রোববার, ২৪ অক্টোবর ২০২১, ৮ কার্তিক ১৪২৮, ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩  |   ২৯ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতি শিক্ষা স্বাস্থ্য সারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   হাইমচরে শীতকালীন সবজির বাম্পার ফলন, দামে অসন্তুষ্ট কৃষক : সবজি ক্ষেতে সবুজ হাসি থাকলেও কৃষকের মুখ ম্লান
  •   অশুভ শক্তি শক্তিশালী হলেও জয়ি হতে পারবে না : শিক্ষামন্ত্রী ডাঃ দীপু মনি এমপি

প্রকাশ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০

স্মরণ

মুক্তিযোদ্ধা কন্যার স্মৃতিকথা

রওশন আরা বেগম

মুক্তিযোদ্ধা কন্যার স্মৃতিকথা
অনলাইন ডেস্ক

যে সমস্ত দেশপ্রেমিকের ত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ, বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম জাবেদ আলী অ্যাডভোকেট তাঁদের অন্যতম। ১৯১৮ সালের ১লা নভেম্বর চরভাগল গ্রামে এই মহান মুক্তিযোদ্ধা জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৩৩ সালে তৎকালীন ফরিদগঞ্জ হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে পাস করেন। সে সময় তাঁর স্কুল জীবনের বন্ধু ছিলেন এ ডব্লিউ এম তোয়াহা মিয়া (প্রাক্তন অধ্যক্ষ, চাঁদপুর সরকারি কলেজ)। তাঁর সাথে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। মরহুম জাবেদ আলী ও তোয়াহা মিয়াসহ দুজনে একই সময়ে একই সাথে যুক্তফ্রন্টের রাজনীতি করতেন। পরবর্তীতে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক (বি.এ.) পাস করেন। ব্যক্তি জীবনে তিনি ছিলেন মেধাবী, সদালাপী ও ভদ্র। ভারত বিভক্তির পর তিনি মোক্তারশীপ পরীক্ষায় পাস করেন এবং চাঁদপুর ফৌজদারি আদালতে আইন ব্যবসায় নিয়োজিত হন। স্বাধীনতার পূর্বকালে তিনি চাঁদপুরে একজন স্বনামধন্য আইনজীবী ছিলেন এবং স্বাধীনতা উত্তরকালে তিনি সরকারের নীতি অনুযায়ী অ্যাডভোকেটশীপ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা জাবেদ আলী আজীবন বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক ছিলেন। যুক্তফ্রন্টের আন্দোলনের সময় তিনি বঙ্গবন্ধুর সহযোগী হিসেবে কাজ করে রাজনৈতিক আঙ্গনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। এতে পাকিস্তান সরকার তাঁর নামে হুলিয়া জারি করে। তাঁকে দুই-দুইবার গ্রেফতার করেন ও তিনি কারাবরণ করেন। বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা আন্দোলনের সময় তিনি চাঁদপুরে রাজনীতিতে সক্রিয় থাকায় বিভিন্ন রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হন। স্বাধীনতার পূর্বকালে তিনি চাঁদপুর মহাকুমা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও ফরিদগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বে যুদ্ধকালীন সময়ে প্রাথমিক দিকে নেতাদের বাড়িতে ক্যাম্প গঠন করা হয়। তিনি দলগতভাবে ফরিদগঞ্জ থানায় বিভিন্নস্থান থেকে আসা শরণার্থীদের তাৎক্ষণিক খাওয়ানোর ব্যবস্থা করেন। তাঁর সাথে ইউনিয়নের নেতা-কর্মীরা সক্রিয় সহযোগিতা করেন। ফরিদগঞ্জ থানা পাকিস্তান সেনাদের দখলের পূর্বেই মজুদকৃত রসদ শূন্য হয়ে যায়। এসব গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের কারণে তার নাম মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাজাকারের খাতায় এক নম্বরে উঠে আসে।

