চাঁদপুর, শনিবার, ২৫ জুন ২০২২, ১১ আষাঢ় ১৪২৯, ২৪ জিলকদ ১৪৪৩  |   ৩১ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতি শিক্ষা স্বাস্থ্য সারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   পদ্মা সেতু : কোন খাতে কত ব্যয়
  •   স্বপ্নের পদ্মা সেতু : অসাধ্যকে সাধন করার মহাকাব্য
  •   বাবুরহাট কলেজের সহকারী অধ্যাপক কামরুজ্জামানের ইন্তেকাল
  •   পদ্মা সেতু উদ্বোধন উদ্‌যাপনে চাঁদপুরেও উৎসবের আমেজ
  •   আজ সেই মাহেন্দ্রক্ষণ : স্বপ্নের পদ্মা সেতু উদ্বোধন

প্রকাশ : ২৪ জুন ২০২২, ০০:০০

মুহাম্মদ (সাঃ)-এর প্রতি ভালোবাসা
অনলাইন ডেস্ক

মহান আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর প্রিয় হাবীব মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সাঃ)কে অত্যন্ত ভালোবাসেন। তাঁকে সাইয়্যেদুল আম্বিয়া, ইমামুল মুরসালিন, খাতামুন নাবিয়্যিন, রহমাতুল্লিল আলামিন, শাফিউল মুজনাবিন হিসেবে জমিনে পাঠিয়েছেন। নবীজি মুহাম্মাদ (সাঃ)-এঁর উচিলায় এ জগৎ সৃষ্টি হয়েছে। সে নবীর প্রতি ভালোবাসা প্রতিটি ঈমানদারদের প্রতি ফরজ। আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেন, ‘নবী মুমিনদের কাছে তাদের নিজেদের চেয়েও অধিক ঘনিষ্ঠ।’ (সূরা আল আহযাব : ৬)।

হাদীস শরীফে হযরত আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সাঃ) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে কেউ (পূর্ণ) মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা, তার সন্তান এবং অন্যান্য সকল মানুষ থেকে প্রিয়তম হব।’ (বুখারী ও মুসলিম)।

পবিত্র কুরআনে এসেছে, আল্লাহ মুমিনদের প্রতি বড় অনুগ্রহ করেছেন, তিনি তাদেরই নিজেদের মধ্য হতে তাদের নিকট রাসূল প্রেরণ করেছেন। যিনি তাদের সামনে আল্লাহর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করেন, তাদেরকে পরিশুদ্ধ করেন এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমাহ শিক্ষা দেন, যদিও তারা এর আগে সুস্পষ্ট গোমরাহীতে লিপ্ত ছিল। (সূরা আলে ইমরান-১৬৪)।

আব্দুল্লাহ ইবনে হিশাম (রাঃ) বলেন, একদিন আমরা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে ছিলাম। নবীজী ওমর (রাঃ)-এর হাত ধরা ছিলেন। ওমর (রাঃ) বলে উঠলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি আমার কাছে সবকিছু থেকে প্রিয়, তবে আমার জান ছাড়া। তখন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, না ওমর, এতে হবে না। যে সত্তার হাতে আমার জান তাঁর কসম! (ততক্ষণ পর্যন্ত তুমি পূর্ণাঙ্গ মুমিন হতে পারবে না,) যতক্ষণ না আমি তোমার কাছে তোমার জানের চেয়েও প্রিয় না হই। পরক্ষণেই ওমর (রাঃ) বললেন, হ্যাঁ এখন তা হয়েছে; আল্লাহর কসম! (এখন থেকে) আপনি আমার কাছে আমার জানের চেয়েও প্রিয়। তখন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ ওমর! এখন হয়েছে। (সহীহ বুখারী : ৬৬৩২)। নবীজী (সাঃ) বলেছেন, যে যাকে ভালবাসে তার সাথেই তার হাশর হবে। (সহীহ মুসলিম-২৬৪০)।

