চাঁদপুর, শনিবার, ২ জুলাই ২০২২, ১৮ আষাঢ় ১৪২৯, ২ জিলহজ ১৪৪৩  |   ২৯ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতি শিক্ষা স্বাস্থ্য সারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   চাঁদপুরের সাবেক এসপি কৃষ্ণ পদ রায় সিএমপির কমিশনার
  •   চাঁদপুরের রোটার‌্যাক্ট ক্লাবগুলোর জিরো আওয়ার সেলিব্রেশন প্রোগ্রাম
  •   চাঁদপুর পৌরসভার অর্থায়নে একটা ব্লাড ব্যাংক করবো
  •   বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষাব্যবস্থা ঢেলে সাজানো হচ্ছে
  •   রোটারিয়ানগণ সেবামূলক যে মহৎ কার্যক্রম করছেন তা সত্যিই অনুকরণীয়

প্রকাশ : ২২ মে ২০২২, ০০:০০

ধারাবাহিক উপন্যাস

রোদে পোড়া পালিশ

কাদের পলাশ

রোদে পোড়া পালিশ
অনলাইন ডেস্ক

এক.

ছিক্কার মতো ঝুলে আছে সখিনা বিবির নিথর দেহ। কতোটা ধকল সহেছে এ শরীর হিসেব মেলানো কঠিন। উত্তম আর বিনয়ের আড়ালে মানুষ কতোটা বিশ্রী বিনোদন নিতে পারে কল্পনাতীত। সর্প কখনো দংশন করে না, যদি না আঘাত পায়। গন্ধম ফল আকর্ষণীয় বটে কিন্তু নিষিদ্ধ। কুনো ব্যাঙ দেখতে কুৎসিত হয়তো কিন্তু বিষাক্ত কীটপতঙ্গ হত্যা করে মানুষের কল্যাণ আনে। নির্ধারিত চরিত্রের বাইরে পৃথিবীর কোনো প্রাণীই যায় না। স্বভাবজাত চরিত্রের মধ্যেই থাকে। পারতপক্ষে খোলস ছেড়ে বেরুয় না। কেবল মানুষ ব্যতীত। গিরগিটি শরীরের রং বদলায় খুব প্রয়োজনে কিন্তু বৈশিষ্ট্য বদলাতে পারে না। শুধু মানুষ ক্ষণিকেই চরিত্র বদলায়।

সূর্যটা যখন ছায়াশূন্য শান্তিপুর গ্রামের সরকার বাড়িতে কিছু মহিলার আনাগোনা। যেনো সমাবেশ। সংখ্যাটা কুড়ির একটু উপরে। কুড়ির বেশি হওয়া নিষেধ ছিলো। ক্ষুদ্র সমাবেশে সখিনা বিবিকে ডেকে নিয়ে আসে জা কুলছুমা। কুলছুমার মতো এমন অনেকেই নিজের খুব খাতিরের মানুষ সাথে করে নিয়ে এসেছে। যে কারণে সংখ্যাটা কুড়ি টপকে গেছে।

কুলছুমা বলে, কইলা হুনচছনি, হরকার বাড়িতে এক বেডালোক আইছে। হেতনে ডাইকা ডাইকা টিয়া দেয়। কী এমন যুগ আইলো মাইনসেরে ডাইকা টাকা দেওনের কতা হুনি নাই কোন দিন। সখিনা বিবির কানে কথাটা প্রথমবারেই ধাক্কা দেয়। প্রতি মুহূর্তে মানুষ অনেক শব্দ শোনে। সকল শব্দ ব্রেইন টাচ্ করে না। কুলছুমার মায়ের কথাগুলোরও যেন শুনতে পায় না সখিনা। অথবা শুনলেও কথাগুলো গুরুত্ব দেয় না অথবা বিশ্বাস হয় না। তাই নিজের কাজে গভীর ধ্যান বাড়ায়। বিয়ের পর এ বাড়িতে এসে আজ অবদি কুলছুমার মা কখনো কুপরামর্শ দেয়নি। সুপরামর্শ ছাড়া। তারপরেও সখিনা বিবি কথায় কান না দিয়ে ঘরের পিড়ালী লেপার কাজ চালিয়ে যায়। ঘরের পিড়ালীতে মাটির প্রলেপ দেয়। তারপর উপরে সুঁতাজালের আঁচড়। অদ্ভুত কারুকাজ যেন। গ্রামীণ জনপদে তা এখন কাদাচিৎ দেখা মিলে। কুলছুমার মা আবার বলে, কিলা? কানে ডিবা দিয়া রাখছচনি? কথা হুনচ না? এবার সখিনা বিবির ধ্যান ভাঙে। ফিরে তাকিয়ে বলে, কী কন ভাবি? আঁইতো মনে কইচ্ছি অন্য কারো লগে কতা কন।

