শনিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১  |   ২৯ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতি শিক্ষা স্বাস্থ্য সারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   হাজীগঞ্জে অগ্নিকাণ্ড : গোডাউনসহ  ৪টি  ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পুড়ে  ছাই।
  •   চাঁদপুরে সর্বনিম্ন ৩ জনের করোনা শনাক্ত

প্রকাশ : ৩১ জুলাই ২০২১, ০০:০০

অদ্ভুত বন্ধু
অনলাইন ডেস্ক

ছাত্রজীবনের শুরু থেকেই প্রত্যেকের জীবনে নতুন কিছু মানুষের আগমন ঘটে। যে মানুষগুলো স্বভাবতই হয় বিচিত্র রঙের মতো। বিচিত্র ব্যক্তিত্বের অধিকারী। আর সেজন্যেই বয়সের ব্যবধানে যখন বাস্তবতা উপলব্ধি করতে শিখেছি, ঠিক তখনই ধীরে ধীরে তাদের ব্যক্তিত্বে নিজেকে খুঁজতে হয়। তাদের ভাবনায় নিজের অবস্থান আবিষ্কার করতে হয়। আর সে চেষ্টা অনেকটা বাধ্য নিয়মের মতো। খুঁজতেই হবে, আবিষ্কার করতেই হবে। নতুবা ব্যক্তিবিশেষ, মুখ দেখে ভালোবাসা বিলি করার পর ভুল মানুষদের ভাগেই অতিরিক্ত ভালোবাসা দিয়ে দেয়ার সম্ভাবনা থাকে। ফলাফল কিছুটা এই যে, ‘আপনি যাকে নিজের দুনিয়া ভাববেন সে আপনাকে তার এলাকাও ভাববে না’। সুতরাং সময়ের সাথে সাথে নিজের বিবেচনা বুদ্ধিটুকু সঠিকভাবে প্রয়োগ করাই সঠিক বন্ধু নির্বাচনে জীবনের জন্যে যথেষ্ট।

স্কুলজীবন থেকেই আমার নিজের জীবনে বেস্টফ্রেন্ড নির্বাচনে বিশেষ ধকল খেতে হয়েছিলো। কাকে কীভাবে কোন্ পরিপ্রেক্ষিতে বেস্টফ্রেন্ড ভাববো তা নিয়ে ভাবতে ভাবতেই সময় পার হয়ে যায় অবস্থা। এক্ষেত্রে কারো সান্নিধ্যে কিংবা পরামর্শ গ্রহণ করা ঠিক হবে কি না, সে নিয়েও মনে যথেষ্ট সংশয় কাজ করছিলো। তাছাড়াও বেস্টফ্রেন্ড নির্বাচনে তৃতীয় ব্যক্তির পরামর্শ গ্রহণ নেয়ার মনোভাব নিজের কাছেই নিজের অপমানের মতো ঠেকছিলো। আর ফলাফল! জীবনে বেস্টফ্রেন্ড নির্বাচনে বিশেষ শূন্যতা রয়েই গেলো...

ছাত্রজীবনে যে কজন ছেলেণ্ডমেয়ের সাথে পড়াশোনা করেছি তার মধ্য থেকে বিশেষ একজন ছাত্র আমার বন্ধু হয়েছিলো। যে কিনা অন্যদের চেয়ে পুরোপুরি আলাদা। অন্যরকম আচরণের জন্যে প্রায়ই দৃষ্টিনন্দিত হতো। অন্য আটণ্ডদশজন ছেলের তুলনায় তার দেহে মাংসের পরিমাণ বেশি হওয়ায় তাকে অন্যরা যথেষ্ট ভয় পেতো। আমিও বটে। তার সাথে আমার সাক্ষাৎও হয় তেমনই এক অদ্ভুত ভয়াবহভাবে। এমনই ভয়াবহ যে তখনকার সময়, পরিবেশ, বয়স অনুযায়ী ভেজা গলা হঠাৎ শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা।

আমি তখন প্রাইমারি স্কুলের তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র। তৃতীয় শ্রেণীতে উঠতে উঠতে এ স্কুলের চেয়ারণ্ডটেবিলের সাথে যথেষ্ট ভাব গড়ে ওঠে। স্কুলের মাঠঘাট, প্রকৃতি পরিবেশ সবই প্রায় চেনা। তাই তো পরিস্থিতির উপর ভিত্তি করে বা না করেও আমার দুষ্টুমি যথাযথ অব্যাহত ছিলো। আমাদের স্কুলের ছেলেমেয়েরা নিয়মিত ক্লাস শুরু হওয়ার বিশণ্ডত্রিশ মিনিট পূর্বে স্কুল অবস্থান করতো। অবশ্য এই সময়টা একেকজনের জন্য একেক রকমভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও আমাদের স্কুলের অধিকাংশ ছেলেণ্ডমেয়েই এ সময়টুকু খেলাধুলা করে কাটাতে অধিক স্বাচ্ছন্দবোধ করতো।