যুগে যুগে বিভিন্ন নবী এবং রাসূল মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর সুসংবাদ তাঁদের উম্মতদের প্রদান করেছেন। পবিত্র কুরআনে ২৬নং সূরা শুয়ারার ১৯৬নং আয়াতে এসেছে, ‘আর নিশ্চয়ই তাহার (মুহাম্মাদ (সাঃ))-এর বর্ণনা পূর্ববর্তী কিতাবসমূহে রয়েছে।’ অর্থাৎ যেমন শেষ নবীর আগমনবার্তা ও তাঁর সুন্দর চারিত্রিক গুণাবলির বর্ণনা পূর্বের ধর্মগ্রন্থসমূহে রয়েছে। অনুরূপ কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার সুসংবাদও পূর্বের কিতাবসমূহে দেয়া হয়েছিলো।

মহান আল্লাহ তা’য়ালা পবিত্র কুরআনুল কারীমে আরো ইরশাদ করেন, স্মরণ করো, যখন মারইয়ামের পুত্র ‘ঈসা বলেছিল, ‘হে বানী ইসরাঈল! আমি তোমাদের প্রতি আল্লাহর রসূল, আমার পূর্ববর্তী তাওরাতের আমি সত্যায়নকারী এবং আমি একজন রসূলের সুসংবাদদাতা যিনি আমার পরে আসবেন, যার নাম আহমাদ।’ অতঃপর সে [অর্থাৎ ‘ঈসা (আঃ) যাঁর সম্পর্কে সুসংবাদ দিয়ে ছিলেন সেই নবী] যখন তাদের কাছে সুস্পষ্ট নিদর্শন নিয়ে আসলো, তখন তারা বললো, ‘এটা তো স্পষ্ট যাদু।’ (৬১ সূরা সাফ-৬)।

এখানে ঈসা আলাইহিস সালাম কর্তৃক সুসংবাদ প্রদত্ত সেই রাসূলের নাম বলা হয়েছে আহমদ। আমাদের প্রিয় শেষ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামণ্ডএর নাম মুহাম্মদ, আহমদ এবং আরও কয়েকটি নাম ছিল। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আমার কয়েকটি নাম রয়েছে, আমি ‘মুহাম্মাদ’, আমি ‘আহমাদ’, আমি ‘মাহী’ বা নিশ্চিহ্নকারী; যার মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ কুফারী নিশ্চিহ্ন করে দিবেন। আর আমি ‘হাশির’ বা একত্রিতকারী; আমার কদমের কাছে সমস্ত মানুষ জমা হবে। আর আমি ‘আকিব' বা পরিসমাপ্তিকারী। [বুখারী : ৩৫৩২, ৪৮৯৬, মুসলিম : ২৩ : ৫৪, তিরমিয়ী : ২৮৪০, মুসনাদে আহমাদ : ৪/৮০, ইবনে হিব্বান : ৬৩১৩]। তবে রাসূলের নাম এ কয়টিতে সীমাবদ্ধ নয়। অন্য হাদীসে আরও এসেছে, আবু মূসা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই আমাদেরকে তার নাম উল্লেখ করেছেন, তন্মধ্যে কিছু আমরা মুখস্ত করতে সক্ষম হয়েছিলাম। তিনি বলেছিলেন, আমি ‘মুহাম্মাদ’ ‘আহমাদ’, হাশির, মুকাফফি (সর্বশেষে আগমনকারী), নাবিইউত তাওবাহ (তাওবাহর নবী), নাবীইউল মালহামাহ (সংগ্রামের নবী)। [মুসলিম : ২৩৫৫, মুসনাদে আহমাদ : ৪/৩৯৫, ৪০৪, ৪০৭]।

ঈসা আলাইহিস সালামের সুসংবাদ প্রদানের কথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীসেও এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীগণ তাকে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদেরকে আপনার নিজের সম্পর্কে কিছু বলুন। জবাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “আমি আমার পিতা (পিতৃপুরুষ) ইবরাহীমের দেয়া, ঈসা এর সুসংবাদ এবং আমার মা যখন আমাকে গর্ভে ধারণ করেছিলেন তখন তিনি স্বপ্নে দেখেছিলেন যে, তার থেকে একটি আলো বের হয়ে সিরিয়ার বুসরা নগরীর প্রাসাদসমূহ আলোকিত হয়ে গেছে।’ [মুস্তাদরাকে হাকিম : ২/৬০০]। অনুরূপ বর্ণনা আরও আছে [মুসনাদে আহমাদ : ৫/২৬২], এমনকি এ সুসংবাদের কথা হাবশার বাদশাহ নাজাসীও স্বীকার করেছিলেন। [দেখুন, মুসনাদে আহমদ : ১/৪৬১-৪৬২]।

