চাঁদপুর। বুধবার ২০ এপ্রিল ২০১৬। ৭ বৈশাখ ১৪২৩। ১২ রজব ১৪৩৭
ckdf

বিজ্ঞাপন দিন

সর্বশেষ খবর :

  • --
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

২৩-সূরা মূ’মিনূন

১১৮ আয়াত, ৬ রুকু, ‘মক্কী’

পরম করুণাাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।

৪৪। অতঃপর আমি একের পর এক আমার রাসূল প্রেরণ করিয়াছি। যখনই কোন জাতির নিকট তাহার রাসূল আসিয়াছে। তখনই উহারা তাহাকে মিথ্যাবাদী বলিয়াছে। অতঃপর আমি উহাদের একের পর এককে ধ্বংস করিলাম। আমি উহাদিগকে কাহিনীর বিষয় করিয়াছি। সুতরাং ধ্বংস হউক অবিশ্বাসীরা।

দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন

 


আকারে মানুষ হলে মানুষ সে নয়, স্বভাব যাহার সৎ মানুষ সে হয়।  

- জোনায়েদ বোগদাদী।


সেই শরীর বেহেস্তে যাবে না যা হারাম জীবিকা দ্বারা পরিপুষ্টি লাভ করছে।

-হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)


ফটো গ্যালারি
৪ মুক্তিযোদ্ধাসহ উত্তরের জনপদে
কাজী শাহাদাত
২০ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


সতের



লালনের কুষ্টিয়ায়



৬ এপ্রিল ২০১৬ বুধবার সকালে নাটোর থেকে রওনা দেবার প্রাক্কালে টিআইবি কর্মকর্তা আবদুর রহমানকে জিজ্ঞেস করেছিলাম কুষ্টিয়া আসতে কতো সময় লাগতে পারে। তিনি জানান, বড় জোর দু ঘণ্টা। আমরা ৯টা ৪০ মিনিটে নাটোর ত্যাগ করি, সে হিসেবে ১১টা ৪০ মিনিটে কুষ্টিয়া পেঁৗছার কথা। কিন্তু সাড়ে ১১টাতেই আমরা কুষ্টিয়া শহরের উপকণ্ঠে পেঁৗছে যাই। এর কিছুক্ষণ আগে আমরা পদ্মা নদীর ওপর নির্মিত দৃষ্টিশোভন লালন শাহ্ সেতু অতিক্রম করি এবং একই সমান্তরালে বাংলাদেশ রেলওয়ের সবচে' প্রাচীন ও বিখ্যাত হার্ডিঞ্জ ব্রিজও প্রত্যক্ষ করি।



লালন শাহ্ সেতু অতিক্রম করা মানেই তো বিশ্বখ্যাত বাউল সাধক ফকির লালন শাহের কুষ্টিয়ায় প্রবেশের আনন্দানুভূতি অর্জন করা। আমরা শহরের উপকণ্ঠে পেঁৗছেই ভাবছিলাম, আর কতক্ষণ পর যেতে পারবো লালনের মাজার ও আখড়ায়।



যানজটের কারণে কুষ্টিয়া শহরের প্রাণকেন্দ্র মহজমপুরে পেঁৗছতে আমাদের পৌনে ১২টা বেজে গেলো। আমরা এখানে টিআইবি অফিসে ১৫ মিনিটের যাত্রা বিরতি দিলাম। ঠিক ১২টা ৩ মিনিটে আমরা কুষ্টিয়া টিআইবির এরিয়া ম্যানেজার আবদুর রহমানকে সাথে নিয়ে রওনা দিলাম কুমারখালী উপজেলার ছেউড়িয়া গ্রামে লালন শাহের আখড়াবাড়ি ও মাজারের দিকে। তবে পথে থামতে হলো কুষ্টিয়া কুঠিবাড়ি 'টেগুর লজ' দেখে।



বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতি বিজড়িত এ 'টেগুর লজ'কে পর্যটকদের জন্যে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করেছে কুষ্টিয়া পৌরসভা। লক্ষ্য করলাম, আজ থেকে ১০ বছর আগে পৌর চেয়ারম্যান আনোয়ার আলীর উদ্যোগে 'টেগুর লজ' সংস্কার ও পুনঃনির্মাণ করা হয়েছে। শ্বেত পাথরে দেখলাম এ মহতী উদ্যোগ বাস্তবায়নের পর ১৪১৩ বঙ্গাব্দের ১২ জ্যৈষ্ঠ শুভ দ্বারোদ্ঘাটন করেছেন বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. আবুল বারাকাত। গেটের সাথেই রয়েছে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত রাজিত মিত্তার প্রদত্ত রবীন্দ্রনাথের আবক্ষ ভাস্কর্য। ক্ষণিকের ভালোলাগায় ভুগলাম 'টেগুর লজ' দেখে। শিলাইদহ কুঠিবাড়িতে গিয়ে অনেক বেশি ভালো লাগার আবাহনেও তাড়িত হচ্ছিলাম আবার।



কয়েক মিনিটের মধ্যে পেঁৗছলাম ছেউড়িয়াতে। আপাত নির্জনতা এবং রোদের প্রখরতায় এখানকার উৎসব মাঠ, লালন আখড়া ও মাজারের স্থাপনাগুলো আমাদের চোখে যেনো বাড়তি ঔজ্জ্বল্য ছিটিয়ে দিচ্ছিল। আমরা আখড়া ও মাজার ছাড়াও ঘুরে ঘুরে দেখলাম লালন একাডেমী কমপ্লেঙ্, যেটি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ২০০৪ সালের ৩০ নভেম্বর উদ্বোধন করেন। লালনের মাজার সংলগ্নই এর অবস্থান। পাশেই রয়েছে লালন লোক সাহিত্য কেন্দ্র। ৫৩ বছর আগে এ কেন্দ্রটি উদ্বোধন করেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর আব্দুল মোনায়েম খান। এখানে আমরা ছোট্ট একটি মিউজিয়ামে ঢুকলাম। লালন ও তাঁর শিষ্যদের স্মৃতি বিজড়িত ও ব্যবহৃত জিনিসপত্র দেখে মাজার এলাকা থেকে বেরিয়ে পড়লাম। গেটের সম্মুখস্থ দোকানপাটে সামান্য কেনাকাটা করে আমরা শিলাইদহের পথে দ্রুত এগিয়ে চললাম।



মানবতাবাদী লালন



লালনের মাজারের আঙ্গিনায় শ্বেত পাথরে 'মানবতাবাদী লালন' শীর্ষক একটি মূল্যবান লেখা সাঁটানো আছে। গেট পেরিয়ে কেউ মূল মাজারের কাছে গেলেই চোখে পড়বে এই লেখা। সযতনে ক্যামেরায় ধারণ করেছি এই লেখা। প্রিয় পাঠক! আপনারা মনোযোগ দিয়ে নিচে পড়ুন এই লেখাটি। আমি নিশ্চিত আপনাদের অনেক ভালো লাগবে।



মহাত্মা লালন শাহ্ একাধারে একজন আধ্যাত্মিক বাউল সাধক, মানবতাবাদী, সমাজ সংস্কারক, দার্শনিক, অসংখ্য অসাধারণ গানের গীতিকার, সুরকার ও গায়ক ছিলেন। আনুমানিক ১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান বাংলাদেশে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। লালনের জন্ম কোথায় তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। লালন নিজে কখনো তা প্রকাশ করেননি। 'হিতকরী' পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ নিবন্ধে বলা হয়েছে, লালন তরুণ বয়সে একবার তীর্থভ্রমণে বের হয়ে পথিমধ্যে গুটিবসন্ত রোগে আক্রান্ত হন। তখন তার সাথীরা তাকে মৃত ভেবে পরিত্যাগ করে চলে যায়। কালিগঙ্গা নদীতে ভেসে আসা মুমূর্ষু লালনকে উদ্ধার করেন ছেউড়িয়া গ্রামের মলম ফকিরের স্ত্রী মতিজান বিবি। মলম শাহ্ ও তার স্ত্রী মতিজান তাদের বাড়িতে নিয়ে সেবা শুশ্রূষা দিয়ে সুস্থ করে তোলেন। আজীবন লালন তাঁর দীক্ষা গুরু সিরাজ সাঁইকে শ্রদ্ধা করেছেন এবং তাঁর কাছ থেকে পথ-নির্দেশনা পেয়েছেন। কুষ্টিয়াতে আখড়ায় স্থায়ী বসবাস করার এক পর্যায়ে বিশাখা নামে একজন মহিলা, বয়সে লালন অপেক্ষা অনেক ছোট, লালন ফকিরের সঙ্গে ছেউড়িয়াতে আসেন এবং সেই থেকে তিনিই আমৃত্যু লালন ফকিরকে দেখাশুনা করতেন। মলম ফকির ছেউড়িয়া গ্রামে তার যে নিজস্ব সম্পত্তি ছিল তা লালন ফকিরের নামে দান করে দেন। যা এখন লালন ফকিরের আখড়া বাড়ি ও সমাধিসৌধ এলাকা।



