চাঁদপুর, শুক্রবার, ২০ মে ২০২২, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯, ১৮ শাওয়াল ১৪৪৩  |   ২৯ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতি শিক্ষা স্বাস্থ্য সারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   চাঁদপুরের ২১তম জেলা প্রশাসক কামরুল হাসান
  •   প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের ৫ পরীক্ষার্থী হতাহত
  •   হাজীগঞ্জের শিশু আরাফ হত্যায় তিন আসামীর মৃত্যুদণ্ড
  •   কল্যাণপুর ইউপির জেলে চাল আত্মসাৎ, দুই গুদাম সিলগালা
  •   মা আর স্ত্রীকে বুঝিয়ে দেয়া হলো দুই ভাইয়ের লাশ

প্রকাশ : ০৬ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০০

বই পড়া কি ভুলেই গেলাম আমরা?
মাছুম বিল্লাহ

শিক্ষাবিদ আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ একবার বলেছিলেন, ‘ঢাকা শহরে এখন প্রতি অলিতে গলিতে খাবারের দোকান বসেছে, প্রতি দোকানেই ভিড়, ভিড় করছে মুখ্যত তরুণরা অথচ সে তুলনায় লাইব্রেরির সংখ্যা তো বাড়েইনি বরং কমে গেছে।’

দেশের জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের বয়স ১৪ থেকে ৩০ বছর, যাদেরকে আমরা কিশোর কিংবা তরুণ বলে থাকি। তরুণদের দেখা যায় গ্যাং কালচারে জড়িয়ে পড়তে, তাদের দেখা যায় ইভটিজিংয়ে, ধর্ষণ, এমনকি হত্যাকা-ের সঙ্গেও জড়াতে। এজন্য কি শুধু তারাই দায়ী?

মাদক, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিষবাষ্পে আক্রান্ত গোটা সমাজ। মাদকের থাবায় আক্রান্ত হতাশাগ্রস্ত তরুণ সমাজ ধীরে ধীরে পা বাড়ায় অপরাধের দিকে। খুন, টেন্ডারবাজি, রাজনৈতিক মাস্তানি, জমি দখল ইত্যাদি অপরাধমূলক কর্মকা-ে সন্ত্রাসীদের অনেকেই ভাড়ায় খাটে।

ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে একটি গোষ্ঠী তরুণদের ব্যবহার করে শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক রীতিনীতি ও পদ্ধতিকে ধ্বংস করার পাঁয়তারা করছে। খাঁটি স্বর্ণ দিয়ে যেমন গহনা হয় না, প্রয়োজন হয় খাদের, তেমনি পরিপূর্ণ মানুষ হতে শিক্ষার পাশাপাশি খেলাধুলা, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ইত্যাদি পাঠ্যক্রমবহির্ভূত কর্মকা-ে জড়িত থাকাও আবশ্যক।

আমাদের সমাজে বর্তমানে খেলার মাঠ, বিনোদন কেন্দ্র, গ্রন্থাগার ইত্যাদির রয়েছে অপর্যাপ্ততা। ফলে ছাত্রছাত্রী ও তরুণ প্রজন্ম প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারছে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত চাপ, পুরনো ধাঁচের শিক্ষাব্যবস্থা ও মুখস্থ বিদ্যার প্রভাবে ছেলেমেয়েদের মধ্যে অল্প বয়সেই পড়াশোনার প্রতি এক ধরনের অনীহা সৃষ্টি হয়।

বই পড়া সম্পর্কে বিল গেটস বলেছেন, ‘ছোটবেলা থেকেই আমার অনেক স্বপ্ন ছিল। আর এই স্বপ্ন পেয়েছিলাম বই থেকে। আপনারা যদি আমার ঘরে যান, দেখবেন বই, অফিসে যান, দেখবেন বই, যখন আমি গাড়িতে থাকি, আমার সঙ্গে থাকে বই।’ সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা পড়তে খুব পছন্দ করেন।

সাহিত্যের প্রতি তার অগাধ ভালোবাসার প্রমাণ ছড়িয়ে রয়েছে তার লেখা ‘ড্রিমস ফ্রম মাই ফাদার’ বইটিতে। সেখানে এক জায়গায় তিনি বলেছেন, ‘সাপ্তাহিক ছুটির দিনে যখন আমার কোনো কাজ থাকে না, তখন নিজের শূন্য অ্যাপার্টমেন্টে বই-ই হয় আমার একমাত্র সঙ্গী।’

যারা সফল হতে চায়, বড়লোক হতে চায়, নাম করতে চায়, মানুষের উপকার করতে চায় বিল গেটসের এই উপদেশ তাদের কাজে লাগবে। জোটে যদি মোটে একটি পয়সা খাদ্য কিনিও ক্ষুধার লাগি, দুটি যদি জোটে তবে একটিতে ফুল কিনিও হে অনুরাগী- কবির এই কথা কি আমরা ভুলে গেছি?

আমরা যদি মাসে ৩০০-৫০০ টাকার মোবাইল বিল দিতে পারি, তাহলে বছরে কেন দুই হাজার টাকার বই কিনব না? আমাদের যদি সোয়া কোটি ফেসবুক গ্রাহক থাকে, তাহলে কেন অন্তত সোয়া কোটি বই বিক্রি হবে না? স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কোনো প্রতিযোগিতায় পুরস্কার হিসেবে বই দেয়া বাধ্যতামূলক করা হোক।

উদ্যোগের অভাবেই দেশে আশানুরূপ পাঠক বাড়েনি। ফলে অধিকাংশ তরুণ এখন সৃজনশীল কর্মকা-ে পিছিয়ে পড়েছে। তরুণদেরও যে বিনোদনের প্রয়োজন, তাদেরও যে একটা অবসর জগৎ আছে সে খোঁজ আমরা অনেকেই রাখি না।

এক সময় তরুণদের অবসর সময় কাটত বই পড়া, খেলাধুলা, বিতর্ক চর্চা, দেয়াল লিখন, আবৃত্তি চর্চা, লেখালেখি, সংগঠনসহ নানা সৃজনশীল কাজ করে। বিভিন্ন সীমাবদ্ধতায় সেসব এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। প্রকৃত বিনোদন নেই বলেই তারা বিপথে পা বাড়াচ্ছে।

বই পড়া সম্পর্কে বহুমাত্রিক জ্যোতির্ময় লেখক হুমায়ুন আজাদ বলেছিলেন, বই পড়া যায় না, নিজেকে পড়তে হয়। মনোযোগ দিয়ে পড়তে হয়। বুঝতে হয়, জ্ঞান বা শিল্পকলার প্রতি আকর্ষণ থাকতে হয়; এবং বই পড়ে হাতে নগদ আমরা কিছু পাই না।

আমাদের রাষ্ট্র যারা চালায়- মন্ত্রী, আমলা, বিচারপতি, ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, সেনাপতি এবং অন্যরা বই পড়ে না; কেননা তাতে কোনো আশু লাভ নেই; বরং পড়া বেশ কষ্টের কাজ; আর শিল্পকলা ও জ্ঞানে গুলশান বারিধারায় প্রাসাদ ওঠে না।

আমাদের সবাইকে এই মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। আর সেজন্য প্রয়োজন আমাদের পাঠাভ্যাস বাড়ানো। সমাজে অস্থিরতার এগুলো মূল কারণ।

পাঠাগার আছে, পাঠক নেই। বই আছে, পাঠক নেই। পাঠক নেই বলে নতুন বই কেনার প্রয়োজন পড়ছে না। দেশের কিছু কিছু পাবলিক লাইব্রেরিতে দেখা যায় অযতেœ পড়ে আছে বই। কোথাও মাকড়সার জাল, ধূলিধূসর পরিবেশ।

ভবনের ছাদের কিছু অংশ ভাঙা। মুখ ফিরিয়েছে পাঠকরাও। এক সময় লাইব্রেরি কেবল পড়ার জায়গা ছিল না। ছিল সামাজিক মেলামেশার জায়গা। ছিল মেয়েদের গল্পের আসর, শিশুদের ক্লাব, তরুণ-বৃদ্ধদের আড্ডা-সবার গন্তব্য ছিল লাইব্রেরি।

বাংলাদেশ বেসরকারি গণগ্রন্থাগার সমিতির তথ্য অনুসারে, দেশে পাঠাগারের সংখ্যা দুই হাজারের কাছাকাছি। দেশে সরকারি ও বেসরকারি গ্রন্থাগারগুলোকে দেখভালের জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠান আছে মাত্র দুটি। অথচ সরকারি গ্রন্থাগারই আছে ৭১টি।

তারা এ ক’টি গ্রন্থাগার দেখভাল করেও খুব একটা আশানুরূপ ফল দেখাতে পারছে না। বেসরকারিগুলো কখন দেখবে। এখানে উল্লেখ্য, ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচি সারা দেশে দুই হাজার নয়শ’ গণকেন্দ্র পাঠাগার গড়ে তুলেছে। একটি ট্রাস্ট এটিকে পরিচালিত করে।

ব্র্যাক ও জনগণের যৌথ উদ্যোগে উত্তোলিত অর্থ ব্যাংকে জমা রেখে তার ইন্টারেস্ট দিয়ে লাইব্রেরিয়ানের মাসিক বেতন দেয়া হয়। চমৎকার একটি পদ্ধতি। ব্র্যাকের নিজস্ব কর্মী ওই গণকেন্দ্রের দেখভাল করতেন, যদিও গণকেন্দ্রটি কমিউনিটির, নিদিষ্ট কোনো বিদ্যালয়ে কিংবা কোনো ইউনিয়ন কাউন্সিলের ভবনে।