পবিত্র কুরানে আরো এসেছে, ‘বলুন, ‘হে মানুষ! নিশ্চয় আমি তোমাদের সবার প্রতি আল্লাহ্র রাসূল, যিনি আসমানসমূহ ও যমীনের সার্বভৌমত্বের অধিকারী। তিনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই; তিনি জীবিত করেন ও মৃত্যু ঘটান। কাজেই তোমারা ঈমান আন আল্লাহ্র প্রতি ও তাঁর রাসূল উম্মী নবীর প্রতি যিনি আল্লাহ ও তাঁর বাণীসমূহে ঈমান রাখেন। আর তোমারা তার অনুসরণ কর, যাতে তোমারা হিদায়াতপ্রাপ্ত হও।’ (৭ সূরা আরাফ-১৫৮)।

এ আয়াতে ইসলামের মূলনীতি-সংক্রান্ত বিষয়গুলোর মধ্য থেকে রিসালাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আলোচিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাত সমগ্র দুনিয়ার সমস্ত জিন ও মানবজাতি তথা কেয়ামত পর্যন্ত আগত তাদের বংশধরদের জন্যে ব্যাপক। তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সাধারণভাবে ঘোষণা করে দেয়ার জন্যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, আপনি মানুষকে বলে দিন, ‘আমি তোমাদের সবার প্রতি নবীরূপে প্রেরিত হয়েছি’। আমার নবুওয়ত লাভ ও রিসালাতপ্রাপ্তি বিগত নবীগণের মতো কোনো বিশেষ জাতি কিংবা বিশেষ ভূখণ্ড অথবা কোনো নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে নয়; বরং সমগ্র বিশ্ব মানবের জন্যে, বিশ্বের প্রতিটি অংশ, প্রতিটি দেশ ও রাষ্ট্র এবং বর্তমান ও ভবিষ্যত বংশধরদের জন্য কেয়ামতকাল পর্যন্ত তা পরিব্যাপ্ত। অন্য আয়াতেও এসেছে, ‘আর আমরা তো আপনাকে কেবল সমগ্র মানবজাতির প্রতি সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি’ [সূরা সাবা : ২৮]। অনুরূপভাবে সূরা আলে ইমরান : ২০, সূরা আল-আনআম : ৯০, সূরা হূদ : ১৭, সূরা ইউসুফ ১০৪, সূরা আল-আম্বিয়া : ১০৭, সূরা আল-ফুরকান : ১, সূরা ছোয়াদ : ৮৭, সূরা আল-কালাম : ৫২ ও সূরা আত-তাকওয়ীর : ২৭।

হাফেজ ইবনে কাসীর রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, এ আয়াতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খাতামুন্নাবিয়ীন বা শেষ নবী হওয়ার বিষয়ে ইঙ্গিত করা হয়েছে। কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আবির্ভাব ও রিসালাত যখন কেয়ামত পর্যন্ত আগত বংশধরদের জন্যে এবং সমগ্র বিশ্বের জন্যে ব্যাপক, তখন আর অন্য কোনো নতুন রাসূলের প্রয়োজনীয়তা অবশিষ্ট থাকেই না। [ইবন কাসীর]।

