চাঁদপুর, সোমবার, ৮ আগস্ট ২০২২, ২৪ শ্রাবণ ১৪২৯, ৯ মহররম ১৪৪৪  |   ২৯ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতি শিক্ষা স্বাস্থ্য সারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   চাঁদপুরে ৭ম শ্রেণির ছাত্রীকে গণধর্ষণ
  •   গলায় ফাঁস লাগিয়ে কিশোরের আত্মহত্যা
  •   জমি খারিজের নামে হাতিয়ে নিলেন বিপুল পরিমাণ টাকা
  •   কিশোর গ্যাং গড়ে উঠার আগেই নির্মূল করতে হবে : মেজর (অবঃ) রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম
  •   ডিবি পুলিশের অভিযানে আন্তঃ জেলা প্রতারকচক্রের ৪ সদস্য গ্রেফতার

প্রকাশ : ০১ জুলাই ২০২২, ০০:০০

হাতিবন্ধুর গল্প
অনলাইন ডেস্ক

পাহাড়ের ঘন অরণ্যে থাকে একদল হাতি। অরণ্যের বাইরে তারা যায়নি কখনো। অরণ্যে তাদের বিচরণ ছিল পাহাড়ি নদীর পাড় হতে কলাবন, পাহাড়ের কোল হতে বড়জোড় সামনের ছোট্ট জলাভূমি। কখনো কোনো লোকালয়ে তারা যায়নি। তাদের এ পাহাড় ও অরণ্য নিবাসে এখনও প্রচুর খাবার পাওয়া যায়। যে নদী বয়ে গেছে অরণ্যের ভেতর দিয়ে তার নাম হাতিসখা। নামের সাথে নদীটির কাজের মিল আছে। সত্যিই সে হাতিদের সখা। হাতিরা দলবেঁধে যখন স্নান করে কিংবা জলপান করতে যায় তখন মনে হয় নদী যেন খেলা করে হাতিদের কাছে পেয়ে। অবশ্য বনের বানরেরাও আসে তার বুকে জল পান করতে। কিন্তু তারা দুষ্টু। শুধু শুধু একে অন্যের সাথে হয় মারামারি নয়ত গুঁতোগুঁতি করে। কিন্তু হাতিরা দলবেঁধে আসে আর দলনেতার কথা মেনে চলে। বনে কেউ হাতিদের মন্দ বলে না।

কিন্তু বেশিদিন এই আনন্দ থাকে না। বনে আসে হাতি ধরার দল। হাতিকে ফাঁদে ফেলে তারা আটকায়। তারপর ধরে ধরে পাচার করে। এই হাতিগুলোকে ট্রেনিং দিয়ে সার্কাসে, চিড়িয়াখানায় রাখে কিংবা পার্বত্য এলাকায় তাদের দিয়ে বড় বড় গাছের গুঁড়ি পরিবহনে কাজে লাগায়। যে সব হাতির দাঁত আছে তারা হলো শিকারীদের প্রধান লক্ষ্য। হাতির দাঁত দিয়ে মূল্যবান অলঙ্কার হয়। তাই নিজের দাঁত হাতির নিজের জন্যে শত্রু। যে হাতি ধরার দল এসেছে তারা বেশ বড় একটা দল নিয়ে এসেছে। এরা অবৈধভাবে হাতি ধরে নিয়ে পাচার করে। হাতির দলে ছিল ছোট্ট একটা বাচ্চা হাতি। সে তার মায়ের সাথে দলে ঘুরতো। চলতো ফিরতো। দুর্ভাগ্য, মায়ের শত সাবধনতা সত্বেও হাতি ধরার দলের ফাঁদে আটকে গেলো সেই বাচ্চা হাতিটা। তারপর সে এক করুণ কাহিনি। মা হাতিটা খুব চেষ্টা করল হাতি ধরার দলের কাছ থেকে তার বাচ্চাটাকে বাঁচাতে। কিন্তু তাদের হাতে বড় বড় বন্দুক, শক্ত শেকল আর ইয়া বড় খাঁচা আছে যা ভাঙা যায় না। তারা সেই বাচ্চা হাতিসহ আরো দুটো হাতি আটকে চলে গেলো নিয়ে। মা হাতিটা তার বাচ্চাকে বাঁচাতে মরিয়া হয়ে আঘাত করেছিল খাঁচায়। কিন্তু তার পায়ে গুলি করে পাচারকারীরা মাকে পঙ্গু বানিয়ে চলে গেল।

