চাঁদপুর, বুধবার, ৩০ নভেম্বর ২০২২, ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪  |   ২৭ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতি শিক্ষা স্বাস্থ্য সারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   সেতু নির্মাণ হলে ঢাকা -চাঁদপুর সদরের দূরত্ব কমবে ৫২ কিলোমিটার
  •   মেঘনায় ট্রলারের ধাক্কায় জেলে নিখোঁজ
  •   নৌ-ধর্মঘট প্রত্যাহার, সকাল থেকে লঞ্চ চলাচল শুরু
  •   মতলব উত্তরে আবারও সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৩
  •   কবরবাসী ইব্রাহিম এসএসসি‘তে পেয়েছে “এ“

প্রকাশ : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০০:০০

বিতর্কের ঊর্ধ্বে ইভিএম
অনলাইন ডেস্ক

ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) দিয়ে দ্রুত ভোট দেয়া এবং গণনা করা যায়, এই বিষয়টি বাংলাদেশের দিনমজুর, ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিতসহ সকল শ্রেণীর মানুষের কাছে ব্যাপক পরিচিত। পরিচয়ের এই বিষয়টি নির্বাচনী কাজের মাধ্যমে যতটুক ব্যাপকতা পেয়েছে তার চেয়ে বেশি হয়েছে রাজনৈতিক তর্ক-বিতর্কের কারণে। সরকারি জোট ইভিএমের পক্ষে আর বিরোধী জোট বিপক্ষে। ইভিএম ব্যবহারে কমিশনের সংলাপে অংশগ্রহণকারী ২৯টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ১৭টি পক্ষে আর ১২টি বিপক্ষে অভিমত দিয়েছে। অতঃপর নির্বাচন কমিশন সংসদের ৩০০ আসনেই ইভিএমে ভোটগ্রহণে নতুন তিন লাখ ইভিএম সংগ্রহ করতে সাড়ে আট হাজার কোটি টাকা লাগবে বলে জানায়। এই সিদ্ধান্তের পরপরই শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা রাজনৈতিক মঞ্চে ও টকশোতে।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সর্বসাধারণ যেখানে দেশব্যাপী বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসহ সবকিছুতে সাশ্রয়ী এবং মিতব্যয়ী সময় পার করছে, সেখানে ইভিএম ক্রয়ে এত টাকা খরচের ব্যাপারটা যেন বিলাসিতা নয়। সম্ভবত জনগণের এই সেন্টিমেন্ট আঁচ করতে পেরে ৩০০ আসনের পরিবর্তে ১৫০টি আসনে ইভিএম ব্যবহার করা হবে বলে পুনরায় কমিশন সিদ্ধান্ত নেয় এবং ইভিএমগুলো সিটি কর্পোরেশন ও জেলা সদরের আসনগুলোতে ব্যবহার করা হবে বলে জানায়। উল্লেখ্য, নতুন প্রতিটি ইভিএমের দাম পড়বে প্রায় দুই লাখ ৩৫ হাজার টাকা, যা ভারতে মাত্র ২২ হাজার টাকা। অর্থাৎ একই মেশিনের দাম আমাদের দেশে ১১ গুণ বেশি। স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক মহলে আবারও আলোচনার ঝড় ওঠে। নড়েচড়ে কমিশনও বলছে, প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান হলেই ইভিএমে ভোট, অন্যথায় নয়।

