চাঁদপুর, শুক্রবার, ১ জুলাই ২০২২, ১৭ আষাঢ় ১৪২৯, ১ জিলহজ ১৪৪৩  |   ২৬ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতি শিক্ষা স্বাস্থ্য সারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   কচুয়ায় অগ্নিকাণ্ডে বসতঘর পুড়ে ছাই
  •   বাংলাদেশে ঈদুল আজহা ১০ জুলাই
  •   ডাকাত সন্দেহে কোস্টগার্ডের হামলায় নিখোঁজ ১ : আহত ২
  •   হাজীগঞ্জে নবজাতকের লাশ উদ্ধার
  •   অধ্যাপক    কামরুজ্জামান সাহেবের স্মরণ সভা  ও মিলাদ

প্রকাশ : ১৬ মে ২০২২, ০০:০০

ওভারিয়ান ক্যান্সার সম্পর্কে জানা জরুরি
অনলাইন ডেস্ক

ক্যান্সারের নাম শুনলেই পিলে চমকে ওঠে সবার। কারণ ক্যান্সার মানেই মৃত্যু অতি নিকটে। ক্যান্সার মানেই মৃত্যুর বিভীষিকা। তবুও সচেতনতা তৈরি হলে ক্যান্সারের মতো ভয়াবহ রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। ক্যান্সারজনিত রোগের মধ্যে মহিলাদের ওভারিয়ান ক্যান্সার অধিক হারে সংঘটিত ক্যান্সারের অন্যতম। তাই আজকের আলোচনা ওভারিয়ান ক্যান্সারকে ঘিরে।

ওভারিয়ান ক্যান্সার কী?

মহিলাদের তলপেটে জরায়ুর দুইদিকে একটি করে দুটি ডিম্ব উৎপাদনের অঙ্গ বিদ্যমান। যাদেরকে ওভারি বলে। প্রতি মাসে ঋতু চক্রের নির্দিষ্ট সময়ে উভয় ওভারি হতে একটি করে পরিপক্ক ডিম্ব তৈরি হয়ে প্রজননের জন্যে উপযুক্ততা তৈরি করে। এই ওভারির উভয় অথবা যে কোনোটিতে অস্বাভাবিক ও অনিয়ন্ত্রিত কোষ বৃদ্ধি হয়ে টিউমার সৃষ্টির মাধ্যমে যে ক্যান্সার সংঘটিত হয় তাকে ওভারিয়ান ক্যান্সার বলে।

ওভারিয়ান ক্যান্সার সংঘটনের বিশ্ব পরিস্থিতি

ওভারিয়ান ক্যান্সার মহিলাজনিত ক্যান্সারের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। শিল্পসমৃদ্ধ দেশগুলোতে এই ক্যান্সারের হার খুব বেশি। তবে জাপানে এর হার কম। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২০১০ সালে ২১,৮৮০ জন মহিলা ওভারিয়ান ক্যান্সারে আক্রান্ত হয় এবং ১৩,৮৫০ জন ক্যান্সারাক্রান্ত নারী এতে মৃত্যুবরণ করেন। প্রতিটি মহিলার জীবনে ওভারিয়ান ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা ১.৪%-২.৫%। ৫৫ বছর হতে ৭৪ বছরে ওভারিয়ান ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ৫০% ভাগেরও বেশি। ৩৫ হতে ৫৪ বছর এর মধ্যে এই ক্যান্সারজনিত মৃত্যুর হার ২৫% ভাগ। বিশ্বের তাবৎ মহিলাদের ১% ভাগ ওভারিয়ান ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করে।

ওভারিয়ান ক্যান্সারের উপসর্গ

* পেট ফেঁপে যাওয়া

* তলপেটে ব্যথা

* খাবার গ্রহণে অসুবিধা

* ঘন ঘন মূত্র ত্যাগের প্রবণতা

এই উপসর্গগুলো মাসে ১২ বারের অধিক অনুভূতি হলে ওভারিয়ান টিউমারের কথা চিন্তা করা যায়।