বাউল গানের অগ্রদূত লালন ধর্ম, বর্ণ, গোত্রসহ সকল প্রকার জাতিগত বিভেদ থেকে সরে এসে মানবতাকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছিলেন। এই মনোভাব থেকেই তিনি তাঁর গানসমূহ রচনা করেন। তাঁর গান ও দর্শন যুগে যুগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুলের মত বহু খ্যাতনামা কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিক, বুদ্ধিজীবীসহ অসংখ্য মানুষকে প্রভাবিত করেছে। লালনের গানে মানুষ ও সমাজই ছিল মুখ্য। লালন বিশ্বাস করতেন সকল মানুষের মাঝে বাস করে এক মনের মানুষ। সবকিছুর ঊধর্ে্ব মানবতাবাদকেই তিনি সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছিলেন। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, মনের মানুষ কোন ধর্ম, জাত, বর্ণ, লিঙ্গ, কুল নেই। মানুষের দৃশ্যমান শরীর এবং অদৃশ্য মনের মানুষ পরস্পর বিচ্ছিন্ন। সকল মানুষের মনে ঈশ্বর বাস করেন। লালনের এই দর্শনকে কোনো ধর্মীয় আদর্শের অন্তর্গত করা যায় না।



লালন, মানবাত্মকে বিবেচনা করেছেন রহস্যময়, অজানা এবং অস্পৃশ্য এক সত্তা রূপে।



খাঁচার ভিতর অচিন পাখি



কেমনে আসে যায়



তারে ধরতে পারলে মন বেড়ি



দিতাম পাখির পায়।



এ গানে লালন মনের অভ্যন্তরের সত্তাকে তুলনা করেছেন এমন এক পাখির সাথে, যা সহজেই খাঁচারূপী দেহের মাঝে আসা যাওয়া করে; কিন্তু তবুও একে বন্দী করে রাখা যায় না। লালন সাঁই ছিলেন উদার ও অসাম্প্রদায়িক ধর্মসাধক এবং তিনি তাঁর গানে মানবতার বাণী প্রচার করতেন। তিনি সবচেয়ে গুরুত্ব দেন দেহের ভেতরকার আত্মাকে। তাঁর মতে আত্মাকে জানলেই পরমাত্মা বা সৃষ্টিকর্তাকে জানা যায়। আত্মা দেহে বাস করে তাই বাউলেরা দেহকে পবিত্র জ্ঞান করেন। সাধারণত নিরক্ষর হলেও বাউলরা জীবনদর্শন সম্পর্কে অনেক গভীরতা প্রকাশ করেছেন। ফকির লালন তাঁর দর্শন ও মতামত বাউল গানের মধ্য দিয়ে প্রকাশ করেছেন। লালনকে বাউল দর্শন এবং গানের একজন অগ্রদূত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাংলা লোকসাহিত্যের একটি বিশেষ অংশ হিসেবে ২০০৫ সালে ইউনেস্কো বাউল গানকে বিশ্বের মৌলিক এবং দৃশ্যমান ঐতিহ্যসমূহের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ হিসেবে ঘোষণা করে। লালন কুষ্টিয়ার কুমারখালি উপজেলার ছেউড়িয়াতে একটি আখড়া তৈরি করেন, যেখানে তিনি তাঁর শিষ্যদের বাউলতত্ত্ব ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা দিতেন। তাঁর শিষ্যরা তাকে 'সাঁই' বলে সম্বোধন করতেন। তিনি প্রতি বছর ফাল্গুন মাসের দোলপূর্ণিমার সময় আখড়ায় একটি ভান্ডারা (মহোৎসব) আয়োজন করতেন। বর্তমান লালন একাডেমী, ছেউড়িয়া, কুমারখালি, কুষ্টিয়া সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসন, কুষ্টিয়ার সহযোগিতায় এই উৎসরেব আয়োজন করে থাকে।



