চাঁদপুর, সোমবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১১ আশ্বিন ১৪২৯, ২৯ সফর ১৪৪৪  |   ৩১ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতি শিক্ষা স্বাস্থ্য সারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   চাঁদপুরের হাজীগঞ্জের ভাটরায় স্ত্রী হত্যার দায়ে স্বামীর মৃত্যুদন্ড
  •   চাঁদপুর জেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রতীক বরাদ্দ চেয়ারম্যান পদে ওচমান হাজীর মোবাইল, জাকির প্রধানিয়ার আনারস
  •   চাঁদপুর জেলা পরিষদ নির্বাচনে ৩ চেয়ারম্যানের প্রার্থিতা প্রত্যাহার
  •   হাইমচরে বজ্রপাতে নৌকা থেকে পড়ে জেলে নিঁঁখোজ
  •   চাঁদপুরে চুরি হওয়া ৪২ মোবাইল উদ্ধার

প্রকাশ : ০৭ আগস্ট ২০২২, ০০:০০

স্থানীয় আম গাছে ক্ষীরশাপাতি ও হিমসাগরের চাষ
মোঃ আবদুর রহমান গাজী ॥

চাঁদপুর সদর উপজেলার আশিকাটি ইউনিয়নে সেনগাঁও বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। এ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ আব্দুল আজিজের নির্দেশনায় সহকারী শিক্ষক (কৃষি শিক্ষা) মোঃ আব্দুল করিম স্থানীয় আম গাছে ক্ষীরশাপাতি ও হিমসাগরের চাষে কলম পদ্ধতি শিখাচ্ছেন।

বিদ্যালয়ের স্থানীয় ৫টি আম গাছে ক্ষীরশাপাতি ও হিমসাগরের চাষ গ্রাফটিং পদ্ধতিতে পরীক্ষামূলকভাবে এ বছর শুরু করেছেন। ওই গ্রামের বাসিন্দাদেরকেও বিনামূল্যে ক্ষীরশাপাতি ও হিমসাগর কলম করে দিচ্ছেন তিনি। ১০০ টি গাছের মধ্যে কলম লাগালে ৭০ থেকে ৭৫ টি গাছেই ফলন আসে।

মোঃ আব্দুল করিম চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার ১৫নং নয়ালাভাঙ্গা ইউনিয়নের কমলাকান্তপুর (কাঁড়াই পাড়া) গ্রামের মোঃ আবুল কালাম আজাদ ও মোসাঃ পেশনারা বেগমের ৪র্থ সন্তান। ছোটবেলা থেকেই আব্দুল করিম নিজ আম বাগানে বাবার সাথে কাজ করতেন। সে জন্যেই আম চাষের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। তিনি কৃষি শিক্ষা বিভাগের শিক্ষক হওয়ার কারণে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কৃষি বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করতে তার নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ সালে সেনগাঁও উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা লাভ করে। প্রতিষ্ঠাকাল থেকে টিনশেড ভবনে বিদ্যালয়টির কার্যক্রম চলে ৪২ বছর। পরবর্তীতে ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে ৪তলা ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়। ২০২০-২১ অর্থ বছরে এ ভবনটির উদ্বোধন করেন শিক্ষামন্ত্রী ও চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য ডাঃ দীপু মনি।

বিদ্যালয়ে ২১৯ জন ছাত্রী আছে। ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান নিয়মিত চলছে। তার মধ্যে ৯ম শ্রেণিতে মানবিক, বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষা শাখা রয়েছে। সেখানে রয়েছে শেখ রাসেল ডিজিটাল কম্পিউটার ল্যাব। এতে রয়েছে ১৭টি ল্যাপটপ এবং ১টি ৫৫ ইঞ্চি স্মার্ট এলইডি টিভি।

