চাঁদপুর, শুক্রবার, ১৯ আগস্ট ২০২২, ৪ ভাদ্র ১৪২৯, ২০ মহররম ১৪৪৪  |   ৩১ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতি শিক্ষা স্বাস্থ্য সারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   উদাসীনতা আর কাকে বলে!
  •   ইবাদত ও খেলাফতের মধ্যেই মুসলমানদের শ্রেষ্ঠত্ব নিহিত
  •   আগামী প্রজন্মকে নির্মাণে এ ধরনের অনুষ্ঠানের কোনো বিকল্প নেই
  •   পীর বাদশা মিয়া রোডে ড্রেন ও সড়ক নির্মাণ কাজ উদ্বোধন করলেন মেয়র জিল্লুর রহমান জুয়েল
  •   এলজিইডি চাঁদপুরের সাড়ে ১০ হাজার তালগাছের বীজ রোপণ

প্রকাশ : ২৬ জুন ২০২২, ০০:০০

পদ্মা সেতু : গাঢ় অনুভূতির নাম
অনলাইন ডেস্ক

কংক্রিট আর স্প্যানের একটি স্থাপনা আজ আমাদের গাঢ় অনুভূতির একটা জায়গা! এ একটি স্থাপনাকে ঘিরে আমাদের এতো উচ্ছ্বাস, এতো আয়োজনের কারণটা যথার্থ। এই স্থাপনাটিকে শুধু একটি স্থাপনা হিসেবে বিবেচনা করলে ভুল হবে। পদ্মা সেতু বাঙালি জাতির যুগান্তকারী অগ্রযাত্রায় উজ্জ্বল এক নক্ষত্র। পদ্মা সেতু মানে বাংলাদেশের অভাবনীয় উন্নয়নের যুগে প্রবেশের সোনালি দ্বার উন্মোচন। যুগ যুগ ধরে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের লালিত স্বপ্ন এই পদ্মা সেতু। এ সেতু শরীয়তপুর, মাদারীপুরসহ বিচ্ছিন্ন কয়েকটি জেলাকে দেশের মূল সড়ক কাঠামোর সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত করবে। সেখানকার বাজার ব্যবস্থায় উন্নতি হবে। দক্ষিণাঞ্চলের পাঁচ কোটি মানুষের জীবনমানে পরিবর্তন আসবে। জিডিপির হার বৃদ্ধি পাবে। চৌকষ নির্মাণশৈলী ও নান্দনিকতার জন্যে পদ্মা সেতু অনন্য এক সৃষ্টি।

পাশাপাশি ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক কতগুলো ব্যাপার জড়িয়ে আছে এ সেতুকে ঘিরে। যে জাতি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্যে মাস্টার দা সূর্যসেন, ক্ষুদিরাম প্রমুখ বিপ্লবী বীরসেনানী মাথা উঁচু করে ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়েছিলেন। বাঁশের কেল্লায় কামানের গোলা তিতুমীরের বক্ষবিদীর্ণ করেছিলো। শরীয়ত উল্লাহর ফরায়েজী আন্দোলন হয়েছিলো। সর্বকালের সেরা বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জীবনের সোনালি সময়গুলো কারাগারের অন্ধকার কুঠুরীতে কাটিয়েছিলো। যে জাতি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্যে ৭ মার্চে রেসকোর্স ময়দানের উত্তাল জনতা গগনচুম্বী প্রমত্তা ঢেউয়ের মতো গর্জে উঠেছিলো। ত্রিশ লাখ শহিদের রক্তবর্ণে বিশ্ব মানচিত্রে যে ভূ-খণ্ড অঙ্কিত হয়েছিলো।

