি? বর্তমানে এ ধারাটির ভাটা পড়েছে। আত্ম অহমিকায় নিবিষ্ট থাকায় এ ধরনের কাজ খুব কমই চোখে পড়ে। তবে বামপন্থী কিছু সংগঠন বর্তমানে এ ধরনের কাজ সামান্য করে থাকে। বিশেষ করে কৃষক-ক্ষেতমজুর সংগঠনগুলো এ ধারায় কম-বেশি যুক্ত।



বঙ্গবন্ধু নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোসের ভক্ত ছিলেন। ১৯৩৮ সাল। এ সময় অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী এ.কে. ফজলুল হক। এ মন্ত্রীসভায় শ্রমমন্ত্রী ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। এ দুই নেতা গোপালগঞ্জ আসবেন, তাই সংবর্ধনা দেয়া হবে। স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন হলো। প্রধান হলেন শেখ মুজিবুর রহমান। এরই মধ্য দিয়ে রাজনীতির মহাফটকে ঢুকে পড়লেন তিনি। শুরু হলো তাঁর অবিরাম পথ চলা। হিন্দু ছেলেরা আসতে চাইলো না। অবশ্য নিম্নবর্ণের নমশূদ্র বংশের কিছু ছেলে এতে যোগ দিল। বঙ্গবন্ধুর সাথে হিন্দু ছেলেদের বেশ বন্ধুত্ব ছিল। খেলাধুলা তাদের সাথেই হতো। তারপরও নিজ ধর্মের প্রতি আগ্রহ কম ছিল না। যা প্রথম দিকের রাজনীতির কর্মসূচিতে অনেকটাই আঁচ করা যায়। হিন্দুদের ক্ষেপে যাওয়ার কারণ ছিলো, হক সাহেব মুসলিম লীগের সাথে মন্ত্রীসভা গঠন করার সময় মুসলিম লীগের কোনো ইউনিট ছিল না। হিন্দু নেতারা তখন অনুষ্ঠান বানচালের জন্য উঠে পড়ে লেগেছিল। তবে ওই সময় মন্ত্রীসভায় মুকুন্দ বিহারী মলি্লকও ছিলেন। এরপরও সামপ্রদায়িক দাঙ্গার ভাব ছিল।



বঙ্গবন্ধুর সাংগঠনিক দক্ষতা ও যোগ্যতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মনে রেখাপাত করলো। বঙ্গবন্ধুকে মুসলিম লীগে যোগ দিতে প্রস্তাব করলেন। বঙ্গবন্ধু রাজি হয়ে গেলেন। সোহরাওয়ার্দী সাহেব তাঁর নাম ঠিকানা টুকে নিলেন। এতে করে সম্পর্ক আরও গভীর হতে লাগলো চিঠি আদান প্রদান করায়। হিন্দু বিদ্বেষী ও মুসলমানপ্রীতির সূত্রে মুসলিম লীগ গঠন হয়ে গেল গোপালগঞ্জে। এ সময় খন্দকার শামসুদ্দীন মুসলিম লীগে যোগদান করলে তিনি মুসলিম ছাত্রলীগের সভাপতি হন, বঙ্গবন্ধু হন সাধারণ সম্পাদক। মুসলিম লীগ গঠিত হলে যিনি সম্পাদক ছিলেন তার সকল কাজ শেখ মুজিবই সম্পাদন করতেন। মুসলিম লীগ বলতে তাকেই বোঝানো হতো। তখন মুসলিম লীগের রাজনীতিতে শ্রেণি চেতনার চেয়ে ধর্মীয় চেতনাই তীব্র ছিল। মুসলমানগণ অধিকার বঞ্চিত, নিষ্পেষিত_এ ধারণা থেকে মুসলিম লীগ গড়ে ওঠে। সমপ্রদায়গত চেতনাই মূল বিষয় হয়ে ওঠে। ফলে পূর্ববঙ্গের মানুষকে এর খেসারত গুণতে হয়েছে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত। যার রেশ এখন পর্যন্ত বহমান। এটা এখন পর্যন্ত মূল পুঁজি হয়ে আছে।



