চাঁদপুর, রবিবার, ২২ মে ২০২২, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯, ২০ শাওয়াল ১৪৪৩  |   ২৮ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতি শিক্ষা স্বাস্থ্য সারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   চাঁদপুর ডায়াবেটিক সমিতির ৭ম বার্ষিক সাধারণ সভা
  •   ইভিএম’র ভুল ধরতে পারলে ১০ মিলিয়ন ডলার পুরস্কার
  •   মতলব দক্ষিণে মাদক বিক্রিতে বাধা দেয়ায় ছেলেকে না পেয়ে বাবাকে মারধর
  •   ভুয়া বিচারপতি বিপ্লব এখন কারাগারে
  •   মতলব দক্ষিণে কীটনাশক খেয়ে বৃদ্ধের আত্মহত্যা

প্রকাশ : ১১ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০০

মমতা : গ্রামীণ নারীর প্রেম-বেদনার উপাখ্যান
সাজেদুর আবেদীন শান্ত

উপন্যাস আমাদের যাপিত জীবনের বিশেষ অনুষঙ্গ। দেশ, জাতি, সমাজ, পরিবারের দর্পণ। একজন ঔপন্যাসিক তার দেখা জগতকে তুলে ধরেন পাঠকের সামনে। তাই বাংলা সাহিত্যের সব শাখার মধ্যে সমকালীন পাঠকের কাছে উপন্যাস সবচেয়ে বেশি আগ্রহের বিষয়। উপন্যাসের পাঠকসংখ্যাও তাই বেশিই বলা যায়। উপন্যাস আমারও আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু।

গেলো বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকাশ হয়েছে কথাশিল্পী সালাহ উদ্দিন মাহমুদের প্রথম উপন্যাস ‘মমতা’। সম্প্রতি শেষ করলাম উপন্যাসটি। প্রথমেই বলে রাখি, সালাহ উদ্দিন মাহমুদ একাধারে কবি, গল্পকার, প্রাবন্ধিক, নাট্যকার, সাহিত্য সমালোচক ও সাংবাদিক। তার আটটি বইয়ের মধ্যে আমার এই একটি বইই পড়ার সৌভাগ্য হয়েছে। এর বিষয়বৈচিত্র্য আমার ভালো লেগেছে।

উপন্যাসটি প্রেমের হলেও একে সামাজিক উপন্যাসই বলা চলে। উপন্যাসে লেখক ত্রিকোণ প্রেম, পরকীয়া, প্রবাস জীবন, গ্রামীণ জনপদ, সামাজিক রীতি-নীতি, ধর্মাচার, কুসংস্কার এবং অনিশ্চিত জীবনের কাহিনি তুলে ধরেছেন। আগেই বলেছি, উপনাসটি মূলত ভালোবাসার। তবে উপন্যাস পড়লে এর অন্তর্নিহিত বেদনার কথাও জানতে পারবেন পাঠক।

মমতা উপন্যাসে নব্বই দশক বা এর আগে-পরের গ্রামের চিত্র চিত্রায়িত হয়েছে। বিশেষ করে পায়ে হাঁটা ও নৌকাই গ্রামের যাতায়াত ব্যবস্থা, সন্ধ্যায় কেরোসিন দিয়ে হারিকেন জ্বালানোর আগে হারিকেনের চিমনি পরিষ্কার করা যেন নব্বই দশকের গ্রামবাংলার চিত্র মনে করিয়ে দেয়। সেই সময়ের এক ভাগ্যবিড়ম্বিত নারী মমতা। মমতাকে কেন্দ্র করেই এগিয়েছে কাহিনি।

উপন্যাসটি শুরু হয়েছে একটি এলাকার বর্ণনা দিয়ে। এলাকার নাম শশীর চর। লেখক শশীর চরের বর্ণনা দিয়েছেন সবুজ-শ্যামল এলাকা হিসেবে। যে এলাকার পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে আড়িয়াল খাঁ নদ। বাজারি নৌকা, ইঞ্জিনচালিত নৌকায় সরগরম থাকে এলাকা। শান্তশিষ্ট এলাকা, যা মৌসুমী ফসলে সব সময় সেজে ওঠে। গ্রামের মানুষেরা কৃষি কাজই করেন বেশি।

উপন্যাসের প্রধান চরিত্র মমতা। মমতার স্বামী জালাল ও মমতার প্রেমিক রাশেদের চরিত্রও ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত। তবে আমার মনে হয়েছে, স্বামী জালালের চেয়ে উপন্যাসের কাহিনি বর্ণনায় রাশেদের চরিত্রই প্রাধান্য পেয়েছে। প্রবাসী জালালের উপস্থিতি বেশি না হলেও প্রাসঙ্গিক কারণে এসেছে বেশ কয়েকবার।