লালনের গান লালনগীতি বা লালনসঙ্গীত হিসেবে পরিচিত। লালন তাঁর সমকালীন সমাজের নানান কুসংস্কার, সাম্প্রদায়িকতা, সামাজিক বিভেদ ইত্যাদির বিরুদ্ধে তাঁর রচিত গানে তিনি একই সাথে প্রশ্ন ও উত্তর করার একটি বিশেষ শৈলী অনুসরণ করেছেন। এছাড়া তাঁর অনেক গানে তিনি রূপকের আড়ালেও তার নানা দর্শন উপস্থাপন করেছেন। সমগ্র বিশ্বে, বিশেষ করে বাংলাদেশসহ সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে লালনের গান বেশ জনপ্রিয়। শ্রোতার পছন্দ অনুসারে বিবিসি বাংলার নির্ধারণ করা সর্বকালের সেরা ২০টি বাংলা গানের তালিকায় লালনের 'খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়' গানটি অবস্থান অন্যতম। আত্মতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব, গুরুত্বত্ত্ব বা মুর্শিদতত্ত্ব, প্রেমভক্তিতত্ত্ব, সাধনতত্ত্ব, মানুষপরমতত্ত্ব, আল্লা-নবীতত্ত্ব, কৃষ্ণ-গৌরতত্ত্ব এবং আরও বিভিন্ন বিষয়ে লালনের গান রয়েছে।



পরিশেষে বলা যায়, লালনের সময়কালে যাবতীয় নিপীড়ন, মানুষের প্রতিবাদহীনতা, ধর্মীয় গোঁড়ামি, কুসংস্কার, লোভ, আত্মকেন্দ্রিকতা সেদিনের সমাজ ও সামাজিক বিকাশের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সমাজের নানা কুসংস্কারকে তিনি তাঁর গানের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করে পরম সত্যকে উদ্ভাসনের চেষ্টা করেছেন। লালনের জীবন ও কর্মকে বাংলা ভাষাভাষী মানুষসহ বিশ্ব সমাজের কাছে উপস্থাপনের জন্য জেলা প্রশাসন, কুষ্টিয়ার সহযোগিতায় লালন একাডেমী এই মরমী সাধককে নিয়ে একটি ওয়েবসাইট চালু করেছে। ওয়েবসাইটের ঠিকানা িি.িষধষড়হধপধফবসু.ড়ৎম.নফ



কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালি উপজেলার ছেউড়িয়া গ্রামের এ মহাত্মা মরমী সাধক ফকির লালন শাহ্ ১১৬ বছর বয়সে ১ কার্তিক ১২৯৭ বঙ্গাব্দ (১৭ অক্টোবর, ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দ) ইহলোক ত্যাগ করেন।



শিলাইদহ রবীন্দ্র কুঠিবাড়ি



শিলাইদহ কুঠিবাড়ি রবীন্দ্রস্মৃতি-বিজড়িত একটি ঐতিহাসিক স্থান ও পর্যটন কেন্দ্র। বর্তমান কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালি উপজেলাধীন পদ্মার দক্ষিণ তীরে জেলা সদর থেকে পাঁচ মাইল উত্তরে গড়াই নদী পেরিয়ে এবং আরও উত্তরে পদ্মা নদীর অপর পাড়ের পাবনা শহরের বিপরীতে এর অবস্থান। বিরাহিমপুর জমিদারির সদর কাচারি ও জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের ঐতিহাসিক কুঠিবাড়ির জন্যও শিলাইদহ বিখ্যাত।



শিলাইদহ নামটি আধুনিক, আগে এ স্থানটি খোরশেদপুর নামে পরিচিত ছিল। ঊনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার এই গ্রামটি কিনে নেওয়ার আগে এখানে একটি নীলকুঠি ছিল। শেলী নামের একজন নীলকর এটি নির্মাণ করেছিলেন বলে জানা যায়। গড়াই এবং পদ্মা নদীর মিলিত প্রবাহের ফলে সৃষ্ট গভীর একটি 'দহ' (ঘূর্ণিস্রোত) থেকে গ্রামটি শেলীদহ নামে পরিচিতি লাভ করেছিল। কালক্রমে তা শিলাইদহ-এ পরিণত হয়। ১৮০৭ সালে রামলোচন ঠাকুরের উইলসূত্রে রবীন্দ্রনাথের পিতামহ দ্বারকানাথ ঠাকুর এ জমিদারির মালিক হন। রবীন্দ্রনাথ জমিদারি দেখাশোনার দায়িত্ব নিয়ে প্রথম শিলাইদহে আসেন ১৮৮৯ সালের নভেম্বর মাসে।