-কি কস? সব কতা হক্কলরে কওন যায় না। চল হরকার বাড়ি যাই।

-কিল্লাই?

-হেই বাইত এক বেডালোক আইবো। হেতনে নাকি মাইয়ালোকগরে টিয়া দিবো।

সখিনা বিবির কানে প্রথম যে কথাগুলো বেজেছিলো তার সাথে মিলিয়ে নেয়। কিন্তু বিশ্বাস করতে পারে না। এমনিতেই ঘরের মানুষটা হাতাইল্লা চলে। ঘরে অনটন লেগেই থাকে। তাই সখিনা বিবির মন থাকে বিবর্ণতায় মোড়ানো। অভাবের তাড়নায় মানুষ আনমনা থাকে সর্বক্ষণ। গৃহস্থলির কাজ করে দুই মেয়েকে কোনো মতে বাঁচিয়ে রাখে সখিনা। স্বামী রমিজ শেখ সংসার-উদাসীন। জুয়া খেলতে ভালোবাসে। প্রতিদিন যা আয় করে প্রায় পুরো অংশই জুয়া নামক দানব হজম করে। একদিন হঠাৎ করে অনেক টাকা আসবে এই আকাক্সক্ষা। পৃথিবীর সব জুয়াড়ির একই মনোবসনা। হঠাৎ বড়লোক হওয়ার স্বপ্ন। কদাচিৎ দুই একজন যে হচ্ছে না তও কিন্তু নয়। পৃথিবীতে হরেক প্রকার জুয়ার প্রচলন রয়েছে। শ্রেণীভেদে খেলার ধরণ বা পরিধিও ভিন্ন। কিন্তু লক্ষ্য অভিন্ন। অনেক ধনাঢ্য ব্যক্তি খেলার ছলে মনোরঞ্জনের জন্যেও জুয়া খেলেন। কতো বাহারি নাম এ জুয়ার। এই যেমন পোকার (জুজু খেলা), বাক্কারাট (বাজি ধরে তাস খেলা), রুলেট, পন্টুন, ফ্লাশ, বিট, ডিলার, ব্লাকজ্যাক এবং কার্ডস্লট মেশিনে জুয়া খেলা হয়ে থাকে। এটাই একমাত্র খেলা যা শুধু পুরুষলোক চর্চা করে। যদিও গ্রামীণ জনপদে তাস খেলাটাই সবেচে জনপ্রিয়। তাস খেলার মধ্যে তিনতাস বা টুয়েন্টিনাইন-এর প্রচলন বেশি।

দ্রুত সখিনা বিবি হাতের এঁটেল মাটি ধোঁয়। দুই মেয়ে স্কুলে গেছে। তাই কোনো মতে ঘরের দরজায় ছোট্ট একটা তালা ঝুলিয়ে কুলছুমা সাথে রওনা হয়। সরকার বাড়ি খুব দূরে নয়। তিন বাড়ি পশ্চিমে। চলতে চলতে নানা আলাপে মশগুল হয় দুই জা। তাদের আর আলাপ। তাদের কথায় শুধু দুঃখবিলাস। দুইজন মেয়ে লোক একসাথে হলেই কথার পিঠে কথা চড়ে। গ্রামীণ সমাজে প্রচলিত খনার বচন ‘এক দুখ যায় কইলে, আরেক দুখ যায় খাইলে’। অর্থাৎ মনের দুঃখবোধ কারো সাথে শেয়ার করলে যেমনি প্রস্বস্তি আসে তেমনি ক্ষুধার যন্ত্রণা উধাও হয় আহার করলে।