মুক্তিযুদ্ধের পূর্বে আমরা একটি মধ্যবিত্ত গোছানো সম্ভ্রান্ত পরিবার ছিলাম। ১৯৭১-এর যুদ্ধের দামামায় ও দুর্যোগে আমাদের পরিবারের সকলেই বিভিন্নভাবে বিচ্ছিন্ন ও অসহায় হয়ে পড়েছিলাম। আমরা চার বোন ও তিন ভাই বাবা-মাসহ পারিবারিকভাবে সুন্দর ও স্বাধীনভাবে বসবাস করছিলাম। যুদ্ধের অশনি সংকেতে সব এলোমেলো হয়ে যায়। যুদ্ধের পূর্বে আমার বড় ভাই ডাঃ শাহ আলম মনসুর আহমেদ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। মেঝ ভাই মোঃ শাহজাহান ফিরোজ উপ-পরিচালক বস্ত্র অধিদপ্তর (প্রাক্তন)। তিনি ৭১-এ মেট্রিক পরীক্ষার্থী ছিলেন। বড়বোন মনোয়ারা আমিন এসএসসি পরীক্ষার পর দেশে বিমানবাহিনী কর্মকর্তার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যুদ্ধের প্রায় দুই বছর পূর্বে স্বামীর চাকরির সুবাদে পশ্চিম পাকিস্তানের করাচিতে চলে যান। যুদ্ধের দুই মাসের মধ্যে পাকিস্তানীরা তাদেরকে পেশওয়ারে বাঙালি বন্দি শিবিরে প্রায় পাঁচ হাজার সরকারি চাকুরিজীবীদের নিয়ে একটি স্থানে আটকে রাখেন। তাদের (বাঙালি) বাইরের সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। মেঝ বোন দিলওয়ারা বেগম মাত্র ৫ম থেকে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে উঠেছেন। বর্তমানে তিনি (এম.এস.সি. এম.এড) বাসাবো-কদমতলী হাইস্কুলের বিজ্ঞানের শিক্ষিকা, ভাইদের মধ্যে ছোট ভাই ডক্টর মনিরুল ইসলাম (শাহপরান) বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটিতে ক্যান্সার রিসার্চ অফিসার। তিনি যুদ্ধের সময় ৩য় শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। আমি রওশন আরা রুশো ও ছোট বোন সাহানা সুলতানা হাসি আমরা দুজন তের মাসের ছোট-বড় দুই বোন ছিলাম। ছোট ভাইয়ের পরে আমরা ছোট দুই বোন পিঠাপিঠি হওয়ায় আমাদেরকে জমজের মতো রুশো হাসি বা একত্রে হাসি-খুশি ডাকতো। আমার ছোট বোন সাহানা সুলতানা হাসি (এমএসসি,এমএড-ঢাকা ভার্সিটি) বর্তমানে আস্ট্রেলিয়ায় ১টি কিন্ডারগার্টেনে রয়েছে। যুদ্ধকালীন চার বছর সময়ের কিছু কিছু বিষয় এখনো কিছুটা মনে পড়ে। এখনও স্বপ্নে দেখি যে, মিলিটারী আসছে, খাওয়া-দাওয়া রেখে আমরা সবাই অন্যবাড়িতে দৌড়িয়ে পালাচ্ছি। এই স্মৃতিচারণের অধিকাংশ বিষয় আমার মায়ের লেখা থেকে সংগ্রহ করা এবং আব্বার কাছ থেকে শুনে লিখেছি ও সংগ্রহ করেছি।