জমিদারির দেখাশোনা করতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কৈশোরে এবং তার পরবর্তীকালেও মাঝে মাঝে এখানে আসতেন এবং এই কুঠিবাড়িতেই থাকতেন। তবে পরবর্তীকালে বন্যার সময় পদ্মার ভাঙ্গনে পুরানো কুঠিবাড়ির নিকটবর্তী এলাকা পর্যন্ত বিলীন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে এই পুরানো কুঠিবাড়িটি ভেঙ্গে ফেলা হয় এবং পুরানো ভবন সামগ্রী দিয়েই নতুন কুঠিবাড়িটি নির্মাণ করা হয়। ১৮৯১ থেকে ১৯০১ সালের মধ্যে এক দশকেরও বেশি সময় রবীন্দ্রনাথ অনিয়মিত বিরতিতে এখানে অবস্থান করেছেন।



তাঁর অবস্থানকালে নানা উপলক্ষে এখানে এসেছেন স্যার জগদীশচন্দ্র বসু (আচার্য), দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, প্রমথ চৌধুরী, মোহিতলাল মজুমদার, লোকেন্দ্রনাথ পালিত প্রমুখ তৎকালীন বঙ্গের খ্যাতনামা বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবী। এই কুঠিবাড়ি ও পদ্মা বোটে বসে রচিত হয় রবীন্দ্রসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফসল সোনার তরী, চিত্রা, চৈতালী, কথা ও কাহিনী, ক্ষণিকা, নৈবেদ্য ও খেয়ার অধিকাংশ কবিতা, পদ্মাপর্বের গল্প, নাটক, উপন্যাস, পত্রাবলী এবং গীতাঞ্জলি ও গীতিমাল্যের গান। এখানে বসেই কবি ১৯১২ সালে গীতাঞ্জলি কাব্যের ইংরেজি অনুবাদ শুরু করেন, যা তাঁকে ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কারের সম্মান এনে দেয়। শিলাইদহ ও পদ্মার প্রতি রবীন্দ্রনাথের ছিল গভীর অনুরাগ, ছিন্নপত্রাবলীতে এর পরিচয় আছে। কবি একটি চিঠিতে লিখেছেন : 'আমার যৌবন ও প্রৌঢ় বয়সের সাহিত্যরস-সাধনার তীর্থস্থান ছিল পদ্মা-প্রবাহচুম্বিত শিলাইদহ পল্লীতে।'



শিলাইদহ কুঠিবাড়ি আম, কাঁঠাল ও অন্যান্য চিরসবুজ বৃক্ষের বাগান, একটি পুষ্পোদ্যান এবং দুটি পুকুরসহ প্রায় ১১ একর মনোরম এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। শিলাইদহে রয়েছে গ্রামীণ পরিবেশ আর মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। কুঠিবাড়ি ভবনটি একটি বেষ্টনী প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। দক্ষিণ দিকে অবস্থিত একটি সাধারণ অথচ আকর্ষণীয় প্রবেশ তোরণ পেরিয়ে এতে প্রবেশ করা যায়। নিচতলা ও দোতলায় বিশাল কেন্দ্রীয় হলকক্ষসহ এতে বিভিন্ন আকারের মোট ১৫টি কক্ষ রয়েছে। নিচতলা ও দোতলার উন্মুক্ত ব্যালকনিগুলি রাণীগঞ্জ টালি দিয়ে তৈরি ঢালু ছাদ দ্বারা আংশিক আচ্ছাদিত। নিচতলার উপরের মধ্যবর্তী অংশে রয়েছে ত্রিকোণ প্রান্ত বিশিষ্ট একটি ঢালু ছাদ। দোতলার ওপরের পিরামিড আকৃতির ছাদ ভবনটিকে আরও বৈচিত্র্য এনে দিয়েছে। বর্তমানে শিলাইদহ কুঠিবাড়ি সংরক্ষিত একটি জাতীয় ইমারত। সরকারি উদ্যোগে এখানে 'ঠাকুর স্মৃতি জাদুঘর' প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।