ব্র্যাক যখন সিদ্ধান্ত নিল, পাঠাগারগুলো পুরোপুরি জনগণই চালাবে, পুরোপুরিই কমিউনিটি দেখভাল করবে তখন থেকে দেখা গেল লাইব্রেরি আর খুলছে না, পাঠক সমাগম নেই। লাইব্রেরি প্রায় বন্ধ।

যদিও এই পাঠাগারগুলো ছিল বহু ধরনের কর্মকা-ের কেন্দ্র। এখানে রয়েছে শিশুকর্নার, পালন করা হয় বিভিন্ন দিবসে বিভিন্ন কর্মসূচি যা মানুষের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জেন্ডার সমতা, জাতীয় ইতিহাস ও কৃষ্টি কালচার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করে।

আগে গ্রাম ও শহরের সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গান, নাচ, নাটক, বিতর্ক, রচনা প্রতিযোগিতার মতো সৃজনশীল ক্রিয়াকলাপ নিয়মিত হতো। এখন এগুলোর জায়গা দখল করেছে ফেসবুক, বিলিয়ার্ড ক্লাব, সাইবার ক্যাফে, ফাস্টফুড, ফুডকোট, ভিডিও গেমের দোকান।

ঢাকা শহরের ৬৪ শতাংশ বিদ্যালয়ে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক বিষয়ে কোনো ক্লাস অনুষ্ঠিত হয় না। সবাই ব্যস্ত জিপিএ-৫ কিভাবে পাওয়া যাবে তা নিয়ে। সেটি হবেই বা না কেন? উচ্চশিক্ষায় ভর্তি পরীক্ষার জন্য প্রথমে দেখা হয় জিপিএ-৫ আছে কিনা।

পাবলিক পরীক্ষায় প্রাপ্ত এই ফল পরবর্তী ভর্তিতে অনেক গুরুত্ব বহন করে, তাই অভিভাবকসহ সবাই সেটি নিয়েই ব্যস্ত থাকেন। অথচ পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে সৃজনশীলতা, শিক্ষার্থীর ভেতরকার শক্তি, বিশ্লেষণমূলক ক্ষমতা, এগুলোর কোনটিই সেভাবে পরীক্ষা করা হয় না।

তাই অভিভাবক, আত্মীয়-স্বজন সবাই মনে করে, ছেলেটি বা মেয়েটি যদি মেডিকেল ভর্তি হতে পারে, কিংবা বুয়েট, কুয়েট, চুয়েটে ভর্তি হতে পারে তার জীবন সার্থক। সে যদি এসব পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকতে পারে তাহলে সামাজিক অপরাধগুলো থেকেও তারা মুক্ত থাকবে।

আসলে মানসিক খাদ্য বলতে যে একটি কথা আছে সেটি আমরা ভুলতে বসেছি। আমরা খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকা-গুলোর উপকারিতার কথা ভুলে গেছি আর তাই সবাই শুধু পাঠ্যবই আর পাতানো পরীক্ষার ফল নিয়ে ব্যস্ত থাকছি।

কোনো কাজে সাফল্য অর্জন করতে হলে মনোযোগ সহকারে সেই কাজটি করা একান্ত প্রয়োজন। এক্ষেত্রে আমাদের বই পড়া যথেষ্ট সাহায্য করে। প্রতিদিন বই পড়লে মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। ফলে উন্নতি ঘটে মনোযোগ ক্ষমতারও।

যারা অ্যাটেনশন ডেফিসিয়েন্সি সিনড্রোমে ভুগছেন, তারা বই পড়া শুরু করলে উপকার পাবেন। পরিস্থিতির পুরোটাই পাল্টে যাবে। বই পড়ার সময় মস্তিষ্কের মধ্যে থাকা হাজারও নিউরন বেশি বেশি করে কাজ করতে শুরু করে।

ফলে সার্বিকভাবে মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এই অবস্থায় একদিকে যেমন বুদ্ধির বিকাশ ঘটে, তেমনি নানা ধরনের ডিজিজে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাও কমে যায়।

সারাদিন কাজের পর ৬০-৭০ শতাংশ মানুষই মন-মেজাজ চাঙ্গা করতে টেলিভিশন দেখেন। বিজ্ঞানের ভাষ্যমতে, মন ও মস্তিষ্কের ক্লান্তি দূর করতে টেলিভিশনের পরিবর্তে বইয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব করা প্রয়োজন।

মাছুম বিল্লাহ : ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে কর্মরত, সাবেক ক্যাডেট কলেজ শিক্ষক।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়