চাঁদপুর, শুক্রবার, ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২০ মাঘ ১৪২৯, ১১ রজব ১৪৪৪  |   ১৭ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতি শিক্ষা স্বাস্থ্য সারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   কচুয়ায় রিয়া হত্যাকারীদের গ্রেফতার ও ফাঁসির দাবিতে মানববন্ধন
  •   কোস্টগার্ডের অভিযানে চাঁদপুর কোর্ট স্টেশনে ১৩শ’ কেজি জাটকা জব্দ
  •   ডাঃ সাজেদা পলিন নড়াইলের সিভিল সার্জন
  •   মতলবের আনন্দবাজারে অগ্নিকাণ্ডে পাঁচটি দোকান পুড়ে ২৫ লক্ষ টাকার ক্ষয়-ক্ষতি
  •   ভাষার মাসের প্রথমদিনে বাংলায় রায় দিলেন হাইকোর্ট

প্রকাশ : ২২ নভেম্বর ২০২২, ০০:০০

কড়ৈতলী উদয়ন যুব সংঘের মাঠটি সংস্কারে কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা
অনলাইন ডেস্ক

ফরিদগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী কড়ৈতলী উদয়ন যুব সংঘের মাঠটি দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের দাবি করে আসছে এলাকাবাসী। কিন্তু অদ্যাবধি সংস্কারের কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। একসময় কড়ৈতলী উদয়ন যুব সংঘের এই মাঠটি পুরো ফরিদগঞ্জ উপজেলায় খেলাধুলার জন্য বিখ্যাত ছিলো। কিন্তু মাঠটি সংস্কারের অভাবে তা দিন দিন বিলুপ্তির পথে। ক্লাবটির পুরানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন একদল যুবক।

আমরা সবাই জানি, মেধা-মনন বিকাশের প্রধান সহায়ক হলো খেলাধুলা। শারীরিক, মানসিক ও বৃদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের জন্য খেলাধুলার কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষার পাশাপাশি খেলাধুলাও জরুরি। বর্তমানে গ্রামাঞ্চলে হাতে গোণা যে ক'টি খেলার মাঠ রয়েছে, সেগুলোর অবস্থা তেমন একটা ভালো নয়। অনেক মাঠ আজ নিজেদের অস্তিত্ব হারিয়েছে। একটুখানি খেলতে গেলে পোহাতে হয় কষ্ট, উঁচু নিচু মাঠের মাটি, বড় বড় ঘাস, বৃষ্টিজনিত জলাবদ্ধতার প্রতিবন্ধকতা। পুকুর বা দিঘিতে প্রতিনিয়ত বিলীন হচ্ছে মাঠ। মাঠগুলো হয়ে যাচ্ছে খেলাধুলার অনুপযোগী। এ পরিস্থিতি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তেমনি একটি মাঠ হলো কড়ৈতলী উদয়ন যুব সংঘের মাঠ। দিঘির করাল গ্রাস ও মাঠটি দিয়ে প্রতিনিয়ত ভারী যানবাহন চলাচল করায় পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে মাঠটি। জরাজীর্ণ এই মাঠটিতে খেলাধুলা করে প্রায়ই খেলোয়াড়দের দুর্ঘটনার শিকার হতে হয়। তাই যুব সমাজকে নেশা, আড্ডা ও যেকোনো খারাপ কাজ থেকে দূরে রাখতে হলে মাঠটি সংস্কার করা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। এলাকার সাধারণ জনগণ মাঠটি সংস্কারের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন।