শিলাইদহেই রবীন্দ্রনাথ প্রথম গ্রামোন্নয়ন ও আধুনিক পদ্ধতির চাষাবাদ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন, পরে পতিসরে তিনি যার বাস্তব রূপ দেন। তিনি শিলাইদহে পুত্রবধূ প্রতিমা দেবীর নামে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও স্থাপন করেছিলেন।



শিলাইদহের এই কুঠিবাড়ি এখন রবীন্দ্রভক্তদের তীর্থস্থানস্বরূপ। এখানে প্রতি বছর ২৫শে বৈশাখ জাতীয় পর্যায়ে কবিগুরুর জন্মবার্ষিকী পালিত হয়। ২২শে শ্রাবণ কবির মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষেও এখানে অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। এসব অনুষ্ঠানে দেশী-বিদেশী অনেক প-িত ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথের জীবন ও কর্মভিত্তিক আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন। আলোচনাশেষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট শিল্পীরা রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশন করেন।



বাংলাপিডিয়া থেকে প্রাপ্ত প্রাগুক্ত তথ্যের বাস্তব রূপ আমরা ৬ এপ্রিল ২০১৬ রৌদ্রতপ্ত দুপুরে শিলাইদহ রবীন্দ্র কুঠিবাড়িতে গিয়ে পেয়েছি। গেল ২০১৫ সালের ০৬ জুন আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যৌথভাবে এই কুঠিবাড়ির সম্প্রসারিত উন্নয়ন কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। এর ফলে এ কুঠিবাড়িটি এমন ঝকঝকে তকতকে। বেষ্টনী প্রাচীরের বাইরে দেখলাম সংস্কৃতি মন্ত্রাণালয়ের অধীনস্থ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কাস্টোডিয়ানের কার্যালয়, উন্নত মানের রেস্ট হাউস সহ আরো কিছু স্থাপনা।



জাদুঘরের সামনে দেখলাম কুমারখালি উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্থাপিত একটি স্তম্ভে তিনটি ফলক। মাঝখানের ফলকটিতে কুমারখালি উপজেলার প্রসিদ্ধি নিয়ে লিখা হয়েছে, যা আমাদের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। পরবর্তী প্রসঙ্গ সে আলোকেই।



 



ধন্য কুমারখালি



অনেক দর্শনীয়, ঐতিহাসিক স্থান ও ব্যক্তিত্বকে নিয়ে কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালি উপজেলা ধন্য। পদ্মা ও গড়াই নদীর প্রবাহ চুম্বিত কুমারখালি উপজেলা ১১টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত। পশ্চিমে কুষ্টিয়া সদর, পূর্বে পাংশা উপজেলা, রাজবাড়ী জেলা, উত্তরে পাবনা সদর ও দক্ষিণে শৈলকূপা উপজেলা অবস্থিত। ১৮৮৭ সালে কুমারখালি, খোক্সা ও বালিয়াকান্দি নিয়ে কুমারখালিতে মহকুমা প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি ছিলো পাবনা জেলার অন্তর্ভুক্ত মহকুমা। ১৮৬৯ সালে কুমারখালি পৌরসভা গঠিত হয়। ১৮৭১ সালে কুমারখালি নদীয়া জেলার অন্তর্ভুক্ত হয় এবং মহকুমার মর্যাদা হারিয়ে ফেলে। কিন্তু হারায়নি স্বীয় প্রসিদ্ধি এবং গৌরব করার মতো বিষয়গুলো।



এই কুমারখালির শিলাইদহে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ি, ছেউড়িয়ার বাউল সম্রাট লালন শাহের মাজার, লাহিনীপাড়ায় 'বিষাদ সিন্ধু' খ্যাত কালজয়ী সাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেনের বাস্তুভিটা, কুমারখালিতে গ্রামীণ সাংবাদিকতার পথিকৎ কাঙালি হরিনাথ মজুমদারের বাস্তুভিটা, বিপ্লবী বাঘা যতিন, রায় বাহাদুর জলধর সেন, সাধক শীবচন্দ্র ও ওহাবী আন্দোলনের অন্যতম নেতা মিয়াজান কাজীর জন্মস্থান, কয়াতে সাহিত্যিক আকবর হোসেনের জন্মস্থান এবং সুলতানপুর কয়াতে কৃষক প্রজাতন্ত্র আন্দোলনের নেতা ও অবিভক্ত বাংলার মন্ত্রী মৌলভী শামছউদ্দিন আহম্মদের বাস্তুভিটা।



