চাঁদপুর, রবিবার, ২৬ জুন ২০২২, ১২ আষাঢ় ১৪২৯, ২৫ জিলকদ ১৪৪৩  |   ৩০ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতি শিক্ষা স্বাস্থ্য সারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   বৃহৎ র‌্যালি আল-আমিন একাডেমি ও চেয়ারম্যান সেলিম খানের
  •   পদ্মা সেতুর থিম সং-এর গীতিকার কবির বকুলকে শিক্ষামন্ত্রীর অভিনন্দন
  •   হাইমচরে পানিতে ডুবে শিশুর করুণ মৃত্যু
  •   শনিবার চাঁদপুরে পাঁচজনের করোনা শনাক্ত
  •   মতলব উত্তরে নৌকাডুবি ॥ নিখোঁজ ১

প্রকাশ : ২৩ মার্চ ২০২২, ০০:০০

প্যাসিফিক রিং অব ফায়ার এবং টোঙ্গার আগ্নেয়গিরি
ড. এম মেসবাহউদ্দিন সরকার

পৃথিবী সৃষ্টির মূল উৎস ছিলো অগ্নিপি-। সেই অগ্নিপি- ছিন্নবিচ্ছিন্ন ও উৎক্ষপিত হয়ে সৃষ্টি হয়েছে নানা গ্রহ, উপগ্রহ, নক্ষত্র, শিলা, বালু, পাথর, লাভা, হ্রদ, ম্যাগমা ইত্যাদি। এসব ছিন্নবিচ্ছিন্ন উৎক্ষপিত টুকরা কোনোটা খুব ঠা-া, কোনোটা খুবই উত্তপ্ত, আবার কোনোটা নাতিশীতোষ্ণ। সব কিছুর উৎস যেহেতু অগ্নিকু-, সে কারণে এর দ্বারা সৃষ্ট আগ্নেয়গিরির প্রাদুর্ভাব আজও লক্ষ করা যায়।

আগ্নেয়গিরির দাবদাহ গরমে বন-জঙ্গল, পাহাড়-পর্বত, জনপদ পুড়ে ছারখার হয়, তা আমরা প্রায়ই দেখি। সাধারণত পানি দিয়ে এসব উত্তাপ নিষ্ক্রিয় করা হয়। অথচ এই পানির নিচেই থাকে পৃথিবীর চেয়েও বড় আয়তনের অগ্নিকু-, যা বৈজ্ঞানিকের কল্পনাকেও হার মানায়। সম্প্রতি সমুদ্রের নিচে থাকা এমনই একটি আগ্নেয়গিরি আছড়ে পড়েছে প্রশান্ত মহাসাগরীয় রাষ্ট্র টোঙ্গাতে। এর নাম দেয়া হয়েছে ‘হুঙ্গা-টোঙ্গা-হুঙ্গা-হাপাই’।

বৈজ্ঞানিকদের মতে, সাগরতলে প্রায় ১০ লাখ আগ্নেয়গিরি আছে। এসব আগ্নেয়গিরি লাভা উদগিরণের সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপক পরিমাণে ছাইও তৈরি করে। গ্লোবাল ফাউন্ডেশন ফর ওশানিক এক্সপ্লোরেশন গ্রুপের মতে, আগ্নেয়গিরিসংক্রান্ত ঘটনাগুলোর চার ভাগের তিন ভাগই ঘটে সমুদ্রের তলদেশে। ব্রিটিশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ প্রধান অধ্যাপক ডেভিড ট্যাপিন বলেছেন, এ এলাকায় অনেক আগ্নেয়গিরির সংখ্যার অর্থ হলো, এখানে প্রচুর ভূমিকম্প হয়, যা সবসময় শিলা এবং দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের নিচের পৃষ্ঠকে স্থানচ্যুত করছে। ‘হুঙ্গা-টোঙ্গা-হুঙ্গা হাপাই’ বিস্ফোরণ গত ২০ বছর ধরে এখানে গড়ে উঠেছে এবং এর ভেতরে ম্যাগমা বা গরম পদার্থ তৈরি হওয়ায় এটি ধীরে ধীরে গ্যাস নির্গত করছে। কিন্তু যখন সমুদ্রের পানি নিচে নেমে যায় এবং নিচের গরম ‘ম্যাগমা’ ওপরে অবস্থান করে, তখন গ্যাস এবং প্রেসার আটকে থাকে। কিন্তু ‘ম্যাগমা’ তখনো তৈরি হতে থাকে এবং প্রেসার বাড়তে থাকায় এমন পর্যায়ে চলে যায়, যেখানে পুরো জায়গাটি আর এটিকে ধারণ করতে পারে না। তারপর সেই রাসায়নিক পদার্থগুলো বিস্ফোরিত হয় এবং এটি ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে। অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির স্কুল অব আর্থ সায়েন্সের প্রফেসর রিচার্ড আর্কুলাস বলেছেন, হুঙ্গা-টোঙ্গা-হুঙ্গা-হাপাই অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনা অনেক বছর ধরে রিং অব ফায়ার বরাবর সবচেয়ে বিস্ফোরক ঘটনাগুলোর মধ্যে একটি।