অন্য বর্ণনায় এসেছে, তাবুক যুদ্ধের সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করছিলেন। সাহাবায়ে কেরামের ভয় হচ্ছিল যে, শক্ররা না এ অবস্থায় আক্রমণ করে বসে। তাই তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চারদিকে সমবেত হয়ে গেলেন। রাসূল সালাত শেষ করে বললেন, আজকের রাতে আমাকে এমন পাঁচটি বিষয় দান করা হয়েছে, যা আমার পূর্বে আর কোন নবী-রাসূলকে দেয়া হয়নি। তার একটি হল এই যে, আমার রিসালাত ও নবুওয়াতকে সমগ্র দুনিয়ার জাতিসমূহের জন্য ব্যাপক করা হয়েছে। আর আমার পূর্বে যত নবী-রাসূলই এসেছেন, তাদের দাওয়াত ও আবির্ভাব নিজ নিজ সম্প্রদায়ের সাথে সম্পৃক্ত ছিল। দ্বিতীয়ত, আমাকে আমার শক্রর মোকাবেলায় এমন প্রভাব দান করা হয়েছে যাতে তারা যদি আমার কাছ থেকে এক মাসের দূরত্বেও থাকে, তবুও তাদের উপর আমার প্রভাব ছেয়ে যাবে। তৃতীয়ত, কাফেরদের সাথে যুদ্ধে প্রাপ্ত মালে-গনীমত আমার জন্য হালাল করে দেয়া হয়েছে। অথচ পূর্ববতী উম্মতদের জন্য তা হালাল ছিলো না। বরং এসব মালের ব্যবহার মহাপাপ বলে মনে করা হত। তাদের গনীমতের মাল ব্যয়ের একমাত্র স্থান ছিল এই যে, আকাশ থেকে বিদ্যুৎ এসে সে সমস্তকে জ্বালিয়ে ভষ্ম করে দিয়ে যাবে। চতুর্থত, আমার জন্য সমগ্র ভূমণ্ডলকে মসজিদ করে দেয়া হয়েছে এবং পবিত্র করার উপকরণ বানিয়ে দেয়া হয়েছে, যাতে আমাদের সালাত যমীনের যে কোন অংশে, যে কোন জায়গায় শুদ্ধ হয়, কোন বিশেষ মসজিদে সীমাবদ্ধ না হয়। পক্ষান্তরে পূর্ববর্তী উম্মতদের ইবাদাত শুধু তাদের উপাসনালয়েই হত, অন্য কোথাও নয়। নিজেদের ঘরে কিংবা মাঠে-ময়দানে তাদের সালাত বা ইবাদাত হত না। তাছাড়া পানি ব্যবহারের যখন সামর্থ্য না থাকে, তা পানি না পাওয়ার জন্য হোক কিংবা কোন রোগ-শোকের কারণে, তখন মাটির দ্বারা তায়াম্মুম করে নেয়াই পবিত্রতা ও অযুর পরিবর্তে যথেষ্ট হয়ে যায়। পূর্ববর্তী উম্মতদের জন্য এ সুবিধা ছিল না। অতঃপর বললেন, আর পঞ্চমটি এই যে, আল্লাহ্ তা’আলা তাঁর প্রত্যেক রাসূলকে একটি দোআ কবুল হওয়ার এমন নিশ্চয়তা দান করেছেন, যার কোনো ব্যতিক্রম হতে পারে না। আর প্রত্যেক নবী-রাসূলই তাদের নিজ নিজ দো’আকে বিশেষ বিশেষ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে নিয়েছেন এবং সে উদ্দেশ্যও সিদ্ধ হয়েছে। আমাকে তাই বলা হল যে, আপনি কোন একটা দোআ করুন। আমি আমার দো’আকে আখেরাতের জন্য সংরক্ষিত করে রেখেছি। সে দো’আ তোমাদের জন্য এবং কেয়ামত পর্যন্ত (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ) আল্লাহ ছাড়া কোন হক মা’বুদ নেই কালেমার সাক্ষ্য দানকারী যেসব লোকের জন্ম হবে, তাদের কাজে লাগবে। [মুসনাদে আহমাদ : ২/২২২]।

আবু মূসা আশ’আরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে উদ্ধৃত বর্ণনায় আরো উল্লেখ রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে লোক আমার আবির্ভাব সম্পর্কে শুনবে, তা সে আমার উম্মতদের মধ্যে হোক কিংবা ইয়াহুদীনাসারা হোক, যদি সে আমার উপর ঈমান না আনে, তাহলে জাহান্নামে যাবে। [মুসনাদে আহমাদঃ ২/৩৫০]।

