রবিবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২১, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৮  |   ২৩ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতি শিক্ষা স্বাস্থ্য সারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   হাজীগঞ্জে ৪৩তম জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলার উদ্ধোধন
  •   কচুয়ায় কলেজ ছাত্রীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার
  •   স্বাক্ষর জাল করে আওয়ামীলীগের তৃণমূলের প্রার্থী তালিকা পরিবর্তনের অভিযোগ
  •   বিএনপির মানিক-শাহীন দুই গ্রুপের সাথে যুগ্ম মহাসচিবের সভা
  •   কচুয়ায় বিপুল পরিমাণ গাঁজাসহ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার

প্রকাশ : ০১ নভেম্বর ২০২১, ০০:০০

১ নভেম্বর বিচার বিভাগের স্বাধীনতা দিবস

অ্যাডভোকেট ফায়জানুল হক রিজন

১ নভেম্বর বিচার বিভাগের স্বাধীনতা দিবস
অনলাইন ডেস্ক

আজ বিচার বিভাগের স্বাধীনতা দিবস! অনেকেই আশ্চর্য হবেন এ শিরোনাম দেখে, বিচার বিভাগ আবার কবে স্বাধীন হলো। ‘বিচার বিভাগ স্বাধীন কিংবা বিচার বিভাগ স্বাধীন হয়েছে’ এ কথাটা অধিকাংশ মানুষই মানতে চান না। এর দায়ভার শুধুমাত্র রাষ্ট্রের না, আমাদেরও।

আমরা মানি কিংবা না মানি, আজ সত্যিই বিচার বিভাগের স্বাধীনতা দিবস। এদিনে প্রকৃত অর্থে রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ হতে বিচার বিভাগ পৃথকতা অর্জন করে। এ পৃথক হওয়ার মাধ্যমে আসলে কী হলো, আগে কী ছিলো আর এখন কী হচ্ছে, একজন নাগরিক হিসেবে এটা জানা আমাদের জন্যে জরুরি।

স্বাধীনতা বড় কঠিন জিনিস। মুক্তিকামী মানুষেরাই সবচেয়ে ভালো জানেন এই স্বাধীনতা কত বেশি প্রয়োজন আর তা অর্জন না হওয়া পর্যন্ত কীরূপ অবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। বহুল প্রচলিত একটি কথা আছে, ‘স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে রক্ষা করা কঠিন’। স্বাধীনতা অর্জনের পর যদি সেই স্বাধীনতা রক্ষা করতে না পারা যায়, কিংবা এর সুফল ভোগ করা না যায় তাহলে এর যে কী যন্ত্রণা তা বাংলাদেশের মানুষের চাইতে ভালো আর কে জানতে পারে? মুক্তির নেশায় আমরা ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন করেছি সুখে থাকবো বলে। কিন্তু সুখ তো পেলাম না। তাই কিছুদিনের মধ্যেই আবার ঝাঁপিয়ে পড়তে হলো পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলনে। সৃষ্টি হলো স্বপ্নের দেশ প্রিয় ‘বাংলাদেশ’।

কিন্তু কী হলো! এই সুখের বাংলাদেশে আজ ৫০ বছর পরেও আমরা স্বাধীনতার কথা বলি। এতো সহজ স্বাধীনতা? এতো সহজ স্বাধীনতার সুখ ভোগ করা? বিচার বিভাগ তো স্বাধীন হলো এই সেদিন অর্থাৎ ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর।

যে কোনো কিছুর পরিবর্তন সহজ, যে কোনো উপায়ে সেটি অর্জন করাও সম্ভব। কিন্তু সেটিকে প্রতিষ্ঠিত করে বাস্তব রূপ দান করা এর চেয়ে বহু কঠিন কাজ। যে কোনো স্বাধীনতাকে বাস্তব রূপ দেয়ার জন্যে সবার আগে সমাজকে তার গোড়া থেকে পরিবর্তন হতে হয়। দায়িত্ব শুধু একপক্ষের নয়। এই যে গোড়ার পরিবর্তন, এটি একটি সামাজিক দীর্ঘ প্রক্রিয়া, ধারাবাহিকতা। কিন্তু এই সামাজিক পরিবর্তনের কাজ আমাদের দেশে হয়নি, বরং আমরা রূপান্তর হচ্ছি কট্টরতা আর ভোগবাদিতার দিকে।

বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করার রিট মামলায় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ থেকে চূড়ান্ত রায় হয়েছিলো ১৯৯৯ সালে। ১৯৯৪ সালে সেই মামলাটি করেছিলেন জেলা জজ ও জুডিশিয়াল অ্যাসোসিয়েশনের তৎকালীন মহাসচিব মাসদার হোসেন। ১২ দফা নির্দেশনা সম্বলিত ওই রায়ের আট বছর পর অর্থাৎ ২০০৭ সালে মূল নির্দেশনাটি বাস্তবায়ন করে বিচার বিভাগকে আলাদা করা হয়েছিলো।

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় স্বাধীন বিচারব্যবস্থার গোড়াপত্তন ঘটে মূলত এই মাসদার হেসেন মামলার রায়ের আলোকে। মাসদার হোসেন মামলার পূর্ব পর্যন্ত বাংলাদেশের সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রের নির্বাহী অঙ্গসমূহ থেকে বিচার বিভাগ পৃথক করার জন্যে রাষ্ট্রের ওপর দায়িত্ব অর্পণ করার কথা থাকলেও বাস্তবে সেটি দেখা যায়নি।

আইয়ুব খান তার স্মৃতিকথা ‘ফ্রেন্ডস্ নট মাস্টার্স’-এ লিখেছেন, নির্বাহী বিভাগ ও আইনসভা সংবিধানের বিধানাবলির আওতায় কাজ করছে, এটা নিশ্চিত করতে একটি স্বাধীন বিচার বিভাগের প্রয়োজন।

স্বনামধন্য ফরাসি প-িত মন্টেস্কু তাঁর ‘দ্য স্পিরিট অব দ্য লজ’ গ্রন্থে বলেছেন, অভিজ্ঞতা আমাদের অনবরত দেখাচ্ছে যে, প্রত্যেক ব্যক্তি, যাঁর হাতে ক্ষমতা রয়েছে, তিনি তা সুকৌশলে অপব্যবহার করে চলেন এবং তাঁকে রুখে না দেয়া পর্যন্ত তিনি তাঁর কর্তৃত্বপরায়ণতা বজায় রেখে চলেন। একটি সভ্য গণতান্ত্রিক দেশে এখানে রাশ টানতে পারেন বিচারকেরা। কারণ ন্যায়সংগত বিচার নিশ্চিত করার দায়িত্ব তাঁদেরই। সে কারণে বিচারকের স্বাধীনতা দরকার এবং এর সঙ্গে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। সুতরাং বর্তমান যুগে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার জন্য বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কোনো বিকল্প নেই।

আপীল বিভাগের সাবেক বিচারপতি আমিরুল কবির চৌধুরী লিখেছেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে সংজ্ঞায়িত করা বা এটা বলতে কী বোঝায় তা সংক্ষেপে বোঝানো কঠিন। এর আক্ষরিক অর্থ হলো নির্বাহী বিভাগের হস্তক্ষেপসহ বাইরের যে কোনো নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব থেকে তার স্বাধীনতাকে সুরক্ষা দেয়া। সে কারণেই সংবিধানে ক্ষমতার পৃথকীকরণ স্বীকৃত। বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতার মৌলিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বিচারকের কর্মমেয়াদ, বিচারকের আর্থিক এবং প্রশাসনিক নিরাপত্তা।

তিনি আরো লিখেছেন, এটা উল্লেখ করা যেতে পারে যে, বিচারলাভের আকাক্সক্ষা মানবসভ্যতার মতোই প্রাচীন। কিন্তু বিচার কেবল আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত আদালতই দিতে পারে। আর ন্যায়সংগত বিচার পেতে হলে আদালতব্যবস্থা অর্থাৎ বিচার বিভাগকে অবশ্যই হতে হবে নিরপেক্ষ, স্বাধীন এবং সাংবিধানিক কর্তৃত্ব দ্বারা কার্যকর। বিচার বিভাগকে অবশ্যই উচ্চ মানসম্পন্ন, সাহসী, প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, একাগ্রচিত্ত স্বাধীন এবং পক্ষপাতমুক্ত মনের মানুষ দ্বারা সংগঠিত করতে হবে।

কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, মাসদার হোসেন মামলার রায়ের পরেও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের পদ চিরতরে বিলুপ্ত হয়নি। তাই আইন বিশেষজ্ঞরা বলে থাকেন, ভ্রাম্যমাণ আদালত আইন তেমনই একটি আইন, ‘যেখানে দ্রুত সমাধান দেয়ার কথা বলে বিচার বিভাগের ওপর শাসন বিভাগের হস্তক্ষেপ জারি রাখা হয়েছে।’