মার্চের প্রথম দিকের শুরুতেই আমরা চাঁদপুর শহরে চৌধুরী পাড়াতে আমাদের বাসা ফেলে গ্রামের বাড়িতে চলে যাই। তার এক সপ্তাহ পরেই সফিনা হোটেলের শহীদুল্যাহ শহীদ ভাই তাঁর বন্ধু মাহাবুব ভাইসহ আমাদের গ্রামের বাড়িতে চলে আসেন। আমাদের বাসা এক সময় ছিলো নতুন বাজার (বর্তমান হোটেল পাঁচতারা)। সেটা ছিলো আমাদের সাবেক নিজেদের বাসা। ঐ নতুনবাজারের বাসায় থাকাকালীন সময়ে শহীদ ভাইদের সাথে আমাদের পারিবারিক ও আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিলো এবং এখনও ঘনিষ্ঠতা আছে। আমার মা তাদের পরিবারের একজন অভিভাবক ও অবৈতনিক শিক্ষিকা ছিলেন। তারা ও আমরা এক পরিবারের সদস্যের মতো ছিলাম। শহীদ ভাই ছিলেন আমার বড় ভাই-বোনের গার্ডিয়ান, আমার বড় বোন ও বড় ভাই ডাক্তার সাহেবকে তিনি পড়াতেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রাক্কালে ৭১-এর পূর্বে তিনি উচ্চ শিক্ষার্থে পাকিস্তান চলে যান। সেখানে দুই বছর পড়াকালীন দেশে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠল। এমনি সময় শহীদ ভাই দেশ ও মাতৃভূমির টানে পাকিস্তান থেকে দেশে চলে আসেন। পাকিস্তান থেকে আসার পর শহীদ ভাই ও তার বন্ধু মাহাবুব আব্বার সাথে খুব যোগাযোগ রাখতেন। ৭১-এর যুদ্ধ যখন সন্নিকটে তখন আমার বড় ভাই ডাঃ শাহআলমকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ থেকে চলে আসার জন্য শহীদ ভাই আহ্বান করেন। আমার বড় ভাই শহীদ ভাইয়ের ডাকে সাড়া দিয়ে মেডিক্যাল কলেজ থেকে চাঁদপুর চলে আসেন। কিছুদিন পরে আমরা পারিবারিক ভাবে গ্রামের বাড়িতে চলে যাই। আমরা বাড়িতে চলে যাওয়ার এক সপ্তাহ পরেই শহীদ ভাই ও তাঁর বন্ধু মাহবুবসহ আমাদের দেশের বাড়িতে চলে আসেন। যাই হোক, তিনি আমাদের বাড়িতে আসার পর আমার দুই ভাই, চাচতো-জেঠাতো ভাইসহ তাদের মধ্যে কিসের একটা চাপা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা গেল। তারা সব ইয়াং ছেলে দফায় দফায় আমাদের বিল্ডিংয়ের সামনের দুটি রুমে বসে কী যেন লেখালেখি করতেন আর বলাবলি করতেন। বাচ্চা ছেলেরা গেলে দৌড়ায়ে ভাগিয়ে দিতেন। এর কিছুদিন পরেই আব্বা না বলে শহীদ ভাইদের সাথে আমার চাচতো দুভাই ও বড় ভাইকে কোথায় যেন পাঠিয়ে দিলেন, এক সপ্তাহ পরে জানা গেল তারা ভারত চলে গেছেন। মা জানতে পেরে কান্নায় খুব ভেঙ্গে পড়েন। এর কিছু দিন পর আব্বাও না বলে ভারতের উদ্দেশ্যে আত্মগোপন হয়ে এদেশ ত্যাগ করেন। আমরা যেন আরও অসহায় হয়ে পড়লাম। আব্বা পথিমধ্যে বর্ডারের কাছে বিজয় নগর নামক স্থানে রাজাকারের হাতে ধরা পড়ে নির্যাতিত হন এবং নামাজি এক লোকের সহায়তায় ভোর রাতে ভারতে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। আব্বা ভারত পৌঁছার সাথে সাথে তিনি তাঁর সহ-মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে খোঁজ নেন। তাঁর ঘনিষ্ঠ সহচর বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম, মরহুম অলিউল্যা নওজোয়ান, বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম আবু জাফর মইনুদ্দীন সাহেবসহ চাঁদপুরের আরও উল্লেখযোগ্য নেতা-কর্মীরা ক্যাম্পে একত্রিত হন। ভারতে চড়িলাম ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ শেষে তাঁরা এক একজন বিভিন্ন দায়িত্ব নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে বিভিন্ন ক্যাম্পে বিভক্ত হন। অতঃপর আমার আব্বাসহ অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাদের ক্যাম্পে বা অধীনে বারশ’ মুক্তিযোদ্ধা ঐ সময় ট্রেনিং গ্রহণ করেন। চাঁদপুর মহাকুমা ও ফরিদগঞ্জে ছিল প্রায় নয়শ’ ৭০ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা। ভারত যাওয়ার তিন মাস পরে শহীদ ভাইসহ আমার দু চাচাতো ভাই ভারত থেকে দেশে ফিরে আসেন। দেশে ফিরে লুকিয়ে তারা বিভিন্ন বাড়িতে থেকে গোরিলা যুদ্ধ করতেন। তাদের সঙ্গী ছিলো আমার মেঝো ভাই মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান ফিরোজ। তারা মাঝে মধ্যে লুকিয়ে লুকিয়ে মার সাথে দেখা করতেন।