মাঠটির পূর্ব দিকে প্রায় ১৬ একর সম্পত্তির উপর 'বাবুর দিঘি' নামে একটি বিশাল দিঘি রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রায় এক হাজার বছর পূর্বে হরিশ চন্দ্র বসু নামে এক জমিদার কড়ৈতলী গ্রামে তাঁর জমিদারির গোড়াপত্তন করেন। তারপর তাঁর শেষ বংশধর গোবিন্দ চন্দ্র বসু প্রায় সত্তর বছর পূর্বে এদেশ ছেড়ে চলে যান। জানা যায়, তারা নাকি খুবই অত্যাচারী জমিদার ছিলো। প্রায় তিনশত একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় তাদের জমিদার বাড়িটি। জমিদারদের বংশের কেউই এই বাড়িটি সম্পর্কে কোনো খোঁজ-খবর নেন না। জমিদার বাড়িটি মূলত ‘বাবুর বাড়ি’ নামেই সবচেয়ে বেশি পরিচিত। কড়ৈতলী বাবুর বাড়ি বললেই একনামে পুরো জেলায় সকলেই চিনে। কী নেই এই বাড়িটিতে। জমিদার বাড়িটিতে রয়েছে দুর্গা মন্দির, বিশাল প্রাসাদ, অট্টালিকা, কাচারি ঘর, এমনকি সুড়ঙ্গপথও রয়েছে। লোকমুখে কথিত আছে, এখানে একটি আঁধার মানিকও রয়েছে। এছাড়া একাধিক ছোট ছোট পুকুর ও প্রায় ১৬ একর সম্পত্তির ওপর বিশাল একটি দিঘি রয়েছে।

এই দিঘিটির কারণেই আজ ঐতিহ্যবাহী কড়েতলী উদয়ন যুব সংঘ মাঠটি বিলীন হয়ে যাচ্ছে। শুধু মাঠটি নয়, মাঠের উত্তর পূর্ব কোণে যে ক্লাব ঘরটি রয়েছে তাও বিলীন হওয়ার পথে। বিগত কয়েক বছর পূর্বে খেলোয়াড়দের খেলাধুলা শেষে গোসল করার জন্য একটা ঘাটলা নির্মাণ করা হয়েছিলো। সেটিও বিলীন হয়ে গেছে এই বিশাল দিঘিটির কারণে। প্রতিনিয়ত বাবুর দিঘির করাল গ্রাসে নিপতিত হয়ে মাঠটি বিলীন হয়ে যাচ্ছে। পূর্ব-পশ্চিমে প্রায় ২০ ফুট ও উত্তর-দক্ষিণে প্রায় ২৫০ ফুট জায়গা এই দিঘিটিতে বিলীন হয়ে গেছে। এলাকার সাধারণ জনগণ ও খেলোয়াড়বৃন্দ একাধিকবার মাঠটি রক্ষা করার জন্য নিজেরা মাটি কেটে মাঠটি রক্ষা করার চেষ্টা করলেও প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে আবার মাঠটি দিঘিতে বিলীন হয়ে যায়।

স্বাধীনতার পরবর্তী সময় ধরে বর্তমান সময় পর্যন্ত মাঠটিতে বিভিন্ন খেলাধুলার আয়োজন হচ্ছে। বহু দূর দূরান্ত থেকে খেলোয়াড়রা এসে এই মাঠটিতে খেলে থাকে। আমার দেখায় শুধু চাঁদপুর জেলার নয়, পার্শ্ববর্তী জেলাগুলো থেকেও বহু দল এই মাঠটিতে খেলতে আসতো। প্রতিবছর বিভিন্ন টুর্নামেন্টের আয়োজন করা হতো। ফুটবল, ক্রিকেটের পাশাপাশি ভলিবলে কড়ৈতলী উদয়ন যুব সংঘের খুবই সুনাম ছিলো। ভলিবলেও খুবই জনপ্রিয় ছিলো কড়ৈতলী উদয়ন যুব সংঘ। শীত মৌসুম আসলেই বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে বহু দল ভলিবল খেলতে আসতো এই মাঠটিতে। মাঠটিতে ভলিবলের একাধিক কোট করা হতো। খুবই দৃষ্টিনন্দন ছিলো মাঠটি। কিন্তু বাবুর দিঘির গ্রাসে মাঠটি সংস্কারের অভাবে প্রতিনিয়ত বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

কয়েকদিন পূর্বে এলাকার বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ ঐতিহ্যবাহী কড়ৈতলী উদয়ন যুব সংঘের মাঠটি রক্ষা ও সংস্কারের দাবিতে মানববন্ধন করে। কড়ৈতলী উদয়ন যুব সংঘ মাঠে খেলতে আসা ফরিদগঞ্জ ফুটবল একাডেমির খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাবৃন্দও বিভিন্ন শ্লোগানের ফেস্টুন সম্বলিত পোস্টার ও ব্যানার হাতে মানববন্ধনে একাত্মতা প্রকাশ করে মাঠটির দ্রুত সংস্কার দাবি জানান।