সেদিনও একইভাবে অধিকাংশ ছেলেণ্ডমেয়ে বাহিরে খেলছিল। তবে কিছু মেয়েদের দেখলাম বসে বসে বই পড়ে। আর এ বিষয়েও একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। আর তাণ্ডহলো, গতকাল ক্লাসে শিক্ষকের দেয়া পড়া।

গতকাল আতিক স্যার গণিত বিষয়ে বাড়ির কাজ দিয়েছিলেন। স্যারের কথামতো দুণ্ডএকজন বাসা থেকে করে নিয়ে আসলেও অধিকাংশই করেনি। আর যারা করেনি তারাই এখন বসে বসে পড়া সম্পন্ন করছে। এ ঘটনার উপর ভিত্তি করে ক্লাসের সকল শিক্ষার্থী তিনটি দলে ভাগ করেছি। যার মধ্যে প্রথম দল হলো ব্রিলিয়ান্ট বিভাগ। যারা কি না বাড়ি থেকে পড়া শিখে আসে। এরপর হলো দ্বিতীয় দলের শিক্ষার্থীরা যারা কি না প্রথম বিভাগের শিক্ষার্থীরা যদি বাসা থেকে পাঠ সম্পন্ন করে আনে তাদের থেকে সংগ্রহ করে ক্লাস শুরু হওয়ার আগের সময়টুকুতে সমস্যা সমাধান করে নেয়। আর তৃতীয় দল হলো গণ্ডারের ফুফাতো ভাই। তাদের কথা হলো পড়ার জন্য স্যারেরা যতই মারুক আমরা কখনোই পড়বো না, পড়ার চেষ্টাও করবো না। এবার তারা আমাদের মারুক, কাটুক আর যাণ্ডই করুক...

এই যে তৃতীয় দলের এই ভাইয়েরা, এদের এই ‘সঙ্গে নিয়ে ডুবার’ স্বভাবটা আমার দেখামতে কখনোই বদালায়নি। তাই তো ক্লাসের কোনো শিক্ষার্থী পড়াবিষয়ক কোনো কথা এদের সাথে ভাগ করত না। এই যে এই তিন ভাগে বিভক্ত শিক্ষার্থী। এদের এই ভাগটা খুবই শৃঙ্খলাপূর্ণ ছিলো, যে প্রথম বিভাগের সে প্রথম নিয়ম অনুসারী। যে দ্বিতীয় বিভাগের সে দ্বিতীয় নিয়ম অনুসারী। আর যে তৃতীয় বিভাগের সে তৃতীয় বিভাগের অনুসারী। কেউই নিজের অবস্থা বদলাতে স্বাচ্ছন্দ বোধ নয়। কিন্তু এর ভেতর যে একেবারেই ভিন্ন ছিলো তার নাম জিহাদ। সবাই সবার নিজ শৃঙ্খলা অনুযায়ী স্কুল সময় পার করলেও সে ছিলো একেবারেই ভিন্ন। এই তিন ভাগের তিন ভাগেই তার পদাচরণ ছিলো। কখনো বাড়ি থেকে পাঠ শিখে আসতো। কখনো বা স্কুলে এসে শিখতো। কখনো আবার, ‘দূর ভালো না আজকে মার খাবো পড়বো না’ বলে পড়া বদা দিয়ে দিতো। এর আগে অবশ্য আমি দ্বিতীয় দলের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম যে কি না, বাড়ি থেকে পড়া না পড়ে আসলেও, স্কুলে এসে ঠিকই শিক্ষকদের বেতের ভয়ে পড়া সম্পন্ন করতাম। আর এভাবেই নয়ণ্ডছয় করে গত দিনগুলো সুখেণ্ডশান্তিতে পার করে আসলেও আমার জীবনে জিহাদের প্রবেশ ছিলে একেবারে মিস্টার অশান্ত দেবীর বাড়িতে ভাড়াটিয়া থাকার মতো।

প্রতিবছর নতুন শ্রেণিতে ওটার পর অন্যান্য স্কুল থেকে নিয়ম করেই কিছু নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়। যাদের ভেতর কিছু মেধাবী, কিছু মধ্য মেধাবী, কিছু নিম্ন মেধাবী আর বাকিগুলো অগা। তো, সে বছরই নতুন হিসেবে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হয় জিহাদ হাসান নামের এক ছেলে। হাজিরা খাতায় নাম ধরে শিক্ষক যখন ডাকলে, রোল বেয়াল্লিশ জিহাদ হাসান! জিহাদ হাসান!

