বৃহস্পতিবার, ০৯ ডিসেম্বর, ২০২১  |   ২৪ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতি শিক্ষা স্বাস্থ্য সারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   সারাদেশে করোনায় ৬ জনের মৃত্যু,শনাক্ত ২৭৭ জন
  •   দলীয় নির্দেশ অমান্য করে নির্বাচনী মাঠে বিএনপি : আওয়ামীলীগে বিদ্রোহী একাধিক প্রার্থী
  •   ভোটের আগেই বিজয়ী ৫ সদস্য
  •   চাঁদপুরে মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধের বিজয়মেলার উদ্বোধন
  •   আবরার হত্যায় ২০ জনের মৃত্যুদণ্ড ও ৫ জনের যাবজ্জীবন কারাদন্ড

প্রকাশ : ২০ অক্টোবর ২০২১, ০০:০০

চাঁদপুরে প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারদের দুই-তৃতীয়াংশ বছরের পর বছর একই কর্মস্থলে
মির্জা জাকির ॥

চাঁদপুর জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বিভাগে আট উপজেলায় আটজন শিক্ষা অফিসার রয়েছেন। এসব উপজেলায় ৫২ জন সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসারের স্থলে বর্তমানে কর্মরত আছেন ২৭ জন। এখনো শূন্য পদ রয়েছে ২৫টি। এই অর্ধেক সংখ্যক বিভিন্ন উপজেলা ও সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারদের বছরের পর বছর একই কর্মস্থলে চাকুরির কারণে অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছে। নিয়মানুসারে তিন বছর পর পর বদলি বা কর্মস্থল পরিবর্তনের কথা থাকলেও অজ্ঞাত কারণে এ জেলায় তা হচ্ছে না। কারণ হিসেবে জানা গেছে, উপজেলা শিক্ষা অফিসার ও সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসাররা অনৈতিক সুবিধা ভোগ করার জন্যেই মূলত একই কর্মস্থলে অবস্থান করছেন বছরের পর বছর।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সদর উপজেলার শিক্ষা অফিসার নাজমা বেগম অদৃশ্য ক্ষমতাবলে প্রায় আট বছর একই কর্মস্থলে রয়েছেন। তার সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসাররা মাঝে মাঝে বদলি হলেও তিনি বদলি হচ্ছেন না। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্র বলছে, কোনো কোনো উপজেলায় আবার সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার (চলতি দায়িত্ব) শিক্ষা অফিসারের দায়িত্ব পালন করছেন অতিরিক্ত হিসেবে। ওইসব অফিসাররা ৩-৪ বছরের অধিক সময় ধরে চলতি দায়িত্ব পালন করলেও পদকে স্থায়ী করা কিংবা বদলি হচ্ছেন না। ফরিদগঞ্জের শিক্ষা অফিসারের চলতি দায়িত্বে চার বছরের বেশি সময় আছেন সহকারী শিক্ষা অফিসার মনির হোসেন।

এদিকে দেখা যাচ্ছে সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তাদের অনেকের সাথে রয়েছে কতিপয় শিক্ষক নেতার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। এসব কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ে গিয়ে নানা ছলছুতোয় অন্য শিক্ষকের ওপর খড়গহস্ত হলেও ওইসব শিক্ষক নেতারা অনুপস্থিত কিংবা দেরি করে বিদ্যালয়ে এলেও সখ্যতার কারণে তাদের কিছুই হয় না। আবার কোনো কোনো উপজেলায় সহকারী শিক্ষা অফিসারের স্ত্রীও একই উপজেলায় শিক্ষকতা করছেন।

কেনো তারা একই কর্মস্থলে বছরের পর বছর অবস্থান করছেন জানতে চাইলে নাম না প্রকাশের শর্তে প্রাথমিকের এক শিক্ষক নেতা জানান, মূলত বদলিবাণিজ্য করে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়ার জন্যেই তারা একই কর্মস্থলে অবস্থান করেন দীর্ঘদিন। এমন দুর্নীতির সাথে সরাসরি মধ্যস্বত্বভোগী হিসেবে কতিপয় শিক্ষক নেতা কাজ করে আসছেন বলে জানান।

বেশ ক’জন প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রতি বছর প্রাথমিকে জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত শিক্ষক বদলি হয়। একটি বদলি হয় সমন্বয় বদলি। আরেকটি হয় প্রার্থীর চাহিদার বিপরীতে শূন্যপদে বদলি। তখনি শিক্ষা অফিসসহ সংশ্লিষ্ট মধ্যস্বত্ব চক্রটি অনৈতিকভাবে বদলিবাণিজ্যে তৎপর হয়ে ওঠেন।

