রবিবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২১, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৮  |   ২৩ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতি শিক্ষা স্বাস্থ্য সারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   হাজীগঞ্জে ৪৩তম জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলার উদ্ধোধন
  •   কচুয়ায় কলেজ ছাত্রীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার
  •   স্বাক্ষর জাল করে আওয়ামীলীগের তৃণমূলের প্রার্থী তালিকা পরিবর্তনের অভিযোগ
  •   বিএনপির মানিক-শাহীন দুই গ্রুপের সাথে যুগ্ম মহাসচিবের সভা
  •   কচুয়ায় বিপুল পরিমাণ গাঁজাসহ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার

প্রকাশ : ২৪ অক্টোবর ২০২১, ০০:০০

বকের সখা বাজপাখি

পীযূষ কান্তি বড়ুয়া

বকের সখা বাজপাখি
অনলাইন ডেস্ক

মানুষের মাঝে যেমন সাধু আছে, সন্ন্যাসী আছে তেমনি বকদের সমাজেও সাধু-সন্ন্যাসী দেখা যায়। মানুষরূপী সন্ন্যাসীরা হয়তো বনে-বাদাড়ে বা নির্জন অরণ্যে ধ্যান করে কাটায়। কিন্তু বক-সন্ন্যাসীরা অরণ্যে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। তারা লোকালয়ের বিলে-ঝিলে একপায়ে দাঁড়িয়ে ধ্যানমগ্ন থাকে। তবে মানুষ-সন্ন্যাসীরা যেমন নিবিড় ধ্যান করে তেমনি কিন্তু বক-সন্ন্যাসীরা ধ্যান করে না। তারা একপায়ে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকলেও জলের নিচে কখন মাছ ছুটে যায় তা দেখতে পায়। তারপর দেরি না করে টুপ করে ধরে ফেলে লম্বা চিমটির মতো ঠোঁট দিয়ে। বকের এই স্বভাবের জন্যেই সে মানুষের সমাজে বকধার্মিক বলে আলোচিত। যদিও বক-সন্ন্যাসীরা অন্যদের মতো এতো নড়াচড়া করে না, তবু তারা চোখ বন্ধ করে রাখলেও টের পায়, কোথা দিয়ে কী হচ্ছে। এ রকম একজন বক-সন্ন্যাসীর কথা বলছি, যার ছিলো চার ছেলে। বক সন্ন্যাসী যেদিকে বসতো, তার চারপাশে তার চার ছেলেই বসে থাকতো আর বাবাকে নকল করতো। দূর থেকে দেখে মনে হতো সারারাত বিনিদ্র কাটিয়ে তারা বাপ-ছেলেতে পাঁচজনে ঝিমুচ্ছে। এ রকম ধ্যানী পরিবার বুঝি আর নেই। মাঝে মাঝে পানির নিচে মাছেরাও বোকা বনে যেতো। মাছ হলো বকের প্রধান খাদ্য। আর বক কি না পানিতে ঠায় দাঁড়িয়ে ধ্যানের চর্চা করে! বকের এ চোখ বোঁজা দেখে মাছেরা যেই নির্ভয়ে ওদিকে যায় অমনি বুড়ো বক খপ্ করে মাছ ধরে উদর পূর্তি করে। এভাবেই চলছিলো বক-সন্ন্যাসীর পরিবারের দিনগুলো।