শহীদুল্যাহ ভাইয়ের মুক্তিযোদ্ধা কালীন ছদ্মনাম নাম ছিল মোঃ জাবেদ, সেই নামেই তিনি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তাঁর সাথে ভারত থেকে আমার দু চাচাতো ভাই কেন আসলেন এটাই ছিল আমাদের বাড়ি ও আমাদের জন্য বিড়ম্বনার কারণ। চারিদিকে গুঞ্জন শুরু হলো যে, অনেক মুক্তিফৌজ জাবেদ আলীর বাড়িতে এসেছে। আজ হোক কাল হোক আমাদের বাড়িতে যে হামলা হবেই এমনটি সবাই বুঝতে পারলেন, নিরাপরাধ অনেক লোক ভয়ে ভয়ে বাঁচার জন্য ফরিদগঞ্জ গিয়ে শান্তিবাহিনীতে যোগদান করেন। কিন্তু তারপরও শেষ রক্ষা হলো না। যুদ্ধের মাঝামাঝিতে আওয়ামী লীগের নেতাদের বাড়ি খুঁজে খুঁজে পোড়ানো হচ্ছিল। শান্তিপ্রিয় মানুষদের ওপর জুলুম, নির্যাতন, অত্যাচার, অনাচার, ধর্ষণ, গুলি করে তখন পাকিস্তানী বাহিনী চারিদিকে বিভীষিকা সৃষ্টি করছে। এমনিই এক সময়ে ২৩-০৭-১৯৭১-এর ভোর রাতে ভরা বর্ষার সময় পাশের বাড়ির রাজাকারদের সঠিক পথনির্দেশনায় পাক হানাদার বাহিনী আমাদের বাড়িতে চলে আসে। ভাগ্যক্রমে সেই রাতে মাসহ আমরা তিনবোন ও একভাই মামাদের বাড়িতে মিলাদের দাওয়াত খেতে গিয়েছিলাম। আমার মেঝ মামা রাজ্জাক মিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং নয়াহাট বাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তার নামও রাজাকারদের খাতায় লিপিবদ্ধ ছিল। পাকিস্তানি বাহিনী আমাদের বিল্ডিংয়ে স্পিরিট দিয়ে আগুন লাগিয়ে দেয় এবং অন্যান্য চাচা-জেঠা ও আত্মীয়-স্বজনের ঘরসহ ছয়টি ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। এরই মধ্যে দুজন চাচাতো ও জেঠাতো ভাই, ফুফুর ভাগিনা, দুজন মহিলা ও একটি শিশু সন্তানকে গুলি করে হত্যা করে। তা-ব চালিয়ে ফিরে যাওয়ার পথেই আমার মামার বাড়ি ছিলো। পাক বাহিনী এবার মামার বাড়িতে ঢুকে। এই বাড়ির লোকজন আমাদের বাড়িতে হানাদারদের যাওয়ার বিষয়টি টের পেয়েছিল বিধায় মামার বাড়িতে পিছনের বিল দিয়ে চার-পাঁচটি বড় নৌকা করে বিলের মধ্যে একটি বাড়িতে গিয়ে আমরা আত্মগোপন করি। পাকিস্তানি ও রাজাকার বাহিনী মিলে মামার বাড়িতে পাঁচটি ঘর পুড়িয়ে দেন। অনেক মালামাল লুটপাট করে নিয়ে যায়। চারিদিকে গুলি আর গুলির শব্দ। তবে মামার বাড়িতে লোকজন না থাকায় কোনো হতাহত হয় নি, শুধুমাত্র একজন পথচারির মৃত্যু ঘটে। বেলা ১২:৩০ মিনিট তারা আামদের এলাকা ত্যাগ করে। পকিস্তানী বাহিনী চলে যাওয়ার পর চারিদিকের মানুষ সবাই বাড়িতে ঢুকে। দেখি সেকি কিয়ামত আর হাহাকার। চারিদিকে শোকের মাতম। আমাদের বাড়িতে ৬টি লাশের বীভৎস দৃশ্য। একটি বাচ্চা পড়ে আছে গুলি খেয়ে। সেই লাশের দৃশ্য আজও মনে পড়লে গা শিউরে উঠে। এ সময় আমরা চরম অসহায় ও এতিমের মত ছিলাম।

