চাঁদপুর, শুক্রবার, ২ ডিসেম্বর ২০২২, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ৭ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪  |   ২৯ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতি শিক্ষা স্বাস্থ্য সারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   কচুয়ায় আলোর মশালের সপ্তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে করোনাযোদ্ধা ও রক্তদাতাদের সংবর্ধনা
  •   সেভ দ্য ফিউচার ফাউন্ডেশন’র সহযোগিতায় ঘরের স্বপ্ন পূরণ হলো প্রতিবন্ধী রিপনের
  •   চাঁদপুরে বিশ্ব এইডস দিবস পালিত
  •   হাজীগঞ্জে মডেল হসপিটালের উদ্বোধন
  •   চাঁদপুর রেলওয়ের সাবেক টিএক্সারের ইন্তেকাল

প্রকাশ : ০৮ আগস্ট ২০২২, ০০:০০

বঙ্গবন্ধুর রবীন্দ্রনাথ : সংকট উত্তরণের শক্তিসুধা
অনলাইন ডেস্ক

বঙ্গবন্ধু ও রবীন্দ্রনাথের কথা একই পরিপ্রেক্ষিতে আলোচনা করতে গেলে মহাকর্ষ বলের কথা মনে পড়ে যায়। মহাকাশ বিজ্ঞান আমাদের জানিয়ে দেয়, এই মহাবিশ্বে প্রতিটি বস্তুকণা একে অপরকে নিজেদের দিকে আকর্ষণ করে। বঙ্গবন্ধু ও রবীন্দ্রনাথ এই মহাবিশ্বের মানব বসতিতে দুই অনন্য জ্যোতিষ্কের মতো, যাঁদের আপন আলোর প্রভায় মুগ্ধ হয়ে আছে বিশ্ব। যদিও দুজনের জন্ম দুটি ভিন্ন শতকে, তবুও জ্যোতিষ্কমণ্ডলীর টানের মতোই একে অপরের দিকে ধাবিত হয়েছেন নিয়তির ইচ্ছেতে। আঠারোশ একষট্টি সালের বৈশাখে জন্ম নেয়া রবীন্দ্রনাথ ঊনিশশো কুড়ি সালের চৈত্রে ধরায় অবতীর্ণ হওয়া শেখ মুজিবের চেয়ে ষাট বছরের বড় হলেও তিনি তাঁর ‘সভ্যতার সংকট’ শীর্ষক প্রবন্ধে যে ত্রাণকর্তার কথা উল্লেখ করেছেন কাঙ্ক্ষিত সেই ত্রাণকর্তা পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর রূপ ধারণ করে সেই ভবিষ্যদ্বাণীকে সত্যে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আধ্যাত্মিক দার্শনিক ও ভবিষ্যদ্বক্তা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উক্ত প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘পরিত্রাণকর্তার জন্মদিন আসছে আমাদের এই দারিদ্র্য লাঞ্ছিত কুটিরের মধ্যে; অপেক্ষা করে থাকব, সভ্যতার দৈববাণী সে নিয়ে আসবে, মানুষের চরম আশ্বাসের কথা মানুষকে এসে শোনাবে এই পূর্বদিগন্ত থেকেই।’ যে মানুষটির জন্যে রবীন্দ্রনাথ আগ্রহভরে অপেক্ষা করেছিলেন, কালের চিত্রনাট্য অবলোকন করলে তাতে স্পষ্ট হয়ে যায়, এই লোকটি বঙ্গবন্ধু ছাড়া আর কেউই নন। একথা আরও স্পষ্ট হয়ে যায় তাঁর ‘স্বদেশী সমাজ’ প্রবন্ধ পাঠে। ‘স্বদেশী সমাজ’ প্রবন্ধে কবিগুরু বেশ জোরের সাথে লিখেছিলেন, ‘স্বদেশকে একটি বিশেষ ব্যক্তির মধ্যে আমরা উপলব্ধি করতে চাই। এমন একটি লোক চাই, যিনি আমাদের সমস্ত সমাজের প্রতিমাস্বরূপ হইবেন। তাহাকে অবলম্বন করিয়াই আমরা আমাদের বৃহৎ স্বদেশীয় সমাজকে ভক্তি করিব, সেবা করিব।’ বঙ্গবন্ধুর সমগ্র জীবনের প্রবাহের পর্যালোচনা থেকে এ কথা আর বলার অবকাশ থাকে না যে, বঙ্গবন্ধুই রবীন্দ্রনাথের সেই কাঙ্ক্ষিত স্বাজাত্যবোধ ধারণকারী নেতা যিনি স্বদেশী সমাজের মুক্তিবাণী ঘোষণা করেছিলেন।