একদিন বকের ঝিলে এক বাজপাখি এলো। হঠাৎ করে বাজপাখির মতো বিরাট শিকারি পাখি দেখে বক-সন্ন্যাসীর পরিবার ভয় পেয়ে গেলো। তাদের ভয় পেতে দেখে বাজপাখি বললো, ভাই বক, আমাকে দেখে তোমরা ভয় পেয়ো না। আমি তোমাদের কোনো ক্ষতি করতে আসিনি। আমি এসেছি তোমার কাছে ধ্যান শিখতে। তুমি কী সুন্দর করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একচোখ বন্ধ করে ধ্যান করো। আমি অনেকদিন উঁচু আকাশ থেকে তোমাকে খেয়াল করেছি। তোমাকে দেখে অন্য বকেরা খুব সমীহ করে। তোমার অনেক আদর এখানে। তাই আমারও ইচ্ছে হলো তোমার মতো ধ্যান শেখার। নিজেদের ঝিলে বাজপাখিকে দেখে অন্য বকেরা গুজ্ গুজ্ ফুস্ ফুস্ শুরু করে দিলোর। তারা চায় না বাজপাখি তাদের সাথে থাক। কারণ বাজপাখিকে বিশ্বাস নেই। এমনিতেই প্রতি সপ্তাহে একদিন চিলের যন্ত্রণায় তারা হিমশিম খায়। তার ওপর বাজের মতো শিকারি পাখির ঘাঁটি গেঁড়ে বসাটা তাদের কাছে ভালো লাগছে না। তারা তাই বক-সন্ন্যাসীর কাছে তাদের প্রতিবাদ জানালো। বক-সন্ন্যাসী তাদের বোঝালো, দেখো, বাজের মতো বড় শিকারি পাখিকে ঝিলের পাহারায় দেখলে অন্য সন্ত্রাসী চিলেরা এসে হামলা করবে না। সন্ন্যাসী বকের এই কথায় অন্যে বকেরা চুপ করে গেলো। তারা যে যার ঘরে ফিরে গেলো। ঘর মানে হলো গাছের মগডাল।

পরের দিন হতে বাজপাখি বক-সন্ন্যাসীর কাছে ধ্যান শিখতে শুরু করলো। বকের ধ্যানের ক্লাসে বাজপাখি খুব মনোযোগী ছাত্র হয়ে উঠলো। প্রতিদিন ভোরে উঠে শুরু হতো কার্যক্রম। বাজপাখির একটা সমস্যা ছিলো। তার পা বকের মতো লম্বা নয় বলে তার পক্ষে একপায়ে দাঁড়িয়ে থাকা কঠিন হয়ে পড়লো। বক সন্ন্যাসী তাকে বললো, ঠিক আছে, তুমি পানিতে দাঁড়ানোর দরকার নেই, তবে পানিতে আধা ডোবা গাছের ডালে দাঁড়াও এক পা তুলে। এভাবেই চলছে বাজের ধ্যানশিক্ষা। কিন্তু বক-সন্ন্যাসীর একথা কিছুতেই মাথায় আসছে না, কেনো বাজপাখির মতো শক্তিধর পাখি এলো তার কাছে ধ্যান শিখতে। একদিন ধ্যানপাঠের ফাঁকে বক তাকে জিজ্ঞেস করে, কি হে বাজ, কেনো তুমি হঠাৎ ধ্যানী হতে চাইলে? বাজপাখি তখন বলে, আমাদের বংশে সবাই বাঁচে সত্তর বছর। কিন্তু চল্লিশ বছরে পড়তে না পড়তেই সবাই বার্ধক্যে উপনীত হই। তখন আর আগের মতো শক্তি থাকে না। শিকার ধরার সেই গতিও আর থাকে না। আমি স্বপ্নে দেখলাম, তোমার মতো ধ্যান করলে আমার আর কষ্ট হবে না। আমি তখন বার্ধক্যকে জয় করতে পারবো। আমার ঠোঁট, নখর কিছুই আর ধার হারাবে না। বাজপাখির কথা শুনে বকের বুকে গর্ব হতে শুরু করে। বক এবার ধীরে ধীরে পাঠদান আরম্ভ করে। বড় কঠিন ধ্যানের পাঠ গ্রহণ। কিন্তু বাজের জন্যে তা কিছুই নয়। সে একাগ্রতায় ধ্যানের অনুশীলন করতে থাকে।

