চাঁদপুর, সোমবার, ১৫ আগস্ট ২০২২, ৩১ শ্রাবণ ১৪২৯, ১৬ মহররম ১৪৪৪  |   ৩১ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতি শিক্ষা স্বাস্থ্য সারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   মন্ত্রীদের দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্যে ‘ফুঁসছে’ আওয়ামী লীগ
  •   নিস্তেজ হচ্ছে ডলার, দর কমেছে প্রায় ৮ টাকা
  •   ১৪০০ লিটার চোরাই ডিজেলসহ আটক ১
  •   ,হাইমচরে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কলেজ শিক্ষকের উপর হামলা
  •   ছাত্রকে বিয়ে করা সেই শিক্ষিকা নিহত!

প্রকাশ : ১১ জুন ২০২২, ০০:০০

রোদে পোড়া পালিশ
অনলাইন ডেস্ক

চার.

ভোরের কোমল রশ্মি জানালার ফাঁকে উঁকি দেয়। শীতের আগমন প্রস্থান হয় প্রশস্তির। কচিপাতা, আমের বোল, কুলের মুকুল বাহারি রূপ দেয় বসন্তকে। নতুনত্বে সাজে প্রকৃতি।

সদ্য ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা শেষ করেছে শুভ। চৈতালিতে নকশিকাঁথা মুড়ি দিয়ে একাত-ওকাত হয়ে শুয়ে থাকতে ভালোই লাগে। তাই ইদানীং সোয়া থেকে একটু দেরি করেই উঠা হয়। যদিও ঘুম ভাঙে পাখিদের সাথে। কিচিরমিচির গানের সুরে।

শুভদের বাড়িতে সকালবেলা হঠাৎ সশরীর হাজির নিপু। একসাথেই এবছর অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েছে। স্কুলজীবন থেকেই শুভ ও নিপুর সম্পর্কটা গভীর। দুজনের মন-মানসিকতা অভিন্ন হলেও মেয়ে-সংক্রান্ত বিষয়ে দুজন দুপ্রান্তে। কিশোর বয়সের একটা ঘটনা অনেক আগেই ভুলে গেছে শুভ। ফাইনাল ইয়ারের পরিক্ষার রেজাল্ট প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত দু বন্ধুই বেকার। কিন্তু এতো সকালে আর কখনো নিপু শুভদের বাড়িতে আসেনি। একসাথে বিকেলের সময়টা উপভোগ করে। গাঁয়ের মেঠপথ ধরে হেঁটে বেড়ায়। কিন্তু দিনের শুরুতে সাধারণত দুজনকে এক সাথে দেখা যায় না। হাঁপাতে হাঁপাতে নিপু বলে, দোস্ত উঠ।

- তুই এতো সকালে আমাদের বাড়ি! ঘটনা কী?

- দ্রুত উঠ।

- কেনো?

- আরে প্রতিদিনই তো ঘুমাস। আজ একটু তাড়াতাড়ি উঠ। আর কোনো প্রশ্ন করিস না।

শুভ মায়ের হাতে বোনা নকশিকাঁথাটা খুব ভালো করে শরীরে জড়িয়ে নিয়ে বলে তুই অন্তত হেডলাইন না বললে আমি উঠবো না। কাঁথাটিও শুভর শরীরে পরম মমতায় মিশে থাকে। কারণ শীতের শুরু ও শেষ দিকেই পাতলা কাঁথার আদর যত্ন বেশি থাকে। তারপর মাসের পর মাস আলমিরা কিংবা লাগেজে বন্দি দশায় সময় কাটে। মানুষ এমনই। প্রয়োজনে কাছে টানে, সেরে গেলে অনাদর অযতেœ দূরে সরিয়ে দেয়। প্রয়োজনে ফের কাছে টানে...।

হেঁচকা টানে গায়ের উপর থেকে কাঁথা সরিয়ে দেয় নিপু। কাঁথা সরাতেই লজ্জায় পড়ে দু বন্ধু। শুভ পরনের লুঙ্গি যে নির্ধারিত জায়গায় ছিলো না। অবশ্য নিপু দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে বলে, আরে আয়। উঠ। বিশ্বাস কর গেলে আর ফিরতে চাইবি না। তোকে একটা জিনিস দেখাবো বলে ফেসবুকে ইনবক্স বা কল না করে ছুটে এসেছি। আমি চাই তুই মিনাকে ভুলে যা।

- তার মানে? হঠাৎ করে আবার মিনা এখানে আসলো কেনো?