বাংলাদেশে কুমারখালির মতো এতোটা ধন্য ও প্রসিদ্ধ আর কতোটি উপজেলা আছে সেটা জানার আগ্রহ নিয়ে আমরা দুপুরের খাবারের কথা ভুলে গিয়ে পাড়ি জমালাম আরেকটি বিখ্যাত উপজেলায়, যার নাম মুজিবনগর।



মুজিবনগর থেকে চাঁদপুরে



মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথতলাই হচ্ছে আজকের মুজিবনগর। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামেই এ নামকরণ করা হয়। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার পর ১০ এপ্রিল মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্যে মুজিবনগরে বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠিত হয় এবং এখানেই ১৭ এপ্রিল উক্ত সরকার শপথগ্রহণ করে। এ সরকারের কর্মকা- বাংলাদেশ ভূখ-ের বাইরে থেকে পরিচালিত হয়েছিল বলে এ সরকার প্রবাসী মুজিবনগর সরকার হিসেবেও খ্যাত। মুক্তাঞ্চল ছিলো বলেই এখানে চলে এই সরকারের কার্যক্রম।



রংপুরে ৩ এপ্রিল ২০১৬ রোববার ভোরে নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার নামে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে চাঁদপুরের ৪ মুক্তিযোদ্ধাসহ আমরা ৬ জন উত্তরবঙ্গ ভ্রমণ শুরু করি। আর ৪র্থ দিন ৬ এপ্রিল ২০১৬ বুধবার বিকেলে মুক্তিযোদ্ধাদের অত্যন্ত আবেগের জায়গা মুজিবনগরে এসে তা' শেষ করি।



আমরা মুজিবনগর থেকে সূর্যাস্তের পূর্বে রওনা দিয়ে কুষ্টিয়া, রাজবাড়ি, ফরিদপুর পাড়ি দিয়ে মাদারীপুর হয়ে শরীয়তপুরের নরসিংহপুর (ঈদগাহ) ফেরিঘাটে পেঁৗছি। রাত আড়াইটায় ছাড়ে ছাড়ে অবস্থায় 'কামিনী' ফেরিতে উঠে চাঁদপুরের হরিণাঘাট অভিমুখে রওনা দেই। দু ঘণ্টা পর ভোর সাড়ে ৪টায় হরিণা ঘাট থেকে হেঁটে হেঁটে যখন হাইমচর-চাঁদপুর রাস্তায় পেঁৗছি, তখন শোনা যাচ্ছিল ফজরের আজান।



সাথে সাথে পাওয়া গেলো একটি সিএনজি স্কুটার। আমি, মুক্তিযোদ্ধা হানিফ পাটোয়ারী, অজিত সাহা, ছানাউল্লাহ খান ও বাসুদের মজুমদারের ওই স্কুটারে ঠাঁই হলেও আমাদের কনিষ্ঠ ভ্রমণসঙ্গী চৌধুরী ইয়াসিন ইকরামের হয়নি। তবুও মুখে ছিলো তার নিখাদ হাসি। এ হাসি উপভোগ করে রওনা দিলাম চাঁদপুর শহরে এবং শহরের বিভিন্ন গন্তব্যে একে একে নেমে পড়লাম। প্রত্যেকের চোখে মুখে ছিলো সন্তুষ্টির উজ্জ্বল আভা। বিদায়কালে বাসুদেব মজুমদার বল্লেন, আমাদের ৬ জনের পুনর্মিলনী হবে ১৩ এপ্রিল সন্ধ্যায় আমার মেথা রোডের বাসায়। সবাই অবশ্যই আসবেন। এক সঙ্গে বসে একটু নিরামিষ ও ডাল-ভাত খাবো। আমরা কেউই এমন নিমন্ত্রণে আর 'না' করতে পারলাম না। (সমাপ্ত)



 


এই পাতার আরো খবর -
    আজকের পাঠকসংখ্যা
    ২৭৫১৯২
    পুরোন সংখ্যা