চাঁদপুর, বুধবার, ৩০ নভেম্বর ২০২২, ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪  |   ২৭ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতি শিক্ষা স্বাস্থ্য সারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   সেতু নির্মাণ হলে ঢাকা -চাঁদপুর সদরের দূরত্ব কমবে ৫২ কিলোমিটার
  •   মেঘনায় ট্রলারের ধাক্কায় জেলে নিখোঁজ
  •   নৌ-ধর্মঘট প্রত্যাহার, সকাল থেকে লঞ্চ চলাচল শুরু
  •   মতলব উত্তরে আবারও সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৩
  •   কবরবাসী ইব্রাহিম এসএসসি‘তে পেয়েছে “এ“

প্রকাশ : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০০:০০

অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণে বঙ্গবন্ধুর দর্শন
অনলাইন ডেস্ক

(গত সংখ্যার পর)

বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিকাশ

তরুণ শেখ মুজিব প্রথম অবস্থায় বৃটিশের নিগড় ভেঙে পাকিস্তান আনার স্বপ্নে বিভোর হলেও পাকিস্তান প্রাপ্তির পর ধীরে ধীরে সে মোহ ভাঙতে খুব একটা বেশি সময় লাগেনি। পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হবে সেই প্রশ্নে পাকিস্তানের নেতাদের স্বরূপ উন্মোচিত হলে খুব দ্রুত বঙ্গবন্ধু নিজের ত্রুটি সামলে নেন। তাঁর অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিকাশ পর্যায়ে তিনি প্রথমেই রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যোগ দিয়ে বুঝিয়ে দেন, ধর্ম নয়, বাঙালির মৌল চেতনা হলো সংস্কৃতি, আর ভাষা হলো বাঙালির সেই মৌল চেতনার আতুরঘর। কাজেই, ভাষা যখন আক্রান্ত, তখন আর দ্বিজাতিতত্ত্বের পাকিস্তানে বাঙালির কোন ফায়দা নেই। পাকিস্তানীদের মুসলিম লীগের বিপরীতে একদিকে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন এবং অন্যদিকে জিন্নাহর অন্যায্য বক্তব্যের প্রতিবাদে রাজপথে দুর্বার আন্দোলন বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে ধীরে ধীরে বিকশিত করে তুলেছে ফল্গুধারার মতো। অসাম্প্রদায়িকতার সেই চেতনা ক্রমশ প্রকাশিত হয়ে ওঠে ঊনিশশো পঞ্চান্ন সালে আওয়ামী মুসলিম লীগকে কেটে-ছেঁটে আওয়ামী লীগে পরিণত করার মাধ্যমে। এবার আর বুঝতে বাকি থাকে না, বঙ্গবন্ধুর মনের তরণী কোন পথে বৈঠা বেয়ে চলেছে। ঊনিশশো বাহান্ন সালে সেপ্টেম্বরের শেষে নয়া চীন ভ্রমণকালে আমরা বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িকতাকে আবিষ্কার করতে পারি আরো ভালোভাবে। তিনি চীনে গিয়ে কমিউনিজমের নামে শোনা ভ্রান্তিগুলো সে দেশের মুসলিম জনগণের সাথে আলাপচারিতায় পরিষ্কার করে নেন। অন্যদিকে নিজের চর্চিত ধর্মবিশ্বাসের কারণে হালাল খাবারের সন্ধানে সতর্ক থাকেন এবং বৌদ্ধ প্রধান দেশে সংখ্যালঘু মুসলিমদের অধিকার ও সুযোগ-সুবিধার বিষয়ে অবহিত হয়ে নিজের মনের উদ্বেগকে প্রশমিত করেন। তিনি একদিকে যেমন রেঙ্গুনে গিয়ে শোয়েদাগন প্যাগোডা যেমন যেমন দর্শন করেন, তেমনি অন্যদিকে ভারতে গিয়ে হযরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতির (রঃ) দরগায় গিয়ে তাঁর মাজার জিয়ারত করেন। তিনি যেমন গানের বাণী না বুঝলেও সুরের কারণে কাওয়ালদের গানে মুগ্ধ হয়ে নিজের পকেটের কথা চিন্তা না করে বখশিশ দিয়ে আসেন, তেমনি নদীর ওপর নৌকায় বসে আব্বাসউদ্দীনের গান শোনাকে জীবনের অন্যতম প্রাপ্তির মহিমা দান করেন। তিনি দুর্নীতিমুক্ত নয়া চীনের কর্মপ্রবণতাকে সাধুবাদ জানিয়ে নিজের জন্মভূমিতে দ্বিতীয় বিপ্লবের বীজ রোপণের দর্শন বয়ে আনেন। নয়া চীনের সততা আর দেশপ্রেমের দর্শনকে বঙ্গবন্ধু তাঁর অসাম্প্রদায়িক চেতনার অংশ হিসেবে আত্তীকরণ করে নেন। ফলে শেখ মুজিবের দর্শন আর তাত্ত্বিক স্তরে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা হয়ে ওঠে সম্পূর্ণ প্রায়োগিক এক বাস্তবতা।