বিশ্ব এখন প্রযুক্তিনির্ভর এবং প্রযুক্তির ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিকস, মেশিন লার্নিং, ইন্টারনেট অব থিংকস, ব্লকচেইন ইত্যাদি আধুনিক প্রযুক্তির মিশেলে চলছে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগ। মানুষ এখন ঘরে বসেই জগত নিয়ন্ত্রণ করছে। গ্রামের কৃষক এখন হাল চাষ, বীজ বপন, ফসল ফলানো এবং উঠানো- সবই করছে যন্ত্রের মাধ্যমে। অতি পরিচিত লাঙ্গল-গরু প্রধানত এখন ছবিতে ও জাদুঘরে। বিকাশ, রকেট, নগদ ইত্যাদি মোবাইল ব্যাংকিংয়ে টাকা লেনদেনসহ অনেক কাজই করছেন একজন দোকানদার, ৮০ বছরের বৃদ্ধা, শ্রমজীবীসহ সকল শ্রেণীর মানুষ। সুযোগ থাকলে অন্যান্য কাজেও প্রযুক্তি ও যন্ত্রের ব্যবহার কেন নয়? তবে তা হতে হবে স্বচ্ছ, নির্ভরযোগ্য, ব্যবহারবান্ধব ও বিতর্কের ঊর্ধ্বে। ভোটের ব্যাপারে সেটা আরও জরুরি। তাই সকল তর্ক-বিতর্ককে মাথায় নিয়েই দেশে প্রথমবারের মতো সব কেন্দ্রে ইভিএম পদ্ধতিতে ভোটগ্রহণ হয় ২০১১ সালের ১৭ জানুয়ারি নরসিংদীর পৌরসভা নির্বাচনে।

পরবর্তীতে ৫ জানুয়ারি ২০১২ সালে কুমিল্লার সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে। এর আগে আংশিক ও পরীক্ষামূলকভাবে ২০১০ সালে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সিটি কর্পোরেশনের ১৪টি কেন্দ্রে, ২০১১ সালে নারায়ণগঞ্জের সিটি কর্পোরেশনের ৫৮টি কেন্দ্রে এবং ২০১২ সালের ২০ ডিসেম্বরে রংপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে কয়েকটি কেন্দ্রে ব্যবহার হয় ইভিএম। পরবর্তীতে ২০১৮ সালের ১৫ মে খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের ২৪ এবং ২৭নং ওয়ার্ডের সব কেন্দ্রে ইভিএম দিয়ে ভোটগ্রহণ করা হয়। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে (২০১৮) ঢাকা-৬ ও ১৩, চট্টগ্রাম-৯, রংপুর-৩, খুলনা-২ এবং সাতক্ষীরা-২ এই ছয়টি আসনে ব্যবহার হয় ইভিএম। সম্প্রতি দেশব্যাপী স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো (ইউনিয়ন এবং উপজেলা পরিষদ) ইভিএম দিয়ে অনুষ্ঠিত হয় এবং উপস্থিত ভোটারদের মধ্যেও ব্যাপক আগ্রহ লক্ষ্য করা যায়।

বর্তমান কমিশন ২০২২ সালের ১৫ জুন ইভিএম দিয়ে কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের যাত্রা শুরু করে। কমিশন সূত্রে বিগত নির্বাচনে ইভিএমে ভোট গণনার হার নিম্নরূপ- একাদশ সংসদ নির্বাচনে ৪৪-৬২ শতাংশ, বিভিন্ন উপ-নির্বাচনে ১২টি আসনে ২৭ দশমিক ০৫ শতাংশ, ছয়টি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ৩৮ দশমিক ৩৭ শতাংশ, ১৯টি উপজেলায় ২৮ দশমিক ৯৫ শতাংশ, ১৭১টি পৌরসভায় ৫৮ দশমিক ৭০ শতাংশ এবং ৫১৮টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ৬৮ দশমিক ৭২ শতাংশ ভোট পড়ে। একাদশ সংসদ নির্বাচনে ইভিএমের চেয়ে ব্যালট পেপারে ভোটের হার ছিল বেশি। ইভিএম আসনগুলোতে গড় ভোট ছিল ৫১ দশমিক ৪২ শতাংশ আর ব্যালট পেপারের আসনে ছিল তা ৮০ দশমিক ২০ শতাংশ। দুইয়ের মধ্যে ব্যবধান ২৮ দশমিক ৭৮ শতাংশ। ইভিএমে সবচেয়ে বেশি ভোট পড়েছে চট্টগ্রাম-৯ আসনে- ৬২ দশমিক ৮৭ শতাংশ। আর সবচেয়ে কম পড়েছে ৪৩ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ ঢাকা-১৩ আসনে। লক্ষণীয়, ইভিএমে ভোটের হার এবং জনপ্রিয়তা দুটিই ধীরে ধীরে বেড়েছে। তবে পেপার ব্যালটকে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি এখনও।

