চাঁদপুর, শুক্রবার, ২ ডিসেম্বর ২০২২, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ৭ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪  |   ২৮ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতি শিক্ষা স্বাস্থ্য সারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   কচুয়ায় আলোর মশালের সপ্তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে করোনাযোদ্ধা ও রক্তদাতাদের সংবর্ধনা
  •   সেভ দ্য ফিউচার ফাউন্ডেশন’র সহযোগিতায় ঘরের স্বপ্ন পূরণ হলো প্রতিবন্ধী রিপনের
  •   চাঁদপুরে বিশ্ব এইডস দিবস পালিত
  •   হাজীগঞ্জে মডেল হসপিটালের উদ্বোধন
  •   চাঁদপুর রেলওয়ের সাবেক টিএক্সারের ইন্তেকাল

প্রকাশ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০০:০০

মানবিক প্রধানমন্ত্রী
অনলাইন ডেস্ক

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক দৈনিক মজুরি ১৭০ টাকা নির্ধারিত এবং সমস্ত পাওনা দুর্গাপূজার আগেই দেয়া হবে, এই আনন্দে চা শ্রমিকরা আন্দোলনের ১৯ দিনের মাথায় কাজে যোগদান করেছেন। এখন ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি কথা বলে ভবিষ্যতে ঘরবাড়ি, শিক্ষা চিকিৎসা, মাতৃত্বকালীন ছুটিসহ নাগরিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত হওয়ার আনন্দে তারাও প্রধানমন্ত্রীকে নাচে-গানে মেতে উঠে আনন্দ দিয়েছেন। দাওয়াত দিয়েছেন চা-পানের। বঙ্গবন্ধুকন্যাও তাদের এই খুশি দেখে আবেগে আপ্লুত হয়েছেন, চোখের পানি ফেলেছেন, হেসেছেনও।

ব্রিটিশ আমল ১৮৫৪ সালে সিলেটের মালনীছড়ায় দেশের প্রথম বাণিজ্যিক চা বাগান প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই হিসেবে এই শিল্পের বয়স ১৬৮ বছর। তখন ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থান থেকে দরিদ্র মানুষদের এনে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের টিলাভূমিতে চা বাগানের সূচনা করা হয়। তখনও সীমাহীন দারিদ্র্যের মধ্য দিয়ে এসব শ্রমিককে কাজ করতে হতো সেখানে। বাজারে প্রচলিত মুদ্রাও তখন তাদের কপালে জুটত না। বাগানে ব্যবহারের জন্য এক ধরনের বিশেষ মুদ্রা পেতেন শ্রমিকরা। এতে তারা বাগানের বাইরে যেতে পারতেন না। বাগানেই তাদের কাটাতে হতো জীবন।

শতাব্দী পেরিয়ে এসে সেই নির্মমতা ও শোষণ এখনও বিদ্যমান। স্বাধীনতার পর নারী শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ছিল মাত্র এক টাকা এক আনা। আর পুরুষ শ্রমিকের ছিল মাত্র এক টাকা দুই আনা। পরে বিভিন্ন সময়ে বেড়ে হয় ৮ টাকা, ১২ টাকা, ১৮ টাকা, ২০ টাকা, ২২ টাকা, ২৪ টাকা। ২০০৮ সালে এসে হয় ৩২ টাকা এবং ২০০৯ সালে ৪৮ টাকা। পরে ২০১৭ সালে ১০২ টাকা এবং সর্বশেষ ২০২০ সালে হয় ১২০ টাকা।

দেশের ১৬৭টি চা বাগানে ৫ লাখ চা শ্রমিকের মধ্যে স্থায়ী শ্রমিক প্রায় ১ লাখ ৩ হাজার ৭৪৭ জন। স্থায়ী শ্রমিকদের তিনটি ক্যাটাগরি। ‘এ’ ক্যাটাগরির শ্রমিকরাই এতদিন ১২০ টাকা পেতেন। ‘বি’ ও ‘সি’ ক্যাটাগরির শ্রমিকদের বেতন আরও কম। তাদের জন্য নেই কোন উৎসব ভাতা ও রেশন। সর্বসাকুল্যে শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি দেখানো হতো ৪১১ টাকা। এর মধ্যে দৃশ্যমান মজুরি দেয়া হতো ১২০ টাকা। বাকিটা বিভিন্ন পণ্য ও সেবার মাধ্যমে ব্যয় দেখানো হতো।

