চাঁদপুর, শুক্রবার, ১ জুলাই ২০২২, ১৭ আষাঢ় ১৪২৯, ১ জিলহজ ১৪৪৩  |   ২৮ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতি শিক্ষা স্বাস্থ্য সারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   কচুয়ায় অগ্নিকাণ্ডে বসতঘর পুড়ে ছাই
  •   বাংলাদেশে ঈদুল আজহা ১০ জুলাই
  •   ডাকাত সন্দেহে কোস্টগার্ডের হামলায় নিখোঁজ ১ : আহত ২
  •   হাজীগঞ্জে নবজাতকের লাশ উদ্ধার
  •   অধ্যাপক    কামরুজ্জামান সাহেবের স্মরণ সভা  ও মিলাদ

প্রকাশ : ২০ মে ২০২২, ০০:০০

আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীর চির বিদায়
রাসেল হাসান ॥

একুশের প্রভাতফেরির সাড়া জাগানো কালজয়ী গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী/আমি কী ভুলিতে পারি...’-এর রচয়িতা, প্রখ্যাত ভাষাসৈনিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ১৯ মে বৃহস্পতিবার সকালে মৃত্যুবরণ করেছেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিলো ৮৮ বছর।

১৯ মে যুক্তরাজ্যের লন্ডনের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয় বলে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের হাই কমিশনার সাঈদা মুনা তাসনিম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

সাঈদা মুনা তাসনিম বলেন, ‘গত কিছুদিন ধরে গাফফার চৌধুরী হাসপাতালে ছিলেন। আজ (১৯ মে) সকাল ৭টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে তাঁর মেয়ে আমাকে জানিয়েছেন। আমরা গভীরভাবে শোকাহত।’

বাঙালির কাছে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী এক সুপরিচিত নাম। ১৯৫২ সালে তিনি কালজয়ী একুশের গানটি লেখা ছাড়াও লিখে গেছেন অনবদ্য কিছু লেখনী।

গাফ্ফার চৌধুরী শহীদ রফিকের মরদেহ দেখেছিলেন। পুলিশের গুলিতে রফিকের মাথার খুলি উড়ে গিয়েছিল। ৫২’র ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহীদ তিনি। কী দেখেছিলেন সেদিন? সেসময় ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী গাফ্ফার চৌধুরী বলেছিলেন, ‘আমি আরো দু’জন বন্ধু নিয়ে গিয়েছিলাম ঢাকা মেডিকেল কলেজের আউটডোর কক্ষে। সেখানে বারান্দায় শহীদ রফিকের লাশ ছিলো। মাথার খুলিটা উড়ে গেছে। অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম তখন ছাত্র। তিনি তার ক্যামেরায় রফিকের ছবি তোলেন।’

রফিকের মরদেহ দেখে গাফ্ফার চৌধুরীর মনে হয়েছিল, যেন তার নিজের ভাইয়ের লাশ পড়ে আছে। তখনই তার মনে গুনগুনিয়ে ওঠে একটি কবিতা, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’। সেই কবিতা পরবর্তীতে গানে রূপ নেয়। অনবদ্য এই কবিতায় প্রথমে আব্দুল লতিফ সুর দেন। তারপরে আলতাফ মাহমুদ সুর দেন। আলতাফ মাহমুদের সুরেই গানটি প্রভাতফেরির গানরূপে গৃহীত হয়।

২১শে ফেব্রুয়ারির সেই ঘটনায় বাঙালি বুঝতে পেরেছিল, তারা আসল স্বাধীনতা পায়নি। তাই ভাষার স্বাধীনতা তথা রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি তখন ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। গাফ্ফার চৌধুরীর কথায়, ফেব্রুয়ারিতে রক্তপাতের পরে এটা শিক্ষিত-অশিক্ষিত সাধারণ মানুষের আন্দোলন হয়ে দাঁড়ায়। যার প্রতিধ্বনি শোনা যায় আব্দুল লতিফের গানে, ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়্যা নিতে চায়।’

তিনি বলেছিলেন, ‘এই চেতনা বা বোধটুকু সাধারণ মানুষের মধ্যেও এসেছিল যে, আমার বাপ-দাদা’র জবান ওরা কাইড়্যা নিতে চায়। সুতরাং আন্দোলনটা তখন আর কোনো এক শ্রেণির মধ্যে সীমিত ছিল না। বাঙালি মাত্রই এই ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে একটা সেক্যুলার জাতীয়তার চেতনায় উন্নীত হয়।’

বিশিষ্ট সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও কলামিস্ট আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী বরিশাল জেলার এক জলবেষ্টিত গ্রাম উলানিয়ার চৌধুরী বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা হাজি ওয়াহিদ রেজা চৌধুরী ও মা মোসাম্মৎ জহুরা খাতুন। তিন ভাই, পাঁচ বোনের মধ্যে বড় ভাই হোসেন রেজা চৌধুরী ও ছোট ভাই আলী রেজা চৌধুরী। বোনেরা হলেন মানিক বিবি, লাইলী খাতুন, সালেহা খাতুন, ফজিলা বেগম ও মাসুমা বেগম।

ছাত্রজীবনে লেখালেখিতে হাতেখড়ি হয়েছিল তাঁর। ১৯৪৯ সালে মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন সম্পাদিত মাসিক সওগাত পত্রিকায় তাঁর গল্প প্রকাশিত হয়। ১৯৫২ সালে সাময়িকপত্রে প্রকাশিত হয় প্রথম উপন্যাস ‘চন্দ্রদ্বীপের উপাখ্যান’।

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর সাংবাদিকতায় হাতেখড়িও ছাত্রজীবনে। ঢাকা কলেজের ছাত্র থাকাকালে যোগ দেন দৈনিক ইনসাফ পত্রিকায়। ১৯৫১ সালে যোগ দেন খায়রুল কবীর সম্পাদিত দৈনিক সংবাদের বার্তা বিভাগে। ১৯৫৬ সালে যোগ দেন তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া সম্পাদিত দৈনিক ইত্তেফাকে।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী কলমযোদ্ধার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। জয় বাংলা পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে মডারেটরের ভূমিকাও পালন করেন। স্বাধীনতার পর ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক জনপদের প্রধান সম্পাদক ছিলেন আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী।

তিনি ১৯৭৪ সালের অক্টোবর মাসে লন্ডনে পাড়ি জমান। ১৯৭৬ সালে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী সেখানে ‘বাংলার ডাক’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন। ‘সাপ্তাহিক জাগরণ’ পত্রিকায়ও কিছুদিন কাজ করেন। পরে তিনি ‘নতুন দিন’ ও ‘পূর্বদেশ’ পত্রিকা বের করেন। প্রবাসে থাকলেও গাফ্ফার চৌধুরী আমৃত্যু বাংলাদেশের প্রধান প্রধান সংবাদ মাধ্যমে নিয়মিত লিখে গেছেন। এছাড়া ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন নানা সভা-সেমিনারে।

সাংবাদিকতার পাশাপাশি গল্প, উপন্যাস, স্মৃতিকথা, ছোটদের উপন্যাসও লিখেছেন তিনি। ‘চন্দ্রদ্বীপের উপাখ্যান’, ‘সম্রাটের ছবি’, ‘ধীরে বহে বুড়িগঙ্গা’, ‘বাঙালি না বাংলাদেশি’সহ তার প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা প্রায় ৩০। এছাড়া তিনি কয়েকটি পূর্ণাঙ্গ নাটক লিখেছেন। এর মধ্যে রয়েছে ‘একজন তাহমিনা’, ‘রক্তাক্ত আগস্ট’ ও ‘পলাশী থেকে বাংলাদেশ’।

নিজের লেখা রাজনৈতিক উপন্যাস ‘পলাশী থেকে ধানমন্ডি’ অবলম্বনে ২০০৭ সালে একটি টেলিভিশন চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন গাফ্ফার চৌধুরী। বঙ্গবন্ধুর মেয়ে শেখ হাসিনাকে নিয়ে তিনি নির্মাণ করেছেন ‘দুর্গম পথের যাত্রী’।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনী অবলম্বনে ‘দ্য পোয়েট অব পলিটিক্স’ নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন গাফ্ফার চৌধুরী। কিন্তু পরে তা আর এগোয়নি।

সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ইউনেস্কো পুরস্কার, বঙ্গবন্ধু পুরস্কার, মানিক মিয়া পদকসহ বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন গাফ্ফার চৌধুরী। বাংলাদেশ সরকার তাঁকে একুশে পদক ও স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করেছে।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়