বঙ্গবন্ধু নিজেও স্বীকার করে নিয়েছেন তাঁর স্বদেশী মানুষকে ভালোবাসতে শেখার অনুপ্রেরণার উৎসের কথা। তিনি স্কুলে নিচু ক্লাসে পড়ার সময় রবীন্দ্রনাথের ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতাটি পাঠের সুযোগ পেয়েছিলেন। ঐ সময়েই তিনি লক্ষ্য করলেন, ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ যেভাবে গ্রামের সহজ সরল মানুষের কথা তুলে ধরেছেন তা আর কেউ ফুটিয়ে তুলতে পারেনি। তিনি যখন পড়লেন, ‘তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ, আমি আজ চোর বটে’, তখন তাঁর মনে হলো, এ যেন তাঁর এবং তাঁরই মতো পল্লিবাসী সরল মানুষের বুকের দীর্ঘশ্বাস। এতো সাদামাটা কথায় বাস্তুহারা দুখি মানুষকে আর কেউ কবিতায় এভাবে আঁকতে পারেনি তাঁর মতো। সেই থেকে রবীন্দ্রনাথ তাঁর মনে স্থায়ী আসন গেঁড়ে নিলেন জীবন-সঙ্কটে পথ-প্রদর্শক হিসেবে। তিনি বড় হয়ে আরও পাঠ গ্রহণ করে জানতে পারলেন, ‘নমো নমো নমো, সুন্দরী মম, জননী জন্মভূমি / গঙ্গার তীর, স্নিগ্ধ সমীর, জীবন জুড়ালে তুমি।’ বঙ্গবন্ধুর বয়ানে এই কবিতাই তাঁকে দেশপ্রেমের শিক্ষায় দীক্ষা দিয়েছে। রবীন্দ্রনাথ হতে পাওয়া দেশপ্রেমের শিক্ষাই তাঁকে দেশের মানুষকে ভালোবাসতে শিখিয়েছে। এভাবে বঙ্গবন্ধু রবীন্দ্রনাথকে আঁকড়ে ধরে বড় হতে থাকলেন। বয়সে নয়, মনে ও মননে। এক সময় তাঁর হাতে এলো কবিগুরুর ‘হে মোর দুর্ভাগা দেশ’ কবিতাটি। তিনি পড়লেন,

‘হে মোর দুর্ভাগা দেশ, যাদের করেছ অপমান,

অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।

মানুষের অধিকারে

বঞ্চিত করেছ যারে,

সম্মুখে দাঁড়ায়ে রেখে তবু কোলে দাও নাই স্থান

অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।’

এ যেন কবিতা নয়, শৃঙ্খলমুক্তির ইশতেহার। এ যেন বঙ্গবন্ধুর কাছে তাঁর সংগ্রামের মোক্ষবাণী। ধীরে ধীরে তাঁর হাতে উঠে এলো ‘সঞ্চয়িতা’। যে জেলেই তিনি যেতেন না কেন, রবীন্দ্রনাথের ‘সঞ্চয়িতা’ তাঁর সঙ্গী ছিল ছায়ার মতো লেপ্টে থেকে। বঙ্গবন্ধুকে আমরা আফসোস করতে দেখি, মিয়ানওয়ালী কারাগারে থাকাকালীন তিনি দুই মাস ‘সঞ্চয়িতা’র সঙ্গসুধা হতে বঞ্চিত ছিলেন। কারণ ওই কারাগারে কোন বাংলা ভাষায় রচিত গ্রন্থ ছিল না। মুজিব-তনয়া শেখ হাসিনার বক্তব্য হতে জানা যায়, বঙ্গবন্ধুর কাছে সঞ্চয়িতা এমন একটি বই ছিল যা তাঁর সাথে প্রতিটি জেলেই গিয়েছিল এবং প্রতিটি জেলের সিল মোহর তাতে উৎকীর্ণ ছিল। এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধুকে আক্ষেপ করতে শোনা যায়, মুক্তিযুদ্ধের সময় হানাদাররা তাঁর সেই ঐতিহাসিক ‘সঞ্চয়িতা’কে অন্যান্য বইয়ের সাথে পুড়িয়ে দিয়েছে। কারাগারে আটক থাকাকালীন বঙ্গবন্ধুর মনে তাঁর পিতামাতার জন্যে বেদনা তৈরি হলে তিনি দ্বারস্থ হতেন রবীন্দ্রনাথের ‘আত্মত্রাণ’ কবিতার। তিনি আউড়ে যেতেন,