এছাড়াও

* তলপেট ভারী হওয়া

* কোমড়ে ব্যথা

* কোষ্ঠকাঠিন্য

* ক্লান্তি

* জরায়ু হতে ঋতুস্রাব বর্হিভূত রক্তক্ষরণ

* ওজন হ্রাস- ইত্যাদি লক্ষণাবলি প্রকাশিত হয়। তবে উক্ত লক্ষণাবলি অন্যান্য রোগেরও সাদৃশ্য বহন করে।

রোগ সংঘটনে উপসর্গের মাত্রা

বয়স : অল্প বয়সে ওভারিয়ান ক্যান্সার হতে পারে। যতো বয়স বৃদ্ধি পায় ততো ক্যান্সার সংঘটনের মাত্রা বাড়ে।

* রক্তস্বল্পতা : ক্যান্সার সংঘটনে সম্ভাবনা ২-৩ গুণ।

* তলপেটে ব্যথা : ক্যান্সার সংঘটনে সম্ভাবনা ৭ গুণ।

* পেট ফুলে যাওয়া : ক্যান্সার সংঘটনে সম্ভাবনা ২৩ গুণ।

* মলদ্বারে রক্তপাত : ক্যান্সার সংঘটনে সম্ভাবনা ২ গুণ।

* ঋতুচক্র সম্পূর্ণ বন্ধ হওয়ার পরও জরায়ু পথে রক্ত ক্ষরণ : ক্যান্সার সংঘটনের সম্ভাবনা ৬% গুণ।

* খাবার গ্রহণে অরুচি : ক্যান্সার সংঘটনে সম্ভাবনা ৫.২ গুণ।

* ওজন হ্রাস : ক্যান্সার সংঘটনে সম্ভাবনা ২ গুণ।

ক্যান্সার-এর ঝুঁকি উপাদান

ওভারিয়ান ক্যান্সারের সঠিক কারণ জানা যায়নি আজও। তবে নি¤েœাক্ত ঝুঁকিগুলো শনাক্ত করা গেছে :

* বয়স্ক মহিলা

* যাদের প্রথম ও দ্বিতীয় মাত্রার আত্মীয় আছে যার ওভারিয়ান ক্যান্সার আছে।

* জ্বীনগত উত্তরাধিকার

* নিঃসন্তান ও বন্ধ্যা মহিলা

* এন্ডোমেট্রিয়াইটিস

* ঋতুস্রাব বন্ধ হওয়ার পর যারা ইস্ট্রোজেন হরমোন থেরাপী গ্রহণ করেন।

ক্যান্সার হতে রক্ষার উপাদান

* কম্বাইন্ড ওরাল কন্ট্রাসেপ্টিভ পিল গ্রহণ

* তরুণ বয়সে প্রথম গর্ভধারণ

* অধিক বয়সে শেষ গর্ভধারণ (যাদের একাধিকবার গর্ভধারণ হয়)

* স্বল্প মাত্রার হরমোন বড়ি দ্বারা জন্মবিরতিকরণ

* টিউব-লাইগেশান

গবেষণায় দেখা গেছে যারা দীর্ঘ ১০ বছর ওরাল কন্ট্রাসেপ্টিভ পিল গ্রহণ করেছেন তাদের মধ্যে ওভারিয়ান ক্যান্সার সংঘটনের মাত্রা ৬০% ভাগ হ্রাস পেয়েছে। আবার যারা সূর্যরোদে দীর্ঘক্ষণ অবস্থান করে অর্থাৎ যাদের দেহে অধিক ভিটামিন ডি বিদ্যমান তাদের ক্ষেত্রে ওভারিয়ান ক্যান্সার সংঘটনের হার কম।

সন্তানবতী মহিলাদের ওভারিয়ান ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কম। সন্তানদায়ী মায়েদের ক্ষেত্রে ওভারিয়ান ক্যান্সার সংঘটনের মাত্রা অতি নিম্ন জরায়ু অপারেশানের মাধ্যমে ফেলে দেয়া মহিলাদের ওভারিয়ান ক্যান্সার সংঘটনের মাত্রা কম। টোটাল অ্যাবডোমিনাল হিস্টেরেক্টো (জরায়ুসহ দুই ওভারি অপারেশন) করা হলে ওভারিয়ান ক্যান্সার হওয়ার পথ রুদ্ধ হয় এবং ব্রেস্ট ক্যান্সার হওয়ার হারও হ্রাস পায়।

রোগ নিরূপণ

* শারীরিক পরীক্ষা তলপেট পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষণ

* রক্তপরীক্ষা কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট ও সিরাম ইলেকট্রোলাইট

* রক্তে মার্কার ঈঅ-১২৫ পরীক্ষণ

* ট্রান্সভ্যাজাইনাল আল্ট্রাসনোগ্রাম

* তলপেট অপারেশন করে শৈল্য চিকিৎসায় বায়োপসির মাধ্যমে রোগ নিরূপণ

* অধিকতর তরুণ রোগীদের ক্ষেত্রে সিরাম আলফা ফিটোপ্রোটিন (অঋচ) ও ল্যাক্টেট ডিহাইড্রোজিনেজ (খউঐ)-এর মাত্রা নিরূপণ (যাদের ম্যালিগনেন্ট জার্ম সেল টিউমার হয়)

* ঙঠঅ১ মার্কার নিরূপণ (ঢ়ৎড়ঃবড়সরপং)

* তলপেটের উদরগহ্বরে সঞ্চিত তরলের মাইক্রোস্কোপিক পরীক্ষায় ক্যান্সার কোষ প্রাপ্তি ইত্যাদি বিবিধ পরীক্ষার মাধ্যমে ওভারিয়ান ক্যান্সার নিরূপণ করা যায়।

ওভারিয়ান ক্যান্সারের ধরণ

যে সকল ওভারিয়ান ক্যান্সার ওভারি হতে উৎপন্ন হয় তাকে প্রাইমারি ওভারিয়ান ক্যান্সার বলে। যে সকল ওভারিয়ান ক্যান্সার দেহের অন্যান্য ক্যান্সারের দূর সঞ্চারণের ফলে উৎপন্ন হয় তাদেরকে সেকেন্ডারী ওভারিয়ান ক্যান্সার বলে। প্রাইমারি ওভারিয়ান ক্যান্সারের মধ্যে ওভারিয়ান এপিথেলিয়াল কার্সিনোমার হার অধিক। এছাড়াও

* সেরাস টিউমার

* এন্ডোমেট্রয়েড টিউমার

* মিউসিনাস সিস্টেডেনো কার্সিনোমা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। কম উল্লেখযোগ্য প্রাইমারি টিউমার ও ক্যান্সারের ক্ষেত্রে :

* জার্ম সেল কার্সিনোমা ৫%

* সার্টোলি-লিডিগ সেল টিউমার ৮%

* ট্রাঞ্জিশনাল সেল কার্সিনোমা

* ম্যালিগন্যান্ট ব্রেনার টিউমার উল্লেখযোগ্য।

সেকেন্ডারী ওভারিয়ান ক্যান্সারের ক্ষেত্রে ব্রেস্ট ও পরিপাকতন্ত্রের ক্যান্সারের সংক্রমণে সৃষ্ট ক্যান্সার উল্লেখযোগ্য। ওভারিয়ান ক্যান্সারে উভয় ওভারি আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা ২৫% ভাগ।

ওভারিয়ান ক্যান্সারের স্টেজ ও গ্রেড

ঞঘগ পদ্ধতিতে ওভারিয়ান ক্যান্সারের স্টেজ মোট ৪টি : ১, ২, ৩ ও ৪. ১ ও ২-এর আবার ধ, ন, প এই তিনটি করে উপবিভাজন বিদ্যমান। স্টেজ ১ ও ২-এর রোগীদের নিরাময় হার অত্যন্ত উচ্চ। স্টেজ ৩ ও ৪-এর রোগীরা নিরাময়ের অতীত বলে ধরা যায়। ওভারিয়ান ক্যান্সারকে হিস্টোলজিক্যালি গ্রেড ০, ১, ৩ এ চারটি গ্রেডে ভাগ করা হয়। গ্রেড ০, ৩, ১-এর নিরাময় হার অধিক। গ্রেড ২-এর নিরাময় হার মোটামুটি। গ্রেড ৩-এর রোগীরা নিরাময়ের অতীত।