প্রধান শিক্ষক মোঃ আব্দুল আজিজ জানান, আমি ২০১৩ সালের ১ এপ্রিল যোগদান করি। তখন বিদ্যালয়ের শ্রেণি কার্যক্রম ছিল ৬ষ্ঠ থেকে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত। ২০১৫ সাল থেকে নবমণ্ডদশম শ্রেণির ৩টি গ্রুপে অনুমতি পাওয়ায় ২০১৭ সাল থেকে নিজ বিদ্যালয়ের নামে ছাত্রীরা এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে আসছে। তাদের রেজাল্ট ভালো এবং সন্তোষজনক। আমার বিদ্যালয়ের কৃষি শিক্ষা বিষয়ক শিক্ষক মোঃ আব্দুল করিম স্থানীয় আম গাছে কলম পদ্ধতিতে ক্ষীরশাপাতি ও হিমসাগরের চাষ শিখাচ্ছেন। এতে করে আমরা অভিভাবক মহলে বেশ প্রশংসিত হয়েছি। ছাত্রীদেরও যথেষ্ট আগ্রহ আছে কৃষি শিক্ষার ওপর।

বিদ্যালয়ের আঙ্গিনায় রয়েছে আম, কাঁঠাল, পেঁপে, জাম, পেয়ারা, বেল, বরই, চালতা, তেঁতুল, জাম্বুরা, আমড়া, আমলকি, অর্জুন, নিম ও হরিতকি। সে সাথে সৌন্দর্য বর্ধনে কৃষ্ণচূড়া, বেলী ফুল, টগর, মরিচ, হাসনেহেনা ও টাইম ফুল রয়েছে।

চাঁদপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে জানা যায়, ক্ষীরশাপাতি ও হিমসাগর আমণ্ডফলের মধ্যে স্বাদে গন্ধে অতুলনীয়। এ আমগুলোর বাজারে বেশ চাহিদা রয়েছে।

বাংলাদেশে উৎপন্ন অল্পসংখ্যক অতি উৎকৃষ্ট জাতের আমের মধ্যে ক্ষীরশাপাতির স্থান শীর্ষে। ল্যাংড়া, ক্ষীরশাপাতি ও গোপালভোগ-এই তিনটি আমের জাতকে আমভক্ত বাঙালি গুণ-মানের বিচারে শীর্ষে রেখেছেন। কোন্ আমটি সর্বশ্রেষ্ঠ, এর বিচার হয়নি, হবেও না কোনো দিন। কারণ, এই তিনটি আমের ভক্তের দল প্রায় সমান তিন শিবিরে বিভক্ত। কাজেই অনন্তকালব্যাপী চলতে থাকবে সর্বশ্রেষ্ঠ আম নির্বাচনের প্রতিযোগিতা, কিন্তু ফলাফল আসবে না কোনো দিনও।

ক্ষীরশাপাতি আম আশু জাতের। জুন মাসের শুরু থেকেই পরিপক্বতা লাভ করে বাজারে আসতে থাকে। জুলাই মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত ক্ষীরশাপাতি বাজারে পাওয়া যায়। তবে জুন মাসের ৭ থেকে ৩০ তারিখ পর্যন্ত ক্ষীরশাপাতি আমের আসল সময়। আমটির আকৃতি মাঝারি। দেখতে অনেকটা গোলাকার। একেকটির ওজন গড়ে ২৬৩ গ্রাম। ক্ষীরশাপাতি আমের বোঁটা বেশ মোটা এবং শক্ত। ত্বক মসৃণ, পাকলে ঊর্ধ্বাংশ অর্থাৎ বোঁটার আশপাশে হলুদ রং ধারণ করে। আমের মধ্যাংশ থেকে নিম্নাংশ হালকা সবুজ।

ক্ষীরশাপাতি সাধারণত গড়ে ৮ দশমিক ৬ সেন্টিমিটার দীর্ঘ হয়ে থাকে। ফলটির প্রস্থ ৭ দশমিক ৫ সেন্টিমিটার এবং উচ্চতা ৬ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়। ক্ষীরশাপাতির খোসা সামান্য মোটা। আঁশবিহীন আমটির শাঁস হলুদাভ। ফলটি সুগন্ধযুক্ত, রসালো ও অত্যন্ত মিষ্টি স্বাদের। এর খাবার উপযোগী অংশ শতকরা ৬৭ দশমিক ২ ভাগ। খোসা ছাড়িয়ে নিলে এমনিতেই শাঁস আঁটি থেকে বেরিয়ে আসে।