তবে এই প্রসঙ্গে প্রয়াত সাংবাদিক ও সংবিধান গবেষক মিজানুর রহমান খান একটা প্রস্তাব রেখেছিলেন, তিনি বলেছিলেন, ‘যতোদিন মোবাইল কোর্ট আইনের আওতায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা অনধিক দুই বছর কারাদ- দেয়ার মতো বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন, ততোদিন তাঁদের চাকরি প্রেষণে সুপ্রিম কোর্টের কাছে ন্যাস্ত থাকবে বলে গণ্য করার বিধান চালু করা যেতে পারে।’

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের দিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা ও বিচারকাজ পরিচালনার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে করা তিনটি রিট আবেদনে বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি আশীষ রঞ্জন দাসের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০১৭ সালের ১১ মে বৃহস্পতিবার, একটি রায় ঘোষণা করেছিলেন।

রায়ে বলেছেন, ভ্রাম্যমাণ আদালত আইনের বিধানের মাধ্যমে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং জেলা ম্যাজিস্ট্রেটদের বিচারিক ক্ষমতা দেয়া সংবিধানের লঙ্ঘন এবং তা বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় সম্মুখ আঘাত এবং ক্ষমতার পৃথক করণের নীতিবিরোধী। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং জেলা ম্যাজিস্ট্রেটসহ বাংলাদেশ কর্মকমিশনের সব সদস্য (প্রশাসন) প্রশাসনিক নির্বাহী। প্রশাসনিক নির্বাহী হিসেবে তারা প্রজাতন্ত্রের সার্বভৌম বিচারিক ক্ষমতা চর্চা করতে পারেন না, কেননা মাসদার হোসেন মামলায় রায়ে এ বিষয়ে পরিষ্কারভাবে বলা আছে। আরও বলা হয়, ভ্রাম্যমাণ আদালত আইনের ৫, ৬ (১), ৬ (২), ৬ (৪), ৭, ৮ (১), ৯, ১০,১১ ও ১৩ ধারা ‘কালারেবল প্রবিশন’। ধারাগুলো সরাসরি মাসদার হোসেন মামলার রায়ের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

আরো একটি পরিতাপের বিষয় হলো, বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় গঠন না হওয়া। এটি স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অন্যতম বড় বাধা। আইনজ্ঞরা বলছেন, বিচার বিভাগ পৃথক হলেও এখনও আইন মন্ত্রণালয় ও সরকারের মুখাপেক্ষী হতে হয়। কারণ বিচারকদের পদোন্নতি, বদলি, পদায়নের বিষয়গুলোতে আইন মন্ত্রণালয়ই প্রাধান্য পাচ্ছে বলেও মনে করা হয়। সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে বিচার বিভাগের জন্য সচিবালয় নির্মাণের উদ্দেশ্যে জায়গা নির্ধারণ করা হলেও পরবর্তীতে সেটি আর এগোয়নি।

ভারতীয় বিচারপতি কৃষ্ণা আয়ার বলেছেন, “স্বাধীন বিচার বিভাগ ছাড়া গণতন্ত্র দাসত্বে পরিণত হতে পারে।” গণতন্ত্রের লালন ও তাকে নিরাপত্তা দিতে বিচারকের স্বাধীনতার বিকল্প কিছু নেই।

সমাজ মুক্তির জন্য চাই স্বাধীন বিচার বিভাগ। ব্রিটেনের সাবেক আইনমন্ত্রী বলেছিলেন, বিচারকেরা আমাদের গণতান্ত্রিক সমাজের খুঁটি। তাঁদের অভিজ্ঞতা ব্রিটেনে শত শত কোটি পাউন্ডের ব্যবসা ডেকে আনে। আর তাঁদের ছাড়া জনগণ বিচার পেতে পারে না।

বিচার বিভাগ পৃথক করণ দিবস উপলক্ষে আমার এই লেখা বঙ্গবন্ধুর একটি উক্তি দিয়ে শেষ করতে চাই, তিনি বলেছিলেন, “আমি হাইকোর্ট ও অধস্তন আদালতগুলো যাতে কাজ করতে পারে তা নিশ্চিত করার জন্য আশু পদক্ষেপ গ্রহণ করব। আমি এ ব্যাপারে সুনিশ্চিত করতে চাই যে, দুর্নীতি ও কালক্ষেপণ উচ্ছেদ করার প্রেক্ষিতে বিচার ব্যবস্থার কতকগুলো মৌলিক ত্রুটি সংশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। প্রশাসন বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের নীতি সূক্ষ্মভাবে পর্যালোচনা করা হবে।”

লেখক : faijanollegalwork@gmail.com

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়