চাঁদপুর, বুধবার, ৩০ নভেম্বর ২০২২, ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪  |   ২৫ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতি শিক্ষা স্বাস্থ্য সারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   সেতু নির্মাণ হলে ঢাকা -চাঁদপুর সদরের দূরত্ব কমবে ৫২ কিলোমিটার
  •   মেঘনায় ট্রলারের ধাক্কায় জেলে নিখোঁজ
  •   নৌ-ধর্মঘট প্রত্যাহার, সকাল থেকে লঞ্চ চলাচল শুরু
  •   মতলব উত্তরে আবারও সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৩
  •   কবরবাসী ইব্রাহিম এসএসসি‘তে পেয়েছে “এ“

প্রকাশ : ২৫ নভেম্বর ২০২২, ০০:০০

ইসলামে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা
অনলাইন ডেস্ক

ইসলামে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব অপরিসীম। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই সর্বত্র ইসলামী সঠিক আদর্শ বাস্তবায়ন হয়। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ধনী-গরিব সমঅধিকার। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কে ছেলে? কে বাবা? কে মা? কে ভাই-বোন? আত্মীয়-স্বজন এটা বিবেচ্য নয়। বরং সঠিকভাবেই বিচার পরিচালনা করতে হবে। স্বজনপ্রীতি করা যাবে না। প্রকৃত দোষীকেই শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

মহান আল্লাহ তা’য়ালা পবিত্র কুরআনুল কারিমে এরশাদ করেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ ও আত্মীয়স্বজনদের দানের নির্দেশ দেন এবং তিনি নিষেধ করেন অশ্লীলতা, অসৎ কাজ ও সীমা লংঘন করতে। তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দেন যাতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ কর। (সূরা ১৬ আন-নাহাল-আয়াত নং ৯০)

আল্লাহ তা’য়ালা আরও এরশাদ করেন, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ দিচ্ছেন আমানতসমূহ তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দিতে। আর যখন মানুষের মধ্যে ফয়সালা করবে তখন ন্যায়ভিত্তিক ফয়সালা করবে। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে কতইনা সুন্দর উপদেশ দিচ্ছেন। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছু শোনেন, সবকিছু দেখেন। (সূরা ৪. আন-নিসা- আয়াত নং ৫৮)

আল্লাহ তা’য়ালা আরও এরশাদ করেন, হে মুমিনগণ, তোমরা ন্যায়ের উপর সুপ্রতিষ্ঠিত থাকবে আল্লাহর জন্য সাক্ষীরূপে। যদিও তা তোমাদের নিজদের কিংবা পিতা-মাতার অথবা নিকটাত্মীয়দের বিরুদ্ধে হয়। যদি সে বিত্তশালী হয় কিংবা দরিদ্র, তবে আল্লাহ উভয়ের ঘনিষ্ঠতর। সুতরাং ন্যায়প্রতিষ্ঠা করতে তোমরা প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না। আর যদি তোমরা ঘুরিয়ে- পেঁচিয়ে কথা বল কিংবা এড়িয়ে যাও তবে আল্লাহ তোমরা যা কর সে বিষয়ে সম্যক অবগত। (সূরা ৪ আন-নিসা, আয়াত নং ১৩৫)

আল্লাহ তা’য়ালা আরও এরশাদ করেন, তাদের মধ্যে ইনসাফের সাথে মীমাংসা কর এবং ন্যায়বিচার কর। নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়বিচারকারীদের ভালবাসেন।(সূরা ৪৯ আল-হুজুরাত,আয়াত নং ৯)

আল্লাহ তা’য়ালা আরও এরশাদ করেন, নিশ্চয় মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই। সুতরাং তোমরা তোমাদের ভাইদের মধ্যে আপোষ- মীমাংসা করে দাও। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, আশা করা যায় তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হবে। (সূরা ৪৯. আল-হুজুরাত,আয়াত নং ১০)

