চাঁদপুর, শুক্রবার, ১৯ আগস্ট ২০২২, ৪ ভাদ্র ১৪২৯, ২০ মহররম ১৪৪৪  |   ৩২ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতি শিক্ষা স্বাস্থ্য সারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   উদাসীনতা আর কাকে বলে!
  •   ইবাদত ও খেলাফতের মধ্যেই মুসলমানদের শ্রেষ্ঠত্ব নিহিত
  •   আগামী প্রজন্মকে নির্মাণে এ ধরনের অনুষ্ঠানের কোনো বিকল্প নেই
  •   পীর বাদশা মিয়া রোডে ড্রেন ও সড়ক নির্মাণ কাজ উদ্বোধন করলেন মেয়র জিল্লুর রহমান জুয়েল
  •   এলজিইডি চাঁদপুরের সাড়ে ১০ হাজার তালগাছের বীজ রোপণ

প্রকাশ : ৩০ জুন ২০২২, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক

প্রজ্ঞাপন জারির মধ্য দিয়ে বীরাঙ্গনাদেরকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলেও, বীরাঙ্গনাদের চিহ্নিত করা থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সুযোগ-সুবিধা প্রদানের পুরো প্রক্রিয়ায় নানা ঘাটতি বিদ্যমান। ‘বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও অধিকার : সুশাসনের চ্যালেঞ্জ এবং উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে এ মন্তব্য করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। একই সঙ্গে সংকট উত্তরণে দশ দফা সুপারিশ প্রদান করেছে সংস্থাটি।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, উপদেষ্টা- নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের, গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হাসান। প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন টিআইবির গবেষণা ও পলিসি বিভাগের রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট-কোয়ালিটেটিভ রাবেয়া আক্তার কনিকা। এই গবেষণাটি তত্ত্বাবধান করেছেন একই বিভাগের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো শাহজাদা এম আকরাম। সংবাদ সম্মেলনটি সঞ্চালনা করেন টিআইবির আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক শেখ মন্জুর-ই-আলম।

এ বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উভয় উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহের পর বিশ্লেষণ করে গুণগত পদ্ধতিতে গবেষণাটি সম্পন্ন করা হয়েছে। বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষাৎকার এবং বীরাঙ্গনাদের নিয়ে কাজ করছে এমন ব্যক্তিবর্গ, সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তার সাক্ষাৎকার গ্রহণ ও দলীয় আলোচনার মাধ্যমে প্রত্যক্ষ তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এছাড়া সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সরকারি কার্যালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য, গেজেট এবং গণমাধ্যমে (প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক) প্রকাশিত প্রতিবেদন, প্রাসঙ্গিক বিভিন্ন বই ও প্রকাশিত প্রতিবেদন সংগ্রহ, যাচাই-বাছাই ও পর্যালোচনা করে গবেষণায় ব্যবহার করা হয়েছে। আইনের শাসন, সক্ষমতা ও কার্যকরতা, অংশগ্রহণ, অনিয়ম ও দুর্নীতি, জবাবদিহি এবং সংবেদনশীলতাণ্ড সুশাসনের ছয়টি নির্দেশকের আলোকে গবেষণায় আওতাভুক্ত বিষয়সমূহকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

গবেষণার ফল থেকে দেখা যায়, বীরাঙ্গনাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও অধিকার প্রাপ্তির প্রক্রিয়া যেখানে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে বাস্তবায়ন করা আবশ্যক সেখানে পরিকল্পনাহীনতা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি, কাঠামোগত জটিলতা, অনিয়মণ্ডদুর্নীতির সুযোগ, জবাবদিহি ব্যবস্থায় ঘাটতি রয়েছে। স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও সামাজিক সচেতনতা ও সংবেদনশীলতার ঘাটতি রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক-সাংস্কৃতিক নেতিবাচক মনোভাবের কারণে বীরাঙ্গনারা এখনো প্রান্তিকীকরণের শিকার। বীরাঙ্গনাদের নিয়ে বিভিন্ন বেসরকারি ও নারী বিষয়ক প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমের নির্দিষ্ট কিছু সংখ্যক কাজ থাকলেও তা নারী বিষয়ক অন্য যেকোন কাজের তুলনায় বেশ অপ্রতুল। বীরাঙ্গনাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও অধিকার প্রদানের এই প্রক্রিয়াটি গতানুগতিক প্রক্রিয়া থেকেও ভিন্ন হলেও এই প্রক্রিয়াটি গতানুগতিক আমলাতান্ত্রিক পদ্ধতিনির্ভর হয়ে আছে।

গবেষণায় দেখা যায়, গেজেটভুক্তির আবেদন হতে শুরু করে গেজেটভুক্তির জন্য সর্বোচ্চ কতদিনে মধ্যে কার্যক্রম নিষ্পত্তি করতে হবে তার জন্য কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা আইনে বা বিধিতে উল্লেখ নেই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৩ বছরেরও বেশি সময় লেগে যায়। এছাড়া, আবেদন প্রাপ্তির তারিখ হতে পরবর্তী ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে আবেদনটি নিষ্পত্তি করার নির্দেশনা থাকলেও ভাতা পেতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৩-৬ মাস বা তারও বেশি সময় লেগে যায়। অন্যদিকে ‘বীর নিবাস’-এর ঘরের জন্য আবেদন করার ৬ বছর অতিবাহিত হয়ে গেলেও ঘর না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আবার, এই ঘর পাওয়ার জন্য ন্যূনতম জমির মালিকানার শর্ত দরিদ্র ও ভূমিহীন বীরাঙ্গনাদের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ। আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সনদ প্রদর্শনের বাধ্যবাধকতা থাকায় বিভিন্ন জটিলতা সৃষ্টি করে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, জাতীয় পরিচয়পত্রে যে বয়স উল্লেখ করা রয়েছে তা অনুমানভিত্তিক, যার সাথে প্রকৃত বয়সের ব্যাপক ব্যবধান রয়েছে। এছাড়াও কিছু কিছু ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারদের কাছ থেকে প্রত্যয়নপত্র সংগ্রহ করাটাও কঠিন হয়ে পড়ে।

গবেষণায় আরও দেখা যায়, কেন্দ্রীয় বা স্থানীয় পর্যায়ে বীরাঙ্গনাদের খুঁজে বের করার বা চিহ্নিত করার কোনো পরিকল্পনা নেই। সংবেদনশীলতা রক্ষার স্বার্থে বীরাঙ্গনা হিসেবে শুধু যারা স্বেচ্ছায় এগিয়ে আসবেন তাদের গেজেটভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। সুনির্দিষ্ট কাঠামো না থাকার কারণে গেজেটভুক্তির জন্য সরকারের এই আহ্বান অনেকক্ষেত্রে প্রকৃত সুবিধাভোগীর কাছে পৌঁছায় না। বিভিন্ন গণমাধ্যম, স্থানীয় পর্যায়ে উপজেলা পরিষদে নোটিশ টাঙ্গানো এবং মাইকিংয়ের মাধ্যমে প্রজ্ঞাপনের সংবাদ প্রচার করা হলেও অনেকক্ষেত্রেই এ তথ্য বীরাঙ্গনাদের কাছে পৌঁছায় না। ফলে এখন পর্যন্ত তালিকাভুক্ত ৪৪৮ জন বীরাঙ্গনার মধ্যে ৪৩৩ জন জীবিত অবস্থায় নিজেদের পক্ষে তালিকাভুক্ত হয়েছেন এবং ১৫ জন বীরাঙ্গনার মