চাঁদপুর, বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৪ আশ্বিন ১৪২৯, ২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪  |   ৩০ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতি শিক্ষা স্বাস্থ্য সারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   ড্রেজার ধ্বংস করাসহ মালিককে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা
  •   শাহরাস্তিতে আলোকচিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন
  •   ফরিদগঞ্জে প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিনে ছাত্রলীগের আয়োজনে বর্ণাঢ্য র‌্যালী
  •   হাজীগঞ্জ পৌরসভা আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভা অনুষ্ঠিত
  •   ভুয়া দুদক কর্মকর্তা সেজে চাঁদা দাবি

প্রকাশ : ০৩ আগস্ট ২০২২, ০০:০০

মুক্তিযোদ্ধা শিরিন বানু মিতিল
অনলাইন ডেস্ক

গত ২০ জুলাই ২০১৬ বুধবার গভীর রাতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মুক্তিযোদ্ধা ও নারীনেত্রী শিরিন বানু মিতিল মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৫ বছর। পারিবারিকভাবে জানানো হয়, রাত সাড়ে ১১টার দিকে শিরিন বানু মিতিল গুরুতর অসুস্থ বোধ করলে তাকে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট নিয়ে যাওয়া হয়। রাত দেড়টার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তিনি স্বামী, এক ছেলে ও দুই মেয়ে রেখে গেছেন।

স্বাধীনতার যুদ্ধে অনেক নারীই ঝাঁপিয়ে পড়ে। নিজের বাঁচা-মরার কথা তখন তাদের মাথায় ছিল না। যেসব পরিবারগুলো আগে থেকেই রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল তাদের পরিবারের মেয়েদের যুদ্ধে আসাটা কিছুটা হলেও সহজ ছিল। দেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে তারা আগে থেকেই জানতেন। পরিবারের আলোচনা থেকে শুনতেন। তেমনি এক পরিবারের মেয়ে ছিলেন শিরিন বানু মিতিল। পাবনা শহরের দিলালপুর মহল্লার খান বাহাদুর লজ-এ ১৯৫০ সালের ২ সেপ্টেম্বর পাবনায় খোন্দকার শাহজাহান মোহাম্মদ ও মা সেলিনা বানু দম্পতির ঘরে জন্মগ্রহণ করেন শিরিন বানু।

১৯৭১ সাল। তখন তিনি পাবনা জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সভানেত্রী। শিরিন বানুর মা সেলিনা বানু ছিলেন বামপন্থি আন্দোলনের প্রথম সারির নেত্রী। বামপন্থি আন্দোলনের শক্ত ঘাঁটি ছিল তার নানার বাড়ি। ২৫ মার্চ থেকেই পাবনায় প্রাথমিক প্রতিরোধ পর্ব শুরু হয়। যা চলে টানা ৯ এপ্রিল পর্যন্ত। ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনী ঢুকে পড়ে পাবনায়। কারফিউ জারি করে। ২৬ মার্চ থেকে রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেফতার শুরু হয়। নির্বিচারে হত্যা-নির্যাতন চালায় সাধারণ জনগণকে। প্রতিবাদ করার লক্ষ্যে জেলা প্রশাসন সিদ্ধান্ত নেয় পাল্টা আঘাত হানার। ২৭ মার্চ শুরু হয় যুদ্ধ। যে যেভাবে পেরেছে নারী-পুরুষ সবাই যুদ্ধে অংশ নেয়। হাতের কাছে যে যা পেয়েছে তা নিয়েই নেমে পড়ে। আস্তে আস্তে সাধারণ জনতার হাতেও অস্ত্র চলে আসে। একদিকে যুদ্ধ করা অন্যদিকে অস্ত্র প্রশিক্ষণ। শিরিন বানুও সবার সঙ্গে সঙ্গে অস্ত্র চালানো শেখা শুরু করে। মাত্র আধঘণ্টা সময়ে তিনি অস্ত্র চালানো শিখে ফেলেন।

মেয়েদের যুদ্ধে যাওয়ার ক্ষেত্রে বিপদও ছিল বেশি এই কারণে অনেকে মেয়েদের সঙ্গে নিতে চাইত না। শিরিন বানু নিজে শার্ট-প্যান্ট পরে রেডি হতেন যুদ্ধে যাওয়ার জন্য। তখন পোশাক দেখে মনেই হতো না তিনি নারী। ছেলেদের পোশাক পড়ে যুদ্ধে যাওয়া দেখে শিরিন বানু মিতিলের ছোট ভাই জিঞ্জির বলে...

-বুজি, প্রীতিলতার মতো তুমিও পারো ছেলেদের পোশাক পরে যুদ্ধে যেতে।’

শিরিন বানু তার খালার কাছেই থাকতেন বেশি। শার্ট-প্যান্ট পরা অবস্থায় দেখে খালা রাফিয়া বানু বলেন...