৭৫-এ দেশি-বিদেশি চক্রান্তে জাতির পিতাকে হত্যা করে সদ্য পথচলা সেই রাষ্ট্রকে দিকভ্রান্ত করে দেয়া হয়। লাখো শহিদের রক্তে রঞ্জিত বাংলাদেশ নিজস্ব চেতনা ভুলে ভিন্নপথে চলতে শুরু করে। একের পর এক সামরিক শাসন ও স্বৈরশাসনে পিষ্ট হয়ে হাজী শরীয়তুল্লাহ, ক্ষুদিরাম, তিতুমীর, নবাব সিরাজের বাংলাদেশ ভিক্ষুকের জাতি হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছিলো। বিদেশি সাহায্য ছাড়া দেশ অচল হয়ে যেতো। বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের ন্যূনতম সম্মানটুকু ছিলো না। হত্যা, গুম, ধর্ষণ, ব্যবিচার, জোর-জবরদস্তি, রক্তারক্তি হয়ে যায় নিত্তনৈমিত্তিক ঘটনা। ক্ষুধা-দারিদ্র্যতা ও লাগামহীন দুর্নীতিতে জর্জরিত জনতা দিশেহারা হয়ে যায়।

এমন পরিস্থিতিতে সেনাশাসক জেনারেল জিয়ার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে নির্বাসিত জীবন থেকে ফিরে আসেন জাতির পিতার যোগ্য উত্তরসূরি শেখ হাসিনা। তাঁর সাহসী নেতৃত্বে বীর বাঙালি আবারো গর্জে উঠে। আবারো কাস্তে হাতে কৃষকের দল রাজপথে নেমে আসে। নাঙ্গা-ভূখা জনতা, আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা এক হয়ে রুখে দাঁড়ায় বন্দুকের নলের সামনে। নূর হোসেনদের রক্তে রাজপথ লাল করে বিদায় নেয় স্বৈরশাসনের অন্ধকার যুগ।

তারপর ’৯৬-র ঐতিহাসিক নির্রাচনে বিজয়ী হয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে দেশ পুনরায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় যাত্রা শুরু করে। মানুষ নতুন স্বপ্নে বিভোর হয়।

কিন্তু চক্রান্তকারীরা থেমে ছিলো না কোনো দিন। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে মানুষকে বিভ্রান্ত করতে তৎপর ছিলো দেশি-বিদেশি সেসব অপশক্তি। তবুও বাঙালি জাতি থেমে নেই। শত্রুর মুখে ছাঁই দিয়ে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের পথিকৃৎ। সাইক্লোন, সিডর, ঝড়-জলোচ্ছ্বাস, সিরিজ বোমা, একুশ আগস্টের গ্রেনেড হামলা, অগ্নি-সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে গত কয়েক দশক ধরে লড়াই করে ধ্বংশস্তূপের ভেতর থেকে ফিনিক্স পাখির মতো জেগে উঠেছে কাজী নজরুলের অবাক বিস্ময়, রবিঠাকুরের সোনার বাংলা।

ভিক্ষুক জাতি আজ উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় শীর্ষ স্থান দখল করেছে। নিজেদের টাকায় পদ্মার মতো খরস্রোতা নদীতে অনন্য বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত সেতুটি নির্মাণ করেছে। এমন খরস্রোতা ও গভীরতম নদীতে প্রকৃতির বৈরী আচরণ সামলে, বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে এ সেতুটি নির্মাণ করা বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রের জন্যে ছিলো এক কঠিনতম দুঃসাধ্যকে সাধন করা।

আজ পদ্মা সেতু উদ্বোধনের প্রাক্কালে মনে পড়ে সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রপতি হেনরী কিসিঞ্জারের কথা। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে তিনি তলাবিহীন ঝুড়ি বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। সেদিন তিনি তামাশা করে বলেছিলেন, পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া অংশটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হবে এবং বাংলাদেশ নামক কোনো ভূ-খণ্ড বিশ্ব মানচিত্রে ঠাঁই পাবে না। অর্ধশতক পূর্বে করা হেনরী কিসিঞ্জারের মন্তব্যে নিরাশ হয়ে পড়েনি সেদিনকার সাড়ে সাত কোটি বাঙালি। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেছিলো একটি সোনালি সকালের প্রত্যাশায়। তাঁদের অনেকেই হয়তো আজ আর বেঁচে নেই। আর যারা এখনো বেঁচে আছেন, তাঁদের অনুভূতি হয়তো আজ বড় বেশি আবেগঘন।

