চাঁদপুর, বুধবার, ৭ ডিসেম্বর ২০২২, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ১২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪  |   ১৯ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতি শিক্ষা স্বাস্থ্য সারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   গাঁজাসহ এক নারী গ্রেফতার
  •   সরকার সড়ক নিরাপদসহ বাংলার মানুষের মঙ্গলের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন : সিনিয়র সচিব শাহ্ কামাল
  •   যেমন প্রার্থী তেমন ভোটার
  •   চাঁদপুর সদর ও পৌর আওয়ামী লীগে পুরানোরাই বহাল
  •   পিন পতন নীরবতা ও স্তব্ধতা

প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০২১, ১৩:৪২

কালের সাক্ষী কুমিল্লার কমনওয়েলথ সমাধিক্ষেত্র

২য় বিশ্ব যুদ্ধের ৭ শতাধিক সৈন্যের শেষ ঠিকানা

তাপস চন্দ্র সরকার
কালের সাক্ষী কুমিল্লার কমনওয়েলথ সমাধিক্ষেত্র

কুমিল্লা শহর থেকে ৫ কিলোমিটার পশ্চিমে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও কুমিল্লা-সিলেট রোড সংলগ্ন ক্যান্টেনম্যান্ট (সেনানিবাস) এলাকাস্থিত কমনওয়েলথ সমাধিক্ষেত্র কিংবা ময়নামতি ওয়ার সিমেট্টি। কুমিল্লা ক্যান্টেনমেন্টের টিপরা বাজার। টিপরা বাজার ও ময়নামতি সাহেবের বাজারের মাঝামাঝি কুমিল্লা-সিলেট সড়কের বাম পাশে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য নিয়ে সাড়ে ৪একর পাহাড়ী ভূমি জুড়ে বাংলাদেশে অবস্থিত দ্বিতীয় এ কমনওয়েলথ সমাধি ক্ষেত্র। এ দেশের অপর কমনওয়েলথ সমাধি রয়েছে চট্টগ্রাম শহরের বাদশা মিয়া চৌধুরী রোডে। যাতে ৭ শ’ ৫৫ জন সৈনিকের সমাধি আছে।

কমনওয়েলথ সমাধিক্ষেত্র কিংবা ময়নামতি ওয়ার সিমেট্টিতে চিরনিদ্রায় শায়িত রয়েছেন দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধে নিহত ৭শ’৩৭ জন সৈনিক। এর মধ্যে এজজন বে-সামরিক ব্যক্তি এবং চব্বিশজন জাপানী যুদ্ধ বন্ধী রয়েছে। স্থানীয়রা এটাকে ইংরেজ কবরস্থান বলে থাকে কিন্তু আসলে এখানে সারিবদ্ধভাবে শায়িত রয়েছেন মুসলিম-খ্রীস্টান-হিন্দু-ইহুদী-বৌদ্ধ। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধে নিহত এবং যুদ্ধে আহত হয়ে পরে মারা যাওয়া সাধারণ সৈনিক থেকে ব্রিগেডিয়ার পদ মর্যাদাধারীকে এখানে সমাহিত করা হয়েছে।

কুমিল্লা কমনওয়েলথ সমাধির পাহাড়ের প্রথম ধাপে রয়েছে ইউরোপিয়ানদের কবর। উপরের সারিতে রয়েছে এ উপ-মহাদেশের যোদ্ধাদের কবর। সমাধি-গুলো সারিবদ্ধভাবে সাজানো রয়েছে। প্রত্যেকটি সমাধিতে লেখা আছে নিহত সৈনিকের নাম, বয়স, পদবী, নিহত হবার তারিখ ও ঠিকানা।

সমাধি ক্ষেত্র তৈরীর আগে সেখানে ছিল বৌদ্ধ বিহারের কেন্দ্রীয় মন্দির। সেখানে নির্মান করা হয়েছে শ্বেত পাথরের একটি ক্রশ। বর্গাকার এ সমাধি ক্ষেত্রের প্রত্যেকটির বাহুর দৈর্ঘ্য প্রায় আড়াইশ ফুট। যাহার আয়তন সাড়ে ৪ একর। সমাধি ক্ষেত্রেটি’র চারদিক বাউন্ডারী দিয়ে ঘেরা। পুরো সমাধি ক্ষেত্রে হরেক রকম ও রং-বেরংয়ে ফুল গাছ এবং অন্যান্য গাছ দিয়ে পরিকল্পিত এবং সুবিন্যন্তভাবে সাজানো হয়েছে।