বাড়ির উঠোনে মহিলারা বসে আছে। যোগ দেয় সখিনা বিবি ও কুলছুমা। সামনে কয়েকটি চেয়ার পাতা। চেয়ারগুলোতে বসে আছেন একজন অপরিচিত পুরুষ মানুষ। অবশ্য সবাই চিনেছেন। তিনিই হচ্ছেন ‘স্যার’। যিনি সবাইকে টাকা দিবেন। দুই পাশে দুইজন মহিলা বসে আছেন। একজন স্যারের অফিসের লোক। অপরজন শান্তিপুর গ্রামের মাতাব্বর শ্যামল বৈদ্যের স্ত্রী। মাতাব্বরের বউ বাকি দুজনকে পরিচয় করিয়ে দেয়। শ্যামল বৈদ্যের স্ত্রী বলাতেই এতো মহিলা ছুটে এসেছে। অন্য কোনো নারী বললে আসতো কি না সন্দেহ।

পুরুষলোকটি উঠে দাঁড়ায়। কিছু সময় চুপ থেকে সবার মুখ একপলক দেখে নেয়। মুসলিম নারীরা মাথার ঘোমটা টেনে দেন। খুব ধীরে সুস্থে কথা শুরু করেন পুরুষলোকটি। ভাব-ভঙ্গিতে জানান দিচ্ছেন প্রাগৈতিহাসিক পৌরষত্ব। তবে তিনি আধুনিক। প্রথমে মুসলিমদের সালাম ও হিন্দুদের আদাব বিনিয়য়ে শুরু করেন কথার পর্ব। খুব মিষ্টি ভাষায় কথা বলেন। সংস্থার নির্ধারিত ছকে উপস্থাপন করেন সকল ফাঁদ। সংস্থার দৃষ্টিতে শর্ত। পূর্বে এমন গুছানো বচন উপস্থিত কেউ শুনেনি। বুভুক্ষের মতো কথাগুলো সবাই গলদকরণে ব্যস্ত। আধঘণ্টার বক্তব্যে সবাইকে বুঝাতে সক্ষম হন এনজিও সংস্থা-এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। দারিদ্র বিমোচন। দারিদ্র বিমোচন শব্দদ্বয়ের সাথেও উঠোনে বসে থাকা মানুষগুলো পরিচিত নন। তাই শব্দদ্বয়ের সহজ অর্থ ব্যবহার করেন পুরুষ লোকটি। আপনারা কেউ গরিব থাকবেন না। একত্রে অনেক টাকা পাবেন। সপ্তায় অল্প অল্প করে ফেরৎ দিতে পারবেন। একসাথে বড় অংকের টাকা পেলে যেকোনো বড় কাজ করা যায়। বড় অংকের টাকার উপকারিতা সম্পর্কে কিঞ্চিত ধারণা দেন তিনি। গ্রামের মহিলারা বুঝতে পারে।

কুলছুমা বলে উঠে, তয় স্যার আপনেরা কতো দিলে আমাগো কতো দিতে অইবো।

শ্যামল বৈদ্যের স্ত্রী কুলছুমার চুপ থাকতে ইশারা দেয়।

-ওনাকে বলতে দিন। আর কোনো প্রশ্ন থাকলে বলুন। অন্য কারো কোনো প্রশ্ন থাকলেও বলতে পারেন। আমি একসাথে জবাব দেবো।