পুরো ক্লাস তখন নিশ্চুপ। জিহাদ হাসান!

ওহ, নতুন শিক্ষার্থী। সে স্কুলে আসেনি বুঝা গেলো। সেটা অবশ্য তেমন কোনো বিষয় না। ভর্তি হওয়ার পর প্রথম দুণ্ডএকদিন অনেকেই স্কুলে আসে না তারপর আস্তে আস্তে নিয়মিত হয়ে যায়। কিন্তু মূখ্য বিষয় হলো তার নামটা। তখনও অবধি আমি জিহাদ নামটা প্রথমবারের মতো শুনেছিলাম। প্রথম বার হওয়া নামের অর্থও ঠিকভাবে বুঝতে পারলাম না। তারপর একই ক্লাসে পড়বে। হয়তো বা বন্ধু হতে পারে। খুব ভালো বন্ধু অথবা খুব খারাপ। যাই হোক ক্লাসমেট তো! তাই না? এই ভেবে কল্পনায় তার ছবি আঁকতে চেষ্টা করলাম। নাম হচ্ছে জিহাদ! তিন অক্ষরের নাম। তার মানে শারীরিকভাবে চিকনই হবে। একটু কালো হবে! না, না। একটু শ্যামলা হবে! না, না। সুন্দরও তো হতে পারে! ধূর! একটা হবেই এত ভাবার কি আছে কালতো স্কুলে আসছেই তখনই না হয় মিলিয়ে নিবো। নামের সাথে দেহের রংণ্ডএর মিল খুঁজে পাইনি বলে সেদিন আর তাকে নিয়ে তেমন ভাবিনি।

পরদিন স্কুল গিয়ে ব্যাগটা টেবিলে রেখলাম। রেখেই মাঠের উদ্দেশ্যে হুটহাট হেঁটে বেড়িয়ে যাওয়ার জন্য ক্লাসরুম ত্যাগ করে, যেণ্ডই মাঠের দিকে দৌড় দিবো ঠিক তখনই এক অপরিচিত ছেলের সাথে জোরে ধাক্কা খেয়ে ঘুরে পড়ে যাই। যেহেতু সেও পড়ে যাবে যাবে অবস্থা তাই আমার বাহুতে আলিঙ্গন রূপক ধরার চেষ্টা করছিলো। তবে তার হাতের দিকে হাত বাড়িয়ে ধরতে গিয়ে যা ঘটে গেলো তার জন্য রীতিমত প্রস্তুত ছিলাম না। সে খয়েরি রংয়ের একটা ফুল হাতা সার্ট পরেছিলো। আর হাতাও পুরোপুরো উন্মুক্ত একেবারে কব্জিতে এসে বুতাম সহযোগে থেমেছে। আর আমার এ পড়ে যাওয়া যাওয়া অবস্থায় তার ওই হাতারে শেষ প্রান্তে অর্থাৎ বুতাম থেকে শুরু করে তার ঠিক আগ পর্যন্ত যে কাটা অংশটা থাকে তার ভেতর আঙ্গুল ডুকে যায়। এবং আমার ধাক্কা লেগে পড়ে যাওয়া দ্রুতি বেশি থাকায় আঙ্গুলের টানে তার হাতের বুতাম আটকানো ফাঁকা অংশটা তিনণ্ডচার ইঞ্চির মতো ছিঁড়ে যায়। আমি পড়ে যাওয়া থেকে উঠে দেহের পেছনের দিকটা ঝাড়তে ঝাড়তে তার দিকে তাকালাম। তাকিয়েই একেবারে বাক্রুদ্ধ হয়ে যাই। রাগে লাল হয়ে ফুঁসে আছে ও। আমাকে লক্ষ করে হাতার ছেঁড়া অংশের দিকে তাকিয়ে ইশারা করলো। বুঝতে পারলাম বড়সড় ভুল করে ফেলছি। মনে মনে ভাবলাম এবার বোধহয় নতুন সার্টই কিনে দিতে হবে। আরো নতুন কিছু ভাবনা যোগ হওয়ার ছিলো। কিন্তু আমার চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা এবং কোনোরকম প্রতিক্রিয়া না দেখেও নিজেই আমার দিকে এগিয়ে এলো। দেহে মাংসের পরিমাণ যথেষ্ট বেশি। তখনকার দিনে আমাদের আব্বুণ্ডআম্মু যাকে স্বাস্থবান বলতো ও ও ছিলো ঠিক তেমনই। গায়ের রং ফর্সা। চুলগুলো সুঠাম দাঁড়ানো। মনে হচ্ছে জেল ব্যবহার করে। আমার দিকে এগিয়ে এসে এক মুহূর্তের জন্যও থামলো না। সরাসরি ছেঁড়া হাতাটা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলো এটা কি করলি তুই? আমি তখনও তাকে চিনতে পারিনি। ও তখনও আমার কাছে অপরিচিত একটা ছেলে হিসেবে ছিলো নিজের শ্রেণিকক্ষের বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকায় এতোটুকু বুঝতে পেরেছি যে ও আমাদেরই ক্লাসের কিন্তু নাম ধাম জানা নেই। সুতরাং করুণার সুরে বুঝাতে লাগলাম যে, আমি ইচ্ছে করে এসব করিনি আমাকে মাফ করে দিতে। চেহারা দেখে ভাবলামা বোধহয় মাফ করে দিবে। কিন্তু না আমার ধারণা পুরোপুরি ভুল। ও এক মুহূর্ত দেরি না করে সার্টের বুতাম খুলে সার্টটা আামর দিকে এগিয়ে ধরে বললো, ‘এই সার্ট তুই ছিঁড়ছত আমি এই সার্ট নিবো না তুই এটা জোড়া লাগিয়ে আগের মতো করে দে একটু ছেঁড়াও যেনো না বুঝা যায়’। আমি হতভম্ব। এখন সার্ট জোড়া লাগাবো কিভাবে! আর জোড়া লাগলে তো দাগ থাকবেই ক্ষত চিহ্নের মতো। আর ও যা কিছু বললো সবই অসম্ভব। আর আমার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি এতটাই নিম্নমুখি ছিলে যে কি রেখে কি করবো কিছুই বুঝতে পারছিলাম না।

