চাঁদপুর, বুধবার, ৩০ নভেম্বর ২০২২, ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪  |   ২৫ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতি শিক্ষা স্বাস্থ্য সারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   সেতু নির্মাণ হলে ঢাকা -চাঁদপুর সদরের দূরত্ব কমবে ৫২ কিলোমিটার
  •   মেঘনায় ট্রলারের ধাক্কায় জেলে নিখোঁজ
  •   নৌ-ধর্মঘট প্রত্যাহার, সকাল থেকে লঞ্চ চলাচল শুরু
  •   মতলব উত্তরে আবারও সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৩
  •   কবরবাসী ইব্রাহিম এসএসসি‘তে পেয়েছে “এ“

প্রকাশ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০০:০০

দৃষ্টান্ত স্থাপন করা সফল উদ্যোক্তা হাবিবুর রহমান পাটওয়ারীর গল্প

একজন আদর্শ খামারী থেকে ৪০ জন খামারীর পরামর্শদাতা ॥ তার মতে, প্রণোদনা না থাকলে তরুণ উদ্যোক্তারা হারিয়ে যাবে

দৃষ্টান্ত স্থাপন করা সফল উদ্যোক্তা হাবিবুর রহমান পাটওয়ারীর গল্প
মোঃ আবদুর রহমান গাজী ॥

খাদ্যের দাম বেড়েছে। সময়ের সাথে ব্যবসা করা কঠিন। কোম্পানির ইচ্ছে মতো মুরগি ও খাদ্যের দাম বাড়ায় । এ ব্যাপারে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কোনো তদারকি নেই। বাণিজ্যের দিক থেকে গার্মেন্টস শিল্প প্রথম স্তরের, আর দ্বিতীয় হলো পোল্ট্রি শিল্প। দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে পোল্ট্রি শিল্পের প্রতি সরকারের নজরদারি জরুরি। বাজারে যে পরিমাণ মাংসের চাহিদা মিটাচ্ছে পোল্ট্রি শিল্প, সেটা অন্য কোনো উপায়ে মিটানো সম্ভব নয়। পোল্ট্রি শিল্পে খামারীদের জন্য সরকারের কাছ থেকে কোনো প্রণোদনা নেই। প্রণোদনা না থাকলে তরুণ উদ্যোক্তারা হারিয়ে যাবে। বেড়ে যাবে বেকারত্বের সংখ্যা। পোল্ট্রি শিল্পে মাংস উৎপাদনে ধস নেমে আসবে বলে সফল উদ্যোক্তা মোঃ হাবিবুর রহমান পাটওয়ারী মনে করেন।

সাধারণ মানুষের অসাধারণ হয়ে ওঠার পথের বাঁকে থাকে ছোট ছোট অনেক গল্প। যে গল্প বিশ্বাসের, যে গল্প পরিশ্রমের, যে গল্প ধৈর্য ধারণের, যে গল্প সাহসিকতার। ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন নিয়ে শুরু হয় পথচলা। নানা বাধা আসে চলার পথে। ঝুঁকি সামলে নিতে না নিতে আবার ঝুঁকি আসে। পথ চলতে গিয়ে থেমে যাওয়া মানে তো সব কিছু শেষ হয়ে যাওয়া নয়। আত্মবিশ্বাসকে পুঁজি করে আবার উঠে দাঁড়াতে হয়। সাফল্য তাদের কাছেই ধরা দেয় যারা থেমে গিয়েও পথের শেষ দেখতে এগিয়ে যায়। তেমনিই একজন পাটওয়ারী এগ্রো লেয়ার ফার্ম, পাটওয়ারী এগ্রো পোল্ট্রি ফার্ম ও মেসার্স হুমায়রা এন্টারপ্রাইজের প্রতিষ্ঠাতা মোঃ হাবিবুর রহমান।

চাঁদপুর সদর উপজেলার বাগাদী ইউনিয়নের ছোবানপুর এক নিভৃত গ্রাম। ওই গ্রামের মোঃ বশির উল্লাহ পাটওয়ারী ও লিলুফা বেগমের ছোট ছেলে মোঃ হাবিবুর রহমান পাটওয়ারী। ৪ ভাই, ১ বোন। হাবিবের স্ত্রী খাদিজা আক্তার ইতি। তার বড় ছেলে ইমরান রহমান (১০) ৩য় শ্রেণিতে পড়ে। বড় মেয়ে হুমায়রা রহমান (৪) আর ছোট মেয়ে হুজাইফা রহমান (১৮ মাস)। এ গ্রামে সহজ সরলভাবে বেড়ে ওঠা হাবিবের। ২৮ বছর বয়সী দৃষ্টান্ত স্থাপন করা সফল উদ্যোক্তা মোঃ হাবিবুর রহমান পাটওয়ারীর গল্প শুনতে মুখোমুখি হয়েছেন এই প্রতিবেদক (দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠের মাসিক আয়োজন কৃষিকণ্ঠের বিভাগীয় সম্পাদক মোঃ আবদুর রহমান গাজী)।