আল্লাহ তা’য়ালা আরও এরশাদ করেন, হে মু’মিনগণ! তোমরা ন্যায়ের সাক্ষ্যদাতা হিসেবে আল্লাহর পথে দৃঢ়ভাবে দন্ডায়মান থাক, কোন সম্প্রদায়ের প্রতি শত্রুতা তোমাদেরকে যেন এতটা উত্তেজিত না করে যে তোমরা ইনসাফ করা ত্যাগ করবে, সুবিচার কর, এটা তাক্বওয়ার নিকটবর্তী, নিশ্চয় তোমরা যা কর, আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক অবহিত (সূরা ৫. আল-মায়েদা,আয়াত নং ৮)

আল্লাহ তা’য়ালা আরও এরশাদ করেন, আর যদি বিচার নিষ্পত্তি করেন তবে তাদের মধ্যে ন্যায়বিচার করবেন; নিশ্চয়ই আল্লাহ্ ন্যায়পরায়ণদেরকে ভালবাসেন।(সূরা ৫, মায়েদা -৪২)

আল্লাহ তা’য়ালা আরও এরশাদ করেন, আর তুমি তাদের মধ্যে বিচার ফয়সালা কর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তদনুযায়ী, তাদের খেয়াল খুশির অনুসরণ করবে না। আর তাদের থেকে সতর্ক থাক তারা যেন আল্লাহ তোমার প্রতি যা নাযিল করেছেন তার কোন বিভ্রান্ত করতে না পারে। যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে জেনে রেখ, আল্লাহ তাদের কোন কোন পাপের কারণে তাদেরকে শাস্তি প্রদান করবেন, মানুষদের অধিকাংশই নাফরমানই হয়ে থাকে। (সূরা ৫, মায়েদা ৪৯)

আল্লাহ তা’য়ালা আরও এরশাদ করেন, নিশ্চয়ই আমি আমার রাসূলদেরকে প্রেরণ করেছি স্পষ্ট প্রমাণসহ এবং তাদের সঙ্গে দিয়েছি কিতাব ও ন্যায় নীতি, যাতে মানুষ সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে। (সূরা ৫৭. আল-হাদীদ,আয়াত নং ২৫)

আল্লাহ তা’য়ালা আরও এরশাদ করেন, এবং বল, ‘আল্লাহ যে কিতাব নাযিল করেছেন আমি তাতে ঈমান এনেছি এবং তোমাদের মধ্যে ন্যায়বিচার করতে আমি আদিষ্ট হয়েছি। আল্লাহ আমাদের রব এবং তোমাদের রব। আমাদের কর্ম আমাদের এবং তোমাদের কর্ম তোমাদের; আমাদের ও তোমাদের মধ্যে কোন বিবাদণ্ডবিসম্বাদ নেই; আল্লাহ আমাদেরকে একত্র করবেন এবং প্রত্যাবর্তন তাঁরই কাছে’। (সূরা ৪২. আশ-শূরা,আয়াত নং ১৫)

আল্লাহ তা’য়ালা আরও এরশাদ করেন, আল্লাহ কি বিচারকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বিচারক নন? (সূরা ৯৫. আত-তীন -আয়াত নং ৮)

আল্লাহ তা’য়ালা আরও এরশাদ করেন, সময়ের কসম,নিশ্চয় সকল মানুষ ক্ষতিগ্রস্ততায় নিপতিত। কিন্তু তারা নয় যারা ঈমান এনেছে, সৎকাজ করেছে, পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দিয়েছে এবং পরস্পরকে ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে।( সূরা ১০৩. আল-আসর, আয়াত নং ১,২,৩)

ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সম্পর্কে হাদীস শরীফে সুন্দর বিবৃতি রয়েছে। নি¤েœ হাদিসের আলোকে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার বিষয়টি আরো অবগত হবো। আবু হুরাইরা (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তা’আলা সাত ব্যক্তিকে সেই দিনে তাঁর (আরশের) ছায়া দান করবেন যেদিন তাঁর ছায়া ব্যতীত আর কোন ছায়া থাকবে না; (তারা হল,) ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ (রাষ্ট্রনেতা), সেই যুবক যার যৌবন আল্লাহ আযযা অজাল্লার ইবাদতে অতিবাহিত হয়, সেই ব্যক্তি যার অন্তর মসজিদসমূহের সাথে লটকে থাকে (মসজিদের প্রতি তার মন সদা আকৃষ্ট থাকে।) সেই দুই ব্যক্তি যারা আল্লাহর সন্তুষ্টিলাভের উদ্দেশ্যে বন্ধুত্ব ও ভালোবাসা স্থাপন করে; যারা এই ভালোবাসার উপর মিলিত হয় এবং এই ভালোবাসার উপরেই চিরবিচ্ছিন্ন (তাদের মৃত্যু) হয়। সেই ব্যক্তি যাকে কোন কুলকামিনী সুন্দরী (অবৈধ যৌন-মিলনের উদ্দেশ্যে) আহবান করে, কিন্তু সে বলে, ‘আমি আল্লাহকে ভয় করি।’ সেই ব্যক্তি যে দান ক’রে গোপন করে; এমনকি তার ডান হাত যা প্রদান করে, তা তার বাম হাত পর্যন্তও জানতে পারে না। আর সেই ব্যক্তি যে নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে; ফলে তার উভয় চোখে পানি বয়ে যায়।(বুখারী ৬৬০, ১৪২৩, ৬৮০৬, মুসলিম ২৪২৭) হাদিসটি সহীহ।

আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহর নিকট যারা ন্যায়পরায়ণ তারা দয়াময়ের ডান পার্শ্বে জ্যোতির মিম্বরের উপর অবস্থান করবে। আর তাঁর উভয় হস্তই ডান। (ঐ ন্যায়পরায়ণ তারা) যারা তাদের বিচারে, পরিবারে এবং তার কর্তৃত্ব ও নেতৃত্বাধীন ব্যক্তিবর্গের ব্যাপারে ন্যায়নিষ্ঠ।(মুসলিম ৪৮২৫)হাদিসটি সহীহ

ইয়ায ইবনে হিমার (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামণ্ডকে বলতে শুনেছি, জান্নাতী তিন প্রকার। (১) ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ, যাকে ভাল কাজ করার তাওফীক দেওয়া হয়েছে। (২) ঐ ব্যক্তি যে প্রত্যেক আত্মীয়-স্বজন ও মুসলিমের প্রতি দয়ালু ও নম্র-হৃদয় এবং (৩) সেই ব্যক্তি যে বহু সন্তানের (গরীব) পিতা হওয়া সত্ত্বেও হারাম ও ভিক্ষাবৃত্তি থেকে দূরে থাকে।(মুসলিম ৭৩৮৬) হাদিসটি সহীহ

আমর বিন আস (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, বিচারক যদি সুবিচারের প্রয়াস রেখে বিচার করে অতঃপর তা সঠিক হয়, তবে তার জন্য রয়েছে দুটি সওয়াব। আর সুবিচারের প্রয়াস রেখে যদি বিচারে ভুল করেও বসে, তবে তার জন্যও রয়েছে একটি সওয়াব।(বুখারী ৭৩৫২, মুসলিম ৪৫৮৪) হাদিসটি সহীহ

আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি বিচারক-পদ গ্রহণ করল অথবা যাকে লোকেদের (কাযী বা) বিচারক নিযুক্ত করা হল, তাকে যেন বিনা ছুরিতে যবাই করা হল। অন্য বর্ণনায় শব্দ ভিন্ন অর্থ একই। (আবূ দাউদ ৩৫৭১, তিরমিযী ১৩২৫, ইবনে মাজাহ ২৩০৮, হাকেম ৪/৯১, সহীহুল জামে’ ৬৫৯৪) হাদিসের মানঃ সহিহ

বুরাইদা (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, কাযী (বিচারক) তিন প্রকার। এদের মধ্যে একজন জান্নাতী এবং অপর দু’জন জাহান্নামী।