ইভিএম একটি ইলেক্ট্রনিক যন্ত্র। তাই এতে কারিগরি সমস্যা হতেই পারে। যান্ত্রিক ত্রুটি ছাড়াও ইভিএমকে ইচ্ছামতো ম্যানুপুলেট ও ফলকে ওলট-পালট করা, বিতর্ক হলে খতিয়ে দেখার জন্য কোন রেকর্ড থাকে না। কারণ, এটি শুধু রিড অনলি মেমোরি। ভোট কাঙ্ক্ষিত প্রার্থীর পক্ষে জমা হলো কিনা তাও বোঝার কোন উপায় নেই। বর্তমানে ইভিএমে বায়োমেট্রিক পদ্ধতি থাকলেও ভোটার ভেরিফাইড অডিট ট্রেইল (ভিভিএটি) সুবিধা নেই। সুধীজনদের সঙ্গে সংলাপে ভিভিএটি যুক্ত করার পরামর্শ এসেছে। ভারতে ভিভিএটি সংযুক্ত করে ভোট পরিচালনা করা হচ্ছে দীর্ঘদিন যাবত।

এ ব্যবস্থায় একজন ভোটার ভোট দেয়ার পর মার্কা সংবলিত একটি প্রিন্টেড কাগজ স্বচক্ষে কিছুক্ষণ (সাত সেকেন্ড) দেখতে পায়। অতঃপর এই কাগজটি ইভিএমের সঙ্গে সংযুক্ত একটি বক্সে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জমা হয়, যা প্রিজাইডিং অফিসার কর্তৃক সংরক্ষিত। দেশে বর্তমানে ব্যবহৃত ইভিএমের সঙ্গে এই সুযোগটি সংযুক্ত হলে ভোটগ্রহণে যেমন স্বচ্ছতা আসবে, তেমনি ভোটারদের মধ্যেও স্বস্তি ও আস্থা জন্মাবে। পরীক্ষামূলকভাবে নির্দিষ্ট কয়েকটি আসনে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে। কী হচ্ছে ভোটাররা তা স্বচক্ষে দেখবেন, রাজনীতিবিদরা এর ভাল-মন্দ আলোচনা-সমালোচনা করবেন। এক পর্যায়ে ইভিএম ব্যাপক হারে ব্যবহারের সুযোগও তৈরি হবে। প্রচলিত ইভিএমটি এভাবেই সীমিত থেকে সর্বত্র ব্যবহারের প্রেক্ষাপট তৈরি হবে। একটি ভাল, স্বচ্ছ এবং ব্যবহারবান্ধব প্রযুক্তির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ কখনই বিপক্ষে যায় না, বরং স্বাগত জানায়।

যা হোক, গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে নির্বাচনী কাজে ইভিএমের ব্যবহার ক্রমাগতভাবে বাড়ছে। কোনরকম যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা না দিলে অতি অল্প সময়ে নির্ভুলভাবে ইভিএমে ভোট দেয়া যায়।

এর অভ্যন্তরীণ প্রতিটা অংশ এমনভাবে কাস্টমাইজ করা যে, কেউ তাৎক্ষণিকভাবে এটাকে ম্যানিপুলেট করতে পারবে না। সুযোগও নেই। দেশের প্রথিতযশা প্রযুক্তিবিদদেরও একই অভিমত। তবে ভোট দেয়ার সময় সহায়তার নামে ম্যানিপুলেট করার অভিযোগ বিস্তর। সেটুকু বন্ধ করতে পারলে এটি একটি খুবই নির্ভরযোগ্য যন্ত্র। ভারতের সব রাজ্যেই এই পদ্ধতিতে ভোট গণনা করা হয়। যদিও ইভিএমের পাশাপাশি প্রচলিত পদ্ধতিও সেখানে প্রচলিত আছে। এই পদ্ধতিতে জর্ডান, মালদ্বীপ, নামিবিয়া, মিসর, ভুটান এবং নেপালেও ভোট গ্রহণ করা হয়। বাংলাদেশের ইভিএম মেশিন ভারতের আদলেই তৈরি।