হাবিবের ছোটবেলার ছোট স্বপ্ন ছিলো তার নিজের টাকায় স্বাবলম্বী হওয়া। যদিও সে স্বপ্নের পিছু ছুটে মাঝপথে স্বপ্নটাকে হারিয়ে ফেলেন। বাগাদী আহমদিয়া ফাযিল মাদ্রাসায় পড়াশোনা অবস্থায় তার স্বপ্ন ছিলো, কিছু একটা কর্ম শুরু করবেন।

২০১০ সালে ৫০০ ব্রয়লার মুরগি দিয়ে হাবিব শুরু করেন ‘পাটওয়ারী এগ্রো পল্ট্রি ফার্ম’। তার পাশাপাশি ওই বছরই মেসার্স হুমায়রা এন্টারপ্রাইজ নামে মাছ ও মুরগি খাদ্যের দোকান শুরু করেন। দুর্দান্ত সাহসিকতায় এগুতে থাকেন। কয়েক বছরের মধ্যেই ব্যবসায় লোকসান হয়। আবার ঘুরে দাঁডান। কিছুটা হলেও ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হন। তাই সাহস বাড়ে। ব্রয়লার মুরগি পালনে অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়। উদ্যোক্তা হবার স্বপ্ন আবারও পেয়ে বসলো তাকে। পূর্বের ক্ষতি ভুলে যেতে না যেতে আবারও ঝুঁকি নিলেন। শুরু হলো নতুন ভাবে। ব্রয়লার সেট বাড়িয়ে হলো ২ হাজার। এভাবেই বৃদ্ধি করতে করতে এখন তিনি পালন করছেন ২৫ হাজার ব্রয়লার মুরগি। ২০২০ সালে তার ফার্মে লোড শেডিংয়ের কারণে প্রায় ৩ হাজার মুরগি মারা যায়। যে মুরগির প্রতিটির ওজন ছিল ১২০০ থেকে ১৬০০ গ্রামের। লাভ-লস মিলিয়ে হাবিবুর রহমানের এ ব্যবসা এক যুগ পার হয়েছে। তার দেখাদেখি ওই ইউনিয়নে ৪০টি পোল্ট্রি ফার্ম হয়েছে। একজন আদর্শ খামারী থেকে ৪০জন খামারীর পরামর্শদাতা এখন তিনি। ওই ফার্মগুলোতে ১ দিনের বাচ্চা সহ খাবার ডেলিভারী দিচ্ছেন তিনিই।

১ লাখ ২০ হাজার টাকা খরচ করে ব্রয়লার মুরগির খামার গড়ে তোলেন বাবার বসত ভিটায়। প্রথম ২ বছর লাভ হলেও পরের বছর লোকসান হয় তার। ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় পরের বছরও মুরগি পালন করেন তিনি। কিন্তু কিছুতেই লাভের মুখ দেখতে পারছিলেন না। খুচরা বাজারে দাম থাকলেও মধ্যস্বত্বভোগীর কারণে একের পর এক লোকসান গুণতে হয় তাকে। হাবিব বলেন, বর্তমানে শ্রমণ্ডঅর্থ দুটিতেই লোকসান খামারিদের। আর লাভ দালাল ও খুচরা বিক্রেতাদের। এক বছরের ব্যবধানে প্রতি বস্তা ফিডে ৮৫০-৯৫০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু পাইকারী বাজারে দুই মাসের ব্যবধানে জাতভেদে মুরগির দাম কেজিতে কমেছে ৭০-৮০ টাকা। উৎপাদিত খরচের চেয়ে কেজিতে ২৭-৩০ টাকা কম দরে বিক্রি করতে হয়েছে। এবারেই দুই হাজার ব্রয়লার মুরগিতে তার ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা লোকসান দিতে হয়েছে।

এক কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রয়ের উপযোগী হয় ৩০-৩৫ দিনে। এ সময়ে কেজিতে উৎপাদন খরচ পড়ে ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা। পাইকারী সেই মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৩৫-১৪৫ টাকা। খুচরা বাজারে এই মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৬০-১৮০ টাকা। ৩০-৩৫ দিন মুরগি পুষে খামার করে লোকসান কেজিতে ২২-২৭ টাকা।

