শনিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১  |   ২৯ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতি শিক্ষা স্বাস্থ্য সারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   হাজীগঞ্জে অগ্নিকাণ্ড : গোডাউনসহ  ৪টি  ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পুড়ে  ছাই।
  •   চাঁদপুরে সর্বনিম্ন ৩ জনের করোনা শনাক্ত

প্রকাশ : ১৭ জুলাই ২০২১, ০০:০০

ঈদ সবার জন্যে আসে না

ইয়াছিন দেওয়ান

ঈদ সবার জন্যে আসে না
অনলাইন ডেস্ক

রমজান ডাকাতিয়া নদীর পাড়ে আছে। হঠাৎ করেই তার মনটা খারাপ হয়ে গেছে। তার মুখটা মেঘমালার মতো লাগছে! সে পাথরের মতো স্থির হয়ে ভাবছে, কিভাবে হুট করে বলে ফেলা কথাটা বাস্তবায়ন করবে।

তার এই মন খারাপের কারণ হলো, পাশের বাড়ির তার সমবয়সী আমিলের কথা পড়ে। সেই অধ্য বিকেলে কামিল আর রমজান মিলে চাঁদ দেখা উপলক্ষে মজা-মাস্তি করছিলো, তখন হঠাৎ করেই আমিল এসে বললো, ‘এই কামিল, আমার বাবা আমার জন্যে ঈদের সুন্দর সুন্দর পোশাক কিনেছি। কি বাহারি রকমের ডিজাইন। আধুনিক পোশাকের উপর চমৎকার কারুকাজ। দেখবি আয়।’

আর তুই কিনেছিস্ তো? তখন কামিল হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়লো। কিন্তু কথাটা রমজানের বুকে লাগলো। তার কাছে মনে হলো তাকে হামার দিয়ে বুক খণ্ড-বিখণ্ড করছে!

অথচ সেই আঘাত শরীরের কোনো ক্ষতি হয় না। কিন্তু হিয়ায় রক্তক্ষরণ হয়। আমিল বললো, আগে আমারটা দেখবো। তারপর রমজানের ঈদের পোশাক দেখবো। কথাটা বলার সাথে সাথে রমজান দারিদ্র্যতা লুকিয়ে বললো, আমি আমার ঈদের পোশাক কাউকে দেখাই না। কাউকেই না। প্রতিত্তোরে কামিল বললো, কেনো রে? রমজান আবারো মিথ্যার আশ্রয় নিলো। বললো, দাদি বলেছে, ঈদের আগে ঈদের পোশাক কাউকে দেখালে ঈদ শেষ হয়ে যায়। ঈদের আনন্দ থাকে না।

তখন আমিল সন্দেহ করে বললো, আমি জানি তোর জন্যে এখনো কেনা হয়নি। হুট করেই রমজান বললো, কিনেছে। তোরা কালকে দেখিস্। ওরা জোর করে বললো, প্লিজ দেখা। কিন্তু রমজান বললো, আমি দেখাবো না। অতঃপর তারা দুজনের রাগ করে চলে গেলো। তারপরেই রমজান নদীর পাড়ে এসে সেই যে বসা দিলো আর ওঠার নাম নেই।

সূর্য ডুবে গেছে। চারদিকে বাজি ফুটছে। ঈদের জামাতের অ্যালাউন্স হচ্ছে। কিন্তু রমজানের এখনো ঈদের পোশাক কেনা হয়নি। আর কিনে দিবেই বা কে? জন্মের এক বছর পার হতেই ওর বাবা না-ফেরার দেশে চলে গেছে। মা-ও নিজের স্বার্থে অন্যথায় চলে গেছে! ওর তিন কূল বলতে বৃদ্ধ এক দাদি আছে। সে নিজেই এখনো অন্যের বাসায় কাজ করে খেতে হয়।

এই রমজান মাসেও ঠিক করে ভালো করে খাবার মিলেনি। অথচ প্রতিবেশীরা সবাই বিত্তবান। এমনকি ওদের বাড়িতে দুজন শিল্পপতিও আছে! ওরা দুটো করে গরু কোরবান দেয়। অথচ রমজানের দাদির মতো অনেকেই দিনের পর দিন অনাহারে দিন কাটায়!