সারমর্ম এই যে, এ আয়াতের দ্বারা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বংশধরদের জন্যে, প্রত্যেক দেশ ও ভূখণ্ডের অধিবাসীদের জন্যে এবং প্রত্যেকটি জাতি ও সম্প্রদায়ের জন্যে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যাপকভাবে রাসূল হওয়া প্রমাণিত হয়েছে। সাথে সাথে একথাও সাব্যস্ত হয়ে গেছে যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আবির্ভাবের পর যে লোক তার প্রতি ঈমান আনবে না, সে লোক কোনো সাবেক শরীআত ও কিতাবের কিংবা অন্য কোনো ধর্ম ও মতের পরিপূর্ণ আনুগত্য একান্ত নিষ্ঠাপরায়ণভাবে করতে থাকা সত্বেও কষ্মিনকালেও মুক্তি পাবে না।

মুহাম্মাদ (সাঃ)কে মুহাব্বত করাই ঈমান

মহান আল্লাহ তা’য়ালা পবিত্র কুরআনুল কারীমে ইরশাদ করেন, বলুন, ‘তোমরা যদি আল্লহকে ভালবাস তবে আমাকে অনুসরণ কর, আল্লাহ্ তোমাদেরকে ভালবাসবেন এবং তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করবেন। আল্লাহ্ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সূরা আলে ইমরান ৩১)।

ভালোবাসা একটি গোপন বিষয়। কারো প্রতি কারো ভালোবাসা আছে কি না, অল্প আছে কি বেশি আছে, তা জানার একমাত্র মাপকাঠি হলো, অবস্থা ও পারস্পরিক ব্যবহার দেখে অনুমান করা অথবা ভালোবাসার চিহ্ন ও লক্ষণাদি দেখে জেনে নেয়া। যারা আল্লাহ্কে ভালোবাসার দাবিদার এবং আল্লাহ্র ভালোবাসা পাওয়ার আকাঙ্খী, আলোচ্য আয়াতসমূহে আল্লাহ্ তা’আলা স্বীয় ভালোবাসার মাপকাঠি তাদের বলে দিয়েছেন। অর্থাৎ জগতে যদি কেউ আল্লাহ্র ভালোবাসার দাবি করে, তবে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অনুসরণের কষ্টিপাথরে তা যাচাই করে দেখা অত্যাবশ্যকীয়। এতে আসল ও মেকী ধরা পড়বে। যার দাবি যতটুকু সত্য হবে, সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণে ততটুকু যত্নবান হবে এবং তার শিক্ষার আলোকে পথের মশালরূপে গ্রহণ করবে। পক্ষান্তরে যার দাবি দুর্বল হবে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণে তার দুর্বলতা সেই পরিমাণে পরিলক্ষিত হবে। ভালোবাসা অনুসারে মানুষের হাশরও হবে। হাদীসে এসেছে, আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, এক লোক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলো, হে আল্লাহ্র রাসূল! কিয়ামত কখন হবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তুমি এর জন্য কি তৈরি করেছো? লোকটি বলল, আমি এর জন্য তেমন সালাত, সাওম ও সাদকা করতে পারিনি, তবে আমি আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসি। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘তুমি তার সাথেই থাকবে যাকে তুমি ভালোবাস’। [বুখারী : ৬১৭১]।

ইয়াহুদী এবং খ্রিস্টান উভয় জাতিরই দাবি ছিলো, আমরা আল্লাহ তা’য়ালাকে ভালোবাসি এবং মহান আল্লাহ আমাদেরকে ভালোবাসেন। বিশেষ করে খ্রিস্টানরা ঈসা এবং তাঁর মা মারিয়্যাম (আলাইহিমাসসালাম)-এর প্রতি ভক্তি ও ভালোবাসায় এতো বাড়াবাড়ি করল যে, তাঁদেরকে উপাস্যের আসনে বসিয়ে দিলো। আর এটাও তারা এই মনে করে করতো যে, এর দ্বারা তারা আল্লাহর নৈকট্য এবং তাঁর সন্তুষ্টি ও ভালোবাসা লাভে ধন্য হতে পারবে। মহান আল্লাহ বললেন, কেবল মৌখিক দাবি এবং মনগড়া তরীকায় আল্লাহর ভালোবাসা এবং তাঁর সন্তুষ্টি লাভ করা যায় না। এ সব লাভ করার পথ তো একটাই। আর তা হলো, শেষ নবী মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর উপর ঈমান আনা এবং তাঁর অনুসরণ করা। এই আয়াতে সমস্ত ভালোবাসার দাবিদারদের জন্যে একটি পথই নির্দিষ্ট করা হয়েছে। অতএব, আল্লাহর ভালোবাসার অনুসন্ধানী যদি মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর অনুসরণের মাধ্যমে তা অনুসন্ধান করে, তাহলে অবশ্যই সে সফল হবে এবং স্বীয় দাবিতে সত্য প্রমাণিত হবে। অন্যথা সে মিথ্যুক হবে এবং উদ্দেশ্য হাসিলেও ব্যর্থ হবে।

