শনিবার, ২৯ জানুয়ারি ২০২২, ১৪ মাঘ ১৪২৮  |   ১২ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতি শিক্ষা স্বাস্থ্য সারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   বালুবাহী ট্রাক চাপায় গাড়ির হেলপার নিহত
  •   চাঁদপুর শহরে যুবকের আত্মহত্যা
  •   ফরিদগঞ্জে ৪ কেজি গাঁজাসহ দুই যুবক আটক
  •   করোনায় মৃত্যু ২০, শনাক্ত ১৫৪৪০ জন
  •   ফরিদগঞ্জে আগুনে পুড়ে বৃদ্ধার মৃত্যু

প্রকাশ : ০৫ ডিসেম্বর ২০২১, ০০:০০

কেউ আপনার সুখের দায়িত্ব নিয়ে বসে নেই আয় বুঝে ব্যয় করেন

কেউ আপনার সুখের দায়িত্ব নিয়ে বসে নেই আয় বুঝে ব্যয় করেন
মীর আব্দুল আলীম

পৃথিবীতে কেউ আপনার সুখের দায়িত্ব নিয়ে বসে নেই, আপনার সুখের জন্যে আপনাকেই পরিশ্রম করতে হবে, আয় করতে হবে। যেমন আয় করবেন, তেমন ব্যয় করতে হবে; অপচয় করা যাবে না। মিতব্যয়ী হতে হবে। তাহলে জীবনটা সুন্দর হবে। এ প্রসঙ্গে একটি পারিবারিক বিষয় আলোচনায় আনলাম।

হানিফ চাচাকে সেন্ডেল কিংবা জুতা পরতে দেখিনি কখনো। প্যান্ট আর পাজামাতো নয়ই। তিনি আমাদের বাড়িতে কাজ করতেন। তবে তাকে আমরা কাজের লোক ভাবিনি কখনো। বয়োবৃদ্ধ হওয়ায় বাড়ির সবাই তাকে অত্যন্ত সম্মান দিয়ে চলতেন। তিনি ছিলেন আমাদের কাছে আপন চাচার মতই। গরুর দুধ দোয়ানো আর লালন-পালন ছিলো তার প্রধান কাজ। সে সুবাদে আমাদের ছাই রঙের একটি গরুর সাথে তখন দিন-রাত তার এত সখ্যতা ছিলো যে, গরুটা যেন একসময় চাচার বন্ধু বনে গিয়েছিলো। হানিফ চাচা খুব আদর-যতœ করে গরুটাকে পালতেন। দাদা সুবেদ আলী মীরের আবার দু’বেলা গরুর দুধ না হলে চলতোই না। তাও আবার তার খাঁটি দুধ চাই। সাথে লাগতো আড়াইহাজারের বড় বিনার চরের খাঁটি দানাদার আখের গুঁড়। দাদা ঐ গরুটা পালতেন খাঁটি দুধের আশায়। তিনি নিজে খাঁটি দুধ খেয়ে যেমন শান্তি পেতেন, আমাদের খাইয়েও তার যেন সুখের সীমা ছিলো না। সেই ৩৩/৩৪ বছর আগের কথা। হানিফ চাচা তখনই অশীতিপর বৃদ্ধ। গরু পালা ছাড়া তার আর কোনো কাজ করার ক্ষমতা ছিলো না।

চাচার একদিন শখ হলো বিমানে চড়ে যশোর যাবেন। তাও আবার নিজের টাকায়। বেতনের জমানো টাকা থেকেই চাচার শখ হলো মৃত্যুর আগে তিনি একবার বিমানে চড়বেন। শখের তোলা ৮০ টাকা বলে কথা। চাচার ইচ্ছায় বাধ সাধলো না কেউ। পরিবার থেকে সিদ্ধান্ত হলো, চাচা বিমানে যাবেন, সাথে আমার বাবাও যাবেন তার সাথে। চাচা আর বাবা যথা সময়ে বিমানে উঠে বসলেন। বাগড়া দিলেন চাচা। ‘এত্তবড় বাড়িডা আকাশে উঠবো কেমনে? পইরা যাইবনাতো?’ দুরুদুরু চাচার বুক। ভয়ের মাঝেই বিমান আকাশে উড়লো। বিমান বালা সবাইকে যথাসময় নাস্তা দিলেন। ধবধবে টিস্যুটাই চাচার বেশি পছন্দের মনে হলো। টিস্যু হাতে নিয়ে চাচা চুষতে লাগলেন। মজা পেলেন না। বাবা বুঝালেন এটা খাবার জিনিস নয়। লজ্জা পেলেন চাচা। কাচুমাচু করে মুখ ঘুরালেন। মিনিট ৩০ পরে তাদের নামতে হলো বিমান থেকে। সেখান থেকে সোজা গেলেন আমার পিতার কর্মস্থলে। সাথেই তার কোয়ার্টার। তিনি তখন পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা। সেখানে দু-চার দিন থাকার পর বাসে চড়ে হানিফ চাচা আবার নারায়ণগঞ্জের বাড়ি ফিরলেন। গরু নিয়ে ফের মেতে উঠলেন। বছর খানেক বিমানের এই গল্প করতে করতেই চাচার সময় কেটে যেতো। এরপরও যেন গল্পের শেষ নেই। এ স্মৃতি নিয়েই বছর না গড়াতেই চাচা আমার একদিন দুনিয়া ছাড়লেন। মরহুম চাচার শখটাকে আমি অসম্মান জানাতে চাই না। কারণ বিমানে চড়ার সখ ছাড়া তাকে আর কখনো কোনো কিছুতেই বাড়াবাড়ি করতে দেখিনি। তবে এ সমাজের অনেকেই আছেন, যারা সঙ্গতির সাথে চলতে চান না। আয় বুঝে ব্যয় করেন না। অন্যের সাথে পাল্লা দিতে গিয়ে নিজেকে নিঃশেষ করে দেন। হাতে কিছু টাকা থাকলে খরচের বিষয়ে লাগামহীন হয়ে পড়েন। এটা ঠিক নয়। ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে খরচের বিষয়ে লাগাম থাকা উচিত। তাই আমার দাদার মতো করে বলবো, ‘আয় বুঝে খরচ কর এবং সঞ্চয়ী হও’।

ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করতে হবে আপনাকেই। সময়ের সঠিক মূল্যায়ন করুন। আয় বুঝে ব্যয় কথাটা অনেক পুরানো হলেও ফেলনা নয়। তাই করুন, ভবিষ্যৎ ভালো হবে বলতে পারি। তবে আমার উল্টো আরেকটা সাজেশন হলো, সব সময় আয় বুঝে কিপটেমি করতে থাকলে আপনি একটা নির্দিষ্ট গ-ির মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যাবেন। তাই মাঝে মাঝে ব্যয় এবং আয় দুটোই বাড়ানোর চেষ্টা করুন। অপচয় অবশ্যই সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখুন। আয়ের উৎস একাধিক বাড়ান। মাঝে মাঝে ঝুঁকি নিন। কিন্তু নিজের সর্বস্ব বাজি রেখে ঝুঁকি নেয়া বোকামি। সব কাজের বিকল্প রাস্তা আগেই খুঁজে রাখুন। সঞ্চয় করার ক্ষেত্রে আগে খরচ করে তারপর বাকিটা সঞ্চয় না করে আগে প্রয়োজনীয় অংশটা সঞ্চয় করুন, তারপর বাদ বাকি খরচ করুন। যতোটা আয় করছেন তার সাথে হিসেব মিলিয়ে নিয়ে ব্যয়ের হিসাবটাও করে ফেলুন। কারণ আপনি হয়তো অন্যকে দেখে নিজের আয়ের চাইতে বেশি খরচ করে ফেললেন, কিন্তু এতে পরবর্তীতে আপনি নিজে যে অর্থ সঙ্কটে পড়বেন তা আপনার জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলবে। তাই জীবনকে সহজ রাখতে চাইলে ঠিকঠাক মতো হিসাব রাখুন। নিজের ওপর বিশ^াস রেখে, নিজের ভাগ্যের ওপর বিশ^াস রেখে এবং নিজের সৃষ্টিকর্তার প্রতি বিশ^াস রেখে তবেই কাজ করুন, দেখবেন মনে প্রশান্তি আসবে। আয় রোজগারও বাড়বে। ব্যয় করুন বুঝে-সুজে। আর তাতে জীবন হয়ে উঠবে খুব সহজ।