জান্নাতী হল সেই বিচারক যে ‘হক’ (সত্য) জানল এবং সেই অনুযায়ী বিচার করল। আর যে বিচারক ‘হক’ জানা সত্ত্বেও অবিচার করল সে জাহান্নামী এবং যে বিচারক না জেনে (বিনা ইলমে) লোকেদের বিচার করল সেও জাহান্নামী। (আবূ দাউদ ৩৫৭৩, তিরমিযী ১৩২২, ইবনে মাজাহ ২৩১৫, সহীহুল জামে’ ৪৪৪৬) হাদিসের মানঃ সহিহ

আবূ উমামা (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি নিজের কসম দ্বারা কোন মুসলিমের অধিকার হরণ করে, সে ব্যক্তির জন্য আল্লাহ দোযখ ওয়াজেব এবং জান্নাত হারাম করে দেন। লোকেরা বলল, ‘যদিও সামান্য কিছু হয় তাও, হে আল্লাহর রসূল!’ বললেন, যদিও বা পিল্লু (গাছের) একটি ডালও হয়।(মালিক, মুসলিম ৩৭০, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ ২৩২৪)হাদিসটি সহীহ

আবূ যার (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি এমন জিনিস দাবী করে যা তার নয়, সে ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয়। আর সে যেন নিজের ঠিকানা জাহান্নামে বানিয়ে নেয়।(ইবনে মাজাহ ২৩১৯, সহীহুল জামে’ ৫৯৯০) হাদিসটি সহীহ

খাওলা আনসারিয়্যাহ (রাঃ) বলেন, তিনি শুনেছেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, নিশ্চয় কিছু লোক আল্লাহর মাল নাহক ব্যয়-বন্টন করবে। সুতরাং তাদের জন্য কিয়ামতের দিন জাহান্নামের আগুন রয়েছে।(বুখারী ৩১১৮)হাদিসটি সহীহ

আনাস (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, এই নেতৃত্ব থাকবে কুরাইশদের মাঝে। যতক্ষণ তাদের কাছে দয়া ভিক্ষা করা হলে তারা দয়া করবে, বিচার করলে ইনসাফ করবে, বিতরণ করলে ন্যায়ভাবে করবে। তাদের মধ্যে যে তা করবে না, তার উপর আল্লাহ, ফিরিশতামণ্ডলী এবং সমস্ত মানবমণ্ডলীর অভিশাপ। তার নিকট থেকে নফল-ফরয কোন ইবাদতই কবূল করা হবে না।(আহমাদ ১২৯০০, ১৯৫৪১, আবূ য়্যা’লা ৪০৩২-৪০৩৩, ত্বাবারানী ৭২৪, সিঃ সহীহাহ ২৮৫৮) হাদিসটি সহীহ

আব্দুল্লাহ বিন আবী আওফা (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, নিশ্চয় মহান আল্লাহ বিচারকের সাথে থাকেন, যতক্ষণ সে অন্যায়বিচার করে না। অতঃপর সে যখন অন্যায়বিচার করে, তখন তিনি তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেন এবং শয়তানকে তার সাথী বানিয়ে দেন।(তিরমিযী ১৩৩০, হাকেম ৭০২৬, বাইহাক্বী ১৯৯৫৪, সহীহুল জামে’ ১৮২৭)। হাদিসটি সহীহ।

আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, (প্রাচীনকালে) একজন লোক অন্য ব্যক্তির কাছ হতে কিছু জায়গা ক্রয় করল। ক্রেতা ঐ জায়গায় (প্রোথিত) একটি কলসী পেল, যাতে স্বর্ণ ছিল। জায়গার ক্রেতা বিক্রেতাকে বলল, ‘তোমার স্বর্ণ নিয়ে নাও। আমি তো তোমার জায়গা খরিদ করেছি, স্বর্ণ তো খরিদ করিনি।’ জায়গার বিক্রেতা বলল, ‘আমি তোমাকে জায়গা এবং তাতে যা কিছু আছে সবই বিক্রি করেছি।’ অতঃপর তারা উভয়েই এক ব্যক্তির নিকট বিচার প্রার্থী হল। বিচারক তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমাদের সন্তান আছে কি?’ তাদের একজন বলল, ‘আমার একজন ছেলে আছে।’ অপরজন বলল, ‘আমার একটি মেয়ে আছে।’ বিচারক বললেন, ‘তোমরা ছেলেটির সাথে মেয়েটির বিয়ে দিয়ে দাও এবং ঐ স্বর্ণ থেকে তাদের জন্য খরচ কর এবং দান কর।(বুখারী ৩৪৭২, মুসলিম ৪৫৯৪) হাদিসটি সহীহ