উপস্থিত সবাই অবাক হয়। ঘরের পতি কখনো এভাবে বউয়ের কথা শোনার উদাহরণ নেই বললেই চলে। অথচ ওই বেটা পরপুরুষ কেমন সবার কথা শুনতে চায়। সবাই বলে উঠে, কুলছুমা ভাবী যে কতা কইছে হেইডার উত্তর দিলেই অইবো।

-তবে শুনুন, আপনাদের প্রত্যেককে দশ হাজার টাকা করে দেয়া হবে। প্রতি সাপ্তাহে আপনারা মাত্র ৪৮০ টাকা করে ফেরৎ দেবেন। এভাবে ২৪ সাপ্তাহ দিলে ঋণ শোধ হয়ে যাবে। ২৪ সাপ্তাহ পর ইচ্ছে করলেই আরো বেশি টাকা নিতে পারবেন। শর্ত হচ্ছে প্রথমে আপনাদের বইয়ে ৫-৬শ’ টাকা সঞ্চয় করতে হবে।

এমন কথা শুনে উপস্থিত ফিসফাস করে বলে উঠে ভালোইতো। একলগে অনেকগুলান টাকা পাইলে একটা গাই গরু কিনা যাইবো। গরুর দুধ বেইছাইতো সাপ্তার টাকা দিয়া দেওন সহজ অইবো।

এনজিও সংস্থায় আস্থা বাড়ে গ্রামের নারীদের। তারা সঞ্চয় শুরু করে। যে যার সাধ্যমতো সঞ্চয় করে। কেউ কুড়ি টাকা কেউ পঞ্চাশ টাকা। মূলত এ সঞ্চয় মহিলাদের হাঁস-মুরগির ডিম বিক্রি করা টাকা। নির্ধারিত সঞ্চয় জমা হওয়ার পর নারীদের মাঝে ঋণ দেয় সংস্থাটি। এভাবে নিরবে ঋণচক্রে আটকে পড়ে শান্তিপুর গ্রামের কুড়ি পরিবার। দেশের প্রান্তিক পর্যায়ে অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের ঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করে। এক্ষেত্রে গ্রামীণ ও শহরাঞ্চলের দরিদ্র জনগোষ্ঠী (ভূমিহীন, ক্ষেতমজুর, দিনমজুর, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, আদিবাসী সম্প্রদায়, বস্তিবাসী, প্রতিবন্ধী মানুষ (বিশেষ করে অনগ্রসর নারী) নিয়ে কাজ করে।

প্রথমে সখিনা বিবি রাজি হয়নি। কিন্তু দ্বিতীয় দফায় অর্থাৎ ২৪ সাপ্তাহ পর গুচ্ছঋণে জড়িয়ে পড়ে সেও। ধীরে ধীরে গ্রামে কুড়িজনের কয়েকটা গ্রুপ হয়। এনজিও সংস্থা মানুষের বিশ্বাস নিয়ে ব্যবসা চাঙ্গা করে তোলে। বাড়ির মহিলারা হাঁস-মুরগির ডিম বিক্রিত অর্থ প্রতি শুক্রবার পৌঁছে দেয় এনজিও কর্তার হাতে। পরিবারে স্বচ্ছলতা আসবে এ আশায় কোন কোন স্বামী স্ত্রীকে সহায়তা করে। কেউ কেউ করে না। সাপ্তার পর সাপ্তাহ যায় কিন্তু কোনো পরিবারই আলোর মুখ দেখে না। আলো যেন দিনদিন দূরে সরতে থাকে। একটা প্রান্তিক গ্রামের জনজীবনে শুরু হয় নিদারূণ কলহ। কিন্তু প্রকাশ হয় না। সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে না। মানুষ কিস্তি চালাতে থাকে। এক মুষ্ঠি সুখের আশায়। কিন্তু সুখ আর ধরা দেয় না। (চলবে)

[পরের পর্ব আগামী সংখ্যায় প্রকাশিত হবে]

* পাঠক ফোরাম বিভাগে লেখা পাঠানোর ঠিকানা : pathok.ck@gmail.com

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়