এ লিখাটা লিখতে গিয়ে দাদার কথা খুব মনে পড়ছে। দাদা ছিলেন আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু। ছোটবেলায় দাদার সাথে এক বিছনায় দিনের পর দিন ঘুমিয়েছি। মৃত্যুর দিনও ১২৩ বছর বয়সে তার হাতে লাঠি থাকলেও তাতে ভর করতে দেখিনি; বিনা চশমায় পত্রিকা আর কোরআন শরীফ এবং হাদিসের বই অনর্গল পড়তে পারতেন। একটু কিপটে স্বভাবের ছিলেন। মিতব্যয়ী আর কি। আগের দিনের মানুষ যেমন ছিলো ঠিক তেমন। দাদা পাটের ব্যবসা করতেন। জমিজিরাত ভালোই ছিলো; গিরস্থি ছিলো ভরপুর। তখনকার সময়ে বেশ টাকা-কড়ি কামাই করলেও খরচ করতেন খুব হিসেব করে। বিনা কারণে কাউকে একটা টাকা বেশি দিতেন না। সব জায়গায় দরদাম করতেন। ঘুরে ঘুরে সদাইপাতি কিনতেন। মাঝে মঝে আমি তাঁর সাথে নিকটস্থ রূপগঞ্জের রূপসী বাজারে বাজার করতে যেতাম। আসার সময় অনেক অনুরোধ করতাম রিকশা নেয়ার জন্য। দাদা নিতে চাইতেন না। বলতেন ‘জোরে জোরে হাঁট নাতি; ব্যায়াম হইবো।’ বলতেন- ‘ঠিক আছে, বাজারের ব্যাগটা না হয় আমারে দে’। আমি দিতে চাইতাম না। বড় ব্যাগটা হাতে ঝুলিয়ে হেঁটে হেঁটেই বাড়ি আসতাম। মিতব্যয়ী হলেও দাদা আমাদের পড়াশোনায় উৎসাহ দেয়ার জন্যে প্রচুর উপহার দিতেন। ভালো খাবার কিনতে তাকে কিপটেমি করতে দেখিনি কখনো। খাবার-দাবারের ব্যাপারে সচেতন ছিলেন। অতিথি আপ্যায়নে ছিলেন বেশ সচেতন। মানুষকে খাইয়ে মজা পেতেন। দাদার কাছে শিখেছি, স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে ভালো ভালো খাবার খেতে হবে। দাদাও খাবারের ব্যাপারে ছিলেন বেশ উদারহস্ত। দাদা আমার কাছে ছিলেন এক অসাধারণ মানুষ। খুব ধার্মিক ও সৎ লোক। পুরো এলাকার বিচারআচার করতেন। চেয়ারম্যান-মেম্বার না হলেও এলাকাবাসী তাকে বেশ সমীহ করতো। তিনি প্রায়ই বলতেন-‘অপচয় করবি না কখনো’। কখনো ভাত টেবিলে পড়লে কুড়িয়ে খেতে নির্দেশ দিতেন। বেশি খেতে মানা নেই, কিন্তু কখনও খাবার নষ্ট করতে দেখলে প্রচ- ক্ষেপে যেতেন। তিনি খুব বেশি শিক্ষিত না হলেও মাঝে সাজে দু-একটা ইংরেজি বেশ শুদ্ধভাবেই বলতেন। দাদা প্রায়ই ইংরেজিতে বলতেন, ‘কাট ইউর কোট একোর্ডিং টু ইউর ক্লথ’। তার কণ্ঠে ইরেজি শব্দ শুনতে বেশ ভালোই লাগতো। তখন এই ইংরেজির বাংলা বুঝলেও ভাবার্থ আমার মাথায় ঢুকত না। খুব ছোট ছিলামতো, তাই ভাবতাম দর্জিদের কাজ আমরা করতে যাব কেন? তাছাড়া শরীর মেপেইতো কোট বানাতে হবে, কাপড় অনুযায়ী কোট বানালে কি শরীরে আসবে? এখন বড় হয়েছি, দাদা কী বলতে চেয়েছেন তা বেশ বুঝি। ভাবি, দাদার মতো কি চলতে পারি? আমাদের মতো উড়নচ-িদের কথা চিন্তা করেই বোধহয় কোম্পানিগুলো ক্রেডিট কার্ড চালু করেছে। ‘খরচ আগে কর; পয়সা পরে দিলেও চলবে’। আমরাও খরচ করছি দেদার। ভবিষ্যতের কথা ভাবছি ক’জন? দাদা একটি যৌথ পরিবার চালিয়েছিলেন। বলা যায় তার চিন্তা-চেতনায় একটা পাড়া চলতো। আর আমরা এখন নিজেই চলতে হিমশিম খাই। বুঝি, যদি দাদার ঐ নীতিটা মানা যেত তাহলে ভালোই হত।

‘আয় বুঝে ব্যয় কর’-এই নীতি সে সময় আমাদের বাপ-দাদারা ঠিকই মেনে চলতেন; আমরা পারি না কেন? তখন তাঁরা ঋণও করতেন না খুব একটা। হিসেব করেই জীবন পার করে দিতেন। আমরা মোটেও তা পারি না। আমাদের রাষ্ট্রও কি আয় বুঝে ব্যয় করতে পারছে? রাষ্ট্রেরই তো মাথাপিছু অনেক দেনা। নতুন নতুন অভাব তৈরি হচ্ছে দিন দিন। লোন করা ছাড়াতো কিছুই সম্ভব নয়। ব্যবসা, উৎপাদন, সবকিছুতেই ঋণ আর ঋণ। ঋণ করা আমাদের যেন অভ্যাস হয়ে গেছে। এ স্বভাব বদলাতে হবে, নইলে আমাদের কপালে যেমন দুর্গতি আছে, রাষ্ট্রকেও পড়তে হবে মহা বিপাকে। এটা মোটেও সুখকর নয়।

লেখক : মীর আব্দুল আলীম, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও সমাজ গবেষক।

ব-সধরষ-হবংিংঃড়ৎবসরৎ@মসধরষ.পড়স

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়