- এখনো বুঝলি না? তোর জন্যে একটা মেয়ে দেখে এসেছি। আমার ভীষণ পছন্দ হয়েছে। তোকে দেখাবো বলে ছুটে এসেছি। মেয়েটাকে দেখে আমি মুগ্ধ। জীবনের এ সময়ে এসে এই প্রথম কোনো মেয়েকে আমার এতো ভালো লেগেছে। প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে আমি কোনো মেয়ের সাথে সম্পর্কে জড়াবো না। এটা আমার প্রতিজ্ঞা। তাছাড়া তুই বিষয়টা খুব ভালোভাবে জানিস্। আমার বড় দাদা ইন্টার পরীক্ষা দেয়ার আগে পালিয়ে বিয়ে করেছে। পরিবার কিছুতেই তা মেনে নেয়নি। আজও নয়। তাই সে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। আমি পরিবার বিচ্ছিন্ন হতে চাই না। কারণ মানুষ প্রেমে পড়লে নিজেকে ভুলে যায়। নিজের শেকড়কে ভুলে যায়। পরজনকে স্বজন ভাবে। বিপদে পড়লে পর তখন আর স্বজন থাকে না। প্রেমিক-প্রেমিকার মনে কয়েকটি বিষয় খুব গুরুতরভাবে হানা দেয়। যেমন একজন অপরজনেক ছাড়া বাঁচবে না। তুমি ছাড়া জীবন আমার অন্ধকার। অসহায়, আমি নিঃস্ব হয়ে যাবো। মরে যাবো। অবশ্য মরে যায়ও কেউ কেউ। এক রশিতে প্রেমিক-প্রেমিকা মৃত্যুর ঘটনাও আছে। একসাথে বিষ খায়। আহা কতো প্রেম! ওরা বুঝে না প্রেমের জন্যে জীবন নয়, জীবনের জন্যে প্রেম। মায়া, মমতা, দরদ সবকিছুর জন্যেই আগে বেঁচে থাকতে হবে। মানুষই যদি না থাকে তবে প্রেম কোথায় যাবে? অবশ্য ওই বোকারা এসব না ভেবেই জীবনকে তুচ্ছ মনে করে বির্সজন দেয়। উঠতি বয়সের তরুণ-তরুণীদের কেউ কেউ যেমনি বুদ্ধিমান, একই সাথে চরম বোকাও। অথচ, পৃথিবীতে মানুষ একা আসে আবার একা যায়। মাঝখানের সব রয়ে যায়। নিপু আরো দৃঢ় গলায় বলে বিশ্বাস কর, মেয়েটি অনেক সুন্দরী। তোর ভালো লাগবেই লাগবে। আমি হান্ড্রেড পার্সেন্ট শিওর।

নিপু ছোটবেলা থেকে একটু লাজুক প্রকৃতির বটে। বিশেষ করে মেয়েদের কাছে কম ঘেঁষা ছেলে। কলেজ লেভেলে এসে খুব প্রয়োজন ছাড়া ক্লাসমেটদের সাথেও কথা বলে না। ভালো লাগা ভালোবাসা তো হাজার মাইল দূরের কথা। অবশ্য জীবনের দু-একটা ঘটনা মানুষের পুরো জীবনকে বিচার করা ঠিক না। শুভ অবাক হয় নিপুর কথা শুনে। লাজুক ছেলে নিপু সুন্দরী মেয়ের খবর নিয়ে এসেছে! আহা! কী মজা কী মজা!

চোখ কচলাতে কচলাতে উঠে বসে শুভ। তাই নাকি এতো সুন্দর! অবজ্ঞা মুডে জানতে চায় শুভ। কে সে? তোর কী হয়?