-‘হ্যাঁ, এখন তুমি নিশ্চিন্তে যুদ্ধে যেতে পারো।’

২৮ মার্চ শহরের জেল রোডে টেলিফোন ভবনে দখলদার ৩৬ জন পাকিস্তানি সেনার সঙ্গে যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাদের সবাই মারা পড়ে। দুজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। এভাবে খণ্ড খণ্ড যুদ্ধ চলতেই থাকে। তখন যুদ্ধ চলছিল নগরবাড়ী ঘাট, আতাইকুলা ও কাশীনাথপুরে। পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণ শুরু হয় আকাশপথে। পাশের জেলা কুষ্টিয়ার প্রতিরোধ ভেঙে পড়ছে। তাদের বিভিন্ন দল পিছিয়ে যাচ্ছে চুয়াডাঙ্গার দিকে। পাবনার ছাত্রনেতা ইকবালের দল একটি গাড়িতে করে কুষ্টিয়া হয়ে চুয়াডাঙ্গার দিকে রওনা হয়। গাড়িতে স্থান সংকুলান না হওয়ায় মিতিল ও তার এক ভাই থেকে যায় কুষ্টিয়ায়। পরে কুষ্টিয়া থেকে চুয়াডাঙ্গা যাওয়ার সময় ভারতীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। এরপর ভারতের স্টেটসম্যান পত্রিকার সাংবাদিক মানস ঘোষ মিতিলের ছবিসহ সাক্ষাৎকার ছাপেন।

একদিনে তারা যখন কুষ্টিয়া থেকে চুয়াডাঙ্গার দিকে যাচ্ছিলেন, তখন গভীর রাতে তাদের দলটিকে পথের মাঝে আটকানো হয়। মূলত ঐ অঞ্চলে পাকিস্তানি সেনাদের প্রতিরোধ করতেই সতর্কতামূলক পাহারায় যারা ছিল তারা মিতিলদের পরিচয় জানতে চায়। তারা পরিচয় দিলেও পাহারায় থাকা লোকেরা প্রথমে সেটা বিশ্বাস করতে চাচ্ছিল না। কারণ তাদের সঙ্গে যিনি আরআই ছিলেন তিনি ছিলেন পশ্চিম বঙ্গের। ফলে তার ভাষার টানটা ছিল বিহারীদের মতো। তাই তারা যে সত্যি মুক্তিযোদ্ধা তার প্রমাণ চাইল। তখন পরিস্থিতির শিকার হয়ে তাদের একজন বলতে বাধ্য হলো যে, ‘আপনারা কি আকাশবাণীতে শিরিন বানুর কথা শুনেছেন?’ তারা বলল যে, ‘হ্যাঁ, আমরা তার কথা শুনেছি।’ যখন তাদের বলা হলো যে, তাদের সঙ্গে সেই শিরিন বানু আছে, তখনও দলের মধ্যে সন্দেহ যে, এত বড় দলের ভেতরে ছদ্মবেশে একজন মেয়ে আছে, এটাকে তারা হয়তো অন্যভাবে দেখবে। কিন্তু মিতিলের পরিচয় জানার পরেই দেখা গেল যে, তারা সবাই তাকেই ঘিরে ধরল। তাদের মধ্যে এক বৃদ্ধ মিতিলের কাছে এগিয়ে এসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলেন, ‘মা আমরা আর ভয় করি না। আমাদের মেয়েরা যখন আমাদের সঙ্গে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করে, তখন বিজয় আমাদের হবেই।’ তার এই কথা শুনে মিতিল খুব অবাক হয়েছিলেন এবং এ দ্বারা প্রমাণ হয়েছিল যে, সারা দেশের মানুষ কীভাবে স্বাধীনতার জন্য উদ্দীপনা ও উৎসাহ নিয়ে পরস্পরের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে ধরছি।’

শিরিন বানু চলে যান কলকাতার উপকণ্ঠে গোবরা ক্যাম্পে প্রশিক্ষণের জন্য। সেখানে দেখা হয় ইলা মিত্রের সঙ্গে। সেখান থেকে যোগাযোগ করেন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে। কয়েকজন নারীকে নিয়ে গঠিত হয় নারীদের ক্যাম্প। যার দায়িত্বে ছিলেন সাজেদা চৌধুরী, যিনি বর্তমানে আওয়ামী লীগের প্রথম সারির একজন নেত্রী। ৩৬ জন নিয়ে গঠিত ক্যাম্পে নারীর সংখ্যা দাঁড়ায় ২৪০ জনে।

দেশ স্বাধীন হলে ১৯৭৩ সালে তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়ায় পড়তে যান। সেখানকার পিপলস ফেন্ডশিপ ইউনিভারসিটি অব রাশিয়ায় নৃবিজ্ঞান বিষয়ে পড়া শেষে ১৯৮০ সালে দেশে ফেরেন তিনি। এর মধ্যে ১৯৭৪ সালে মাসুদুর রহমানের সঙ্গে তার বিয়ে হয়।

শিরিন বানু বেসরকারি সংস্থা পিআরআইপি ট্রাস্টের ‘জেন্ডার অ্যান্ড গভার্নেন্স’ বিষয়ে পরামর্শক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি চাইল্ড অ্যান্ড মাদার কেয়ার (সিএমসি) নামে একটি সেবাকেন্দ্রের সঙ্গেও বিশেষজ্ঞ হিসেবে যুক্ত ছিলেন। ২০০৫ সালে ভারতীয় অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানী কমলা ভাসিনের নেতৃত্বে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত সহ¯্র সংগ্রামী নারীর যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছিল, তাতে বাংলাদেশের ১৬ জনের মধ্যে শিরিনও বানুও ছিলেন।

যুদ্ধের দিন সম্পর্কে শিরিন বানু মিতিল বলেন, ‘অস্ত্রের অভাবে অনেক সময় আমাদের যুদ্ধে যাওয়া সম্ভব হয়নি। তবুও আমাদের যুদ্ধ থেমে যায়নি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেশে ফিরে আসি। বার বার চোখে ভাসে যুদ্ধের দিনগুলোর কথা, বাবার কথা। আমাকে ছেলের পোশাকে দেখে বাবা মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করে বলেছেন, তোমাদের আর ভয় নেই। আসলে আমাদের মনোবল আর প্রাণশক্তিই আমাদের জয়ের মুখ দেখিয়েছে।’

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়