এই সময়ে শিক্ষক নেতাদের ঢাল বানিয়ে শিক্ষা অফিসাররা নিরীহ শিক্ষকদের ভয়-ভীতি দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা বদলি বাণিজ্যের মিশনে নামেন। সমন্বয় বদলিতে সিনিয়র শিক্ষকদের নব্য জাতীয়করণকৃত রেজিস্টার্ড বিদ্যালয়ের নিয়ম থাকলেও তা মানা হচ্ছে না জেলার কোথায়ও। জানা যায়, সিনিয়র শিক্ষকদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করে জুনিয়র শিক্ষকদের বদলি করে কাগজে-কলমে সমন্বয় দেখানোরও অভিযোগ রয়েছে শিক্ষা অফিসগুলোর বিরুদ্ধে।

এতে করে সিনিয়র শিক্ষকরা একই কর্মস্থলে যুগের পর যুগ শিক্ষকতা করে আসছেন। ফলে প্রাথমিক শিক্ষার অর্জিত মানসম্পন্ন শিক্ষা বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছেন সিনিয়র শিক্ষকরা। পাশাপাশি তারা ক্লাস ও কর্মস্থল ফাঁকির মতো কর্মকা- চালিয়ে যান হরহামেশাই।

শূন্যপদের বিপরীতে নিয়মিত বদলিতে সিনিয়র প্রার্থীর পদায়নের নিয়ম থাকলেও তা কেবল কাগজে-কলমেই থাকছে। প্রাথমিকে নারী শিক্ষক বেশি হওয়ায় বাণিজ্যের সুযোগও বেশি নেয় শিক্ষা অফিস ও শিক্ষক নেতারা। এখানে বদলিতে কোন্ শিক্ষক কত টাকা বেশি দিয়ে বদলি হতে পারবেন তা-ই দেখে শিক্ষা অফিস।

জানা গেছে, কেবল শিক্ষকদের বদলি বাণিজ্য নয়, স্কুল প্রতি বরাদ্দকৃত ক্ষুদ্র মেরামত, স্লিপ বরাদ্দ, ভবন নির্মাণসহ বরাদ্দের সবখাতেই পার্সেন্টিজ নেয়ার অভিযোগ আছে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা অফিসের বিরুদ্ধে। এমনকি কোনো প্রতিষ্ঠানে ক্ষুদ্র মেরামতের টাকা প্রয়োজন না হলেও প্রধান শিক্ষককে পার্সেন্টিজের শর্তে টাকা বরাদ্দের ব্যবস্থা করে কোনো কোনো শিক্ষা অফিস। কারণ হিসেবে জানা গেছে, গত ৫ বছর ধরে বরাদ্দের পরিমাণও দ্বিগুণ করা হয়েছে।

এছাড়া কোনো কোনো শিক্ষা অফিস অনেক সময় নারী শিক্ষকদের পারিবারিক ঝামেলার দেন-দরবার করে থাকে। এই সময়ে স্বামীর কিংবা স্ত্রীর আবেদন বিবেচনায় তারা ভুক্তভোগী শিক্ষকের চাকুরি রক্ষা কিংবা বিভাগীয় মামলার ভয়ভীতি দেখিয়ে আর্থিক সুবিধা আদায়ের কথাও শোনা যায়। আর এ কারণেই একই কর্মস্থলে বছরের পর বছর পার করে দেন উপজেলা শিক্ষা অফিসার ও সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসাররা।

এমন অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে যোগাযোগ করলে সংশ্লিষ্টরা জানান ভিন্ন কথা। জেলা অফিস জানায়, উপজেলা শিক্ষা অফিসার ও সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসারের শূন্য পদের বিপরীতে অফিসার নিয়োগ না দেয়ায় একই কর্মস্থলে কেউ কেউ দীর্ঘদিন অবস্থান করেন। তবে এমন কোনো দুর্নীতির অভিযোগ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে আসে না।

এসব বিষয় নিয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাহাবউদ্দিন বলেন, ইতোমধ্যে এ জেলায় অনেক শিক্ষা ও সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা স্বেচ্ছায় বদলির আবেদন করেছেন। দেশের কোভিড পরিস্থিতির কারণে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর হয়তো এ সময় বদলি করছে না। আবার এটাও ঠিক কেউ কেউ সংশ্লিষ্ট উপজেলায় থাকতেও চাচ্ছেন বলে তিনি স্বীকার করেন। তবে বর্তমানে বদলি শুরু হয়েছে বলে এ কর্মকর্তা জানান।

উল্লেখ্য, চাঁদপুর জেলার ৮টি উপজেলায় প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে ১ হাজার ১শ’ ৫৬টি। আর এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন ৭ হাজার ২শ’ ১ জন শিক্ষক। প্রাক-প্রাথমিক ব্যতীত জেলায় প্রথম শ্রেণি হতে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা হচ্ছে ২ লাখ ১৯ হাজার ৪শ’ ২ জন।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়