৩. ১৯৪০ সালে সমপ্রদায়গত চেতনা আরো দানা বাঁধতে থাকে। এ সময় 'লাহোর প্রস্তাব' উত্থাপন হয়। শ্রেণি চেতনা ব্যতিরেকে সমপ্রদায় চেতনাই মূল প্রতিপাদ্য হিসেবে কাজ করেছিল। তবে ওই সময়ের মুসলিম লীগ নেতারা মুসলমানভিত্তিক কর্মকা-কে এবং পাকিস্তান আন্দোলনকে সামপ্রদায়িক আন্দোলন মানতে নারাজ ছিলেন। কিন্তু দেখা গেল 'মুসলমান' তকমায় রাজনীতি করলেও মুসলমানরা রাজশক্তির নিয়ামক থেকে দূরে চলে গেছেন। এ জায়গায় হিন্দুরা এগিয়ে গেলেন এবং রাষ্ট্র ও সমাজের কর্তৃত্ব নিয়ে গেলেন।



১৯৪০ সালে ভূমিব্যবস্থার সংস্কারের প্রস্তাব দেয় 'ক্লাউড কমিশন'। ওই সময় প্রধানমন্ত্রী ছিলেন এ.কে. ফজলুল হক। এই কমিশনের সুপারিশ ছিল জমিদারি প্রথার উচ্ছেদ করা এবং চাষীদের সরাসরি সরকারের প্রজা করা এবং তাদের উৎপাদিত ফসলের তিনভাগের দুইভাগ মালিকানা প্রদান করা। এই সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য কৃষক সমাজ ঐক্যবদ্ধ হতে থাকে। 'তোলা' ও 'লেখাই' নামক নানা করের বিরুদ্ধে আন্দোলন আরো জোরদার হতে থাকে। এই আন্দোলনে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলে অংশ নেন। এ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ছেচলি্লশের দাঙ্গা ও সামপ্রদায়িক বিদ্বেষকে জোরালো করে হিন্দু-মুসলমান। এ আন্দোলনে নেতাদের উল্লেখযোগ্য ছিলেন ইলামিত্র, বিষ্ণু চট্টোপাধ্যায়, অজিত বসু, কংসারী হালদার, নুর জালাল, ভূপাল ও কৃষ্ণবিনোদ রায়। দিনাজপুর জেলার সমিরুদ্দিন ও শিবরাজ ছিলেন তেভাগা আন্দোলনের প্রথম শহীদ। আর এদিকে চট্টগ্রামের মাস্টার দা সূর্য সেন ও প্রীতিলতার সাহসী আন্দোলনও ব্রিটিশ রাজত্বের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল। মাস্টারদা সূর্যসেন প্রথম স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করেন।



তেভাগা আন্দোলনটি ওই সময়ে অর্থাৎ ১৯৪৬ সালে ঠাকুরগাঁও জেলার রাণী শংকৈল উপজেলায় ছড়িয়ে পড়ে। ওই এলাকার কৃষক নারীরা লাঠি, কুড়াল, দা-বটি যার কাছে যা ছিল তা নিয়ে পুলিশি হামলাকে মোকাবেলা করেছিল। তেভাগা আন্দোলন প্রগতি ধারার দিকে ধাবমান হয়ে তা সাহিত্য-সংগীতে একাকার হয়েছে। গোলাম কুদ্দুস, পুর্ণেন্দু পাত্রী, মানিক বন্দোপাধ্যায় সাহিত্যিকগণ তেভাগা আন্দোলন কাব্য-উপন্যাসে যুক্ত করেন। তেভাগা, টংক, নাচোল, নানকার বিদ্রোহ এসব আন্দোলন অসামপ্রদায়িক চেতনাকে আরো সুদৃঢ় করতে থাকে। এ আন্দোলনে নিগৃহীত হিন্দু-মুসলমান কৃষকগণ ঐক্যবদ্ধ হন। এরই ফলস্বরূপ 'গণ আজাদী লীগ' নামে প্রগতিবাদীধর্মী একটি সংগঠন গড়ে ওঠে। ১৯৪৭ সালের ৩ জুন মাউন্ট ব্যাটেনের রোয়েদাদ ঘোষণার মধ্য দিয়ে মুসলীগ লীগের ভিতরে প্রগতিবাদী পক্ষ অর্থাৎ বামপন্থীরা 'গণ আজাদী লীগ' গঠন করেন। একদিকে পাকিস্তান গড়ে তোলার তীব্র সংগ্রামে যেমন মুসলিম লীগ মরিয়া, তাদের সাথে যুগপৎ কাজ করে যাচ্ছিল জামায়াতে ইসলামী। যদিও আবুল আলা মওদুদীর মতবাদ নিয়ে মুসলিগ লীগে তুমুল মতানৈক্য ছিল। ইসলাম প্রতিষ্ঠার ভাবধারায় চলন-বলনই ছিল জামায়াতে ইসলামীর মূল লক্ষ্য।