বাচ্চাকে হারিয়ে মা থাকে বিমর্ষ। সে খাবার খেতে যায় না ঠিকমত আর নদীর ধারেও যেতে মন চায় না। নদীতে যখন যেত তখন বাচ্চাটা খুশিতে শুঁড় দিয়ে জল ছিটাতো। সে জলে মা মিছে রাগ হলেও তার আরাম লাগতো। যতক্ষণ না তার বাছাটা নদীতে গেলে তার গায়ে জল না ছিটাত ততক্ষণ মায়ে জল হতে উঠে আসত না। মায়ে ভাবে, আহা তার বাছাটা কেমন আছে কে জানে! এদিকে হাতিধরার দল বাচ্চা হাতিটাকে নিয়ে গিয়ে একটা সার্কাস দলের কাছে বিক্রি করে দিল। সার্কাস দলে তাকে যে লোকটা চালাত, ট্রেনিং দিতো তাকে বলে মাহুত। মাহুতের কাছে বাচ্চা হাতিটা তিনমাস শিখল সার্কাসের আদব-কায়দা। কীভাবে ওয়েলকাম জানাতে হয়, কীভাবে সার্কাসের শিল্পীদের শুঁড় দিয়ে পিঠে নিতে হয়, কীভাবে তার পায়ের নীচে মাহুতকে রেখেও চাপ না দিয়ে খেলা দেখাতে হয় ইত্যাদি। সার্কাস কম্পানি তাকে একটা নাম দিলো। তার নাম হলো প্রিন্স। প্রিন্স মানে যুবরাজ, অর্থাৎ রাজার ছেলে। সারাদিন প্রিন্স খাটাখাটনি করে। রাত হলে সে তার খাঁচায় থাকে একা। তখন তার মায়ের কথা মনে পড়ে। মায়ের জন্যে সে মাঝে মাঝে দুচোখের জল ফেলে। সে জানে তাকে ছাড়া মা ভালো নেই।

সার্কাসে একজন কিশোর শিল্পী আছে। তার নাম রাজা। হাল্কা পাতলা শরীর। অনেক কঠিন কঠিন খেলা সে পারে। রাজা আর প্রিন্সের বেশ ভালো বন্ধুতা হয়ে যায়। তাদের জুটি ধীরে ধীরে দর্শকদের কাছে অত্যন্ত আদরণীয় জুটি হয়।রাজা

অনেক উঁচু থেকে দড়ি ধরে লাফ দিয়ে প্রিন্সের পিঠে বসে। প্রিন্স রাজাকে পিঠে নিয়ে এক বাঁশের সাঁকোর ওপর একপায়ে দাঁড়িয়ে শুঁড় তুলে স্যালুট জানায় দর্শকদের। এভাবে কঠিন খেলা দেখিয়ে দেখিয়ে দুজনেই ধীরে ধীরে বড় হয়ে ওঠে। একদিন সার্কাসের দলটা খেলা দেখাতে যায় সেই পার্বত্য এলাকায়। পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলে সারি বেঁধে সার্কাসের দল। সামনে প্রিন্সের পিঠে রাজা আর পেছনে অন্য গাড়ির বহর। রাস্তার দুপাশে লোকজন জমায়েত হয়ে যায় তাদের দেখতে। প্রিন্স তাদের সালাম দেয় শুঁড় তুলে। কেউ কেউ তার শুঁড়ে বিশ-পঞ্চাশ টাকা গুঁজে দেয়। ঐ টাকা সে তার পিঠে বসে থাকা রাজার হাতে দিয়ে দেয়। এ টাকা সার্কাসের মালিককে পরে বুঝিয়ে দিতে হয়। মাঝে মাঝে প্রিন্স ডাক দেয়। তার ডাককে লোকেরা বৃংহন বলে। কেউ জানে না সে কী বলছে। শুধু রাজা জানে। রাজা প্রিন্সের আবেগ, ভাষা সব বুঝে। কখন প্রিন্স খুশি হয়, কখন প্রিন্স রেগে যায় তা রাজা বুঝে। কখন প্রিন্সের মায়ের কথা মনে পড়ে, কখন সে কান্না করে, কখন তার ক্ষিধে পায় এসব তার নখদর্পণে। প্রিন্সের এই পথচলায় বৃংহন এর একটা উদ্দেশ্য আছে। সে চিনেছে, এটাই সে পথ যে পথে তার আবাসভূমির পাহাড়ে যাওয়া যায়। এই রাস্তা হতে তাদের বিচরণের অরণ্য খুব কাছে। সে তার ডাকের মধ্যে মায়ের জন্যে সংকেত রেখে যায়। যদি মা আশেপাশে থাকে তবে ঠিকই শুনতে পাবে।