বাংলাদেশ হেনরী কিসিঞ্জারের দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেনেডি স্পেস প্যাড থেকে থেকেই ফায়ার করে মহাকাশে কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করেছে। আজকের বাংলাদেশ পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বাংলাদেশ। আজকের বাংলাদেশ মেট্রোরেল, নদীগর্ভ ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা টানেল, গভীর সমুদ্র বন্দর, টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ায়, রূপসা থেকে পাথুরিয়ায় নিভৃত পল্লীর হাঁটু কাঁদায় ডুবে থাকা সরু রাস্তাটিকে পিচঢালাই করা সুপ্রশস্ত-মসৃণ সড়কপথ, অসংখ্য ফ্লাইওভার ও তথ্য-প্রযুক্তি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।

নিঃশ্চয়ই তলাবিহীন ঝুড়ির এমন দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলাকে দুঃস্বপ্নের মতো করে দেখছে চক্রান্তকারীরা। এতো চক্রান্ত আর অপপ্রচার করেও বাঙালি জাতিকে রুখতে পারেনি তারা। নিশ্চয়ই মাথায় হাত চাপড়ে, দাঁতে দাঁতে চেপে গাত্রদাহ নিবারণ করছেন কিসিঞ্জারের দল।

পাশাপাশি বাংলাদেশী পাকপ্রেতাত্মার দল, যারা আঁতুড়ঘরেই বাংলাদেশকে হত্যা করতে মরিয়া হয়ে উঠেছিলো। বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছিলো। স্বাধীনতাত্তোর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অপপ্রচার চালিয়ে বাংলাদেশকে সত্যিকার অর্থে তলাবিহীন ঝুড়ি বানাতে উঠে-পড়ে লেগেছিলো। তারপর বিভিন্ন সময়ে হুমায়ুন আজাদ, শাহ এএমএস কিবরিয়া ও আহসান উল্লাহ মাস্টারসহ মুক্তচিন্তার অধিকারী দেশের মেধাসম্পদকে হত্যা করেছিলো। আজও যারা কাঁড়ি-কাঁড়ি টাকা খরচ করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ-বিরোধী অপপ্রচারে মত্ত। যাদের দোসররা বিদেশী লবিষ্ট নিয়োগ করে বিশ্ব ব্যাংককে পদ্মা সেতুতে বিনিয়োগে নিবৃত্ত করেছিলো। পদ্মা সেতু সেই সব অপশক্তির বিরোদ্ধে শক্তিশালী একটা জবাব।

অন্যদিক থেকে ভাবতে গেলে পদ্মা সেতু পর্যটন শিল্পেরও প্রসার ঘটাবে এবং দক্ষিণ বাংলার কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত, সুন্দরবন, ষাটগম্বুজ মসজিদ, সাতক্ষীরার যশোরেশ্বরী কালি বাড়ি, টুঙ্গিপাড়ার জাতির পিতার মাজার, মাওয়া ও জাজিরা পাড়ের রিসোর্টসহ, নতুন-পুরাতন পর্যটন কেন্দ্র দেশি-বিদেশি পর্যটকদের পদভারে মুখরিত হবে। পর্যটনশিল্পে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে। সেতুর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে মাদারীপুর জেলায়। এখানে নির্মিত হবে সফটওয়্যার ফার্ম। আসবে বিদেশি বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান। আইটিপার্ক হবে। জানা গেছে এখানে অলিম্পিক ভিলেজ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথা।