অপরদিকে বাম শক্তি অর্থাৎ কমিউনিস্ট পার্টির নেতা-কর্মীদের শোষণবিরোধী ও মানবমুক্তির আন্দোলন তীব্র হতে থাকে। ব্রিটিশ জমিদারদের অন্যায়-নির্যাতন, সম্পদ শোষণ এ সব কিছুর আয়োজন নিয়ে কৃষক জনতার মাঝে ক্ষোভ-অসন্তোষ বেড়ে উঠতে থাকে। আর মুসলিম লীগে অবস্থান নেয়া ধনী বুর্জোয়া শ্রেণি কৃষকদের মোড়কে কাজে লাগিয়ে পাকিস্তান গড়ার স্রোত নিয়ে আসতে থাকেন সমপ্রদায়গত ফর্মুলা দিয়ে। ঠিক সে মুহূর্তে জামায়াতে ইসলামী সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা পায় (১৯৮৮ সালে মুদ্রিত, যা জামায়াতে ইসলামীর বৈশিষ্ট্য পুস্তিকাতে পাওয়া যায়।)



(৪) জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী। ১৯৩২ সালে এ উপমহাদেশে ইসলামী আন্দোলন শুরু হয়েছে বলে তাদের বক্তব্য। মওদুদীর নেতৃত্বেই নাকি এ উপমহাদেশে ইসলামী আন্দোলনের প্রচলন ঘটে। খুব কৌশলে তিনি 'তারজুমানুল কুরআন' পত্রিকার মাধ্যমে সাংগঠনিক কাজ শুরু করেন। শাহওয়ালী উল্লাহ দেহলভী (রঃ)-এর চিন্তাধারার ভিত্তিতে গত শতাব্দীতে সাইয়েদ আহম্মেদ শহীদ (রঃ) ও সাইয়েদ ইসমাইল শহীদ (রঃ)-এর নেতৃত্বে পরিচালিত ইসলামী আন্দোলনটি ১৮৩১ সালে বালাকোট যুদ্ধে বিপর্যস্ত হবার পর অন্তত একশ বছর আর গড়ে উঠেনি। পরে মাওলানা মওদুদী একশ বছর পর এ আন্দোলন শুরু করেন। এক পর্যায়ে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে আদর্শ ছড়িয়ে দিয়েছিলেন।



জামায়াতে ইসলামীর প্রেসক্রিপশন পাকিস্তান আমলে কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধকরণের কাজকে ত্বরান্বিত করে। এতে করে কমিউনিস্টরা গোপনে কর্মকা- করেন। উন্মুক্তভাবে কাজকে এগিয়ে নিতে বুদ্ধিদীপ্ত, দক্ষ ও যোগ্য কমিউনিস্টরা ন্যাপ ও আওয়ামী লীগে যুক্ত হন। ফলে '৭১-এর নেতৃত্ব আওয়ামী লীগের কাছে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলে যায়।



অবিভক্ত ভারতে সুবিধাবঞ্চিতদের কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে প্রগতিবাদী সংগঠন। মুসলমান সমাজকে বাঁচানোর নামে ধর্মীয় ভাবাপন্ন সংগঠন মুসলিম লীগও গড়ে ওঠে। একদিকে বাম প্রগতিশীলদের সংগ্রাম ব্রিটিশদের শোষণ-অপশাসনের বিরুদ্ধে আর অন্যদিকে গড়ে ওঠে মধ্যবিত্ত শ্রেণির, যারা হিন্দু জমিদারদের বিরুদ্ধে একটি বলয় সৃষ্টির জন্য মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা করেন। সে সময়কালে সোভিয়েত ইউনিয়নের তাসখন্দে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে ওঠে। এ পার্টির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মানবেন্দ্র নাথ রায়। যিনি এমএন রায় নামেই সমধিক পরিচিত। তার আসল নাম ছিল নরেন্দ্র নাথ ভট্টাচার্য। ১৯২০ সালের ১৭ অক্টোবর এ পার্টি গড়ে ওঠে। কমিউনিস্ট পার্টি গঠন করার পূর্বে বাঘা যতিনের সাথে গুপ্ত সংগঠন গড়ে তোলেন এম এন রায়। মানবেন্দ্র নাথ হলো তার ছদ্মনাম।