উক্ত রাবী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামণ্ডকে বলতে শুনেছেন যে, দু’জন মহিলার সাথে তাদের দু’টি ছেলে ছিল। একদা একটি নেকড়ে বাঘ এসে তাদের মধ্যে একজনের ছেলেকে নিয়ে গেল। একজন মহিলা তার সঙ্গিনীকে বলল, ‘বাঘে তোমার ছেলেকেই নিয়ে গেছে।’ অপরজন বলল, ‘তোমার ছেলেকেই বাঘে নিয়ে গেছে।’ সুতরাং তারা দাঊদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট বিচারপ্রার্থিনী হল। তিনি (অবশিষ্ট ছেলেটি) বড় মহিলাটির ছেলে বলে ফায়সালা করে দিলেন। অতঃপর তারা দাঊদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পুত্র সুলায়মান সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট বের হয়ে গিয়ে উভয়েই আনুপূর্বিক ঘটনাটি বর্ণনা করল। তখন তিনি বললেন, ‘আমাকে একটি চাকু দাও। আমি একে দু টুকরো করে দু’জনের মধ্যে ভাগ ক’রে দেব।’ তখন ছোট মহিলাটি বলল, ‘আপনি এরূপ করবেন না। আল্লাহ আপনাকে রহম করুন। ছেলেটি ওরই।’ তখন তিনি ছেলেটি ছোট মহিলার (নিশ্চিত জেনে) ফায়সালা দিলেন।(বুখারী ৩৪২৭, ৬৭৬৯, মুসলিম ৪৫৯২) হাদিসটি সহীহ

আবূ সাঈদ ও আবূ হুরাইরা (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ যখনই কোন নবী প্রেরণ করেন এবং কোন খলীফা নির্বাচিত করেন, তখনই তাঁর জন্য দু’জন সঙ্গী নিযুক্ত ক’রে দেন। একজন সঙ্গী তাঁকে ভাল কাজের নির্দেশ দেয় এবং তার প্রতি উৎসাহিত করে। আর দ্বিতীয়জন সঙ্গী তাঁকে মন্দ কাজের নির্দেশ দেয় এবং তার প্রতি উৎসাহিত করে। আর রক্ষা পান কেবলমাত্র তিনিই, যাকে আল্লাহ রক্ষা করেন।(বুখারী ৬৬১১, ৭১৯৮) হাদিসটি সহীহ

আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন আল্লাহ কোন শাসকের মঙ্গল চান, তখন তিনি তার জন্য সত্যনিষ্ঠ (শুভাকাঙ্ক্ষী) একজন মন্ত্রী নিযুক্ত করে দেন। শাসক (কোন কথা) ভুলে গেলে সে তাকে তা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং স্মরণ থাকলে তার সাহায্য করে। আর যখন আল্লাহ তার অন্য কিছু (অমঙ্গল) চান, তখন তার জন্য মন্দ মন্ত্রী নিযুক্ত করে দেন। শাসক বিস্মৃত হলে সে তাকে স্মরণ করিয়ে দেয় না এবং স্মরণ থাকলে তার সাহায্য করে না। (আবূ দাঊদ ২৯৩৪, উত্তম সূত্রে মুসলিমের শর্তে) হাদিসটি সহীহ