‘বিপদে মোরে রক্ষা কর এ নহে মোর প্রার্থনা,

বিপদে আমি না যেন করি ভয়,

দুঃখণ্ডতাপে ব্যথিত চিতে নাই বা দিলে সান্ত¡না

দুঃখে যেন করিতে পারি জয়।’

শুধু তাই নয়, তাঁর কণ্ঠে গুণগুণ করে তিনি সুর ভাঁজতেন রবীন্দ্র সঙ্গীতের। তাঁর প্রিয় ছিল, ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে’, আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ, সত্য সুন্দর, সঙ্কোচের বিহ্বলতা নিজেরে অপমান, আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি... ইত্যাদি গানগুলো। ঊনিশশো বাহাত্তর সালের সাত ফেব্রুয়ারি তারিখে তাঁর সম্মানে কোলকাতায় যে অনুষ্ঠান করা হয়েছিল তাতে রবীন্দ্রনাথের ‘চিত্রাঙ্গদা’ নৃত্যনাট্য পরিবেশন করা হয়েছিল। তাঁরা শেখ মুজিবের রবীন্দ্রানুভূতির প্রগাঢ়তা সম্পর্কে জানতেন। সে সময় ভারত সফরকালে ভোজসভায় রবীন্দ্রনাথের গানই বাজানো হয়েছিল আবহ সঙ্গীত হিসেবে। গানগুলো ছিল, ‘‘আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ সত্য সুন্দর, যে রাতে মোর দুয়ারগুলি, ক্লান্তি আমার ক্ষমা করো প্রভু’ ইত্যাদি।

রবীন্দ্রনাথের একটি গান ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’ বঙ্গবন্ধুর প্রাণের গহীনে স্বদেশের প্রকৃতির মমতা মাখিয়ে দেয়। এ গানের প্রতি বঙ্গবন্ধুর ভালোবাসা এতই প্রগাঢ় যে, তিনি দফায় দফায় গানটি নিজে যেমন শুনেছেন, তেমনি অন্যকেও শুনিয়েছেন। এই গানটি ঊনিশশো পাঁচ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন উপলক্ষে রচিত ও গীত হয়েছিল। ঊনিশশো ছাপ্পান্ন সালের একদিন হঠাৎ গণিতজ্ঞ কাজী মোতাহার হোসেনের কন্যা সানজীদা খাতুনের ডাক পড়ল সেই গান গাওয়ার জন্যে। এমনিতেই সানজীদা খাতুন সেদিন কার্জন হলে বঙ্গবন্ধুর সামনে গান গাওয়ার জন্যে আমন্ত্রিত ছিলেন। বঙ্গবন্ধু তাঁকে ডেকে পাঠিয়েছেন পশ্চিম পাকিস্তান হতে আগত প্রতিনিধি দলকে ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’ গানটা গেয়ে শোনাতে। ভয়ে ভয়ে তিনি কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই গানটি গেয়ে শুনিয়েছিলেন। তিনি সেই ঘটনা হতে বুঝে নেন, ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’ গানটা হঠাৎ করে জাতীয় সঙ্গীত হয়নি, এটি অনেক পূর্ব পরিকল্পনার ফসল। ঊনিশশো ছেষট্টি সালে ঢাকার ইডেন হোটেলে আওয়ামী লীগের তিনদিনব্যাপী কাউন্সিল অধিবেশন শুরু হয়। কাউন্সিলের উদ্বোধন হয় এই গানটি পরিবেশনের মধ্য দিয়ে। পরবর্তীকালে ঊনিশশো একাত্তর সালের তেসরা জানুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি’ গানটি গাওয়ার মাধ্যমেই বঙ্গবন্ধু তাঁর জনসভা শুরু করেন। ঊনিশশো বাহাত্তর সালের আট জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে জীবিত অবস্থায় মুক্তি পেয়ে লন্ডন হয়ে দিল্লি আসার পথে ভারতীয় কূটনীতিক মিঃ শশাঙ্ক এস ব্যাণার্জিকে গানটি নিজে গেয়ে শোনান ও গাইতে বলেন। তিনি মনে করেন, এ গানটিই বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হওয়া উচিত। তাঁর সেই পরিকল্পনাকে তিনি বাস্তবায়িত করেন ঊনিশশো বাহাত্তর সালের তের জানুয়ারি অনুষ্ঠিত মন্ত্রীসভার বৈঠকে। এসময় গানটির প্রথম দশ লাইনকে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গ্রহণ করা হয়।