'১৯৪৭-এর দেশভাগের পর বামপন্থী আন্দোলনে জিতেন ঘোষের ভূমিকা স্বাধীনতা আন্দোলনে অনন্য সাধারণ ভূমিকা পালন করে। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সাধনায় এবং বামপন্থীদের অদম্য কর্মকা-ে স্বাধীনতা আন্দোলনের যুগ সূচনা হয়। জিতেন ঘোষ বিক্রমপুরে কৃষকদের নিয়ে দাংগা প্রতিরোধে অংশ নেন। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে তিনি আটক হন। ১৯৬৯ সালে শেখ মুজিবুর রহমান, মনিসিংহ, মতিয়া চৌধুরীর সাথে তিনি জেল খাটেন। অবশেষে এক সাথে তিনি ছাড়া পান। মানবিক সমাজ গঠনে বঙ্গবন্ধুও মানুষের নিত্যনৈমিত্তিক সমস্যা নিয়ে আন্দোলন সংগ্রাম করেছেন এমন প্রমাণ আছে অনেক (যদিও বৈপ্লবিক ধারার কোনো দল তিনি করেননি)।



১৯৫৬ সালের একটা সময়ের কথা তুলে ধরা যাক। ১৩ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ মুখ্যমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করে খসড়া শাসনতন্ত্রে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্তির দাবি জানান। ১৪ জুলাই আওয়ামী লীগের সভায় প্রশাসনে সামরিক বাহিনীর প্রতিনিধিত্বের বিরোধিতা করে একটি সিদ্ধান্ত প্রস্তাব আকারে গৃহীত হয়। এই সিদ্ধান্তের প্রস্তাব আনেন বঙ্গবন্ধু। ৪ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে খাদ্যের দাবিতে ভুখা মিছিল বের করা হয়। চকবাজার এলাকায় পুলিশ মিছিলে গুলি চালালে ৩জন নিহত হন। ১৬ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধু কোয়ালিশন সরকারের শিল্প-বাণিজ্য, শ্রম, দুর্নীতি দমন ও ভিলেজ এইড দপ্তরের মন্ত্রীর দায়িত্ব পান।



(৫)বঙ্গবন্ধু তাঁর শত্রুর অমানবিক মুহূর্তেও মূর্ছা গিয়েছিলেন। তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে (পৃষ্ঠা ১৯৫) উল্লেখ করেন "১৯৫১ সালের অক্টোবর মাসে মওলানা ভাসানী ও আমি যখন জেলে, সেই সময় জনাব লিয়াকত আলী খানকে রাওয়ালপিন্ডিতে এক জনসভায় গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। খাজা নাজিমউদ্দিন সাহেব গভর্নর জেনারেলের পদ ছেড়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী হলেন এবং গোলাম মোহাম্মদকে অর্থমন্ত্রী থেকে গভর্নর জেনারেল করলেন। লিয়াকত আলী খান যে ষড়যন্ত্রের রাজনীতি শুরু করেছিলেন, সেই ষড়যন্ত্রেই তাকে মরতে হলো। বাকিরা যারা লিয়াকত আলী খানকে হত্যা করার পেছনে ছিল আজ পর্যন্ত তা উদ্ঘাটন হয় নাই।...যদিও তারই হুকুমে এবং নূরুল আমিন সাহেবের মেহেরবানিতে আমরা জেলে আছি, তবুও তাঁর মৃত্যুতে দুঃখ পেয়েছিলাম। কারণ ষড়যন্ত্রের রাজনীতিতে আমরা বিশ্বাস করি না।"



বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের প্রথম সোপান মুসলিম লীগ হলেও মুসলিম লীগের ধর্মনীতির আড়ালে বুর্জোয়া শ্রেণির বগলদাবা থেকে বেরিয়ে এসে 'আওয়ামী মুসলিম লীগ' গঠনে কাজ করেন। পাকিস্তান জন্মের দু'বছর পর 'আওয়ামী মুসলিম লীগ' প্রতিষ্ঠিত হয়। আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাকাল থেকে অবদান রাখেন মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শামসুল হক ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। রাজনীতির এ প্রাণপুরুষগণ ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের দায়িত্বে। প্রতিষ্ঠার শুরুতে এ দলের সভাপতি ছিলেন মাওলানা ভাসানী ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন শামসুল হক। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশেমের নেতৃত্বাধীন বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সম্মেলন ১৯৪৯ সালে অনুষ্ঠিত হয়। ওই সম্মেলনের মধ্য দিয়ে এ দেশে ১৯৫৩ সালে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হয় 'আওয়ামী মুসলিম লীগ' থেকে 'মুসলিম' শব্দটি বাদ দিয়ে। মাওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কাউন্সিলে 'আওয়ামী লীগ' নাম নির্ধারণ করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল দল মত নির্বিশেষে যাতে করে সকলের মুক্তির জন্য সংগ্রাম ও সেবা করা যায়। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুনের সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, খন্দকার মোশতাক আহমদ ও এ কে রফিকুল হোসেনকে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক করা হয়। ১৯৫৫ সালে পররাষ্ট্র নীতির বিষয়ে মতপার্থক্য দেখা দেয়। সে কারণে মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) নামে আরেকটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করা হয়। বঙ্গবন্ধু ১৯৫৬ সালে খসড়া শাসনতন্ত্রে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের বিষয়টি উল্লেখ করেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর নিকট, পাশাপাশি একই বছরের ১৪ জুলাই সামরিক বাহিনীর বিরোধিতা করেন। ৪ সেপ্টেম্বর ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে খাদ্যের দাবিতে ভুখা মিছিল বের করেন। ১৯৫৮ সালে প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দর মির্জা ও সামরিক বাহিনীর প্রধান জেনারেল আইয়ুব খান রাজনীতি নিষিদ্ধ করলে শেখ মুজিব গ্রেফতার হন। ১৪ মাস জেল খেটে ১৯৬০ সালে 'স্বাধীন বাংলার বিপ্লবী পরিষদ' নামে একটি গোপন সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। পরে প্রতি মহকুমা ও থানায় 'নিউক্লিয়াস' গঠন করেন। ১৯৬২ সালের ২ জুন বঙ্গবন্ধু জননিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার হন। পরে ১৮ জুন মুক্তি পান। ৫ জুলাই পল্টন ময়দানে জনসভা করেন এবং আইয়ুব সরকারের বিরোধিতা করে বক্তৃতা দেন। এক পর্যায়ে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে 'জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট' গঠন করেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ১৯৬৩ সালের ৫ ডিসেম্বর বৈরুতে মৃত্যুবরণ করেন। ১১ মার্চ সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন করেন। দাঙ্গা বিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলেন। পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবকে দাবিয়ে রাখতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ১৪ দিন পূর্বে গ্রেফতার করে। ১৯৬৫ সালে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলায় আবার গ্রেফতার করে। এক বছর জেল খেটে ১৯৬৬ সালে তিনি ঐতিহাসিক ৬ দফা উত্থাপন করেন, যা মুক্তি সনদ হিসেবে আখ্যায়িত। ১ মার্চ বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৬৬ সালে নারায়ণগঞ্জের পাটকল শ্রমিকদের জনসভা শেষে তিনি গ্রেফতার হন। এর প্রতিবাদে ধর্মঘট হলে পাকিস্তান সরকারের পুলিশের গুলিতে ১১ জন শ্রমিক নিহত হন।



১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় মুক্তির পর ২৩ ফেব্রুয়ারি 'ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ' সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রায় ১০ লাখ ছাত্র জনতার উপস্থিতিতে 'বঙ্গবন্ধু' উপাধিতে ভূষিত করেন। বঙ্গবন্ধু ছাত্র সমাজের ১১ দফা দাবিকে সমর্থন জানান। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৭০ সালের নির্বাচন চলে আসে। আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসন পায়। ৩০০টি আসনের মধ্যে প্রাদেশিক পরিষদে পায় ২৮৮টি। মুক্তিসংগ্রামকে আরো সুদৃঢ় করার মূল পথ তীব্র হয়ে গেল। স্বাধীনতা আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার প্রধান আস্থা ও বিশ্বাস জনমনে সৃষ্টি হয়ে গেল।