অনেক জাতের উচ্চমানের আম রয়েছে, যেগুলো গাছপাকা অবস্থায় খেলে টকের পরিমাণ প্রায় ৫০ শতাংশ রয়ে যায়। এগুলো গাছপাকা অবস্থায় গাছ থেকে নামিয়ে অন্তত তিন থেকে চার দিন ঘরে রাখার পর মিষ্টতা আসে। এ-জাতীয় আম হচ্ছে মল্লিকা, মোহনভোগ, আশ্বিনা, বৃন্দাবনি ইত্যাদি। ক্ষীরশাপাতি পাকা অবস্থায় গাছ থেকে নামিয়ে কেটে ফালি করে খেতেও অত্যন্ত সুস্বাদু। ক্ষীরশাপাতির মিষ্টতার পরিমাণ ১৯ শতাংশ। গাছ থেকে সংগ্রহের পর আমটি ছয় থেকে আট দিন পর্যন্ত ঘরে রাখা যায়। এই ফলের আঁটি পাতলা।

ক্ষীরশাপাতির ফলন খুব ভালো। তবে জাতটি অনিয়মিত। প্রতিবছরেই ফল আসবে না। যে বছর গাছে ফল আসবে, পরিমাণে অল্প আসবে না। গাছ ফলে ভরে যাবে। আমটি অত্যন্ত বাণিজ্যসফল। নবাবগঞ্জ জেলার সর্বত্র, বিশেষ করে শিবগঞ্জ উপজেলায় সর্বাধিক ক্ষীরশাপাতি আমের চাষ হয়ে থাকে। এখানকার বাগানে উৎপাদিত ক্ষীরশাপাতি গুণে ও মানে সর্বোৎকৃষ্ট। নবাবগঞ্জ ব্যতীত রাজশাহী, নাটোর, দিনাজপুর, বগুড়া, নওগাঁ, পাবনা ও সাতক্ষীরা অঞ্চলে ক্ষীরশাপাতি আমের আবাদ হয়ে থাকে। তবে নবাবগঞ্জের পরেই ক্ষীরশাপাতি উৎপাদনে রাজশাহীর স্থান অগ্রগণ্য। ক্ষীরশাপাতির আরেকটি জাত রয়েছে ক্ষুদিক্ষীরশা নামের। এই আম আসল ক্ষীরশাপাতির চেয়ে ওজনে সামান্য কম। স্বাদ একই রকমের। ক্ষুদিক্ষীরশার রং কালচে সবুজ। আসল ক্ষীরশাপাতি হালকা সবুজ রঙের হয়ে থাকে। উভয় জাতের মূল্য ও মান একই পর্যায়ের।

ঢাকা, কুমিল্লা, সিলেট, চট্টগ্রাম, বরিশাল-এসব জেলায় হিমসাগর নামের জাতটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। হিমসাগর ও ক্ষীরশাপাতির স্বাদ প্রায় একই রকমের। দেখতেও ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয় না। তবে হিমসাগরের উৎপাদন অত্যন্ত কম হওয়ায় খুচরা বিক্রেতারা ক্ষীরশাপাতি আমকে হিমসাগর বলেই বিক্রি করছেন উল্লিখিত জেলাগুলোর শহর ও বাজারে। ক্রেতাসাধারণ সানন্দে ক্ষীরশাপাতি আম কিনছেন হিমসাগর মনে করে। এতে ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

ক্ষীরশাপাতি একান্তই বাংলাদেশের আম। ধারণা করা হয়, মুর্শিদাবাদের নবাবদের বাগান থেকে প্রথম উদ্ভাবিত হয়েছিল ক্ষীরশাপাতি। মুকুল আসার পর মোট চার মাস সময় নেয় আমটি পোক্ত হতে। আমটি চেনার সহজ উপায় হচ্ছে এটি দেখতে অনেকটা গোলাকার, বোঁটা বেশ মোটা। পৃষ্ঠদেশের কাঁধের চেয়ে সম্মুখের কাঁধ অপেক্ষাকৃত স্ফীত। ফলটির অবতল বা সাইনাস এবং ঠোঁট নেই বললেই চলে। শীর্ষদেশ গোলাকৃতির।

হিমসাগর : বাংলাদেশে অতি উৎকৃষ্ট জাতের মধ্যে হিমসাগরের অবস্থান প্রায় শীর্ষে। হিমসাগর আম জুন মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে পাকতে শুরু করে এবং পুরো জুন মাস বাজারে পাওয়া যায়। হিমসাগর জাতটি আশু বলা যেতে পারে; পাশাপাশি মধ্য মৌসুমি জাতের আম হিসেবেও গণ্য করা যায় একে।