চিকিৎসা

ক. শৈল্য চিকিৎসা : অধিকতর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা। এর দ্বারা ক্যান্সারাক্রান্ত টিউমার, ওভারি ইত্যাদি অপসারণ করা হয়। যদি কোনো ক্যান্সার শুধু ওভারিতে আবদ্ধ থাকে তবে শুধু শৈল্য চিকিৎসায় দুই ওভারিসহ জরায়ু এবং আশপাশের লিগামেল্ট অপসারণ করলে রোগী নিরাময় হয়।

খ. কেমোথেরাপী : শৈল্য চিকিৎসার পর কেমোথেরাপী প্রয়োগ করা হয়। শৈল্য চিকিৎসার ২১ দিন পর কেমোথেরাপী প্রয়োগ হয়।

গ. রেডিওথেরাপী : কখনো কখনো প্রয়োগ হয়। তবে যাদের রেডিওথেরাপী প্রয়োগ হয় তাদের নিরাময় আশা করা যায় না।

প্রতিরোধ

* টিউব-লাইগেশান

* মুখে জন্মবিরতিকরণ বড়ি গ্রহণ

* টোটাল অ্যাবডোমিনাল হিসটেরেক্টমি অপারেশন।

ওভারিয়ান ক্যান্সারের জটিলতা

* উদর গহ্বরে পানি ও রস সঞ্চয়

* দূরবর্তী অঙ্গে ছড়িয়ে পড়া

* বিবিধ অঙ্গের কার্যকর ক্ষমতা নষ্ট হওয়া

* খাদ্যনালীর স্ফীতি ও অবরুদ্ধতা

ওভারিয়ান ক্যান্সারাক্রান্ত রোগীর ভবিষ্যৎ

প্রায় সকল ক্ষেত্রে ওভারিয়ান ক্যান্সার রোগ নিরূপণ হতে হতেই স্টেজ ৩ ও স্টেজ ৪ ছুঁয়ে যায়। এজন্যে এতে মৃত্যুর হার বেশি হয়। কেননা ওভারিয়ান ক্যান্সারের উপসর্গ অন্যান্য অনেক সাধারণ উপসর্গের সাথে মিলে যায়। তাই রোগীদের এ ব্যাপারে সচেতনতা কম থাকে। এজন্যে এই রোগ অতি দেরিতে নিরূপিত হয়। ওভারিয়ান ক্যান্সার শতকরা ৬০ ভাগই নিরূপিত হওয়ার সময় স্টেজ ৩ বা ৪-এ আক্রান্ত হয়। ওভারিয়ান ক্যান্সার হতে ক্যান্সার কোষ উদরগহ্বরের সঞ্চিত রসে ছড়িয়ে পড়ে যা দূরতম সঞ্চারণে ক্যান্সার ছড়িয়ে দেয়।

তবে ওভারিয়ান ক্যান্সার সকল স্টেজে ৪৭% ভাগ ৫ বছরের দীর্ঘ জীবন পায়। স্টেজ ১ ও স্টেজ ২-এর রোগীরা ৯২.৭% ভাগ ৫ বছর বা তার অধিক দীর্ঘ জীবন পায়।

স্ক্রীনিং : বছরে একবার করে সকল মহিলার চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে ওভারিয়ান ক্যান্সারের ঝুঁকি নিরূপণ করে স্ক্রীনিং করা দরকার। বছরে একবার তলপেটের আল্ট্রাসনোগ্রাম ও ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় ওভারিয়ান ক্যান্সার অগ্রিম শনাক্ত করা সম্ভব।

* চিকিৎসাঙ্গন বিভাগে লেখা পাঠানোর ই-মেইল

into.alamin@gmail.com

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়