১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগের বিপরীতে ৩০৯টির মধ্যে যুক্তফ্রন্ট পায় ২২৩টি আসন। ভাসানীর নেতৃত্বে আওয়ামী মুসলিম লীগ পায় ১৪৩টি আসন।



(৬) আন্দোলন-সংগ্রামে কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে যাত্রা শুরু করলেও ভোটের রাজনীতিতে সর্বদাই ব্যর্থতায় মজে যায়। কমরেড মনিসিং, বারীন দত্ত (আব্দুস সালাম হলো তাঁর ছদ্ম নাম)-এর মতো বাঘা বাঘা নেতাদের ত্যাগ তিতিক্ষার মূল্যায়ন জনগণ দিতে পারেনি এবং এখন পর্যন্তও না। নিরীক্ষণে উঠে আসে কমিউনিস্ট পার্টির উপর রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞা, ধর্মীয় অপবাদ ও অপরাপর দলগুলোর ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নির্ভরতাই প্রধান কারণ বলে বিশ্লেষক মহলে আলোচিত। কমিউনিস্ট পার্টি ব্যতিরেকে সব দলই কম-বেশি ধর্মচর্চা রাজনীতিতে নিয়ে আসায় মানুষের মননজগৎ ধর্মীয় নীতির আদলে নিবিষ্ট থাকতে হয়েছে। প্রসঙ্গক্রমে উদাহরণ দিতে হয়, লেডী ব্রেবোর্ন কলেজের প্রকাশনায় ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ইশিতা চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন যে, "পর্দাপ্রথা, মুসলিম নারীদের অন্যান্য ধর্মমতের নারীদের থেকে আরও বেশি পিছিয়ে দিয়েছিল, সেই পর্দাকে স্বীকৃতিস্বরূপ 'পর্দা কলেজ' নামকরণের কারণ ছিল মুসলিম নারীদের শিক্ষাক্ষেত্রে এগিয়ে নেয়া।" পর্দা কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন কৃষক শ্রমিক প্রজাপার্টির সভাপতি একে ফজলুল হক। পরে এটা ব্রেবোর্ন কলেজ নামে প্রতিষ্ঠিত হয়। সে সময়ের ব্রিটিশ গভর্নর ছিলেন লর্ড ব্রেবোর্ন। তার স্ত্রী লেডিডোরিন ব্রাউন ব্রোবোর্নের নামে 'লেডি ব্রেবোর্ন' কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়।



যেহেতু একদিকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে সবসময় বামপন্থীরা সোচ্চার ছিলেন, তেমনি অজ্ঞতা, কুসংস্কার ও প্রথা বিরোধিতায় ছিল সচেষ্ট। পাশাপাশি মুসলমান সমপ্রদায়কে কাজে লাগিয়ে ব্রিটিশ অনুগত হিন্দু জমিদারদের বিরুদ্ধে মুসলিম লীগ ছিল তুমুল সোচ্চার। শুধু তাই নয়, কমিউনিস্টরা জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য ব্রিটিশবিরোধী অবিরত আন্দোলন-বিক্ষোভ চালালে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য কোণঠাসা হয়ে পড়ে। রাজনীতিতে যেহেতু কমিউনিস্টরা নিষিদ্ধ, সেহেতু মুসলিম লীগ, আওয়ামী মুসলিম লীগ, কৃষক শ্রমিক প্রজা পার্টি, আওয়ামী লীগসহ অপরাপর দলগুলোর জনগণের সাথে নিবিড় যোগাযোগ হেতু তারা সুফল বেশি পেয়েছে। বঙ্গবন্ধু মুসলিম লীগ দিয়ে শুরু করলেও রাজনৈতিক শিক্ষা ও চর্চার মধ্য দিয়ে নিজের প্রজ্ঞায় প্রগতি ধারার রাজনীতিতে অগ্রসর হয়েছেন। পাকিস্তানীদের ধর্মীয় অনুশাসন প্রক্রিয়ার আদলে শোষণযন্ত্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন। এতে করে বামপন্থী প্রগতিধারার শিবিরের সাথে যোগসূত্রতা স্থাপন করে '৬৬'র ছয় দফা, '৬৯'র গণঅভ্যুত্থান ও পরে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের দিকে ধাবিত হন।