অবশেষে কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে অনেক অনুনয়ণ্ডবিনয় করে ওকে মানালাম। শেষে সমাধান হলো সার্টটা দর্জির কাছ থেকে সেলাই করে দিতে হবে। যেহেতু আমার মা সেলাই কাজ জানে এবং তার নিজরেই মেশিন আছে সুতরাং এ কথায় রাজি হয়ে গেলাম। সেও রাজি হলো।

উফফ হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। পরবর্তীতে অবশ্য সে আর ওটা সেলাই করতে দেয়নি এবং সেদিনের পর ওই সার্টটা ওকে আর পরতেও দেখিনি। তারপর আস্তে আস্তে আমাদের মাঝে বন্ধুত্ব সৃষ্টি হয়। এবং একসাথে একই বেঞ্চে প্রায়ই বসতাম। প্রথম পর্যায়ে ওর বন্ধু হতে পেরে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করলেও আস্তে আস্তে নিজের চিন্তাধারার উপর নিজেরই আস্থা ঘুছে যায়। ধীরে ধীরে মনে হতে থাকে স্কুলজীবনে সবচেয়ে বড় ভুল ভাবনা ছিলো ওর বন্ধু হতে পেরে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করা। স্কুলের ছাত্রণ্ডছাত্রীদের ভেতর আমি যে তিন বিভাগ নিশ্চিত করেছিলাম। জিহাদ ছিলো সেখানকার গিরগিটি। একেকবার একেক বিভাগের মধ্যে পড়ে যেতো। তবে একা নয়। ওর বন্ধু হওয়ার খাতিরে আমাকেও নিয়ে যেতো।

একবার বাড়ি থেকে পাঠ সম্পন্ন করতে পারিনি বলে স্কুল এসে পড়া পড়ছিলাম। এমন সময় ওণ্ডও আসলো ব্যাগটা পাশেই নামিয়ে রেখে বললো চল বাহিরে খেলতে যাই। হাতের বইটা দেখিয়ে স্যারের অতীতের রেকর্ড বললাম। ও আমায় চমকে দিয়ে স্যারের ভাবিষৎকর্ম বলে দিলো, এবং এ ও বললো আরে অনেকেই পরা দিবো, তাদের পড়া নিতে নিতে স্যার আমাদের পেটানো সময়ই পাবে না। কালকে দেখিসনি শুধুমাত্র পড়া নিয়েই চলে গেছে যারা দেয়নি তাদের কিছুই বলেনি।