‘বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ পাঠে জানা যায়, কারা কর্তৃপক্ষ তাঁকে রবীন্দ্রনাথের ‘রাশিয়ার চিঠি’ বইটি পড়তে দেয়নি। কারণ তারা মনে করেছিল, এই বই বঙ্গবন্ধুর শক্তিসুধা, চিন্তার অমৃতধারা। কারাকর্তৃপক্ষের হেন আচরণে বঙ্গবন্ধু যারপরনাই ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। পশ্চিম পাকিস্তানের লাহোরে বঙ্গবন্ধু তাঁর রাজনৈতিক গুরু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে দেখা করতে গেলে সেখানকার আইনহীবী বন্ধুরা তাঁর কাছে বাংলা কবিতা শুনতে চান। বঙ্গবন্ধু তাদেরকে নজরুল ও রবীন্দ্রনাথের কবিতা শুনিয়ে দেন, যা শহীদ সোহরাওয়ার্দী ইংরেজিতে তর্জমা করে বুঝিয়ে দেন।

ঊনিশশো পঁয়ষট্টি সালে পাক-ভারত যুদ্ধের সময় পূর্ববঙ্গসহ পাকিস্তানে রবীন্দ্রনাথের গান নিষিদ্ধ হয়ে যায়। এরপর ঊনিশশো সাতষট্টি সালের তেইশে জুন পাকিস্তানের তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দীন রবীন্দ্র সঙ্গীতকে আমাদের সংস্কৃতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয় আখ্যা দিয়ে পাকিস্তান গণপরিষদে দেয়া ভাষণে রবীন্দ্র সঙ্গীত নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দেন। বঙ্গবন্ধুর দল আওয়ামী লীগ তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ জানিয়ে বলে, ‘ক্ষমতাবলে হয়তো সাময়িকভাবে রেডিও ও টেলিভিশন হইতে রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রচার বন্ধ করা যাইতে পারে। কিন্তু গণচিত্ত হইতে রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুমধুর আবেদনকে কোনো কালেই মুছিয়া ফেলা যাইবে না।’

আইয়ুব শাহীর কারাগার থেকে ঊনিশশো ঊনষট্টি সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মুক্তি পেয়ে বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে আয়োজিত বিশাল জনসভায় সরকারের ওই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ করেন। তেইশে ফেব্রুয়ারির ভাষণে তিনি বললেন, ‘আমরা মির্জা গালিব, সক্রেটিস, শেক্সপিয়ার, এরিস্টটল, দান্তে, লেনিন, মাও সেতুং পড়ি জ্ঞান আহরণের জন্য। আর দেউলিয়া সরকার আমাদের পাঠ নিষিদ্ধ করিয়া দিয়াছেন রবীন্দ্রনাথের লেখা; যিনি একজন বাঙালী কবি এবং বাংলায় কবিতা লিখিয়া যিনি বিশ্বকবি হইয়াছেন। আমরা এই ব্যবস্থা মানি না-আমরা রবীন্দ্রনাথের বই পড়িবই, আমরা রবীন্দ্রসঙ্গীত গাহিবই এবং রবীন্দ্রসঙ্গীত এই দেশে গীত হইবেই।’ জগন্নাথ কলেজে (বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) একবার রবীন্দ্রনাথের স্মরণ অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু গিয়েছিলেন অতিথি হয়ে। এসময় তিনি রবীন্দ্রনাথের গান ও কবিতায় বুঁদ হয়েছিলেন মনের আনন্দে। বঙ্গবন্ধু আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা হতে গণঅভ্যুত্থানের শক্তিতে মুক্তি পাওয়ার পর একদিকে আইয়ুব খানের যেমন পতন হয়, তেমনি অন্যদিকে তিনিও আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠেন। তাঁর চাপের কারণে তৎকালীন সম্প্রচার কর্তৃপক্ষ রেডিও-টেলিভিশনে রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রচারের সময় বাড়াতে বাধ্য হয়। ঊনিশশো ঊনসত্তর সালের ষোল ডিসেম্বর বাংলা একাডেমিতে আয়োজিত রবীন্দ্রসঙ্গীতের অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বেতার-টেলিভিশনে রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রচারের সময়সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব করে প্রধান অতিথির ভাষণ দেন। তিনি সে ভাষণে বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথ ছাড়া বাংলা ভাষা অসম্পূর্ণ এবং রবীন্দ্রনাথ তাঁর কাজের মাধ্যমে বাঙালির মাঝে আশা জাগিয়েছেন।’