একদিন বকের ঝিলে এক পাখিশিকারির আগমন ঘটে। সেদিন ধ্যানশিক্ষা শেষে বাজ গেছে নিজের কোটরে। মনের আনন্দে বকের বাচ্চারা ঘুরছে ঝিলে। বক-সন্ন্যাসী যথারীতি চোখ বুঁজে ধ্যানে মগ্ন। এমন সময় শিকারীর জালে বক গেলো আটকে। শিকারী মহানন্দে জাল গুটাতে শুরু করে। বক-সন্ন্যাসীকে জালে পেয়ে শিকারীর পোয়াবারো। ভালো দাম পাবে বাজারে। বক-সন্ন্যাসী কিছু বুঝে উঠার আগেই শিকারী তাকে কব্জা করে ফেলে। বকের ছানারা তা দেখে বাজপাখির কাছে গেলো। বাজপাখি দ্রুত এলো বকের ঝিলে। তারপর দেখলো দূর হতে, শিকারী কীভাবে বক সন্ন্যাসীকে নিয়ে যাচ্ছে বেঁধে। ঘটনা দেখে বাজের মাথা গেলো গরম হয়ে। বাজপাখি শিকারীর মাথার উপর চক্কর দিতে থাকে। চক্কর দিতে দিতে ফন্দি আঁটে। শিকারী দ্রুতবেগে আটক বকপাখিসহ তার বাড়ির আঙিনায় এসে পৌঁছে। তারপর নিরাপদ মনে করে বকটাকে একটা পাখির খাঁচায় আটকে রাখে।

শিকারীর আঙিনায় ছিলো একটা নারকেল গাছ। সেই গাছে প্রচুর ডাব হয়েছে। শিকারী পানির পিপাসা মিটানোর জন্যে গাছে উঠতে মনস্থ করে ডাব পাড়তে। মাত্র নারকেল গাছের তলায় গেছে ডাব পাড়তে। এটাই সুযোগ মনে করে বাজপাখি সচল হয়ে ওঠে। বাজের নখর অনেক ধারালো। বাজ তার নখর দিয়ে ক্রমাগত একটার পর একটা ডাব ছিঁড়ে শিকারীর মাথায় ফেলতে শুরু করে। দুটো ডাব মাথায় পড়তেই শিকারী অজ্ঞান হয়ে ধপাস করে মাটিতে পড়ে গেলো। বাজপাখি এই সুযোগে বকের খাঁচাসহ ঠোঁটে নিয়ে উড়ে চলে এলো বকের ঝিলে। খাঁচার ভিতর শিকারীর কবলমুক্ত বক-সন্ন্যাসীকে পেয়ে তার বাচ্চারা খুশি হলো। কিন্তু খাঁচার তালা তারা কেউ ভাঙ্গতে পারলো না। এদিকে বক যদি খাঁচার বের না হয় তবে সে আর মাছ ধরতে পারবে না। না খেয়ে শেষমেষ মারা যাবে। বাজ তার শক্ত ঠোঁট দিয়ে বেজায় চেষ্টা করল বককে খাঁচা ভেঙ্গে বাইরে আনতে। কিন্তু পারল না। অগত্যা বাজ পাখি আটক বককে খাঁচাসহ গাছের ডালে ঝুলিয়ে রাখে। নিজে নখরে মাছ শিকার করে বকের জন্য দুইবেলা নিয়ে আসে। বাজপাখির আনা মাছে বকের দিন কোনমতে গুজরান হয়। কিন্তু এভাবে সারা জীবন চলে না। বক ও বাজপাখি উভয়ে একথা জানত। বাজ তাই উড়ে উড়ে তালাচাবিঅলা খুঁজতো। গ্রামে তালাচাবিঅলা তেমন নাই। কিন্তু শহরের অলিতে গলিতে তালাচাবিঅলা ঘুরে। বাজপাখি গ্রাম ছেড়ে শহরে গিয়ে তালাচাবিঅলার সন্ধান পায়। সে উঁচু গাছের ডালে বসে খেয়াল করে, তালাচাবিঅলার ছোট একটা বাচ্চা আছে যেটা উঠোনে হামাগুড়ি দিয়ে খেলা করে। দুপুরের দিকে সে বাসায় আসে খেতে। সে সময় তার সাথে তালা খোলার যন্ত্রপাতিও সাথে থাকে। পর পর তিনদিন বাজপাখি তালাচাবিঅলাকে অনুসরণ করে। চতুর্থ দিনের দিন সে পরিকল্পনা সাজায় বকপাখিকে খাঁচামুক্ত করার।