গাছ-গাছালির অপূর্ব নৈর্মগিক সৌন্দর্য্য ঘিরে রেখেছে এ সমাধি ক্ষেত্রটি। ফুলের সৌরভ, গাছের পাতায় বাতাস আর রোদের খেলা, পাখী ডাকে বিমোহিত পরিবেশের এ সমাধি ক্ষেত্রটি। সেখানে গেলে মনে অন্যরকম এক অনুভূতির জন্ম দেয়। তখন মনে হয় মানব জাতির জন্য যুদ্ধ কি খুব প্রয়োজনীয় ?

এ সমাধি ক্ষেত্রে মোট সমাধি সংখ্যা ৭শ’ ৩৮টি। এখান থেকে ১৯৬২ সালে ১টি সমাধি নিহত সৈনিকের আত্মীয়-স্বজনরা যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যান। বর্তমানে এ সমাধি ক্ষেত্র সমাধি রয়েছে ৭শ’ ৩৭টি। এর মধ্যে ১৪জন শায়িত সৈনিকের পরিচয় পাওয়া যায়নি। এখানে যাদের সমাহিত করা হয়েছে তাদের লাশ আনা হয়েছে ঢাকা, ফরিদপুর, সৈয়দপুর ও সিরাজগঞ্জ থেকে। আর্মি গ্যারিসন ইঞ্জিনিয়ারগণ এ সমাধি ক্ষেত্রটি তৈরী করেন।

এ সমাধি ক্ষেত্রে রয়েছে বৃটেনের ৩শ’ ৫০জন, কানাডার ১২জন, অস্ট্রেলিয়ার ১২জন, নিউজিল্যান্ডের ৪জন, দক্ষিণ আফ্রিকার ১জন, ভারতের ১শ’ ৭২জন, পূর্ব আাফ্রিকার ৫৬জন, পশ্চিম আফ্রিকার ৮৬জন, বার্মার ১জন, দক্ষিণ রোডেশিয়ার ৩জন, বেলজিয়ামের ১জন, পোলান্ডের ১জন এবং জাপানের ২৪জন যুদ্ধ বন্দীর কবর। এ ছাড়াও ১জন বে-সামরিক ব্যক্তিকেও এখানে সমাহিত করা হয়েছে। বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে মৃত সৈন্যের লাশ এখানে এনে এ সমাধি ক্ষেত্রে সমাহিত করা হয়। কুমিল্লার ময়নামতি সমাধি ক্ষেত্র এবং চট্টগ্রামের সমাধি ক্ষেত্র এ দু’টির সার্বিক তদারকি করছে কমনওয়েলথ গ্রেভস কমিশন। এর প্রধান কার্যালয় হচ্ছে লন্ডনে। কমনওয়েলথভূক্ত দেশ সমূহের অনুদানে চলে এ সংস্থাটি। এ কমিশন বাংলাদেশের এ দু’টি সমাধি ক্ষেত্র ছাড়াও ভারতের ১০টি, বার্মার ৩টি,

পাকিস্তানের ২টি, থাইল্যান্ডের ২টি, সিঙ্গাপুরের ১টি, মালয়েশিয়ার ১টি, এবং জাপানের ১টি সমাধি ক্ষেত্রগুলোও রক্ষনাবেক্ষন করছে এবং কুমিল্লার ময়নামতি সমাধি ক্ষেত্রটিতে গ্রেভস কমিশনের নিয়োগকৃত ১জন কেয়ারটেকার ও ৫জন গার্ডেনার রক্ষনাবেক্ষনের কাজে নিয়োজিত আছে।

প্রতিদিনই সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১২ টা এবং দুপুর ১টা হতে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এ যুদ্ধ সমাধিস্থল সর্বসাধারনের জন্য উম্মুক্ত থাকে। এ সমাধি ক্ষেত্রটি দেখতে আসে প্রতিদিন দেশ-বিদেশের হাজারো দর্শণ্যার্থী।

লেখক : এডভোকেট ও গণমাধ্যমকর্মী, কুমিল্লা। মোবাইল : ০১৭১৪-৩৭৩৬০৫/০১৮৪৬-৩৯২০৫৫, ই-মেইল- : tapash.sarker10@gmail.com

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়