আমাদের সব থেকেও যেন কিছুই নেই। বড় ভাই ও বাবা ভারত গিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে গেছেন। মেঝো ভাইয়া বিভিন্ন স্থানে গিয়ে শহীদ ভাইয়ের সাথে গোরিলা যুদ্ধ করছেন। ছোট ভাইয়া শাহপরান ও দিলওয়ারা বেগম সেই সময়ে নানার বাড়িতে বেশি থাকতেন। বড় বোন তার স্বামীসহ পাকিস্তানে বন্দিশিবিরে আটকানো। আমরা ছোট দুই বোন রুশো ও হাসি শুধু মায়ের সাথে থাকি। নিজেদের পুড়ে যাওয়া বিল্ডিংয়ে কোনো রকম ব্যবস্থা করে থাকতে ছিলাম। কিন্তু তাও প্রায় শুনতাম যে, মিলিটারি যেহেতু আমাদের মারতে পারেনি, তাই তারা আবারও যে কোন সময়ে আমাদের বাড়িতে আসতে পারে। তাই আমরা আজকে নিজেদের ঘরে, কালকে অন্যবাড়িতে, পরশু আরেক ঘরে এইভাবেই পালিয়ে রাত্রি যাপন করতাম। এতে অনেকেই ভেতরে ভেতরে ক্ষোভ পোষণ করতো যে, এই জাবেদ আলীর জন্য আমাদের এই দশা। এই জাবেদ আলী কী জন্যে আওয়ামী লীগ করতে গেলো ? কেনইবা আামদের গ্রামের ছেলেদেরকে মুক্তিযুদ্ধ করতে নিয়ে গেছে। তার জন্যে আমাদের এই মৃত্যু ও দুরবস্থা। এসব কারণে আমার মাকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মানুষের কথা মুখ বুঁজে সহ্য করতে হতো।

দিনভর কষ্ট করে রাত জেগে মা নামাজ কোরআন শরীফ পড়তেন আর উতলা হয়ে কান্না করতেন, আর আমরা দুই বোন মায়ের সাথে উঠে কান্নার সুর তুলতাম। পাশের চাচী-জেঠিরা রাতে এসে আমাদের কান্না থামাতেন। মা বলতেন, আমার স্বামী, আদরের সন্তানরা কে কোথায় আছে, সুখের সংসার কী হলো ? মা শুধু স্বামীর পোড়া বিল্ডিংয়ে দিনে পড়ে থাকেন আর আমাদের ছোট দুটা বাচ্চা নিয়ে ভয়ে রাত অন্য আত্মীয়ের ঘরে কাটালেন। এর চেয়ে দুঃখ আর মানবেতর জীবন কী হতে পারে! শুধুমাত্র আমার মায়ের ছোট ভাই (ছোট মামা) আমাদের বাজার সদাই ও দেখাশুনা করতেন। সেই নিশি রাতের কান্নার কথা আজও মনে পড়লে আমার বিদ্রোহী মনে জেগে ওঠে। সেই রাজাকার আলবদরকে কোনোভাবেই ক্ষমা করা যায় না। ওদের বিচার হতেই হবে- হওয়া উচিত যার জন্য জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী রাজাকারদের যথাযথ বিচার করেছেন।

আমার মা সেকালে বৃটিশ বানিকুলার স্কুল থেকে এঞও পাস (জিটিআই) করেন। তিনি সেকালে মেধাবী ও স্কলারশিপ পাওয়া ছাত্রী ছিলেন। ৪র্থ শ্রেণীতে বৃত্তিও পেয়েছেন। হাতের লিখা সুন্দর ছিলো এবং চারুকারু শিল্পে কয়েকবার পুরস্কৃত হয়েছেন। সেকালের পড়াশুনার গুণে ও মেধার কারণে আমরা সকল ভাই-বোন প্রথম শ্রেণী থেকে ৬ষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত বাংলা, ইংরেজি ও পাটি গণিত পড়তাম। আম্মা ও আব্বা আমাদেরকে গৃহ-শিক্ষকের মতো সমানভাবে বাংলা গণিত ও ইংরেজি বিষয়ে পড়াশুনা করাতেন। আব্বা ইংরেজিতে ভীষণ ভাল ছিলেন। প্রথম জীবনে আমার মা চিটাগাং কাজীর দেউরী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। আব্বার সাথে মায়ের মধ্যেও দেশ-মাতৃকা, স্বাধীনতার ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অপরীসীম ছিল।

মায়ের হাতে গড়া একজন সৎ, আদর্শ ও প্রিয় ছাত্র ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ জাবেদ ভাই। তাঁদের সাথে আমাদের পারিবারিক গভীর সম্পর্ক ও আত্মীয়তার বন্ধন ছিল, যা এখনও আছে। শহীদ জাবেদ ভাই পশ্চিম পাকিস্তানে থাকাকালীন সময়ে তাঁর মায়ের পক্ষ হয়ে আমার মা যখন শহীদ ভাইয়ের কাছে চিঠির লিখনিতে সব তুলে ধরতেন, তখন শহীদ ভাই মাকে লিখতেন, খালাম্মা আপনার লিখায় যেন আমার পরিবারের সম্পূর্ণ চিত্র ফুটে উঠেছে। যেন শহীদ ভাইও উনার আরেকটি সন্তান বা ছেলের মত ছিলেন। যার জন্য যুদ্ধকালীন সময়ে মৃত্যুর ঠিক একদিন পূর্বে তিনি আমাদের বাড়িতে মায়ের হাতে শেষ খাবার খেয়ে বিদায় নিয়ে বাড়ির পিছনের দিক দিয়ে লুকিয়ে নৌকায় চলে যান। সেই স্মৃতি এখনও ভাসে। তার একদিন পরে শহীদ ভাই ঘাতকের মাধ্যমে শহীদ হওয়ার খবর আমরা জানতে পারি। এতে মা খুব বিমর্ষ ও শোকাহত হয়ে পড়েন। যাক সমস্ত দুঃখ-দুর্দশা পেরিয়ে স্বাধীনতার পর আমরা আবার পর্যায়ক্রমে একত্রে হতে থাকলাম। স্বাধীনতার একমাস পর আব্বা দেশে ফিরলেন। কিন্তু আমার বড় ভাই তখনও দেশে ফিরে নাই। বড় বোন বিদেশে পারিবারিক ভাবে আটকা পড়ে আছেন। যুদ্ধকালীন শহীদ ভাইয়ের মৃত্যুসহ সব মিলিয়ে মা যেন সর্বক্ষণই শোকাহত। এর দুই মাস পর আমার বড় ভাই দেশে ফিরে আসল। মা হারানো ছেলেকে পেয়ে যেন ঈদের আনন্দে উচ্ছ্বসিত হলো। এরপর পাকিস্তান থেকে মুক্তি পেলো স্বাধীন বাংলাদেশের রূপকার ও স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান। তিনি বাংলাদেশে আসার পর পাকিস্তানী বন্দি বাংলাদেশী ও এদেশে আটকানো পাকিস্তানিদের দুই দেশে বন্দী মুক্তি আদান-প্রদান চুক্তিতে সিদ্ধান্ত হয়। এতে ছয় মাসের মধ্যে বন্দিদের