পরিকল্পনামতো বাজপাখি নখরে বকপাখিসহ খাঁচা ধরে উড়ে উড়ে শহরে আসে। তারপর ঠিক দুপুরের দিকে তালাচাবিঅলার উঠোনের গাছে উঁচু ডালে বসে থাকে বক পাখিকে নিয়ে। দুপুরে খাওয়ার সময় হলে তালাচাবিঅলা খেতে আসে বাসায়। তার ছোট হামাগুড়ি দেয়া শিশুটা বারান্দায় খেলছিলো। এমন সময় বাজপাখি বকের খাঁচাটাকে তালাচাবিঅলার পায়ের সামনে ফেলে দিয়ে তার শিশুটিকে নখরে ধরে গাছের মাঝামাঝি ডালে বসে রইলো। তালাচাবিঅলা হই হই করে তেড়ে আসলো। কিন্তু তাতেও বাজপাখি নির্বিকার। বাজপাখিকে অনড় দেখে তালাচাবিঅলার বোধোদয় হল। পুত্রস্নেহের কারণে তার বোধশক্তি যেনো বেড়ে গেলো। সে আঁচ করতে পারলো, বাজপাখি তার শিশুটিকে উড়িয়ে ছিনিয়ে নিতে আসেনি। সে এসেছে বকপাখিকে বন্দীদশা হতে মুক্তি দিতে। তালাচাবিঅলা অধৈর্য না হয়ে খুব দ্রুত নকল চাবি বানিয়ে তালা খুলে দিলো। তালা খুলে দেয়া মাত্রই বকপাখি ডানা ঝাপটে বেরিয়ে এলো খাঁচা ছেড়ে। তারপর কয়েকবার মকশো করে উড়াল দিলো গাছের ডালে যেখানে বাজপাখি বসেছিলো তালাচাবিঅলার শিশুপুত্রকে নখরে আঁকড়ে। বকের মুক্তিতে বাজপাখি শিশুপুত্রকে নিয়ে আঙিনায় নামলো। তারপর তাকে ঘরের দাওয়ায় আলতো করে ছেড়ে উড়ে এলো গাছের ডালে। শিশুটি এতোক্ষণ কাঁদছিলো। যেই দাওয়ায় তাকে বাজপাখি ছেড়ে এলো অমনি শিশুটির কান্না বন্ধ হয়ে গেলো। তার বাবা তাকে দ্রুত কোলে নিয়ে আদর মাখিয়ে সারা গায়ে দেখতে লাগলো তার কোনো ক্ষতি হয়েছে কি না। আশ্চর্য। বাজপাখিটার নখরের কোনো আঘাত শিশুটার গায়ে লাগেনি। অর্থাৎ পাখিটা শিশুটার কোনো ক্ষতি করেনি। বরং শিশুটা এখন গাছের ডালে বসে থাকা বাজপাখিটার দিকে চেয়ে হাসছে। শিশুটিকে বাবার কোলে হাসতে দেখে নিশ্চিন্তে বাজপাখি ও বক-সন্ন্যাসী উড়াল দিলো বক ঝিলের উদ্দেশ্যে। তাদের এ উড়ালে আরো দৃঢ় হয়ে ওঠে বন্ধুতার বন্ধন।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়