যার মধ্যে শিক্ষা, চিকিৎসা, ঘরভাড়া, পেনশন, রেশন, উৎসব ভাতা, বার্ষিক ছুটি ভাতা, ধানক্ষেতের জন্য ভূমি ইজারা ব্যয়, রক্ষণাবেক্ষণ, গরু চরানো এবং চৌকিদার ব্যয়, শ্রমিকদের জন্য ব্যবহৃত জমি বাবদ ভূমি উন্নয়ন কর, শ্রমিক কল্যাণ কর্মসূচী (গৃহ মেরামত, বিশুদ্ধ পানীয় জল সরবরাহ, ম্যালেরিয়া প্রতিরোধক স্প্রে, পয়ঃনিষ্কাশন, ছুপি-ছাতা, গাতি, গামছা, জ্বালানি কাঠ সরবরাহ)। এমনকি বাসাবাড়িতে উৎপাদিত যে ফলমূল তার মূল্য এবং ভবিষ্য তহবিলের জন্য নিয়োগকৃত কর্তার ভাতা বাবদ কর্তৃপক্ষ যে ব্যয় করে, সেগুলো টাকায় রূপান্তর করে যুক্ত করা হতো দৈনিক মজুরিতে। এই সাকুল্য আয় ধরে হিসাব করলেও সরকারী বাগানে কর্মরত একজন চা শ্রমিকের মাসিক বেতনের পরিমাণ দাঁড়ায় ১২ হাজার ৩৩০ টাকা।

যা অন্য যে কোন শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের মাসিক বেতনের তুলনায় কম। এসব শ্রমিকের সন্তান বা পোষ্যদের শিক্ষা ব্যয় হিসাবে প্রতিদিন ৮ পয়সা বরাদ্দ দেয়া হতো। এ ছাড়াও দৈনিক রেশন বাবদ ৩১ টাকা ৮ পয়সা, চিকিৎসা সুবিধা বাবদ ৮ টাকা ২২ পয়সা, ঘরভাড়া ৭৬ টাকা ৯২ পয়সা এবং অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিকের পেনশন সুবিধা বাবদ ২ টাকা এবং দৈনিক ঝুঁকিভাতা হিসাবে ৪ থেকে ৬ টাকা বরাদ্দ ছিল এতদিন।

১২০ টাকা মজুরি দিয়ে শ্রমিকদের যেন ‘নুন আনতে পান্তা ফুরায়’ দশা হতো। অবশ্য এই ১২০ টাকা মজুরি তখনি পেত, যখন ন্যূনতম ২৩-২৪ কেজি পাতা সংগ্রহ করতে পারত। পরিমাণ কম হলে মজুরিও অনুপাতে কম আসত। অবর্ণনীয় আরও হিসাব আছে। চা শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা সাধারণ শ্রমিকদের মতো নয়। তারা সকাল থেকে দুপুর এবং দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত- দুই শিফটে মোট ১২ ঘণ্টা কাজ করে থাকেন। কখনও কখনও আরও বেশি। এই সময়ে সে ২৩-২৪ কেজি কাঁচা পাতা উত্তোলন করে। যা থেকে ৬ কেজি পরিশোধিত চা উৎপাদন হয় এবং যার বাজার মূল্য কমপক্ষে ২৫০০ টাকা। সে হিসাবে একজন চা শ্রমিকের আয় খুবই নগণ্য বলা চলে।

তবে ভরা মৌসুমে (আগস্ট থেকে অক্টোবর) একজন শ্রমিক ৫০ কেজি পর্যন্ত পাতা তুলতে পারে। গাছে তখন কচিপাতা বেশি থাকে, দুহাত ভরে পাতা আসে, আয়ও বেশি হয়। দুঃখের বিষয়, চা শ্রমিকদের এই মজুরি বাংলাদেশেই সবচেয়ে কম। পার্শ্ববর্তী দেশ শ্রীলঙ্কায় এই মজুরি ২৬৪, পশ্চিমবঙ্গে ২৭৬, ভিয়েতনাম ৩০৫, নেপালে ৩২৪ ও ভারতের কেরালায় ৫০৩ টাকা। তাই যুগ যুগ ধরে বঞ্চনার শিকার চা শ্রমিকরা দুর্মূল্যের বাজারে দৈনিক মজুরি ৩০০ টাকার যে দাবি করে এসেছিলেন, তা প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে ১৭০ টাকায় পরিসমাপ্ত হলো।

সময় নিউজ এবং টি অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যানুসারে (১৮ আগস্ট ২০২২) দৈনিক ১২০ টাকা মজুরির পাশাপাশি কিছু সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন এসব শ্রমিক। তা হলো- পরিবার প্রতি ১ হাজার ৫৫১ স্কয়ার ফিট বাসা। প্রতি সপ্তাহে প্রতিটি শ্রমিককে দুই টাকা কেজি দরে সাড়ে তিন কেজি আটা। সন্তানদের সুশিক্ষা নিশ্চিতে প্রাথমিক, জুনিয়র ও উচ্চ বিদ্যালয়সহ মোট ৭৬৮টি বিদ্যালয়, যেখানে ১ হাজার ২৩২ শিক্ষক আছেন এবং ৪৪,১৭১ শিক্ষার্থী বিনামূল্যে পড়ালেখার সুযোগ পাচ্ছে। নারী শ্রমিকদের ১৬ সপ্তাহের মজুরিসহ মাতৃত্বকালীন ছুটি আছে। সবার জন্য অসুস্থতাজনিত ছুটি ভাতা, ভবিষ্যত তহবিল ভাতা, কাজে উপস্থিতি ভাতা ইত্যাদি।

