চাঁদপুর, বুধবার, ৩০ নভেম্বর ২০২২, ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪  |   ২৫ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতি শিক্ষা স্বাস্থ্য সারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   সেতু নির্মাণ হলে ঢাকা -চাঁদপুর সদরের দূরত্ব কমবে ৫২ কিলোমিটার
  •   মেঘনায় ট্রলারের ধাক্কায় জেলে নিখোঁজ
  •   নৌ-ধর্মঘট প্রত্যাহার, সকাল থেকে লঞ্চ চলাচল শুরু
  •   মতলব উত্তরে আবারও সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৩
  •   কবরবাসী ইব্রাহিম এসএসসি‘তে পেয়েছে “এ“

প্রকাশ : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক

আশির দশকের প্রাথমিক শিক্ষা ও বিংশ শতাব্দীর প্রাথমিক শিক্ষার পার্থক্যটা লক্ষ্যণীয়। স্লেট-পেন্সিল, খড়িমাটি আমাদের সময়ে প্রাথমিক শিক্ষার প্রধান উপকরণ ছিলো! পাঠশালা বা স্কুল ছিলো জরাজীর্ণ। স্যারেরা সবাই লুঙ্গি পরে স্কুলে আসতেন, আমরাও সবাই (মেয়েরা) ফ্রক এবং (ছেলেরা) হাফপ্যান্ট পরে আর খালি পায়ে স্কুলে যেতাম। প্রচণ্ড গরম, অপ্রতুল ক্লাস রুমের কারণে স্কুলের মাঠে গাছের ছায়ায় পড়াতেন। স্যারদের ভয়ে তটস্থ হয়ে থাকতাম। স্যারেরা যখন আমাদের উপর বেশি রাগ হতেন তখন জোড় বেত নিয়ে এসে মারতেন। আমরা ম্যাডামদেরকে দিদিমণি ডাকতাম। প্রচণ্ড ভয় এবং শ্রদ্ধা করতাম পন্ডিত স্যার আর হেডস্যারকে। স্কুলে যাওয়ার পথ ছিলো বেশির ভাগ মাটির এবং অধিকাংশ রাস্তায় ছিলো ভাংতি, সেখানে বর্ষার সময় হাঁটু বা কোমর সমান পানি থাকতো। আব্বা কাঁধে করে ভাংতি পার করে দিতেন। অনেক সময় বর্ষায় নৌকায় করে অনেকে মিলে স্কুলে আসা-যাওয়া করতে হতো। মাঝে মধ্যে নৌকায় স্কুলে যাওয়ার সময় বৃষ্টি চলে আসলে নুরু কাকা উনার নৌকায় থাকা পাথলা (পাতা এবং বাঁশ দিয়ে তৈরি এক ধরনের ছাতা) আমার মাথায় দিয়ে দিতেন। স্কুল জীবনে বান্ধবী ছিল আছিয়া, পুতুল, মাজেদা। ছেলে বন্ধু তো থাকার প্রশ্নই আসে না। সে সময় স্কুলে যাবার পূর্বে আম্মা মাথায় খুব বেশি করে সরিষার তেল দিয়ে বেণী বেঁধে দিতেন। স্কুলে যাবার কোনো স্কুল ব্যাগ ছিল না। পলিথিনে করে বই নিয়ে আসতাম, বৃষ্টি হলে মাঝে মাঝে নিজের গায়ের জামার ভিতরে বই রেখে বাড়ি আসতাম। হেডস্যার যদি কোনোভাবে জানত টিও স্যার আসবেন, তখন আমাদেরকে দিয়ে স্কুলের মাঠ পরিষ্কার করাতেন। বিভিন্ন জাতীয় দিবসগুলোতে স্কুল বন্ধ থাকতো। অনেক সময় বলতেই পারতাম না স্কুল বন্ধ থাকার সঠিক কারণ। তার কারণে দিবসগুলোর তাৎপর্য সম্পর্কে আমরা (ছাত্র/ছাত্রীরা) বলতেই পারতাম না।

আমাদের সময় স্কুলে কোনো টয়লেট ছিল না। বাড়ি থেকে টয়লেটের কাজ সেরে যেতে হতো। এবার আসি স্কুলের পড়ালেখা নিয়ে আমাদের বাল্যশিক্ষা ও আদর্শলিপি নামের বই। সেখানে থাকতো বাংলা ভাষা লেখা-পড়া শিক্ষার যাবতীয় পাঠ। শিখতে হতো শতকিয়া বা নামতা ইত্যাদি। তারপর দ্বিতীয় শ্রেণী, তৃতীয় শ্রেণী করে ধাপে ধাপে এক একটি শ্রেণী। স্কুলে পণ্ডিত মশাই, মৌলভী সাহেবের ভয়ে আমরা ছিলাম সব সময় তটস্থ। মোটের উপর স্কুলের শিক্ষকেরা থাকতেন আমাদের কাছে বাঘের চেয়ে ভয়ঙ্কর!