আমার বড় বোনের ননদ। মানে বেয়াইন। প্রায় দুই বছর পর দেখেছি। আমিতো তাকে দেখে মুগ্ধ। এমন মুগ্ধতা কখনো ছোঁয়নি আমার মনে। দেখতে দেখতে কত বড় হয়ে গেছে মেয়েটা। গতকাল সন্ধ্যায় তালই মহাশয় আমাদের বাড়িতে বেড়াতে এসেছেন। ও কিছুদিন থাকবে। অবশ্য তালই চলে যাবেন।

- বেয়াইন মানে কোনো আইন নাই। বলে লাফ দিয়ে খাট থেকে নামে শুভ। দ্রুত ফ্রেস হয়ে বের হয় দুজন। নাস্তা না খেয়েই নিপুদের বাড়ির উদ্দেশ্যে পা ফেলে।

বাড়ির আঙিনা থেকে একজন ভদ্রমহিলা ‘কই যাস শুভ’ বলে চিৎকার শুরু করে। রাহেলা বেগম শুভ’র মা। খুব রাগী মানুষ। তিনি শাসন জানেন শুধু নিজের সন্তানদের বেলায়। তার ছেলেদের ব্যাপারে কেউ বিচার দিলেই রাগ টগবগ করতে থাকে। মা আসছি বলে শুভ ও নিপু মুহূর্তেই চোখের সীমানা অতিক্রম করে। রাহেলা বেগম ভেবে কুল পায় না সাতসকালে কোথায় যাচ্ছে ছেলেটা। আজকাল যে যুগ পড়েছে। কী নেট দুনিয়া। কখন যে কি ঘটে ভাবাও মুশকিল। সমাজের মানুষ আজ ভালোতো কাল মন্দ। এখন ভালো-মন্দে বিভেদ তৈরি করা কঠিন।

স্বামী বিদেশে থাকায় দুই ছেলেকে নিয়ে খুব চিন্তায় থাকেন রাহেলা বেগম। অবশ্য মেয়েদের বিয়ে হওয়াতে এখন তাদের নিয়ে ভাবনা নেই। মানসিক চাপ নেই বললে ওই শুভকে নিয়েই। অবশ্য বিয়ের আগে মেয়েদের এক প্রকার পাহারা দিয়ে রাখতে হয়েছে। রাহেলা বেগম ভাবেন, সকালে বের হয়েছে বিষয়টি না হয় সহজ-সরল। কিন্তু শুভ যেদিন রাত করে বাড়ি ফিরে তখন চিন্তার অন্তত থাকে না। বাড়ি না আসা অবদি চোখে ঘুম আসে না। তখন নফল নামাজ পড়লেও মনে খুব ভয় ধরে। এসব ভাবতে ভাবতে রান্না ঘরের দিকে পা বাড়ায় রাহেলা বেগম।

দুই বন্ধু গ্রামের মাটির কাঁচা রাস্তায় হাঁটছে। ভোরের কোমল বাতাস মনকে শীতল করে। প্রফুল্ল করে তোলে। দূর্বাঘাসের চকচকে শিশির বিন্দু দুজনের পায়ে চুমো এঁটে দিচ্ছে। ইতোমধ্যে হালাকা কুয়াশা কেটে গেছে। সূর্যের আলো এবার তেরছা হয়ে পড়ছে।

শুভ বলে, শোন; তোর এতো ভালো লেগেছে ভালো কথা। তবে আমায় নিচ্ছিস্ কেন? তুই তো ইচ্ছে করলে পিছু ধরতে পারিস্। জীবনে একবার প্রেমে পড়। মজা আছে। ভালোলাগা মানুষের চলন-বলন সবই সুন্দর হয়। দাঁড়ালে ভালো লাগবে। হাঁটলে ভালো লাগবে। বসলেও। রুদ্র চক্ষুর দিকে তাকালেও ভালো লাগবে। কোনো কিছুতেই বিস্বাদ আসবে না। বিশেষত প্রিয় মানুষের সব কিছুতেই মূর্ছনার মিছিল হয়। সব কিছুতে মজে যেতে ইচ্ছে হয়। মেয়েদের পেছনে ঘোরার সময়টাও জীবন ইতিহাসের অংশ। জীবন থেকে এটা বাদ দেয়া বোকামি ছাড়া কিছুই না। তবে কাউকে বিরক্ত বা উত্যক্ত করে নয়।