ক’জন খামারির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঈদ ঘিরে এবারে অধিকাংশ খামারিই মুরগি পালন করেন। প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগির উৎপাদন খরচ পড়ে ১৪০-১৫০ টাকা, সোনালি মুরগির উৎপাদন খরচ প্রতি কেজিতে পড়ে ২৪০-২৫০ টাকা। কিন্তু খামারির কাছ থেকে পাইকারী ব্যবসায়ীরা ব্রয়লার মুরগি কিনছেন ১৩৫-১৪৫ টাকা ও সোনালি মুরগি ২৫০-২৮০ টাকায়। আর খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ২৯০-৩০০ টাকায়। গত বছরে তিন দফায় প্রতি বস্তা ফিডে প্রকারভেদে ৯০০-১০০০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। বাজারে সেই অনুযায়ী দাম না থাকায় বিক্রয়ের উপযোগী মুরগি নিয়ে বিপাকে পড়েছেন খামারিরা। বাধ্য হয়েই অনেককে মোটা অঙ্কের লোকসান গুণতে হচ্ছে। পোল্ট্রি শিল্পে খামারীদের জন্য সরকারের কাছ থেকে কোনো প্রণোদনা নেই। প্রণোদনা না থাকলে তরুণ উদ্যোক্তারা হারিয়ে যাবে। বেড়ে যাবে বেকারত্বের সংখ্যা। পোল্ট্রি শিল্পে মাংস উৎপাদনে ধস নেমে আসবে বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা।

ছোবহানপুর গ্রামে ১ একর জমি নিয়ে হাবিব শুরু করেন লেয়ার মুরগি পালন। সে ফার্মের নামকরণ করেছেন পাটওয়ারী এগ্রো লেয়ার ফার্ম। সেখানে ৮ হাজার লেয়ার পালন করেন তিনি। দৈনিক ৭ হাজার ৩০০ ডিম উত্তোলন করেন এ ফার্ম থেকে। ডিম বিক্রিতে কোনো প্রকার বেগ পেতে হয় না। খরিদদাররা নিজ নিজ প্রয়োজন মতো নিয়ে যান ডিম।

হাবিবের এক যুগের বেশি এ ব্যবসায় লেগে থাকা চ্যালেঞ্জিং ছিলো। এখন তিনি আলোর মুখ দেখছেন। তার এলাকাবাসীও তাকে ভালোভাবেই দেখছেন। তার এ সাফল্যে বাবা-মা, এলাকাবাসীর দোয়া আছে বলে তিনি জানান।

হাবিবুর রহমান পাটওয়ারী নিজে স্বাবলম্বী। অন্যকে স্বাবলম্বী করতে পথ দেখিয়ে সফল হয়েছেন। তার অধীনে ১২ জন শ্রমিক কাজ করেন। তাদের বেতন ১১ হাজার ৫০০ থেকে শুরু ১৩ হাজার ৫০০ পর্যন্ত। শ্রমিকরাও আনন্দ চিত্তে দৈনিক কাজ করে যাচ্ছেন। হাবিবুর রহমান পাটওয়ারীর প্রতিষ্ঠিত পাটওয়ারী এগ্রো লেয়ার ফার্ম, পাটওয়ারী এগ্রো পোল্ট্রি ফার্ম ও মেসার্স হুমায়রা এন্টারপ্রাইজ।

আগামীর উদ্যোক্তাদের জন্যে পরামর্শ চাইলে মোঃ হাবিবুর রহমান বলতে শুরু করেন, চোখে স্বপ্ন থাকতে হবে। লেগে থাকতে হবে যে কোনো কাজে। আর সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি তা হচ্ছে জানতে হবে, শিখতে হবে। জানা ছাড়া, শেখা ছাড়া কোনো কিছুই ভালোভাবে করা সম্ভব নয়। আর মানুষকে অন্ধ বিশ্বাসও করা যাবে না। যাকে বিশ্বাস করে দায়-দায়িত্ব দিতে হবে তার সম্পর্কে ভালোভাবে খোঁজ-খবর নিতে হবে। পরিশ্রম করতে হবে কৌশলী হয়ে। বুদ্ধিমানের মত খাটতে হবে। সততার সাথে বিপদ মোকাবেলা করতে হবে। আল্লাহর কাছে সবসময় আশ্রয় প্রার্থনা করতে হবে। সফলতার জন্য ধৈর্র্য ধরতে হবে এবং হাসিমুখে সবসময় ভালো ব্যবহার করতে হবে।

বাগাদী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মোঃ বেলায়েত হোসেন বিল্লাল গাজী বলেন, হাবিব কর্মঠ ছেলে। তার পোল্ট্রি শিল্পের কারণে আমাদের এলাকার মানুষজনের শহরে যেতে হয় না। ডিম ও মুরগি গ্রামবাসী হাতের নাগালেই পাচ্ছেন। তার দেখাদেখি অনেকেই এখন পোল্ট্রি ব্যবসায়ী হয়েছেন।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ বখতিয়ার উদ্দিন বলেন, বাগাদী ইউনিয়নে সবচেয়ে বড় পোল্ট্রি খামারী মোঃ হাবিবুর রহমান পাটওয়ারী। তার ব্রয়লার মুরগির সংখ্যা ২৫ হাজার। এসব খামারে উৎপাদিত মুরগি স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে আশপাশের জেলাসহ ঢাকা শহরেও যায়। এছাড়া তার ৮ হাজার সেটের লেয়ার মুরগি ফার্ম রয়েছে। সে খুব কর্মবীর। তার দেখাদেখি ওই গ্রামে ৪০টি পোল্ট্রি খামার গড়ে উঠেছে।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়