চাঁদপুর, শুক্রবার, ১২ আগস্ট ২০২২, ২৮ শ্রাবণ ১৪২৯, ১৩ মহররম ১৪৪৪   |   ২৬ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতি শিক্ষা স্বাস্থ্য সারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   নানার বাড়িতে বেড়াতে এসে পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু
  •   নাতির নিরাপত্তা চেয়ে দাদির দৌঁড়ঝাঁপ ! 
  •   অবশেষে চাঁদপুর-শরিয়তপুর নৌরুটে রো রো ফেরি
  •   ফরিদগঞ্জে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে গৃহবধূর মৃত্যু
  •   কুড়িয়ে পাওয়া টাকা ফেরত........

প্রকাশ : ২৯ ডিসেম্বর ২০২১, ০০:০০

জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ এখন মহাকাশের পথে
ড. এম মেসবাহউদ্দিন সরকার

মহাবিশ্বের অনেক অজানা রহস্য উদ্ঘাটনের লক্ষ্যে মহাকাশের পথে এখন জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ। ঘটনাটিকে ঐতিহাসিক করার লক্ষ্যে বড়দিনের ভোরে (২৫ ডিসেম্বর) ফ্রেঞ্চ গিনি থেকে উৎক্ষেপিত হয়েছে এ মহাকাশযান। মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসা, কানাডীয় ও ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার যৌথ প্রচেষ্টায় নির্মিত হয়েছে এ টেলিস্কোপ, যা গভীর মহাশূন্যে দৃষ্টি ফেলে কোটি কোটি বছর অতীতের মহাবিশ্বের প্রাচীনতম ছায়াপথগুলো স্পষ্ট করে দেখার সুযোগ করে দেবে। এমনটি অতীতে কখনো সম্ভব হয়নি। মহাবিস্ফোরণের মাত্র কয়েকশ মিলিয়ন বছর পরে মহাবিশ্বের যৌবনকালের ঘটনা ও পটভূমি এ টেলিস্কোপ মানুষের সামনে তুলে ধরবে। মহাবিশ্বে আসা প্রথম আলো এবং পুনঃআয়নিত হওয়া বিগ ব্যাংয়ের পর মহাবিশ্ব অত্যন্ত উত্তপ্ত ছিলো। বিভিন্ন ধরনের কণায় (যেমন প্রোটন, ইলেকট্রন ও নিউট্রন) পরিপূর্ণ থাকার কারণে আলো স্থানান্তর হতে পারেনি, তাই ওই কালকে অন্ধকার সময় বলা হতো। কিন্তু পরবর্তীকালে মহাবিশ্ব আস্তে আস্তে শীতল হতে শুরু করে এবং প্রোটন ও নিউট্রন একত্র হয়ে আয়নিত হাইড্রোজেন গঠন করে এবং সঙ্গে কিছু আয়নিত হিলিয়ামও তৈরি হয়। পরে আয়নিত হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম মুক্ত ইলেকট্রনকে আকর্ষণ করে নিরপেক্ষ পরমাণু গঠন করে। মহাবিশ্বে আয়নিত কণা কমে যাওয়ায় আলো চলতে আর কোনো বাধা ছিলো না। জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ এই প্রথম আলো শনাক্ত করার চেষ্টা করবে। এছাড়া মহাকাশে এ মুহূর্তে কয়েক হাজার এক্সো-প্ল্যানেট বা বহিঃসৌরম-লীয় গ্রহ শনাক্ত করা হয়েছে এবং ক্রমেই এ সংখ্যা বাড়ছে। এ টেলিস্কোপের মাধ্যমে অন্য নক্ষত্রের গ্রহের গঠন, বায়ুম-লের উপাদান, পানির অস্তিত্ব, সেই গ্রহে প্রাণ ধারণের উপযুক্ত পরিবেশ রয়েছে কিনা, এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে।