- আরে ধুর। আমার এখনো অনেক সময় আছে। ভবিষ্যতে অনেক মেয়ে সারি বেঁধে পেছন পেছন ঘুরবে। তাছাড়া প্রেম ভালোবাসা আমি বুঝি না। কারো প্রতি ভালোলাগার পর যদি মনের ভেতর ব্যতিক্রম অনুভূতি জন্মায় তবেই তার পিছু ছোটা শুরু করবো। তখন দেখবি, আমি তোর চেয়ে আরো বেশি সিরিয়াস। যা হোকে, তোকে তো মিনা কিছুই জানায়নি। ঝুলিয়ে রেখেছে। তুইও লটকে আছিস। হ্যাঁ-ও বলছে না; না-ও বলছে না। খুব ধূর্ত মেয়েটা। তার এমন আচরণে আমার খুব জেদ হয়। ওতো বলে দিলেই পারে।

- এভাবে বলিস না। ও সুযোগ পায় না বলে জবাব দিচ্ছে না। শীঘ্রই হয়তো কিছু একটা বলবে। আমি এখনো অপেক্ষায় আছি তার মুখে কিছু শোনবো বলে। শোন, মিনার কারণে আমার জীবনে গতি এসেছে। তুইতো জানিস, আমি ক্লাস এইট পর্যন্ত স্কুলে ছিলাম অনিয়মিত। অথচ মিনাকে দেখার পর সম্পূর্ণ বদলে গেছি। ওর প্রতি ভালোলাগা তৈরি হয়েছে বলেই আমি স্কুলে নিয়মিত হতে শুরু করি। প্রতিদিন বাড়ির কাজ শেষ করি। স্যারদের পড়া গলদকরণ করি। মিনাকে না দেখলে অনিয়মিত ছাত্র হিসেবেই আমার ছাত্রত্ব শেষ হতো। কিংবা এতোদিনে ছাত্রত্বও থাকতো না।

- তা অবশ্য ঠিক। তুইতো শালা বিশ্বপ্রেমিক হয়ে যাবি। ক্লাস টু থেকে প্রেমে পড়তে শুরু করেছিস। শ্যাম বর্ণের রুমা মেয়েটার কথা মনে আছে?

- থাকবে না কেন? আমার জীবনে প্রথম ভালো লাগা। বলতে বলতে উদাস হয়ে যায় শুভ। এতো ভালো লাগতো মেয়েটিকে, অবিশ্বাস্য। আমি বহুবার ওকে ঘুমঘোরে দেখেছি। একসাথে পুতুল খেলছি। রেললাইনের পথ ধরে হেঁটেছি। ঘুরেছি শিশু পার্কের এপার-ওপার। এখন কোথায় আছে জানি না। অবশ্য এতোদিনে ভুলে গেছি তাকে। সেও নিশ্চই আমাকে। অবশ্য সে আমাকে মনে রাখার কোনো কারণ নেই। আরে ধুর, বেহুদাই আবল তাবল বকছি। তোর বুঝি আর কাম নাই? একটার পর একটা সামনে এনে দেস ক্যান?

- জ্ঞানী লোকেরা নাকি বলেন, কিশোর বয়সে সুন্দরের প্রেমে পড়া ভালো, সাঁতার কাটা আনন্দের কিন্তু ডুবে যাওয়া দুর্ভাগ্যের। খুবই মন্দ বিষয়। তুই ডুবে যাসনি বলে বেঁচে গেছিস। আমি চাই তোর যা করতে মন চায় তা অবশ্যই করবি। কিন্তু পড়ালেখা ঠিক রেখে।

- আমি জানি তুই এখন আবার আকলিমার কথা বলবি, তারপর কাকলী। শেষ পর্যন্ত আমার খালাতো বোন লাইরিনের নামও বাদ দিবি না। প্লিজ; আর একটা কথা না বলে চল হাঁট।

- কাকলীর সাথে যেন তোর বিয়ে হয় নামাজের মোনাজাতে সে দোয়া করতি। মনে পড়ে?