ঊনিশশো বাহাত্তরের দশ জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করে তিনি যে ভাষণ দেন তাতে রবীন্দ্রনাথকে উল্লেখ করে তাঁর ‘বঙ্গমাতা’ কবিতার চরণ ধরে তিনি বলেছিলেন, ‘সাত কোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী, রেখেছ বাঙাল করে মানুষ করনি', হে কবিগুরু আপনি এসে দেখে যান, আপনার উক্তি আজ ভুল প্রমাণিত হয়েছে। আপনার বাঙালি আজ মানুষ হয়েছে। বঙ্গবন্ধু কবিগুরুকে এমনই ধারণ করতেন যে, তাঁর বক্তব্যে কবিগুরুর কবিতা হতে উদ্ধৃতি থাকতোই। বাহাত্তরের সাত ফেব্রুয়ারিতে বঙ্গবন্ধু ভারতে রাষ্ট্রীয় সফরে বক্তব্য প্রদানের সময় ভারতীয় জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেছিলেন,

‘নিঃস্ব আমি রিক্ত আমি

দেবার কিছু নাই,

আছে শুধু ভালোবাসা,

দিলাম আমি তাই।’

একই ভাষণে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি রবীন্দ্রনাথের ‘প্রান্তিক’ কাব্যগ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত করে বলেন,

‘নাগিণীরা দিকে দিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নিঃশ্বাস

শান্তির ললিতবাণী শুনাইবে ব্যর্থ পরিহাস।’

ঊনিশশো বাহাত্তর সালের আট মে রবীন্দ্রজন্মবার্ষিকীতে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে লক্ষ লক্ষ প্রাণ ও অপরিমেয় ত্যাগের বিনিময়ে। কিন্তু সত্য, শ্রেয়, ন্যায় ও স্বাজাত্যের যে চেতনা বাঙালি কবিগুরুর কাছ থেকে লাভ করেছেন, আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রামে তারও অবদান অনেকখানি।’ বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণের পরে আর বুঝতে কারো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়, রবীন্দ্রনাথ বঙ্গবন্ধুর কতটুকু স্থানজুড়ে ছিলেন।

রবীন্দ্রনাথের সৃজন-সরোবরে বঙ্গবন্ধুর নিত্য সন্তরণ সম্পর্কে সম্যক অবহিত হওয়া যায় ঊনিশশো চুয়াত্তর সালে বাংলা একাডেমি আয়োজিত আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন উদ্বোধনকালে। তাঁকে সাহিত্য সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানাতে গিয়েছিলেন বাংলা একাডেমির তৎকালীন কর্মকর্তাবৃন্দ। তিনি তাঁদের বলেছিলেন, ‘আমি রবীন্দ্রনাথ পড়ি, ভালোবাসি তাঁকে। সাহিত্যে আমার পুঁজি তো ওইটুকুই।’

সিলেটে জন্ম নেয়া ভারতীয় সাংবাদিক ও ছড়াশিল্পী অমিতাভ চৌধুরী যখন সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুকে প্রিয় কবিতা আওড়াতে বলেছিলেন, বঙ্গবন্ধু তখন রবীন্দ্রনাথের ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতার সাধারণ কয়েকটি লাইন অসাধারণ মমতায় আবৃত্তি করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর এই রবীন্দ্রপ্রেমে অভিভূত হয়েছিলেন অমিতাভ চৌধুরী। তাকে ডেকে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আচ্ছা, রবীন্দ্রনাথের এই চোখ দুটিতে কী আছে বলুন তো? দেখুন, দেখুন চেয়ে দেখুন, চোখ দুটিতে জ্বলজ্বল করছে মানুষের প্রতি ভালোবাসা। এ জন্যই তো তাঁকে আমি এত ভালোবাসি। আর এই ‘সঞ্চয়িতা’ সঙ্গে থাকলে আমি আর কিছুই চাই না।’ বাস্তবিক, বঙ্গবন্ধুকে বেশি টেনেছিল রবীন্দ্রনাথের কবিতা। নাটক বা উপন্যাস নয়।