জেমস ওয়েবের পুরো নাম জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ, সংক্ষেপে একে ‘ওয়েব’ বলা হয়। এটি হাবল টেলিস্কোপের বিকল্প এবং জেমস ইওয়েবের নাম অনুসারে এ নামকরণ করা হয়েছে। এটি ৩০ দিনে মহাকাশ যাত্রা সম্পন্ন করে পৃথিবী থেকে ১৫ লাখ কিলোমিটার দূরত্বে দ্বিতীয় লাগ্রঁজীয় বিন্দুতে পৌঁছাবে এবং পৃথিবীর অন্ধকারাচ্ছন্ন অংশে অবস্থান করে বছরে একবার সূর্যকে প্রদক্ষিণ করবে। পরে ছায়াপথের ‘জন্ম ও বিবর্তন’ এবং ‘নক্ষত্র ও গ্রহ’গুলোর সৃষ্টিসংক্রান্ত তথ্য অনুসন্ধান করবে। পর্যবেক্ষণ করবে পৃথিবী থেকে সবচেয়ে বেশি দূরে মহাবিশ্বে বিরাজমান বস্তু ও সংঘটিত ঘটনাগুলো। ফলে অবলোহিত বিকিরণ চিত্রণের মাধ্যমে ১৩৫০ কোটি বছরেরও আগে মহাবিশ্বের প্রথম ছায়াপথ ও নক্ষত্রগুলো কীভাবে রূপলাভ করেছিল তা জানা যাবে। এ ছাড়া মানুষের বসবাসযোগ্য সম্ভাব্য বহিঃগ্রহগুলোর আবহম-লের বিস্তারিত খুঁটিনাটি এবং সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহ ও উপগ্রহের বিস্তারিত দেখা সম্ভব হবে।

টেলিস্কোপটি ১৮টি ষড়ভুজাকৃতি দর্পণখ-ের সমবায়ে নির্মিত এবং প্রতিটি দর্পণখ- সোনার পাত লাগানো বেরিলিয়াম ধাতু দিয়ে তৈরি। খ-গুলো একত্রে মিলে একটি বৃহৎ ৬.৫ মিটার ব্যাসবিশিষ্ট দর্পণ, যা হাবল দূরবীক্ষণ যন্ত্রের দর্পণটির (২.৪ মিটার ব্যাস) তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বড়। যেখানে হাবলকে অতিবেগুনি, দৃশ্যমান আলো ও অবলোহিত বিকিরণ (০.১ থেকে ১ মাইক্রোমিটার তরঙ্গ দৈর্ঘ্য বিশিষ্ট) বর্ণালী পর্যবেক্ষণ করার জন্য তৈরি করা হয়েছিল, সেখানে ওয়েব অপেক্ষাকৃত নিুতর কম্পাঙ্কের পরিসীমার বিকিরণ পর্যবেক্ষণ করবে, যার মধ্যে দীর্ঘ তরঙ্গ দৈর্ঘ্যরে দৃশ্যমান কমলা আলো থেকে শুরু করে মধ্য অবলোহিত তরঙ্গগুলো অন্তর্ভুক্ত (০.৬-২৮.৩ মাইক্রোমিটার তরঙ্গ দৈর্ঘ্য বিশিষ্ট)। এক কথায়-এগুলোকে বলা হয় ইনফ্রারেড তরঙ্গ, যা এ টেলিস্কোপে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ টেলিস্কোপটি লাগ্রঁজীয় বিন্দুতে অবস্থান করবে, ফলে পৃথিবীর সঙ্গে সমান্তরালে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করবে এবং সূর্য, পৃথিবী ও লাগ্রঁজীয় বিন্দু সব সময় একই লাইনে থাকবে। ফলে পৃথিবী থেকে সব সময় যোগাযোগ রাখা সম্ভব হবে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে; যেহেতু সূর্য একপাশে থাকবে, তাই সূর্যের আলো (পৃথিবীর তাপ থেকেও রক্ষা হবে, যা এলবিডু নামে পরিচিত) সরাসরি আসবে না স্যাটেলাইটে। সঠিকভাবে কাজ করার জন্য ওয়েবকে অত্যন্ত শীতল অবস্থায় রাখা হবে, যার ফলে অতিসূক্ষ্ম, দুর্বল সংকেতগুলো সৌরজগতের আলোকীয় ও তাপীয় বিকিরণের কারণে সৃষ্ট অনাকাক্সিক্ষত ব্যতিচার থেকে সুরক্ষিত রাখবে। এ ছাড়া যন্ত্রটিকে সূর্যের তাপ থেকে সুরক্ষার জন্য ১৫০ বর্গমিটার (১৬০০ বর্গফুট) ক্ষেত্রফলের একটি সৌরবর্ম মোতায়েন থাকবে, যা সিলিকন ও অ্যালুমিনিয়ামে আবৃত পাঁচটি তাপ-অন্তরক ক্যাপটন পাত দিয়ে নির্মিত, যা যন্ত্রটির দর্পণ ও অন্যান্য যন্ত্রাংশের তাপমাত্রা ৫০ কেলভিনের নিচে (শূন্যের নিচে ২২৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস) রাখতে সাহায্য করবে। দূরবীক্ষণ যন্ত্রটির দর্পণ ও সৌরবর্ম উভয়কেই ভাঁজ করে রেখে উৎক্ষেপণ করা হবে এবং যন্ত্রটি তার সঠিক কক্ষপথে পৌছালে ভাঁজগুলো খুলে যাবে। সমগ্র মোতায়েন প্রক্রিয়াটি শেষ করতে উৎক্ষেপণ মুহূর্ত থেকে প্রায় ছয় মাস লাগবে। ফলে ২০২২ সালের জুলাই মাস থেকে যন্ত্রটি পৃথিবীতে বৈজ্ঞানিক উপাত্ত প্রেরণ করা শুরু করবে। এটিকে কমপক্ষে প্রায় ১০ বছর কর্মক্ষম রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, আজ থেকে প্রায় ১ হাজার ৩৭৫ কোটি বছর আগে এ মহাবিশ্ব একটি অতিঘন ও উত্তপ্ত অবস্থা থেকে সৃষ্টি হয়েছিল। বিজ্ঞানী এডুইন হাবলের মতে, দূরবর্তী ছায়াপথগুলো পরস্পর দূরে সরে যাচ্ছে, ফলে মহাবিশ্ব ক্রমেই সম্প্রসারিত হচ্ছে। অতি উচ্চক্ষমতাবিশিষ্ট টেলিস্কোপ (কোবে, হাবল স্পেস টেলিস্কোপ এবং ডব্লিউএমএপি) যন্ত্রের সাহায্যে মহাবিশ্বের বিবর্তন সম্পর্কিত এসব তথ্য জানা ও গবেষণা করা বর্তমানে অনেক সহজ হচ্ছে। পৃথিবী, চাঁদ, সূর্য, নক্ষত্র, মঙ্গল গ্রহসহ নানা বিষয়ে মহাকাশ বিজ্ঞানীরা তাদের গবেষণালব্ধ ফল নিয়ে নভোম-লে পাড়ি জমাচ্ছে এবং সেখান থেকে প্রতিনিয়ত পাঠাচ্ছে রহস্যময় তথ্য-উপাত্ত এবং ছবি। তবুও এ নভোম-লের বিস্ফোরণ ও উৎপত্তি কখন, কেন এবং কোন সময়ে ঘটেছিল তা আজও রহস্যময়। যদিও বর্তমানে হাবল টেলিস্কোপের কল্যাণে মহাবিশ্বের অসামান্য ছবি ও তথ্য পাওয়া যায়। কিন্তু মহাবিশ্বের অসংখ্য তারা ও অন্যান্য অংশ ঢাকা পড়ে আছে বিভিন্ন মহাজাগতিক ধূলিকণার আড়ালে। অনেক সময় দৃশ্যমান আলো অন্য নক্ষত্র থেকে হাবল টেলিস্কোপ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। তাই জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কাছে এখনো অজানা রয়ে গেছে কীভাবে সৌরজগৎ গঠিত হয়, প্রাথমিক ধূলিকণা থেকে কীভাবে গ্রহ গঠিত হয়, বড় ধরনের গ্রহের প্রভাব সৌরজগতে কেমন, গ্রহগুলোর কক্ষপথ কীভাবে স্থিতিশীল হয় ইত্যাদি নানা প্রশ্ন।