মমতার স্বামী একজন প্রবাসী। তখন গ্রাম থেকে বিদেশে যাওয়ার প্রাথমিককাল। জমি-জিরাতের কাজ ফেলে গ্রামের তরুণ-মধ্যবয়সীরা ছুটছে বিদেশের উদ্দেশ্যে। জালালও বিদেশ যায়। বিদেশ বলতে তারা দুবাইকেই চেনে। বিদেশ গিয়ে জালাল মাঝে মাঝে চিঠি দিলেও মাসখানেক আগে থেকে একদম চিঠি দেয়া বন্ধ করে দেয়। জালালের বাবা অর্থাৎ মমতার শ^শুর নিয়মিত পোস্ট অফিসে গিয়ে চিঠি খোঁজেন। পোস্ট মাস্টার আফছার উদ্দিনের কাছে জানতে চান তার ছেলে কোনো চিঠি দিয়েছে কি-না। কিন্তু পোস্ট মাস্টারের জবাবে হতাশ হয়ে ফিরে আসেন। এভাবে কাহিনি বর্ণনা হতে থাকে উপন্যাসে। সেই সময়ে মমতার প্রেমিক রাশেদ বিদেশ থেকে দেশে ফেরেন। এক রাতে রাশেদ আসে মমতার ঘরে। তাদের পুরোনো প্রেম আর বাধা মানে না। লিপ্ত হয় শারীরিক সম্পর্কে। ভোর রাতে মমতার ঘর থেকে চলে যায় রাশেদ। সকালে মমতার কক্ষের খাটের পাশে তার শাশুড়ি রাশেদের মানিব্যাগ কুড়িয়ে পায়।

এর আগেও মমতা-রাশেদের শারীরিক সম্পর্ক হয় একটি জঙ্গলে। প্রথমবার বিদেশফেরত রাশেদ মমতার বিবাহের খবর শুনে আহত হয়। যোগাযোগের চেষ্টা করে করে একদিন পেয়ে যায় মোক্ষম সুযোগ। জালালের অনুপস্থিতি যখন হতাশায় ফেলে মমতাকে। এভাবেই মমতা-রাশেদের অনিশ্চিত সম্পর্ক এগিয়ে যায়।

তারই ধারাবাহিকতায় মমতার গর্ভে আসে রাশেদের সন্তান। রাশেদ আবার প্রবাসী হয়। কিন্তু জানতে পারে না মমতার পরিণতি। প্রবাসের কঠিন জীবন পেরিয়ে জালাল একদিন দেশে ফিরে আসে। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। সমাজের কানাকানি মমতাকে বিষিয়ে তোলে। ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে জালাল। বাজারে বিশাল সালিসে মমতাকে অপমান করা হয়। ঘটনাগুলো খুবই নিপুণভাবে বর্ণনা করা হয়েছে উপন্যাসটিতে।

সবশেষে বদলে যায় মমতার জীবন। সন্তান প্রসবের পর রাতের অন্ধকারে গ্রাম ছাড়ে মমতা। মমতার বাবার মৃত্যু, সমাজপতিদের রক্তচক্ষু, মমতার অনিশ্চিত জীবন, সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে লেখকের সুগভীর চিন্তা পাঠককে ভাবতে বাধ্য করবে। মমতা উপন্যাসের প্রতিটি চরিত্র পাঠকের জন্য একেকটি বার্তা বয়ে এনেছে। কিশোরী মমতার বিয়ে আমাদের তৎকালীন সমাজব্যবস্থার দিকে আঙুল তুলেছে।

এর বাইরে বিদেশ থেকে চিঠি লেখা, কথা রেকর্ড করে পাঠানো, একজনের চিঠি অন্যকে দিয়ে পড়ানো, বিদেশ থেকে পাঠানো ক্যাসেট উঠানে বসে শোনা, বিদেশে যাওয়ার আগে মিলাদ পড়ানোসহ নানাবিধ বিষয় উঠে এসেছে। এছাড়া এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি, মোবাইল ফোন ব্যবহার, এলাকাভিত্তিক উন্নয়ন, প্রবাসীদের দিনবদলের চিত্রও সুনিপুণভাবে তুলে ধরেছেন লেখক। সবমিলিয়ে একে নারী অধিকারের প্রামাণ্য দলিলও বলা যায়।

যা-ই হোক, উপন্যাসটি পড়ে আমার মনে হয়েছে, লেখক এখানে প্রেম-ভালোবাসা ও ক্ষণিকের শান্তির চেয়ে অন্তরের বেদনাকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন। লেখক বঞ্চিত নারীর হৃদয়ের গভীর ক্ষত ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন। উপন্যাসের কাহিনি আমাকে মুগ্ধ করেছে। আশা করি অন্য পাঠককেও আকৃষ্ট করবে।

যে কথা না বললেই নয়, বইটির প্রচ্ছদ আমার নজর কেড়েছে। বইটির বাঁধাইসহ ভেতরের পাতাগুলো উন্নত। বইটির ভেতরে ভুল-ত্রুটি তেমন চোখে পড়েনি আমার। তবে মনে হয়েছে, পরকীয়ার কাহিনিতে লেখক তাড়াহুড়া করেছেন। খুব দ্রুত বিষয়টি শেষ করেছেন। আরেকটু বর্ণনা থাকলে আরও ভালো লাগত। আমি লেখক ও উপন্যাসটির সাফল্য কামনা করছি। আশা করি উপন্যাসটি পড়ে আপনাদের ভালো লাগবে। আমি ‘মমতা’র বহুল পাঠ কামনা করছি।

বই : মমতা

বইয়ের ধরণ : উপন্যাস

লেখক : সালাহ উদ্দিন মাহমুদ

প্রচ্ছদ : আরিফুল হাসান

প্রকাশক : অন্যধারা

প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ২০২১

মূল্য : ২০০ টাকা।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়