স্কুল-পাঠশালায় শিক্ষাসামগ্রীর মধ্যে লিকলিকে বেত ছিলো একটি বিশেষ উপাদান। তার সাথে কান ধরে বেঞ্চের ওপর দাঁড়িয়ে থাকার মতো শাস্তি, কাট্টা চেঙ্গি, কপালে চাড়া দিয়ে সূর্যের দিকে মুখ করে তাকিয়ে থাকার মতো শাস্তি ছিলো। পড়া না শিখলে শাস্তি ছিলো অবধারিত। শাস্তির ভয়ে অনেক সময় ভয়ে মাঝে মধ্যে স্কুল পালাতাম। তারপরও পড়ার মধ্যে একটি আনন্দ কাজ করতো। বছরের প্রথম দিকে ৩টি নতুন বই ও ৩টি পুরাতন বই দেয়া হতো নতুন উত্তীর্ণ শ্রেণিতে। নতুন বই পেয়ে রাতে লজিং স্যারের কাছে কুপি বা হারিকেনের আলো দিয়ে পড়তাম। শীতের সকালে বাড়ির উঠোনে চাটাই বিছিয়ে কবিতা মুখস্থ করতাম। প্রতিযোগিতা ছিলো নতুন বইয়ের প্রথম থেকে কে কত পৃষ্ঠা পড়তে পেরেছি।

এখন তো পরিস্থিতি বদলে গেছে। প্রাচীন সেই শিক্ষা ব্যবস্থা বা পদ্ধতি কিছুই নেই।

এখনকার শিশুরা আনন্দ-উৎসাহের মধ্যে শিক্ষা জীবন শুরু করে। আধুনিক পদ্ধতিতে শিক্ষালাভ করে। শিশুদের মেধা-বুদ্ধিবৃত্তির অকল্পনীয় উন্নতি হয়েছে। তারা কম্পিউটার জগতে প্রবেশ করেছে। স্কুল তাদের কাছে আনন্দ ও মানসিক তুষ্টির ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারা শিশুদের কাছে এখন বন্ধুর মতো হয়ে গেছে।

স্কুলে বড় বড় বিল্ডিং হয়েছে। দুই তলা, তিনতলা বিল্ডিং প্রায় সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রয়েছে। রয়েছে বিভিন্ন শিক্ষার উপকরণ, খেলার সামগ্রী, বিনোদনের সকল ব্যবস্থা, রং-বেরঙের লিখনী। উচ্চ শিক্ষিত স্যার, ম্যাডাম সবাই শার্ট প্যান্ট, দামী শাড়ি, থ্রি-পিচ, বোরখা পরে স্কুল আসে, সকল ছাত্র/ছাত্রী ইউনিফর্ম পরে স্কুলে আসে। কম্পিউটার, প্রজেক্টর দিয়ে পড়াশোনা করানো হয়, বাচ্চারা দামী দামী স্কুল ব্যাগ ব্যবহার করে। বর্তমানে শিশুদের স্কুল ব্যাগ, জামা, জুতা কেনার জন্য সরকার অর্থপ্রদান করে থাকে। সেই সাথে শিক্ষা উপকরণ (বই, খাতা, কলম, পেন্সিল) কেনার জন্য শতভাগ শিক্ষার্থীদের প্রতি মাসে উপবৃত্তির অর্থ দিয়ে থাকে। এখনকার শিশুরা প্রাইভেট গাড়ি, মোটর বাইক, স্কুল ভ্যান দিয়ে স্কুলে আসা-যাওয়া করে। বছরের প্রথম দিন ‘বই উৎসব’ পালনের মধ্য দিয়ে শিশুদের হাতে তুলে দেওয়া হয় পরিচ্ছন্ন, চকচকে মলাটের নতুন বই।

বর্তমানে বিদ্যালয়গুলোতে জাতীয় দিবস উদ্‌যাপিত হয়। যথাযোগ্য মর্যাদায় ভাবগাম্ভীর্যের সাথে র‌্যালি, আলোচনা সভা, মিলাদ, মিষ্টি বিতরণ, কেক কাটা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পুরস্কার বিতরণের মধ্য দিয়ে উদ্‌যাপিত হয়।

সব মিলিয়ে বর্তমান প্রাথমিক শিক্ষায় এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। ডিজিটাল কনটেন্ট, বাস্তব উপকরণ, চারু ও কারুকাজ, সংগীত, পরিবেশের বিভিন্ন উপাদান ও দিক নিয়ে সরাসরি পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, গণিত অলিম্পিয়াড কৌশল প্রয়োগে ‘আনন্দে গণিত শিখি’ শিশুদের গণিত ভীতি দূরীকরণে, সমস্যা সমাধান ইত্যাদি প্রক্রিয়ায় যুগোপযোগী ও বাস্তব সম্মত শিক্ষা পদ্ধতি আমাদের প্রজন্মকে উন্মুক্ত মেধা বিকাশে সহায়তা করছে।

আমাদের সময় লেখাপড়া ছিল মুখস্থ ও পাঠ নির্ভর। বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষাকে আরও যুগোপযোগী করার জন্য বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ‘শেখ হাসিনা’ নিয়েছে নানামুখী পদক্ষেপ।

‘জয় হোক প্রধানমন্ত্রীর, জয় হোক প্রাথমিক শিক্ষার’।

লেখক পরিচিতি : হালেমা খাতুন, প্রধান শিক্ষক, ১৪৪নং নারায়ণপুর উত্তর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বিএসসি (সম্মান), এমএসসি (উদ্ভিদ বিজ্ঞান), সরকারি তিতুমীর কলেজ, ঢাকা।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়