কোনোদিন দাদির প্রতি খেতে না পারার জন্যে অভিযোগ করেনি। এমনকি না খেয়ে থাকার জন্যে তার একটু কষ্ট হয় না। খারাপ লাগে না। বরং হাসি-খুশি দিন কাটায়। যার চাহিদা কম সেই জীবনে সুখি হতে পারে। এটা রমজান ভালোই বুঝে। কিন্তু একটা কথার জন্যে, সামান্য একটা পোশাকের জন্যে তার প্রথমবারের মতো মন খারাপ। সে এখন শান্ত। গভীর সমুদ্র!

সবাই আগামীকাল ঈদ করবে। কিন্তু রমজান ঘরেই বসে থাকতে হবে। বের হলেই ওকে অপমান করা হবে। রমজানের এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে, জেলখানাও এরচেয়ে ভালো। অত্যন্ত অপরাধীরাও ঈদের দিন আনন্দে থাকে। তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করা হয়।

চারদিকে অন্ধকার। শরীরের পশমও দেখা যায় না। হঠাৎ করেই রমজান তার হাতের দিকে তাকায়। তার হাত খুব কালো দেখা যায়। আচমকাই আমিলের বাবার কালো টাকার কথা মনে পড়ে। তাই তার মনটা ভালো হয়ে গেলো। সে নিজেকে এই ভেবে শান্তনা দিলো যে, তার বাবা রাতারাতি বড় লোক হয়ে গিয়েছিলো। একেবারে হুট করেই! এইতো সেদিন গরুর দালালি করতো। তারপর হুট করেই পাটের ব্যবসা ধরলো। তারপরেই অনেক টাকাওয়ালা!

অনেকেই তার পাটের রহস্য উন্মোচন করেছে। কিন্তু ক্ষমতাসীনদের সাথে ভালো সম্পর্ক বলে। কেউ তাদের কিছু বলার সাহস পায় না। গ্রামের অধিকাংশ লোকই গুঞ্জন করে। রমজান কোনোদিন দেখেনি। কিন্তু রমজান বিশ্বাস করে ‘যা রটে কিছু তো বটে’

উন্নতমানের সুঁতার সাথে নাকি ওর বাবা পেন্সিডাইরের বোতল বিন্যাস্ত ভাবে বেঁধে রাখে! তারপর পানিতে কখনো পাট কখনো মোস্তাইক কখনো ধইঞ্চার নিচে লুকিয়ে রাখে। তারপর গভীর রাতে সুঁতা ধরে টেনে টেনে ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করে! তার বাবার কালো টাকার কোনো মূল্য নেই। এগুলো হারাম ব্যবসা। তাছাড়া মানুষ ভালো জানে না। আমি গরিব ভালোই আছি। আমার পোশাক দরকার নাই। আমি বুক ফুলিয়ে কথা বলতে পারবো।

অবশেষে রমজান বাড়িতে এসে না খেয়েই শুয়ে পড়লো। দাদি তার মনোভাব বুঝতে পারলো। পরের দিন ভোরবেলা দাদি জাকাতের টাকা তুলে বাজার থেকে একটা সস্তা পাঞ্জাবি কিনলো। রেখে দিলো রমজানের বালিশের কাছে।

সকাল সাতটা। তার সমবয়সীদের হৈ-হুল্লোড় শব্দ শুনে ঘুম ভাঙলো। হঠাৎ চোখে পড়লো পাঞ্জাবির দিকে। দেখেই সে আনন্দে আত্মহারা। টান দিয়ে বুকে জড়িয়ে নিলো। এমনভাবে আদর শুরু করলো যেনো তার সন্তানকে কয়েক যুগ পড়ে কাছে পেয়েছে! অতঃপর দাদিকে পুকুর ঘাটে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো। দুইজনের সেই কি আনন্দের কান্না। অতঃপর রমজান সেই ঈদের পোশাক গায়ে দিয়ে ঈদগাহে চলে গেলো।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়