ঠিক যে সময়ে প্রিন্স ডাকতে ডাকতে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল, ঐ সময়ে তার মা ঐরাবতী নদীর পাড়ে বসে তার ছোটবেলার দুষ্টুমির কথা স্মরণ করছিল। ছেলের গলা শুনতে পেয়ে মা প্রথমে মনে করেছে তার মনের ভুল। সে তার বিশাল কান খাড়া করে শুনলো। হুম। ভুল নয়, এ তার ছেলের ডাক। তার বুকে রক্ত উঠে ছলকে। কিন্তু ডাকের মধ্যে বার্তা যেমন আছে তেমনি সাবধানতাও আছে। আজ রাতে সে সার্কাসের দলের আস্তানায় থাকবে বলেছে। ছেলের ডাক শুনে মায়ে অরণ্যে দূর হতে লুকিয়ে দেখে প্রিন্সের দলকে। ছেলেটা অনেক বড় হয়েছে। ঐরাবতী তার দলের সাথে বুদ্ধি করে। প্রিন্সের দল রাতে ঠাঁই নেয় পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত এক বিশাল মাঠে। আগামীকাল এখানেই শো হবে তাদের। সারা শহর মাইকিং করে ভরে ফেলা হয়েছে। আগামীকাল বিকেল থেকে প্রিন্স ও রাজার দলের সার্কাস। ছোট ছোট হ্যান্ডবিলে রাজা ও প্রিন্সের ছবি ছাপিয়ে বিতরণ করা হয়েছে। এদিকে রাজা ও প্রিন্স চোখে চোখে কী জানি বিনিময় করে নেয়। রাত নামল। চারদিক সুনসান নিরবতা। শুধু জেগে আছে একা পাহারাদার। এক সময় পাহারাদারেরও দু'চোখ লেগে আসে ঘুমে। এ ফাঁকে ঐরাবতী ও তার দলের পঞ্চাশটা ছোট-বড় হাতি এসে ঘিরে ফেলেছে মাঠ। তাদের কারো কোনো শব্দ নেই। রাজা আস্তে আস্তে খুলে দেয় প্রিন্সকে। প্রিন্স মাকে পেয়ে পাগলের মতো হয়ে যায়। প্রিন্সের মা-ও প্রিন্সকে জড়িয়ে আদর করতে থাকে। তারপর খুব দ্রুত সন্তর্পণে তারা সদলে চলে যায় অরণ্যের গভীরে।

একটু পরেই সকাল হবে। সকাল হলেই প্রিন্সকে পাওয়া না গেলে সবাই রাজাকে ধরবে। রাজা অবশ্য পাহারাদারের পানীয় জলে ঘুমের বড়ি মিশিয়ে দিয়েছিল কায়দা করে। তাই পাহারাদার গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। গতরাতে কৌশলে রাজা মাহুতের কাছ থেকে প্রিন্সের শেকলের চাবি আলাদা করে নিয়েছিল। তাই প্রিন্সকে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিতে কোন অসুবিধা হয়নি। প্রিন্স যাওয়ার পর একদিকে রাজার মনে ভয়, তাকে না সবাই ধরে পিটিয়ে মারে, আবার অন্যদিকে প্রিন্সের জন্যে তার মায়া। সে জানে মায়ের কাছ থেকে আলাদা হওয়ার কষ্ট। তার বয়স যখন পাঁচ বছর তখনই তার মা মারা যায়। তার ছয় মাস পরে তার বাবা আবার বিয়ে করে। নতুন মা এসে রাজাকে খাবার দিতো না। শুধু গালাগাল দিতো। রাজাকে কথায় কথায় মারতো। তার বাবা জানতো কিন্তু কিছু বলতো না। একদিন আর সহ্য করতে না