বঙ্গবন্ধুর দলীয় রাজনীতি যেমন শ্রেণি চেতনার ছিল না এবং বহু শ্রেণির সমন্বয়ে দলীয় রাজনীতিতে ছিলেন, যে কারণে বঙ্গবন্ধু প্রগতির চেতনা পোষণ করায় ধর্মীয় অপবাদ তাকে আচ্ছন্ন করতে পারেনি বলেই আপামর জনসাধারণ তাকে লুফে নিয়েছিল। তাঁর ডাকে সাড়া দিয়েছিল। '৭১-এর শেষ সোপানে মানুষের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে পেঁৗছে দিতে পেরেছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাদের দল আওয়ামী লীগের ছিল সকল শ্রেণির মানুষের সাথে যোগাযোগ। আর এদিকে কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের ছিল শ্রেণি চেতনাবোধ, শোষক-শোষিতের পার্থক্য নিরূপণের জ্ঞান ও বলিষ্ঠতা। এ দুটো বিষয়ের সমন্বয়ে দেশ স্বাধীনতার দিকে চলে যায়। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুর ছয়দফার আবেদন ছাড়িয়েও মানুষ স্বাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙ্গে পুরো স্বাধীন হয়ে একটি ভূখ-ের জন্য প্রস্তুুত হয়ে যান। ১৯৬৯ সালের ছাত্র সমাজের সেই এগারো দফাই ছিল মুক্তিযুদ্ধের আরেকটা ফটক। যদিও আলাদা রাষ্ট্র চাওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট না হলেও ১১ দফার সবগুলো দাবিপূরণ সাপেক্ষে সম্পূর্ণ স্বাধীন রাষ্ট্রের ফলাফল ভোগ করারই ইঙ্গিত বহন করে। বিশেষ করে হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশনে ছাত্রদের জ্বলে উঠার একটি উপাদান। তিনি নেতা-কর্মীদের খোঁজ খবর রাখতেন সবসময়। তোফায়েল আহম্মেদের 'আমার মা' প্রবন্ধ পাঠ করলে তা স্পষ্ট হওয়া যাবে।



বঙ্গবন্ধু তার আচরণ সামাজিকীকরণ করা সত্ত্বেও সমাজের একদল বিপথগামী তাঁর আস্থা ও বিশ্বাসকে কুঠারাঘাত করেছে। বঙ্গবন্ধুকে ব্র্যাকেটবন্দী করে রাখা হয়েছে। সকলের শ্লোাগান 'জয় বাংলা'কেও তা-ই করা হয়েছে। এ দুটো শব্দ সকলের, কোনো গোষ্ঠীর একার নয়। বঙ্গবন্ধু ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনকে আরও সুসংহত করতে স্বাধীনতা যুদ্ধকালে আওয়ামী লীগ ও বামপন্থী দলগুলোর সমন্বয়ে ১৯৭১ সালে অস্থায়ী সরকার প্রতিষ্ঠা করেন। এ সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির তৎকালীন সভাপতি কমরেড মনিসিং ও ন্যাপের সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহম্মেদ। এই ঐক্যকে আরও দূরে এগিয়ে নিতে আওয়ামী লীগ, কমিউনিস্ট পার্টি ও ন্যাপের সমন্বয়ে স্বাধীনতার পর বাকশাল প্রতিষ্ঠিত হয়। যদিও বাম ঘরানার বিশ্লেষকগণ বর্তমানে এ ঐক্যকে সময় বিবেচনায় হয় না বলে আখ্যায়িত করেন। এখানে মানুষের চিন্তা ও চাহিদাকে বিবেচনায় এনে এ কাজটি করা হয়নি বলে ব্যাখ্যা দেন। যাই হোক, রাষ্ট্রের অস্থিমজ্জা প্রধানব্যক্তি ও হৃৎপি- স্বরূপ বঙ্গবন্ধুর মতো মহান ব্যক্তিকে '৭৫-এর ১৫ আগস্ট সপরিবারে হত্যা করা হয়। অবশেষে অমানবিককূপ প্রতিষ্ঠা পায়। স্বাধীনতোত্তর শত্রুরা ক্ষমতায় আসে। সে থেকে '৭২-এর মূলনীতি গণতন্ত্র, ধর্ম নিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদ_এ চারনীতি ভূলুণ্ঠিত। কেউই এর মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করছে না এবং প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা-প্রচেষ্টা আমরা দেখছি না। ক্ষমতায় থাকতে কিংবা যেতে এবং পাকাপোক্ত করতে পুঁজিবাদ থেকে লুটেরা পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও সামপ্রদায়িকতার মতো উল্টো চারনীতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে । এর তোষণ-পোষণ করে কোনোমতে টিকে থাকা যেনো প্রধান প্রয়াস হয়ে দেখা দিয়েছে।