আল্লাহ তা’য়ালা আরো ইরশাদ করেন, ‘বলুন, ‘তোমরা আল্লাহ্ ও রাসূলের আনুগত্য কর।’ তারপর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে নিশ্চয় আল্লাহ্ কাফেরদেরকে পছন্দ করেন না।’ (আলে ইমরান-৩২)।

আয়াতের শেষে বলা হয়েছে যে, ‘নিশ্চয় আল্লাহ্ কাফেরদেরকে পছন্দ করেন না’। এ থেকে বোঝা গেলো যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করা ফরজ। আল্লাহর আনুগত্য ও রাসূলের আনুগত্যের মধ্যে তারতম্য করা যাবে না। আল্লাহর নির্দেশ যেমন মানতে হবে, তেমনি রাসূলের নির্দেশও মানতে হবে। কেউ আল্লাহ্র আনুগত্য করলো কিন্তু রাসূলের আনুগত্য করলো না, সে কুফরীর গ-ি থেকে বের হতে পারলো না। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আমি যেন কাউকে এ রকম না দেখতে পাই যে, সে সোফায় হেলান দিয়ে বসে আছে, তখন তার কাছে আমি যে সমস্ত আদেশ-নিষেধ দিয়েছি সে সমস্ত আদেশ-নিষেধের কোন কিছু এসে পড়লো, তখন সে বলল, আমরা জানি না, আমরা আল্লাহর কিতাবে যা পেয়েছি তার অনুসরণ করেছি’। [আবু দাউদ ৪৬০৫, তিরমিযী : ২৬৬৩ ও ইবনে মাজাহ : ১৩]।

সুতরাং কোনো ঈমানদারের পক্ষে রাসূলের আদেশ-নিষেধ পাওয়ার পর সেটা কুরআনে নেই বলে বাহানা করার কোনো সুযোগ নেই। যদি তা করা হয় তবে তা হবে সুস্পষ্ট কুফরী। এই আয়াতে আল্লাহর আনুগত্য করার সাথে সাথে রসূল (সাঃ)-এর অনুসরণ করার প্রতি পুনরায় তাকীদ করে এ কথা পরিষ্কার করে দেয়া হয়েছে যে, এখন মুক্তির পথই হলো কেবল মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর অনুসরণ করা। আর এ থেকে বিমুখ হলে, তা হবে কুফরী এবং এমন কুফরীর কাফেরদেরকে আল্লাহ পছন্দ করেন না। তাতে তারা আল্লাহর ভালোবাসা ও তাঁর নৈকট্য লাভের যতোই দাবি করুক না কেনো।

সর্বোপরি কথা হলো, রাসূল (সাঃ)-এর প্রেমণ্ডভালোবাসাই ঈমান। রাসূল (সাঃ)-এর অনুসরণে আল্লাহর অনুসরণ হয়। রাসূল (সাঃ)-এর অনুসরণে দুনিয়া ও আখেরাতে কামিয়াবী হাসিল হয়।

মুফতি মুহাঃ আবু বকর বিন ফারুক : ইমাম ও খতিব, বিষ্ণুপুর, মনোহরখাদী মদিনাবাজার বাইতুল আমিন জামে মসজিদ, চাঁদপু সদর, চাঁদপুর।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়