তাছাড়াও পদ্মা সেতু প্রকল্পে নির্মিত হয়েছে আরো বেশ কিছু স্থাপনা। সেতুর দুই প্রান্তে বাস্তবাবায়িত হয়েছে দুটি করে থানা ও ফায়ার সার্ভিস স্টেশন। সেতুকে কেন্দ্র করে উভয় পাশে ১২ কিলোমিটার পর্যন্ত নদীশাসন করা হয়েছে। ১৪ কিলোমিটার সংযোগসড়ক নির্মিত হয়েছে। সমগ্র দক্ষিণ বঙ্গকে রেল যোগাযোগের আওতায় আনা হয়েছে। সেতুর জন্যে জমি অধিগ্রহণকালে ক্ষতিগ্রস্তদের আবাসন ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। নির্মিত হয়েছে পদ্মা সেতু কমপ্লেক্স, মসজিদ, জাদুঘর ইত্যাদি। কাজেই পদ্মা সেতু কেবল মাত্র পদ্মা নদীর উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ৬.১৫ কিলোমিটারের একটি সেতুই নয়। বরং অনেক মানুষের জীবিকা নির্বাহের বিশাল একটা উৎস, বিশাল কর্মযজ্ঞ। এ প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের বক্তব্য হচ্ছে, সেতুটি বাস্তবায়িত হলে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ১ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে যাবে। আর প্রতি বছর দারিদ্র্যতা নিরসন হবে শূন্য দশমিক ৮৪ ভাগ।

এই সেতু নির্মাণে প্রতিবন্ধকতার ঘটনাবলি যতোদিন পদ্মা সেতু থাকবে ততোদিন প্রতিটি কংক্রিট ও স্প্যানের গাঁথুনীতে গেঁথে থাকবে সেই সব ইতিহাস। বিশ্বব্যাংক বিনিয়োগ চুক্তি স্থগিত করলে অনিশ্চিত হয়ে পড়ে এ সেতুর নির্মাণ কাজ। হতাশ হয়ে পড়েন দক্ষিণবঙ্গের আশায় বুক বেঁধে রাখা মানুষগুলো। বিএনপি-জামায়াত অপশক্তি নগ্ন উল্লাসে মেতে উঠে। এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাহসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। শেখ হাসিনা পিতা বঙ্গবন্ধুর মতোই কারো কাছে নতী স্বীকার না করে নিজেদের সামর্থ্যরে উপর নির্ভর করেন। তিনি দৃপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করেন, অন্যের কাছে হাত পেতে টাকা এনে পদ্মা সেতু করবো না। আমাদের জনগণের টাকায় পদ্মা সেতু নির্মিত হবে। এই ঘোষণার পরপরই বিএনপি-জামায়াতের কথিত বুদ্ধিজীবীরা বিভিন্ন কটূক্তি করতে থাকে। শিবির জঙ্গিরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা অপপ্রচার চালিয়ে দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করে। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতসহ বিভিন্ন পরাশক্তি কোনোরূপ বিদেশি সাহায্য ছাড়াই সম্পূর্ণভাবে নিজেদের টাকায় বাংলাদেশের এমন সাহসী পদক্ষেপে প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে উঠে। তারা বিভিন্ন ভাবে সেতুর কাজে বাধাদানের চেষ্টা অব্যাহত রাখে। কিন্তু অবিচলভাবে লক্ষ্যে এগুতে থাকেন শেখ হাসিনা। যেভাবে তিনি নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন করেছিলেন। এদেশের মানুষের ভোট ও ভাতের অধিকার নিশ্চিত করেছিলেন। বার বার মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেছিলেন। তেমনিভাবে লক্ষ্যে অবিচল থেকে নানান চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দেন শেখ হাসিনা। তাই নানা কারণে পদ্মা সেতু বাঙালি জাতির পরম অনুভূতির একটা জায়গা। বড় বেশি গৌরবের সম্পদ।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়