অবশেষে বলতে দ্বিধা হচ্ছে না যে, মুক্তিযুদ্ধপূর্ব আওয়ামী লীগের চরিত্র আর এখনকার চরিত্র এক নয়। ফ্যাকাশে বটে। যে কোনো দলেই গণতন্ত্র কেন্দ্রিকতার বিপরীতে খোদ দলের মধ্যে কেন্দ্রিকতা থাকাতে দল এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় একঘেঁয়েমি ও স্বৈরতন্ত্রী আচরণ প্রতিষ্ঠা পায়। এক ব্যক্তির মর্জিতেই রাষ্ট্র পরিচালিত হয়ে থাকে। সামপ্রদায়িকতার ব্যুহ থেকে আওয়ামী লীগকে বের করে আনা কঠিন। বৈতরণী পার হবার এখনই সময়। আর এখনকার আওয়ামী লীগ সেই নীতি থেকে সটকে পড়ে স্বৈরতন্ত্রী মানসিকতা, পুঁজিবাদী আখ্যানে ডুবে যাওয়া ও সামপ্রদায়িকতার বেড়াজালে আটকে যাওয়া গোটা বাঙালি জাতির জন্য অমানিশার জমিন আবাদ করারই নামান্তর। তাই বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়ন করতে ছাত্রলীগ-যুবলীগকে সামাল দিতে হবে। আর যাতে আবরার বিশ্বজিতের মতো কারো পরিণতি বহন করতে না হয়, সেটা নিবৃত্তকরণ জরুরি হয়ে পড়েছে এসব অঙ্গ সংগঠনগুলোর। তাই বলতেই হচ্ছে, অস্পষ্ট তথা ধোঁয়াশা নীতি নিয়ে আওয়ামী লীগ কেন বামপন্থীসহ কোনো দলই এগুতে পারবে না এবং লক্ষ্য উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন তাদের জন্যে সুদূরপরাহত। যা সমপ্রদায় গোষ্ঠীর প্রেসক্রিপশন বাস্তবায়নে উঠে পড়ে লাগার মতই। এতে করে সভ্যতা ও বিজ্ঞানের পথে এগুনো পুরোপুরি অসম্ভব বলেই মনে হচ্ছে। তাই সকলের ভিশন হোক মুক্তিযুদ্ধ-৭১। এ মিশনই হতে হবে সভ্যতার পথরেখা, সভ্যতার আবাহন ও সভ্যতার বিস্তীর্ণ বারিরাশি। তবেই সার্থক ও সুন্দর হয়ে উঠতে পারে আমাদের মননজগৎ ও জনপদ।



লেখক : আহ্বায়ক, চাঁদপুর লেখক পরিষদ ; সাধারণ সম্পাদক, মাধ্যমিক সহকারী শিক্ষক সমিতি, চাঁদপুর। মোবাইল ফোন : ০১৬২৭ ৮৪০৪৯৫



 



 



 


করোনা পরিস্থিতি
বাংলাদেশ বিশ্ব
আক্রান্ত ৩,৩৯,৩৩২ ২,৯২,০১,৬৮৫
সুস্থ ২,৪৩,১৫৫ ২,১০,৩৫,৯২৬
মৃত্যু ৪,৭৫৯ ৯,২৮,৬৮৬
দেশ ২১৩
সূত্র: আইইডিসিআর ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
আজকের পাঠকসংখ্যা
৬০১৬১৮
পুরোন সংখ্যা