আদান-প্রদানের ব্যবস্থা করা হলো। আমার বড় বোনও চুক্তির দশ মাসের মধ্যে দেশে চলে এলেন। ১৯৭৫ সালে বীর মুক্তিযোদ্ধা জাবেদ আলী চাঁদপুরের হাইমচরে তাৎকালীন ৪ আসন থেকে জাতীয় সংসদের উপ-নির্বাচন করেন। আব্বার ঘনিষ্ঠজন বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম অ্যাডঃ সিরাজুল ইসলাম (সাবেক ছাত্র নেতা ও ফরিদগঞ্জ উপজেলার বর্তমান চেয়ারম্যান মোঃ জাহিদুল ইসলাম রোমানের বাবার) ও শামছুদ্দীন প্রফেসর সহ এই তিনজন একেই দল থেকে একেই আসনে নির্বাচন করেন। সেই নির্বাচনে বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম কাকা আব্বার চেয়ে ১৪৭ ভোট বেশি পেয়ে সংসদ উপ-নির্বাচন বিজয়ী হয়ে এমপি নির্বাচিত হন। আমার আব্বার সময়কালীন যারা আওয়ামী লীগের উল্লেখযোগ্য নেতা ছিলেন তাঁরা হলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মিজানুর রহমান চৌধুরী (যিনি আব্বার খুব কাছের লোক ছিলেন)। এছাড়া ভাষা সৈনিক বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম এম.এ. ওয়াদুদ (গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর পিতা), জেলা পরিষদের সাবেক প্রশাসক ৮নং সেক্টর কমান্ডার লেঃ কর্নেল আবু ওসমান চৌধুরী, জননেতা আব্দুর করিম পাটওয়ারী (সাবেক পৌর চেয়ারম্যান), মরহুম অলিউল্যাহ নওজোয়ান, মরহুম সোনা আখন্দ, মরহুম বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু জাফর মাঈনুদ্দিনসহ আরও অনেকে। রোমান ও আমাদের বাড়ি ফরিদগঞ্জে একই এলাকায় পাশাপাশি হওয়ায় ও চাঁদপুর শহরে নতুন বাজারে একত্রে থাকায় বেশি ঘনিষ্ঠতা ও আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিলো আব্বা ও সিরাজ কাকার মধ্যে। তাঁরা যেনো ছিলেন সহোদর ভাইয়ের মত। রোমানের আম্মা ও আমার মা ছিলেন ছোট ও বড় বোনের মতো। এখনও ওদের ও আমাদের সম্পর্ক পারিবারিক ভাইবোনের মতো। উপরে উলে¬খিত নেতা ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তের ও ত্যাগের বিনিময়ে আজকের এই স্বাধীন বাংলাদেশ।

আমার আব্বা ১৯৮৫ সালে মৃত্যুবরণ করেন। মা আরও দৃঢ়তার সাথে সংসারের দায়িত্ব পালন করেন। যদিও তখন আমার বড় ভাইয়া অ্যামেরিকা থেকে ঋজঈঝ করে বড় ডাক্তার হয়ে এসেছেন। মেঝো ভাই ব্যস্ত দপ্তরের প্রকৌশলী। বড় দু’বোন বিবাহিত। আমাদের ছোট দুই বোনকে বিয়ে দেয়া ও ছোট ভাইকে বিয়ে করানোসহ সকল ভাই-বোনদের প্রতি দৃষ্টি রেখেছেন। মা সবসময় মাতৃভূমি ও স্বাধীনতা নিয়ে ভাবতেন এবং দৈনিক দুটি পত্রিকা পড়তেন। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও দৃঢ়তা আমার আব্বার মতো ছিল।