এ সময় ফরিদগঞ্জ ফুটবল একাডেমির কর্মকর্তাবৃন্দ বলেন, এই দিঘিটির করাল গ্রাস মাঠটিকে নিশ্চিহ্ন করে খেলাধুলার অনুপযোগী করে ফেলছে, খেলাধুলার আনন্দ হরণ করছে। তাই তারা ঐতিহ্যবাহী কড়ৈতলী উদয়ন যুব সংঘের মাঠটিতে খেলাধুলার সুষ্ঠু ব্যবস্থা করা, খেলার উপযোগী মাঠের ব্যবস্থা করা, দিঘির ভাঙ্গনের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য মাঠের পূর্ব পাশে ওয়াল দিয়ে ও ভরাট করে মাঠটিকে উদ্ধারের ব্যবস্থা করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন। এছাড়াও কড়ৈতলী উদয়ন যুব সংঘের সকল ক্রীড়ামোদী এবং এলাকার সর্বস্তরের জনসাধারণ এই মানববন্ধনে অংশগ্রহণ করে।

কড়ৈতলী উদয়ন যুব সংঘের এই মাঠ থেকে খেলাধুলা করে ঢাকার বিভিন্ন ক্লাব থেকে শুরু করে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলেও নেতৃত্ব দিয়েছেন খেলোয়াড়রা।

তেমনি একজন খেলোয়াড় বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক ও আবাহনী লিঃ-এর খেলোয়াড় রেজাউল করিম রেজা। রেজা ও আমি একই সাথে এই মাঠে খেলাধুলা করতাম। ২০০০ সালে অনূর্ধ্ব ১৬ ফুটবল দলে খেলোয়াড় নেওয়ার সময় রেজা ও আমি একসাথে লাইনে দাঁড়িয়েছি। রেজা খুবই ভালো মানের একজন খেলোয়াড় ছিলো। ভাগ্য সুপ্রসন্ন হওয়ায় রেজা অনূর্ধ্ব ১৬ ফুটবল দলে সুযোগ পায়। পরবর্তীতে রেজা বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলেরও নেতৃত্ব দিয়েছে। রেজা ইতিমধ্যে বাংলাদেশের ফুটবলকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে আরও বেশি জনপ্রিয় করে গড়ে তোলার জন্য এবং বর্তমান প্রজন্মকে নেশা, আড্ডা ও যেকোন খারাপ কাজ থেকে দূরে রাখার জন্য ফরিদগঞ্জের কৃতী সন্তান বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের আরেকজন খেলোয়াড় রাফিসহ ফরিদগঞ্জের তাঁর বন্ধুদের সাথে নিয়ে ফরিদগঞ্জ ফুটবল একাডেমি নামে একটি ফুটবল একাডেমি গড়ে তোলে। মাঠটি রক্ষা ও সংস্কারের দাবিতে মানববন্ধনে রেজাউল করিম রেজাকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়। যথারীতি রেজা মানববন্ধনে অংশগ্রহণ করে। এ সময় তিনি বলেন, আমি কড়ৈতলী উদয়ন যুব সংঘের এই মাঠে খেলেই আজ এই পর্যন্ত পৌঁছেছি। কিন্তু পাশের বাবুর দিঘিতে ইতোমধ্যেই মাঠের পূর্ব-পশ্চিমে অন্তত ২০/২৫ ফুট ও উত্তর-দক্ষিণে ২০০-২৫০ ফুট জায়গা বিলীন হয়ে গেছে। মাঠ দিয়ে যানবাহন চলায় পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে মাঠটি। আমি শুনেছি মাঠটির অবস্থা খারাপ থাকার কারণে গত একমাসে একটি খেলাও হয়নি মাঠে। তারপরও কর্তৃপক্ষ জরাজীর্ণ মাঠে প্রীতি ফুটবল ম্যাচের আয়োজন করেছে। মাঠটি রক্ষা ও সংস্কারের জন্য আমি যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যথাসাধ্য চেষ্টা করবো। তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বাবুর দিঘিতে বিলীন হওয়া মাঠ পুনরুদ্ধার করাসহ মাঠ সংস্কারের জোর দাবি জানান।

রাজন চন্দ্র দে : ক্রীড়া লেখক, চাঁদপুর।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়