- পড়ে না মানে। খুব বেশি করে পড়ে। কাকলী কোকিলের ডাকের মতো সুন্দর না হলেও ক্লাসে দ্বিতীয় ছাত্রী ছিলো। সে সময় আমি একজন ভালো ছাত্রীর প্রেমে পড়েছিলাম। কোনো মেয়ের নয়।

এক কিলোমিটার পথ ১০ মিনিটে পাড়ি দিয়েছে দুজন। শুভ ও নিপুর মাঝে একপ্রকার হাঁটা প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিলো। মাঝখানে পরীক্ষার বিষয় নিয়ে কথা বলতে বলতে নিপুদের বাড়ি সামনে এসে হাজির হয়।

নিপুদের বাড়িটা অনেক বড়। গ্রামের এক কোনে বাড়িটার অবস্থান হওয়ায় নাম হয়েছে কোনার বাড়ি। কোনার বাড়ি বলেই সবাই চেনে। বর্তমানে নাম বদলে বৈদ্য বাড়ি নামকরণ করা হয়েছে। এখন আধুনিক নাম বৈদ্য বাড়ি। প্রধান সড়ক থেকে বাড়ির রাস্তা প্রায় দুইশ মিটার। দুর্বাঘাষে শিশির টলমল। একেকটা যেনো মুক্তা ঝরছে। বাড়ির প্রবেশ গেটেই একটা টিউবওয়েল রয়েছে। বেশ পুরানো। টিউবওয়েলকে গ্রামে ‘কল’ বলে ডাকে। মাঠে-ঘাটে সবাই যখন কাজ শেষে বাড়ি ফিরে এ কলেই হাত-মুখ ধূয়ে ঘরে যায়। কলের গায়ে মরিচা ধরেছে। প্রায় শত বছরের পুরানো শত ঘটনার সাক্ষি হয়ে আজও ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে কলটি। হালকা হলুদ মরিচা পড়েছে। কিন্তু হাতল এ বাড়ির লোকেদের স্পর্শে খুব মসৃণ। যদিও ক্ষয়ে গেছে শরীরের অনেকটুকু। এও সাক্ষী দেয় বছরের পর বছর কিংবা যুগের পর যুগের ইতিহাস। যদি কখনো এক কলের জবান খুলে যায়, তবে এ গ্রামের প্রায় সবটুকু ইতিহাস সহজে জানা যাবে। আর যদি কেউ অনুলিখন করে তবে পরের শত শতাব্দি বয়ে বেড়াবে কোনার বাড়ির ইতিহাস।

শুভ দেখতে পায়, কলের সামনে তিনজন তরুণী দাঁড়িয়ে গল্পে মশগুল। একজন কলের পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে নিচ্ছে। কাছে আসতেই উপস্থিত সবাইকে চিনলেও কলের পানি দিয়ে যে মুখ ভেজাচ্ছে পেছন থেকে চেনা থেকে দুষ্কর হয়ে ওঠে। মুরব্বিরা বলেন, পরিচিত জনের হাঁটা দেখেই চেনা যায়। অপরিচিতের বেলায় কখনো কখনো পরিচয়ের পরও চেনা যায় দায়। আবার কেউ কেউ বলে থাকেন ‘ চেনা পথ দূরের ভালো, অচেনা পথ কাছেরও ভালো নয়।’

কলের দিক থেকে মুখ ঘুরাতেই তাজ্জব হয়ে পড়ে শুভ। এ যেন পরী। সাদা থ্রি পিচ উজ্জ্বলতা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েকগুণ। মুখের উপর থেকে কয়েক ফোঁটা পানি মাটিতে পড়তেই আলিঙ্গন করছে। হামাগুড়ি খায় জলফোঁটা। আর কয়েক ফোঁটা মুখের উপর জ্বলজ্বল করছে। ঝিলিক দিয়ে আলো ছাড়ায় মুক্তোর মতো।

নিপু বলে কেমন দেখালাম?

