সোমবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২১  |   ৩৪ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতি শিক্ষা স্বাস্থ্য সারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   এসএসসি-এইচএসসি পরীক্ষার সময়সূচি প্রকাশ

প্রকাশ : ০১ আগস্ট ২০২১, ০০:০০

আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর পেয়ে মাহমুদারা এখন  আনন্দে ভাসছেন
প্রবীর চক্রবর্তী ॥

দুঃখে যাদের জীবন গড়া তাদের আবার দুঃখ কিসের। কবির এই অমর কথাটি প্রযোজ্য তৃতীয় লিঙ্গের জন্যে। আমরা যাদের হিজড়া বলে জানি। জন্মের পর থেকেই তাদের দুঃখ শুরু, আর শেষ হয় মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। তাও স্বাভাবিক নয়। তাদের দাফন-কাফনে সমাজের লোকেরা এখনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়। হিজড়ারা নিজেদের বাঁচাতে একত্রিত হয়ে জীবন ধারণ করে। যদিও তাদের অর্থ আয়ের পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তারপরও হিজড়ারা এখন নিজেদের বদলে ফেলতে চায়। সমাজের অংশ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। সেই কাজের অংশ হিসেবে নিজেদের জন্যে এক টুকরা জমি ও একটি বাড়ি তাদের স্বপ্ন। অবশেষে তাদের স্বপন পূরণ হলো মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে ভূমিহীনদের জন্য তৈরি করা ঘরের মধ্য দিয়ে। সরকার ইতিমধ্যেই হিজড়াদের কর্মসংস্থান ও চাকুরির বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেয়া শুরু করেছেন। তাদের ট্রেনিং দিয়ে আয়বর্ধক কাজে লাগনোর চেষ্টা করেছেন। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে হিজড়াদের ট্রাফিক হিসেবে নিয়োগ দেয়ায় ইতিমধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশে তৃতীয় লিঙ্গের লোক হিসেবে বৈশাখী টিভিতে সংবাদ পাঠিকা হিসেবে একজনের অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু তাদের আশ্রয় দেয়ার বিষয়টি এখনো সেভাবে তৈরি হয়নি। তারা এখনো নিজেদের ঘর খুঁজে বেড়ায়।

ফরিদগঞ্জ উপজেলায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের দ্বিতীয় দফায় তৈরি করা ২০টি ঘরের মধ্যে মাহমুদা হিজড়ার নামে একটি ঘর বরাদ্দ দিয়ে ইতিহাস গড়া হলো। সম্ভবত তৃতীয় লিঙ্গের কোনো ব্যক্তি এই প্রথম ভূমিহীন হিসেবে বরাদ্দের ঘর পেলেন।

জানা গেছে, স্থানীয় সংসদ সদস্য মুহম্মদ শফিকুর রহমানের বিশেষ আগ্রহ এবং নির্দেশনা অনুযায়ী হিজড়াদের ঘর প্রদান করে তা বাস্তবায়ন করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শিউলী হরি।

শনিবার সরেজমিন ফরিদগঞ্জ উপজেলার বালিথুবা পশ্চিম ইউনিয়নের বাঘড়া বাজারের সিমেন্ট ঘাটের পাশে তৈরি করে ১৩টি ঘর পরিদর্শন করে দেখা যায়, বরাদ্দপ্রাপ্ত লোকজন নিজেদের মতো করে ঘর সাজিয়ে নিয়েছেন। মাহমুদা হিজড়ার ঘরে গিয়ে দেখা গেল, হিজড়া রেশমি ঘরের মধ্যে রান্না করছেন। ঘর পেয়ে আবেগে আপ্লুত মাহমুদা হিজড়া জানান, সাংবাদিক শফিকুর রহমান এমপি ও ইউএনও শিউলী হরির কারণে আমরা আজ ঘর পেলাম। বর্তমানে আমি মাহমুদা হিজড়া, মুধমালা হিজড়া ও রেশমি হিজড়া এখানে থাকি। আমরা আনন্দিত। আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আমাদের সংসদ সদস্য মুহম্মদ শফিকুর রহমান এবং আমাদের ইউএনও শিউলী হরি দিদির প্রতি কৃতজ্ঞ। কর্তৃপক্ষের নিকট আবেদন, আমাদের রাস্তাটুকুর কাজ সম্পন্ন করে দিলেই আমরা খুশি। তবে আমাদের কিছু ব্যক্তিগত কিছু বিষয়ে ইউএনওকে জানিয়েছি। তিনি সমাধান করে দিবেন বলে আশ^স্ত করেছেন।