নিঃসরণ এবং উদগিরণ প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে আগ্নেয়গিরিকে প্রধানত তিন ভাগে ভাগ করা হয়। ১. জাগ্রত-এদের মুখে নিয়মিতভাবে ধোঁয়া, ছাই, গলিত লাভা ও গ্যাস থাকে। যেমন-সিসিলব মাউন্ট এটনা। ২. সুপ্ত-এগুলো আগে উদগিরণ হয়েছিল, কিন্তু বর্তমানে সক্রিয় অবস্থায় নেই, কিন্তু যে কোনো সময় উদগিরণ হওয়ার সম্ভাবনা আছে। যেমন-জাপানের ফুজি পর্বত। ৩. লুপ্ত-এসব আগ্নেয়গিরি কোনো একসময় জাগ্রত ছিল কিন্তু আগামীদিনে বা ভবিষ্যতে অগ্ন্যুৎপাত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। যেমন-আফ্রিকার কিলিমানজারো।

সাধারণত ভূমিকম্প দেবে আগ্নেয়গিরি সৃষ্টি হয় এই মতামতই বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। এর কারণ হলো-১. ভূপৃষ্ঠের অভ্যন্তরভাগে যতোই যাওয়া যায় উত্তাপের মাত্রা ততো বেড়ে যায়। যদিও ভূগর্ভের উপাদানগুলো গলিত অবস্থায় থাকে। কিন্তু পৃথিবীর উপরিভাগের শিলাস্তরগুলোর প্রচ- চাপে এসব উপাদান গলিত হলেও স্থিতিশীল অবস্থায় থাকে। কোনো কারণে এই চাপের পরিমাণ কমে গেলে পৃথিবীর অভ্যন্তরের পদার্থগুলোর স্থিতিস্থাপক অবস্থার পরিবর্তন হতে পারে। এর ফলে এই পদার্থের ওই তরল পরে কোনো ভঙ্গুর স্থান, ভেতর বা কোনো দুর্বল স্তরের মাঝে বেরিয়ে এলে আগ্নেয়গিরির সৃষ্টি হয়। ২. আগ্নেয়গিরির উৎপত্তির আরেকটা কারণ হচ্ছে, ভূগর্ভে থাকা জলীয়বাষ্প ও অন্যান্য বাষ্পের প্রচ- চাপ। পৃথিবীর ভেতরের বা মাঝের কোনো ভূগর্ভতলে পানি গলে ভূগর্ভের উত্তাপে সেই পানি বাষ্পে পরিণত হয় ও আয়তন বাড়ে। এভাবে আয়তন বাড়ার ফলে অভ্যন্তরভাগে প্রচ- চাপের সৃষ্টি হয়। ফলে গলিত পদার্থগুলোর জলীয়বাষ্প ও অন্যান্য বাষ্প চাপের ফলে ভূপৃষ্ঠের ওপরে আসতে আসতে আগ্নেয়গিরির সৃষ্টি হয়। ৩. তেজস্ক্রিয় উপাদান, যেমন-রেডিয়াম, ইউরেনিয়াম অবিরাম তাপ বিকিরণের ফলে ভূগর্ভের উত্তাপ বাড়ে ও এর বিভিন্ন উপাদান তরল হলে আয়তন বাড়ে। ফলে কোনো সুড়ঙ্গ বা ফাটল দিয়ে এই উত্তপ্ত পদার্থগুলো ওপরে উঠে এলে আগ্নেয়গিরির সৃষ্টি হয়। ৪. ভূগর্ভের কোথাও কিংবা রাসায়নিক কারণে বাষ্পের সৃষ্টি হলে সেই বাষ্প পৃথিবীর উপরিভাগের দুর্বল অংশের চাপের কারণেও আগ্নেয়গিরির সৃষ্টি হয়।

টোঙ্গা বহুল কথিত প্যাসিফিক রিং অব ফায়ারে অবস্থিত, যেখানে ‘ম্যাগমা’ উৎপাদনের হার খুব বেশি। ফলে টোঙ্গায় সাম্প্রতিক সময়ের আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণটি ছিল এতো ব্যাপক এবং শক্তিশালী।

লেখক : অধ্যাপক, আইআইটি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়