একসঙ্গে ১৬ জন, ৩২ জন কিংবা ৬৪ জন প্রার্থীর নাম, ছবি এবং নির্বাচনী প্রতীক রাখা যায়, যেখানে চারটি ব্যালট ইউনিট আছে। অত্যাধুনিক ইভিএমে ৩৬৪ জন প্রার্থীর নাম, ছবি এবং নির্বাচনী প্রতীকসহ ২৪টি ব্যালট ইউনিট রাখার ব্যবস্থা করা যায়। এটাকে আরও আধুনিক করা যায় ভোটারদের তথ্যের ডেটাবেজ তৈরি করে। ভোট দেয়া হলেই এসএমএস পাবে। তাতে কারচুপির ব্যাপারটি হাতেনাতে ধরা পড়বে। এভাবেই ইভিএম ক্রমে ক্রমে উন্নতি হয়ে ভবিষ্যতে একটি নির্ভরযোগ্য ও সবার গ্রহণযোগ্য নির্বাচনী টুলস হিসেবে উপস্থাপিত হবে।

তবে সমালোচনাও আছে ইভিএমের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে দেশে ও বিদেশে। আমাদের দেশে এই বিতর্ক আরও প্রকট। আঙ্গুলের ছাপ মেলাতে না পেরে ভোট দিতে পারেননি প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিজেই ১ ফেব্রুয়ারির (২০২০) ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে। সিনিয়র সাংবাদিক আবু সাঈদ খানও তার ভোট দিতে পারেননি বলে তিনি নিজে ওইদিনই বলেছেন টকশোতে। আবার ভোট দেয়া হয়ে গেছে, এরকম অভিযোগও শোনা গেছে অনেক ভোটারের মুখে। অনিয়ম ও অভিযোগের কারণে নেদারল্যান্ডস, আয়ারল্যান্ড, ইতালি, জার্মানি, ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্সে এই পদ্ধতি বাতিল হয়েছে। অন্যদিকে ইভিএম এবং ডিআরই পদ্ধতিতে ই-ভোটিংয়ের ফলে ব্যাপক কারচুপির প্রমাণ মিলেছে যুক্তরাষ্ট্রেই।

অবশ্য আমাদের দেশে ইভিএম ব্যবহারে বয়স্কদের প্রযুক্তিভীতি, সংস্কার, দক্ষ জনবলের অভাব, যান্ত্রিক ত্রুটি, এটিকে নিজের ইচ্ছেমতো চলতে না দেয়া ইত্যাদি অভিযোগ বিস্তর। কমিশনকেও এ ব্যাপারে দায়সারা বক্তব্য দিতে দেখা গেছে। এক দলের এজেন্ট অন্য দলের এজেন্টকে বের করে দিলে কমিশনের কিছু করার নেই। এটা কোন সাংবিধানিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তার বক্তব্য হতে পারে না। কখনও কোন ইভিএম অচল হয়ে গেলে আরেকটি সচল ইভিএম প্রতিস্থাপন করতে হবে সঙ্গে সঙ্গেই। মনে রাখতে হবে, কি হচ্ছে না হচ্ছে সবকিছুর রেকর্ড থাকছে। তাই যন্ত্রটিকে দোষ না দিয়ে যেটি সমস্যা সেটি সকলে বুঝতে ও সমাধান করতে চেষ্টা করতে হবে।

ইভিএমকে বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখা এবং এর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির উদ্যোগ তেমন নেই। কীভাবে ভোট দিতে হয় তা এলাকার ভোটারদের নিয়ে বছরব্যাপী প্রশিক্ষণ, হাটে-বাজারে জারি-সারি গান, গম্ভীরা, পুঁথিপাঠ, পোস্টার, কার্টুন, পথনাট্য ইত্যাদি প্রদর্শন এবং গণমাধ্যমে বারবার প্রচার করা যেতে পারে। বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় প্রত্যেকটি টেলিভিশন চ্যানেলে প্রতিদিন এক ঘণ্টার একটি ‘ইভিএম অনুষ্ঠান’ পরিচালনা করা যায়। এভাবেই ইভিএম ভীতি ও সংস্কার দূর হয়ে একদিন সকলের আগ্রহ, আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্য যন্ত্রে পরিণত হবে। জয় হবে ইভিএমের।

ড. এম মেসবাহ উদ্দিন সরকার : অধ্যাপক, আইআইটি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

লেখা পাঠানোর ই-মেইল : pathok.ck@gmail.com

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়