টেলিস্কোপ শব্দটি প্রাচীন গ্রিক শব্দ টেলি ‘দূর’ এবং স্কোপেইন ‘দেখতে’ থেকে এসেছে। টেলিস্কোপের মূল অর্থ ‘দূরদর্শন’। এ ধরনের প্রথম দূরবীক্ষণ যন্ত্রটি তৈরি করেছিলেন হ্যান্স লিপারশে, ১৬০৮ সালে। ১৬০৯ সালে দূরবর্তী তারা পর্যবেক্ষণের জন্য গ্যালিলিও গ্যালিলি একটি দুরবিন তৈরি করেন। ১৬১১ সালে ইয়োহানেস কেপলার একটি দূরবীক্ষণ যন্ত্র নির্মাণ করেন, যা অনেকটা জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক দূরবীক্ষণ যন্ত্রের মতো ছিল। ১৭৩৩ সালে জেমস গ্রেগরি একটি অ্যাক্রোমেটিক ডাবলেট অবজেক্টিভ তৈরি করেন, যার মাধ্যমে প্রতিসরণ দুরবিনের প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়। বিশ শতকে ১৯৩০-এর দশকে রেডিও টেলিস্কোপ এবং ১৯৬০-এর দশকে ইনফ্রা-রেড টেলিস্কোপসহ অনেক ধরনের টেলিস্কোপ আবিষ্কৃত হয়েছিল। তবে এখন পর্যন্ত তৈরি টেলিস্কোপগুলোর মধ্যে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপটিই সবচেয়ে শক্তিমান ও আধুনিক। মহাকাশ বিজ্ঞানকে আরও একধাপ সামনে নিয়ে যাবে এ জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ।

ড. এম মেসবাহউদ্দিন সরকার : অধ্যাপক, আইআইটি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়