ইবনে উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, প্রতিটি মানুষই দায়িত্বশীল। সুতরাং প্রত্যেকে অবশ্যই তার অধীনস্থদের দায়িত্বশীলতার বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। দেশের শাসক জনগণের দায়িত্বশীল। সে তার দায়িত্বশীলতার ব্যাপারে জবাবদিহী করবে। পুরুষ তার পরিবারের দায়িত্বশীল। অতএব সে তার দায়িত্বশীলতার বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। স্ত্রী তার স্বামীগৃহের দায়িত্বশীলা। কাজেই সে তার দায়িত্বশীলতা বিষয়ে জিজ্ঞাসিতা হবে। দাস তার প্রভুর সম্পদের দায়িত্বশীল। সে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে। তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকেই নিজ নিজ অধীনস্থের দায়িত্বশীলতার ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে।(বুখারী ৮৯৩, ২৪০৯, ৫১৮৮ প্রভৃতি, মুসলিম ৪৮২৮) হাদিসটি সহীহ

আনাস বিন মালিক (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, আল্লাহ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তা’আলা প্রত্যেক রক্ষককে তার রক্ষণাবেক্ষণ সম্পর্কে এবং প্রত্যেক তত্ত্বাবধায়ক ও অভিভাবককে তার তত্ত্বাবধান ও অভিভাবকত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন করবেন। যথার্থই কি তারা তাদের কর্তব্য পালন করেছে, অথবা অবহেলা হেতু তা বিনষ্ট করেছে? (নাসাঈ ৯১৭৪ ইবনে হিব্বান ৪৪৯২, সহীহুল জামে’ ১৭৭৪) হাদিসটি সহীহ

আবূ য়্যা’লা মা’ক্বিল ইবনে য়্যাসার (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, ‘‘কোন বান্দাকে আল্লাহ কোন প্রজার উপর শাসক বানালে, যেদিন সে মরবে সেদিন যদি সে প্রজার প্রতি ধোঁকাবাজি ক’রে মরে, তাহলে আল্লাহ তার প্রতি জান্নাত হারাম ক’রে দেবেন।’’ (বুখারী ৭১৫১, মুসলিম ৩৮০, ৪৮৩৪)

অন্য এক বর্ণনায় আছে, ‘‘অতঃপর সে (শাসক) তার হিতাকাঙ্ক্ষীতার সাথে তাদের অধিকারসমূহ রক্ষা করল না, সে জান্নাতের সুগন্ধটুকুও পাবে না।’’ (বুখারী ৭১৫০)

মুসলিমের অন্য এক বর্ণনায় আছে, ‘‘যে কোন আমীর মুসলিমদের দেখাশুনার দায়িত্ব নিল, অতঃপর সে তাদের (সমস্যা দূর করার) চেষ্টা করল না এবং তাদের হিতাকাক্সক্ষী হল না, সে তাদের সঙ্গে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’’ (মুসলিম ৩৮৩, ৪৮৩৬) হাদিসটি সহীহ

পরিশেষে বলতে হয়, অনেক ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার প্রাপ্তিতে বৈষম্যের শিকার হতে হয়। গরিবরা বিচারের ফাঁকে আটকে যান, ধনীরা তা থেকে রেহাই পেয়ে যান। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব বিচারের থেকে বের হয়ে যান। কিন্তু অন্য লোকেরা ন্যায়বিচার প্রাপ্তিতে বাধাগ্রস্ত হন। ন্যায়বিচার প্রাপ্তিতে অন্যতম প্রতিবন্ধক উৎকোচ গ্রহণ। উৎকোচ গ্রহনের কারনে ন্যায়বিচার না পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এজন্য কোরআন হাদিসের আলোকে আমাদের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তবেই ইসলামের প্রকৃত অনুসারী হিসেবে আমরা পরিগণিত হবো। মহান আল্লাহ তা’য়ালা আমাদেরকে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার তাওফিক দান করুক। আমিন।

লেখক : খতিব, বিষ্ণুপুর মনোহরখাদী মদিনা বাজার বাইতুল আমীন জামে মসজিদ, চাঁদপুর সদর, চাঁদপুর।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়