আমার মনে হয় বঙ্গবন্ধুর ছবির মধ্যে আমার আব্বার প্রতিচ্ছবি ছিলো। কোথায় যেন মিল ছিল, যার জন্যে জাতির জনকের দিকে তাকালে আমার মনটা মলিন হয়ে যায়। মার বয়স এখন প্রায় ৯৭ বৎসর। তিনি বার্ধক্যজনিত কারণে অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়েছেন। ভাই এপ্রিল২০২১ মৃত্যুবরণ করেন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক ডাঃ শাহ আলম মনছুর আহমেদ বর্তমানে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সেক্টর কমান্ডারস্ ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির একজন নেতা (কোষাধ্যক্ষ)। মেঝো ভাই মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান ফিরোজ উপ পরিচালক (প্রাক্তন), বস্ত্র দপ্তর, ঢাকা। সবাই সম্মানিত পদে স্ব স্ব স্থানে আছেন। আমার একটি বিষয়ে ভীষণ দুঃখ বোধ হয় যে, চাঁদপুরের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন স্থানে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের নাম নেই। কিন্তু বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন আলোচনায় আব্বার নাম চলে আসলেও অনেক ক্ষেত্রেও আব্বার নাম লিখা হয় না। যিনি বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা দাবি আদায় থেকে একজন আওয়মীলীগের দেশপ্রেমিক সৈনিক ও স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন কর্মনিষ্ঠ সংগঠক ছিলেন। ভারতের মুক্তিযোদ্ধা চড়িলাম ক্যাম্পের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সহ-অধিনায়ক ছিলেন। যিনি স্বাধীনতা এনেছেন যার নাম প্রত্যেকে মুক্তিবার্তায় নিবন্ধনকৃত ০২০৫০৫০১০০নং বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে লিপিবদ্ধ রয়েছে ও সম্মানীভাতা আসছে। তবে অনেক নতুন মুক্তিযোদ্ধার কারণে পুরাতন ও প্রকৃত অনেক মুক্তিযোদ্ধার নামও হারিয়ে যাচ্ছে। তাই প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার নাম অটুট থাকুক এ কামনা করছি।

তৎকালীন পাকিস্তানী বাহিনী কর্তৃক আমাদের গ্রামের বাড়ির দালানটি ধ্বংসপ্রাপ্ত অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধের নৃশংসতার স্মৃতি বহন করে আজও দাঁড়িয়ে আছে। বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম জাবেদ আলী তাঁর জীবদশায় ছেলেমেয়েদের মানুষ করার লক্ষ্যে মনোযোগী হওয়ায় আর নিজের ক্ষতিগ্রস্ত দালানটি সংস্কার করার মত অর্থ ব্যয় করে পুনঃনির্মাণ করতে পারেননি বিধায় আমার বড় ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক ডাঃ শাহ আলম মনছুর আহম্মেদ মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন, যাতে আমাদের বাড়িটি মুক্তিযুদ্ধের স্মারক হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়। তৎপ্রেক্ষিতে ফরিদগঞ্জের দুজন এমপি ও তৎকালীন ৮নং সেক্টর কমান্ডার লেঃ কর্নেল (অবঃ) আবু ওসমান চৌধুরী সাহেব আমাদের বাড়তে যান। অতঃপর বাড়ির বিল্ডিংটি অধিগ্রহণ করে মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য করার জন্য অঙ্গীকার করেন।

আমাদের পরিবারটি স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করার অপরাধে (!) যুদ্ধকালীন সময়ে যুদ্ধের আলোড়ন ও আন্দোলনের আবর্তনে একেবারেই বিচ্ছিন্ন ও নিষ্পেষিত হয়েছিলা। অনেক অর্থ-সম্পদ ও আত্মীয়-স্বজন হারিয়ে ভালবাসার ত্যাগ স্বীকার করেই একটি বাংলাদেশ পেয়েছি। আমরা আজ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান, বীর মুক্তিযোদ্ধা ভাইদের বোন হিসেবে গর্বিত। এটাই আমাদের পরম পাওয়া। লাখো শোকরিয়া আল্ল¬াহর দরবারে।

লেখক পরিচিতি : রওশন আরা বেগম, প্রধান শিক্ষকা, পীর মহসীন উদ্দিন পৌর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, চাঁদপুর।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়