ঊনিশশো পঁয়ষট্টি সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধকালীন ভারতীয় উৎসজাত কোন কিছু রেডিওতে প্রচার না করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হলে রবীন্দ্রনাথ সেই তালিকাভুক্ত হয়ে নিষিদ্ধ হয়ে যান পূর্ববঙ্গে। ঊনিশশো সাতষট্টি সালের জুন মাসে তৎকালীন পাকিস্তানের তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিন লিখিতভাবে পাকিস্তানের বেতার-টেলিভিশনে রবীন্দ্র-সংগীত নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। যুক্তি ছিল, রবীন্দ্রনাথ পাকিস্তানের সংস্কৃতি ও চর্চার সাথে অবান্তর। বঙ্গবন্ধু এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে দৃঢ় কণ্ঠে উচ্চারণ করেন, ‘আমরা মির্জা গালিব, সক্রেটিস, শেক্সপিয়ার, এরিস্টটল, দান্তে, লেনিন, মাও সে তুং পড়ি জ্ঞান আহরণের জন্য। আর দেউলিয়া সরকার আমাদের পাঠ নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের লেখা, যিনি একজন বাঙালি কবি এবং বাংলায় কবিতা লিখে যিনি বিশ্বকবি হয়েছেন। আমরা এই ব্যবস্থা মানি না-আমরা রবীন্দ্রনাথের বই পড়বই, আমরা রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইবই এবং রবীন্দ্রসঙ্গীত এই দেশে গীত হবেই।’ ১৯৬৯ সালের ১৭ ডিসেম্বর ‘ÔThe Pakistan Times’ পত্রিকায় পরিবেশিত সংবাদের সূত্র হতে আমরা জানতে পারি, বঙ্গবন্ধু বাংলা একাডেমিতে বক্তব্য প্রদানকালে রবীন্দ্রনাথকে পাঠের ওপর অধিক গুরুত্ব প্রদান করেন। পত্রিকান্তরে তাঁর বক্তব্যকে ইংরেজিতে ভাষান্তরিত করে বলা হয়, ‘ÔTagore had reflected the hopes and aspiration of the millions of Bengalees through his works. Without him„the Bengali Language was incomplete.’ কেবল তাই নয়, তাঁর লেখা গান ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’-কে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত করার মাধ্যমে তিনি সুস্পষ্ট ভাবেই প্রতিষ্ঠা করেছেন তাঁর অসাম্প্রদায়িক দর্শনের ভিত্তি-শিলা। (চলবে)

[পরের পর্ব আগামী সংখ্যায় প্রকাশিত হবে]

লেখা পাঠানোর ই-মেইল : pathok.ck@gmail.com

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়