স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিতে ৭২১ শয্যার হাসপাতাল, ১৫৫টি ডিসপেনসারিসহ সর্বমোট ৮৯১ জন মেডিক্যাল স্টাফ আছে। উৎসবভাতা (৪৭ দিনের মজুরির সমান পাঁচ হাজার ২৪০ টাকা)। যার ৬০ ভাগ দেয়া হয় দুর্গাপূজায় এবং ৪০ ভাগ দেয়া হয় ফাগুয়া উৎসবে। অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিকের ভাতা, বিভিন্ন রকম শ্রমিক কল্যাণসূচী যেমন- বিশুদ্ধ খাবার পানি, ম্যালেরিয়া প্রতিষেধক, স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট, পূজা, বিনোদন প্রভৃতি কর্মকাণ্ডে সামগ্রিক আর্থিক সহায়তা প্রদান। অবসরের পর পরিবারের সদস্যরা চাকরিতে নিয়োগ পাওয়ার সুযোগ।

চা বোর্ডের তথ্যানুসারে, একজন শ্রমিককে প্রতি কেজি ২ টাকা দরে প্রতি সপ্তাহে ১০ কেজির কিছু বেশি এবং মাসে ৪০ কেজির বেশি চাল বা গম রেশন হিসেবে পায় ভর্তুকি মূল্যে। আছে বাসস্থানের ব্যবস্থাও। কিন্তু বাসস্থানের জন্য বাগান থেকে ২০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১২ ফুট প্রস্থের দুই রুমের যে ঘর দেয়া হয়, তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই থাকার অনুপোযোগী এবং যথেষ্ট নয়। স্বাস্থ্যসম্মত তো নয়ই। কারণ, একেক ঘরে পরিবারের ৮-১০ সদস্য নিয়েও থাকতে হয়। অনেকেরই আছে বৃদ্ধ বাবা-মাও।

শ্রমিকদের বক্তব্য অনুযায়ী, যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর অবস্থানগত কারণে সেখানে তাদের সন্তানকে পাঠাতে পারে না। বাগানের সন্নিকটে সরকারী কোন প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই। তাই প্রাথমিকেই ধাক্কা খাওয়ায় চা শ্রমিকদের সন্তানরা শিক্ষার আলো থেকে প্রায় বঞ্চিত। যে কারণে বড় হয়ে পিতা-মাতার পথ অনুসরণ করে বাধ্য হয়ে চা বাগানেই শ্রম বিক্রি করতে হয় তাদের।

উল্লেখ্য, ১৬৮ বছরের পুরনো শিল্প হিসেবে বাংলাদেশের অন্যান্য যে কোন শিল্পের তুলনায় চা শ্রমিকদের বেতন যথেষ্ট কম। বর্তমানে ১৭০ টাকা মানে প্রতি বছরে গড়ে এক টাকা বেড়েছে বলা যায়। অথচ এরা আমাদের জাতীয় জীবনে ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। ১৯৭১ সালে অন্যান্য জনতার মতো তারাও পাকিস্তানী হানাদারের বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ৬০৩ জন চা শ্রমিক শহীদও হয়েছেন। তাদের শ্রমে অর্জিত হচ্ছে হাজার কোটি বৈদেশিক মুদ্রা। ২০১৬ সালে সর্বোচ্চ ৮ কোটি কেজি চা উৎপাদন ছিল সর্বোচ্চ। যা ছাপিয়ে ২০১৯ সালে উৎপাদন ৯ কোটি ৬০ লাখ কেজি হয়।

২০২১ সালে ছোট-বড় সব বাগান থেকে রেকর্ড পরিমাণ চা উৎপাদন করে। ২০২২ সালে ১০০ মিলিয়ন কেজি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। সদ্য ঘোষিত প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস অনুযায়ী দৈনিক মজুরি ১৭০ টাকায় পাশাপাশি অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দ্রুত এবং সেই সঙ্গে বাসস্থান নিশ্চিন্ত হলে চা উৎপাদনের এই ধারা আরও বৃদ্ধি পাবে। সচল হবে অর্থনীতির চাকা। দেশ আয় করবে বৈদেশিক মুদ্রা! জিডিপিতে চা শ্রমিকদের অবদান থাকবে আগের চেয়ে বেশি। স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে তারাও পাবেন সমমর্যাদা।

ড. এম মেসবাহ উদ্দিন সরকার : অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজি (আইআইটি), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

লেখা পাঠানোর ই-মেইল : pathok.ck@gmail.com

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়