মাহমুদা জানান, ইতিপূর্বে আমি ফরিদগঞ্জ পৌর এলাকার একটি ঘরে ভাড়া থাকতাম। যদিও আমাদের কেউ ভাড়া দিতে চাইতো না। অনেক অনুনয়-বিননয় করে ঘর ভাড়া নিতে হতো। ঘর পাওয়ার পর আমরা তিনজন এখানে থাকি। আমার দলের বাকি ৮জন হিজড়া এখনো ভাড়া বাড়িতেই তাকে। আমি ইউএনওকে অনুরোধ করেছি, আমাকে একটি বাড়তি রুমের ব্যবস্থা করে দিতে। যাতে আমরা সকলে একস্থানে থাকতে পারি। তিনি জানান, ঘরগুলো খুবই ভালো হয়েছে। প্রতি সপ্তাহে ইউএনও বা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এসে আমাদের খোঁজ-খবর নেন। শুক্রবার মিলাদ পড়িয়ে আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘরে উঠেছি।

রান্না করতে করতে রেশমি হিজড়া বলেন, আমাদের দেখলে সকলে হাসাহাসি করে। অন্যরকম আনন্দ উপভোগ করে। কিন্তু আমরাও মানুষ। আমাদেরও একটি জীবন রয়েছে। আজ আমরা নিজেদের ঘর পেয়ে আনন্দিত। যেই আনন্দ বলে বুঝাতে পারবো না। ঈদের পূর্বে ইউএনও দিদি আমাদেরকে ঈদ উপহার ও খাবার দিয়ে গেছেন। বাঘড়া বাজারের ১৩টি ঘরের সবার খোঁজ-খবর নিচ্ছেন। আমরা এখানে খুবই ভাল আছি। ঘরের চারপাশে পাকা করে দেয়ায় আমাদের আর কোনো সমস্যা নেই।

ঘরপ্রাপ্ত ফারুকুল ইসলাম, শাহানারা বেগম জানান, আমরা সুখের দেখা পেয়েছি। হিজড়ারা আমাদের সাথে থাকছে। এতে আমাদের কোনো সমস্যা নেই। ঈদের পূর্বে আমাদেরকে ইউএনও ঈদ উপহারসহ খাবার দিয়ে গেছেন। নিজের ঘরে থাকতে পেরে আমরা সুখি মানুষ। তকে করোনার কারণে কিছুটা বেগতিক অবস্থায় রয়েছি। আশা করছি এই দুঃসময়ে আমাদের খাদ্য সহায়তা অব্যাহত রাখবেন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শিউলী হরি বলেন, মুজিববর্ষ উপলক্ষে আশ্রয়ণ প্রকল্পের দ্বিতীয় দফায় আমরা ২০টি ঘর তৈরি করতে পেরেছি। সেই ঘর থেকে একটি ঘর এমপি মহোদয়ের বিশেষ আগ্রহে আমি তৃতীয় লিঙ্গের একটি পরিবারকে দিতে পেরেছি। তাদের হাতে ঘরের চাবি দিতে পারি আমি নিজেও খুব খুশি। আশা করছি সমাজের অবহেলিত এই সম্প্রদায়কে এভাবে আমরা প্রতিষ্ঠিত করতে পারবো। শুধু তারাই নয়, ফরিদগঞ্জের ২০টি ঘরের প্রতিটি পরিবারকে আমি নিজের পরিবারের সদস্য হিসেবে মনে করে তাদের খোঁজ-খবর রাখছি।

এ ব্যাপারে ফরিদগঞ্জ থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য মুহম্মদ শফিকুর রহমান বলেন, তৃতীয় লিঙ্গের ব্যাপারে আমাদের আগে ভাবতে হবে তারা মানুষ কিনা। যদি মানুষ হিসেবে গণ্য করি, তবে অবশ্যই তারা সকল ধরনের অধিকার পাওয়ার যোগ্য। সেই হিসেবে আমি মুজিববর্ষ উপলক্ষে ফরিদগঞ্জে হওয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলোর মধ্যে অন্তত একটি ঘর তাদের দেয়ার চেষ্টা করেছি।

তিনি আরো বলেন, আমি যখন এমপি হসেবে প্রথম ফরিদগঞ্জে আসি, তখন মাহমুদা আমার কাছে এসেছিলো। তাকে আমি ১ হাজার টাকা দিলে, সে চোখের জল ফেলে বললো, আমি টাকা চাই না, মাথা গোঁজার ঠাঁই চাই। তার সেই অনুরোধ আমি রক্ষা করতে পেরেছি। তাছাড়া আপনারা জানেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তৃতীয় লিঙ্গের লোকজনের জন্যে বাজেটে আলাদা বরাদ্দ রেখেছেন। অর্থাৎ বর্তমান সরকার সমাজের সকল শ্রেণির লোকজনের কথা ভাবেন।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়