প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে বঙ্গবন্ধু সকালে নাশতা সারতেন রবীন্দ্র সঙ্গীত শুনতে শুনতে। টুঙ্গীপাড়া যাওয়ার পথে নদীর দৃশ্য বিমোহিত হয়ে বঙ্গবন্ধু রবীন্দ্রনাথে মশগুল হয়ে আবৃত্তি করতেন,

‘নমো নমো নমো সুন্দরী মম জননী জন্মভূমি

গঙ্গার তীর স্নিগ্ধ সমীর, জীবন জুড়ালে তুমি

অবারিত মাঠ গগন ললাট চুমে তব পদধূলি

ছায়াসুনিবিড় শান্তির নীড় ছোট ছোট গ্রামগুলি

পল্লবগন আম্রকানন রাখালপর খেলাগেহ

স্তব্ধ অতল দীঘি কালোজল নিশীথ শীতল ¯েœহ।’

বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর হাতে শপথ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীরূপে সরকার গঠনের পর সাংবাদিক তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন তাঁর অনুভূতির কথা। তিনি এখানেও রবীন্দ্রনাথকে উদ্ধৃত করে বলেছেন,

‘উদয়ের পথে শুনি কার বাণী

ভয় নাই ওরে ভয় নাই

নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান

ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।’

বঙ্গবন্ধুর চিন্তাপ্রবাহে রবীন্দ্রনাথ প্রতিনিয়ত তরঙ্গ তুলে বয়ে যেতেন। পাকিস্তান প্রতিনিধি দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য শেখ মুজিব নয়া চীনের শান্তি সম্মেলনে গিয়ে বাংলায় বক্তৃতা দেয়ার যুক্তি তুলে ধরেছিলেন দুটি। প্রথমত পূর্ব বাংলার ছাত্ররা জীবন দিয়েছে বাংলা ভাষার জন্যে এবং বাংলা পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকের ভাষা। দ্বিতীয়ত বাংলা ভাষায় কবিতা লিখে রবীন্দ্রনাথ বিশ্বকবি হয়েছেন। শিক্ষিত লোক যিনি রবীন্দ্রনাথের নাম শোনেননি এমন লোক শুধু চীন কেন, পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও তিনি খুব কম দেখেছেন। এমনি করে দিবসলোকের মতো বাংলা ভাষা আর রবীন্দ্রনাথকে সমার্থক করে দেখার মধ্য দিয়েই বঙ্গবন্ধুর প্রগাঢ় রবীন্দ্রপ্রেম প্রকাশিত হয়ে যায়। কেবল তাই নয়, হয়তো নদীমাতৃক দেশের মানুষ বলেই বঙ্গবন্ধু তাঁর নির্বাচনী প্রতীক নৌকা বেছে নিয়েছেন। কিন্তু তার পেছনে রবীন্দ্রনাথের ‘সোনার তরী’র যে কোনো ভূমিকা নেই তা হলফ করে বলা যায় না। বঙ্গবন্ধু ও রবীন্দ্রনাথ উভয়েই বাঙালির মনন-মানস ও চেতনার নির্মাতা। বঙ্গবন্ধুর ভাষায় রবীন্দ্রনাথ যেমন বাঙালির মনে শ্রেয় ও স্বাজাত্যবোধের উদ্গীরণ ঘটিয়েছেন, তেমনি রবীন্দ্রনাথ বর্ণিত পরিত্রাণকারী মহানায়কের প্রতিচ্ছবিও ধারণ করেন বঙ্গবন্ধু। দিনশেষে রবীন্দ্রনাথ বঙ্গবন্ধুর সঙ্কটে শক্তিসুধার মতোই বিরাজিত থাকেন মহাকালের ইতিহাসে।

তথ্যসূত্র :

১. সঞ্চয়িতা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

২. সভ্যতার সঙ্কট, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

৩. অসমাপ্ত আত্মজীবনী, শেখ মুজিবুর রহমান

৪. আমার দেখা নয়া চীন, শেখ মুজিবুর রহমান

৫. শেখ মুজিব আমার পিতা, শেখ হাসিনা

৬. স্বদেশী সমাজ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

৭. সংস্কৃতির চড়াই-উৎরাই, সন্জীদা খাতুন

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়