শুভ কিছু না বলে থ খেয়ে থাকে। মনে মনে ভাবে, নিপুর পছন্দ প্রশংসা পাবার যোগ্য। মনে হয় এতো দিনে শালার প্রেমিক প্রেমিক মন সজাগ হয়েছে।

রূপবতি। না না অপ্সরী। মানুষ কত সুন্দর হতে পারে নিজেকে প্রশ্ন করে শুভ। মুগ্ধ শুভ ভুলে যায় অতীত। পেছনের সব ভালোলাগা যেন এখানে পরাজিত। পরাভূত। দুমড়ে মুসড়ে পড়ে পেছনের সব ভালোলাগা ইতিহাস। ভালোলাগা এতো তীব্রও হতে পারে, আগে বুঝতে পারেনি শুভ। মানুষ অতি ভালোলাগায় বধির হয়। অতি শোকেও।

- কিরে, কী হলো কিছু বলছিস্ না যে? মূলত জীবনে এই প্রথম কোনো মেয়েকে আমার ভালো লেগেছে নিপু বলে। তবে আমার বিশ্বাস ওকে তুই ম্যানেজ করতে পারবি। আমি চাই, ওর সাথে তোর সম্পর্ক হোক। তোর সাথে মেয়েটিকে দেখতে আমার খুব ভালো লাগবে। মানাবে বেশ।

নিপুর কথার প্রতিত্তোর দেয় না শুভ। শুভর নিরবতায় নিপু ডুব দেয় নিজের জগতে। শুভ আমার ভালো বন্ধু। ওর প্রেমিক প্রেমিক হৃদয়। যেনো পৃথিবীর সব মেয়েকে ভালোবাসবে। অথচ আমি এখনো বেরসিক। শূন্য হৃদয়ে চলতে পছন্দ করি। অবশ্য আমার জন্যে শুভর দুঃখবোধ হয় জানি। খুব ছোট বেলা থেকে ভালোলাগা অনুধাবন করতে পারে শুভ। এ ভালোলাগায় কোনো পাপ নেই। লোভ নেই। প্রাপ্তি নেই। স্বার্থহীন বলেই আমি বিশ্বাস করি। আছে; শুধু একরত্তি তৃপ্তি। অবশ্য আজ আমাকে কেনো যেন খুব বোকা বোকা মনে হচ্ছে। জীবনে প্রথম ভালোলাগা মানুষটির সামনে বন্ধুকে এগিয়ে দিলাম। জীবনে কখনোতো কারো প্রতি আমার এমন ভালোলাগা জন্মায়নি। আমার ভেতরটা কি যেন বলতে চায়। কিন্তু বুঝতে পারছি না। ঈষৎ মনের গোপন কোনে কেমন কেমন যেন অনুভূত হচ্ছে। একটা ঝড় তোলপাড় করে দিচ্ছে সব। ভাবনার ফাঁকে মেয়েটির দিকে তাকায় নিপু। আবার শুভ’র দিকে। মেয়েটির সাথে থাকা অলকা ও শোলকা দুই বন্ধুর কর্মকাণ্ড অবলোকন করছে। শুভ’র মূর্তি হওয়ার দৃশ্য দেখে অলকা শোলকা একে অপরের দিকে তাকায়। মুখের ইশারায় দুজন দুজনকে শব্দহীন প্রশ্ন করে ঘটনা কী? দুজনেই ইশারায় জবাব দেয়; বুঝতে পারছি না।

অলকা বলে, কী শুভ দা কী হয়েছে? এভাবে রইলেন যে?