হিমসাগর আমের গাছের আকৃতি মাঝারি। একটি হিমসাগর আমের গাছ ১২ বছর বয়সী হলে পূর্ণাঙ্গভাবে ফল দিতে সক্ষম হয়। ফলন মাঝারি এবং অনিয়মিত। হিমসাগর আম পূর্ণতাপ্রাপ্ত হলে এর গড়ন বুকের দিকটা গোলাকার এবং অবতল বা সাইনাস থেকে সামান্য লম্বাটে আকার নিয়ে শীর্ষদেশ গোলাকৃতির হয়ে থাকে। পরিপক্ব হিমসাগর আমের রং হালকা সবুজ। পাকার পরেও সবুজ থেকে যায়। ত্বক মসৃণ, খোসা পাতলা। আমটির ঠোঁট নেই। হিমসাগর অত্যন্ত উৎকৃষ্ট স্বাদের সুগন্ধযুক্ত আম। শাঁস নরম এবং আঁশবিহীন। শাঁস কমলা রঙের। আমটির খাবারের উপযোগী অংশ ৬৭ দশমিক ৫ ভাগ। হিমসাগর আম সুমিষ্ট। টিএসএস বা মিষ্টতার পরিমাণ শতকরা ২২ দশমিক ৮৪ ভাগ। পরিপক্ব আম সংগ্রহ করার পর আট দিন পর্যন্ত ঘরে রাখা যায়। ফলটির গড় ওজন ২১৯ গ্রাম। লম্বায় ৮ দশমিক ৬৯ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। ফলের বোঁটা বেশ শক্ত বলে ঝোড়ো হাওয়া সহ্য করার ক্ষমতা রাখে। ক্ষীরশাপাতি আমের সঙ্গে হিমসাগর আমের বেশ কিছুটা সাদৃশ্য থাকার কারণে এই আমকে অনেকেই ক্ষীরশাপাতি মনে করে ভুল করে থাকেন। আবার ক্ষীরশাপাতি আমকে হিমসাগর নামে বিক্রি করা হয়। ক্ষীরশাপাতি ও হিমসাগর আমকে আলাদা করা সহজ হবে রঙের পার্থক্য দেখে। পাকার পর ক্ষীরশাপাতি আমের ওপরের অংশ হলুদ রং ধারণ করবে। এ ক্ষেত্রে হিমসাগর আম পাকার পরেও সবুজাভ হালকা হলুদ রঙের হবে।

চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, সাতক্ষীরা এবং ভারতের নদীয়া জেলায় উৎপাদিত হিমসাগর আমের সঙ্গে ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলায় উৎপাদিত শাদওয়ালা বা শাদৌলা নামের অতি উৎকৃষ্ট জাতের আমের অনেক সাদৃশ্য রয়েছে। একই কথা ক্ষীরশাপাতির ক্ষেত্রেও বলা যায়। মুর্শিদাবাদের নবাব শাদৌলা আমের সবচেয়ে বড় সমঝদার ছিলেন বলে জানা যায়।

চাঁদপুর সদর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা কৃষিবিদ আয়শা আক্তার বলেন, প্রযুক্তিকে শিক্ষার কাজে সঠিক ভাবে ব্যবহার করতে না পারলে, প্রতিযোগিতার এই যুগে সবার থেকে পিছিয়ে পড়বে শিক্ষার্থীরা। বিদ্যালয়ের আঙ্গিনায় শিক্ষার্থীদের নিয়ে গাছে কলম পদ্ধতি শিখানো হচ্ছে , এটা একটি ভালো দিক। এখন হাতে কলমের শিক্ষার গুরুত্ব অনেক। এতে শিক্ষার্থীরা নিজেরাও শিখলো এবং অন্যকেও শেখাতে পারবে। তিনি আরো বলেন, একজন শিক্ষার্থী কোথাও বেড়াতে গেলে সেখানে ভালো ফল পেলে, ওই গাছ থেকে কলম নিয়ে নিজের আঙ্গিনায় গ্রাফটিং পদ্ধতিতে লাগাতে পারবে। এতে করে অন্য জেলার ভালো ফলগুলো স্থানীয়ভাবে আমরা উৎপাদন করতে পারবো।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়