পেরে রাজা পালিয়ে যায় ঘর থেকে। তারপর কেমনে কেমনে জানি এই সার্কাসের দলে সে জুটে গেছে। সার্কাসের মালিক তাকে খুব আদর করে। খুব যত্ন করে উনি রাজাকে সব কঠিন কঠিন খেলা শিখিয়েছেন। প্রিন্সকে তার মায়ের সাথে ছেড়ে দিয়ে হয়তো রাজা সার্কাসের মালিকের ক্ষতি করে দিয়েছে কিন্তু একটা হাতিশাবককে সে তার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছে। এসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে একসময় রাজা ঘুমিয়ে পড়ল।

সার্কাস দলের তাঁবুজুড়ে সকালে হৈ চৈ পড়ে গেল। ঘটনা কী? ঘটনা আর কিছু নয়, ঘটনা হলো সার্কাসের প্রাণ, সার্কাসের শোভা হাতিশাবক প্রিন্সকে পাওয়া যাচ্ছে না। সবাই জড়ো হলো শূন্য হাতিখাঁচার দিকে। মালিক বসে আছেন চেয়ারে। পাহারাদার, মাহুত আর রাজাকে ডাকানো হলো। তাদের জেরা চলছে। প্রথমে পাহারাদারের পালা। তুমি কী করছিলে গতকাল রাতে? পাহারাদার মাথা নিচু করে রইল। মালিক বুঝলো যে সে ঘুমিয়ে ছিল। কিন্তু তার একার পক্ষে হাতি ছেড়ে দেওয়া সম্ভব নয়। হাতির শেকলের চাবি থাকে মাহুতের কাছে। মাহুতকে ডাকানো হলো। মাহুত বললো, চাবি গতকাল রাজাকে সে দিয়েছিল। রাজা প্রিন্সকে নিয়ে প্র্যাকটিস করেছে। তাহলে প্রিন্সকে ছেড়ে দিলো কে? সার্কাস দলের মালিক বশির উল্লাহ্ রাজাকে নরম কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, রাজা, শেকলের চাবি কোথায়? রাজা বলে উঠলো, স্যার, চাবি গতরাতেই মাহুতকে দিয়ে দিয়েছি। ওনার পকেটে আছে। ঠিকই মাহুত তার পকেটে হাত দিয়ে দেখে চাবি তার পকেটে। এবার বশির উল্লাহ্ পুলিশে খবর দেয়। নিকটবর্তী থানা হতে পুলিশ আসে। বশিরউল্লাহ্ চান না কোন একজন বাদ যাক। এরা সবাই নিজের কাজটা ভালো পারে। তিনি হাতি ফেরৎ পেলেই খুশি। পাহারাদার,মাহুত আর রাজাকে হাতকড়া লাগিয়ে পুলিশ নিয়ে যাচ্ছে থানায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্যে। রাজা পুলিশের গাড়িতে উঠতে যাবে এমন সময় কোথা থেকে দৌড়ে প্রিন্স ও তার মা এসে হাজির। প্রিন্স দ্রুত রাজাকে শুঁড় দিয়ে পিঠে নিয়ে নেয়। তারপর মাঠের ভিতর চলে আসে। তার পিছে পিছে ঐরাবতীও মাঠে ঢোকে। তারপর মা-ছেলে মিলে অদ্ভুত খুশিতে দুলে দুলে নাচতে থাকে। পিঠে হাতকড়া পরা রাজার চোখে জল গড়ায়।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়