আর শোলকা বলে নিপুকে।

এবার মেয়েটি টের পায় তাকে নিয়ে কিছু একটা হচ্ছে। মেয়েটি লজ্জা পায়। অবশ্য মেয়েরা প্রশংসা পেতে ভালোবাসে। মিথ্যা প্রশংসা করলেও ধরতে পারে না। বলা চলে মেয়ে মানুষ বোকা। বুঝতে পারে না কোনটা মিথ্যা প্রশংসা আর কোনটা সত্য। যদিও মেয়েটি দেখতে সুন্দর। অসম্ভব সুন্দর। অদ্ভুত সুন্দর। যে কারো ভালোলাগার মতো মেয়ে। প্রথম দেখাতেই যে কেউ প্রেমে পড়তেই পারে।

মূলত মেয়েটির নাম নুপুর হলেও অনেক দিন পর দেখা হওয়ায় নিপু ঠিক নামটি মনে করতে পারেনি। তাই শুভকেও বলা হয়ে উঠেনি।

নিপু ইর্য়াকি করে বলে, বেয়াইন কবে এতো সুন্দর হলো ঠেরই পেলাম না। কথা শুনে বিব্রত হয় মেয়েটি।

শুভ বলে, বেয়াইনের নাম কী?

আগ বাড়িয়ে শোলকা বলে, কেন? নিপু দা বলেনি?

- বললে তো জানতে চাইতাম না।

- নুপুর। নুপুর রানী।

- সত্যি সত্যিই নুপুর একজন রানী। এ রানীর রাজা কে?

- খুঁজছে। তবে পায়নি এখনো।

- নুপুর কী বাজে?

- বাজবে না কেন?

- নুপুর বাজাতে জানে, তা কি নুপুর জানে?

নুপুর অবাক হয়। এমন কথাতো আগে কখনো শুনেনি সে। তবে খুব কৌশল করে নুপুর বলে, নুপুরের রিনিঝিনি ছন্দে কেউ যদি বাজে, ক্ষতি কী তাতে?

- খুব ভালো বলেছেন। ধীর পায়ে হেঁটে সবাই একসাথে বাড়ির ভেতরে অগ্রসর হয়।

নিপুদের ঘরে গিয়ে নুপুর হালকা সেজেগুজে বের হয়। ততক্ষণ অলকা শোলকার সাথে কথা হয় নিপু ও শুভর। এবার পাঁচজন মিলে বাড়ির দক্ষিণ পাশে আখড়ার কাছে যায়। কথা হয়। অনেক কথা। সুযোগ বুঝে শোলকা ভালোলাগার কথা বুঝাতে চায়। নিপু বুঝে না। অবশ্য শোলকা কাকাতো বোন বলে নিপু কখনো ওভাবে চিন্তাই করেনি। যদিও শোলকা নিপুকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে প্রতিদিন। প্রতিরাত। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে, জেগে জেগে।

যদিও এ স্বপ্ন শাস্ত্রসিদ্ধ নয়। সনাতন ধর্মমতে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এ হয় না। হতে পারে না। অন্যান্য হিন্দু বাড়ির চেয়ে এ বাড়িটা একটু আলাদা। এবাড়ির বাসিন্দারা একটু পবিত্র থাকতে পছন্দ করে। অন্য ধর্মের মানুষদের একটু ভিন্ন চোখে দেখে। এখন আর সে পরিস্থিতি নেই। শুভ এ বাড়ির প্রতিটি মানুষের সাথে মিশে গেছে। শুভও যেনো এ বাড়ির কারো ভাই, কারো দেবর, কারো কাকা ইত্যাদি। রক্ত সম্পর্কীয় মানুষ। দীর্ঘদিনের আসা যাওয়ায় ইতোমধ্যে শুভকে সবাই নিজের করে নিয়েছে। শুভর ধর্ম কি এ নিয়ে বাড়ির কারো কোনো প্রশ্ন নেই। এতোটাই আপন করে নিয়েছে সবাই। সে প্রশ্ন কখনো কারো মনে আসেনি। শুভ মুসলিম সবারই জানা। (চলবে)

[পরের পর্ব আগামী সংখ্যায় প্রকাশিত হবে]

* পাঠক ফোরাম বিভাগে লেখা পাঠানোর ঠিকানা : pathok.ck@gmail.com

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়