এই বলে হাহা করে হাসতে লাগলো। আমি ওর কথায় মন দিয়ে একই ভাবনা ভাবলাম এবং চিন্তা করলাম।

এই সময়টুকু বাহিরে দুষ্টুমি করার অথচ আমি বসে বসে পড়ছি। আর জিহাদের কথা অনুযায়ী স্যারের হাতে মার খাওয়ারও সম্ভাবনা নেই। সুতরাং বাহিরে গিয়ে মজা করাই এই সময়টুকু বাজেভাবে নষ্ট করতে চাই না। বইটা ব্যাগে ডুকিয়ে দুষ্টুমি করার জন্য বাহিরে চলে গেলাম। স্কুলের ঘণ্টা বেজে গেছে। সবাই সবার ক্লাসে চলে গেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই স্যারও ক্লাসে চলে এলেন।

হাজিরা ডাকলেন। অবশেষে বই হাতে নিয়ে সেই পুরোনো প্রশ্ন, ‘কালকে কি কোনো পড়া দেওয়া ছিলো?’

একই সঙ্গে ক্লাসের ব্রিলিয়ান্ট ছাত্রীদের সমস্বরে আওয়াজ, ‘জ্বি স্যার’।

সবাই পড়ে এসেছ তো! উপস্থিত শিক্ষার্থীদের প্রায় সত্তর ভাগই হ্যাঁণ্ডসূচক জবাব দিবো; বাকিরা চুপ। এবার স্যার বললেন প্রতিদিনই তো পড়া নেই আজকে কোনো পড়া নেওয়া হবে না। আজকে পাড়া না পড়ে আসা অসভ্যদের শিক্ষা দিয়ে ছাড়বো।

কে কে পড়া পারিস না দাঁড়া।

তুমি থেকে সোজা তুই...

স্যারের কথায় এই বিশাল পরিবর্তন যে কতটা ভয়াবহ হবে তা মোটামুটি আন্দাজ করতে চাচ্ছিালম। পুরোপুরি না বুঝলেও এতটুকু বুঝতে পারলাম যে কপাল আজ মন্দ। উপর থেকে আজকের বেতটাও অন্যান্য দিনের চেয়ে অধিক বড়, ভারী, মোটা ও শক্ত।

কি হলো দাঁড়াস না কেন?

দ্বিতীয়বার দমকণ্ডসূচক শব্দে হুঁশ ফিরলো। ধীরে ধীরে ক্লাসের প্রায় অর্ধেক ছাত্রছাত্রী দাঁড়িয়ে গেলো।

পরিস্থিতি দেখে স্যারের মাথা পুরে গরম হয়ে গেলো।

কারণ ছেলেদের মধ্যে মাত্র দুজন বসা বাকি সবাই দাঁড়ানো।

অনেকটা নিষ্ঠুর মনণ্ডমানসিকতা নিয়ে স্যার একটা ভয়াবহ সিদ্ধান্ত নিলেন বললেন, আজ কোনো মেয়েকেই পিটাবো না, যা পেটানোর সব ছেলেদের পেটাবো।

এ কথা বলে স্যার তার কাজ শুরু করে দিলেন।

স্যার তার আসনেই বসে আছেন৷ তবে তিনি বলে দিয়েছেন যে মিলাদের বাধ্য তবররুক আনার জন্য একে একে সবাই যেনো তার কাছাকাছি গিয়ে আসে।

প্রথমেই যে গেলো তার বা হাত স্যার নিজের বা হাত দিয়ে ধরে নিতম্বের উপর ঠাসণ্ডঠাস করে পাঁচ ঘা দিয়ে দিলেন। মুহূর্তের মধ্যে উচ্চ কান্নার রোলে ভেসে ওঠলো ক্লাসরুম।

পেটে অমানবিকভাবে গুট গুট আওয়াজ করছে বুঝলমা মানসিক অবস্থা খারাপ হয়ে গেছে।

অস্বস্তি ঢোক গিলতে গিলতে জিহাদের দিকে এক নজর তাকালাম। ও অন্যদিকে তাকিয়েছিলো। আমার চোখে পড়তে এক চাপে খিক খিক করে হাসি বেরিয়ে এলো। মনে হচ্ছিলো অনেকক্ষণ ধরে আটকে রাখা হাসির বহিঃপ্রকাশ। বুঝতে বাকি রইলো না, যে ও যতদিন সাথে আছে কারণে অণ্ডকারণে শিক্ষকের বেতার বাড়ি আমায় ছাড়বে না...।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়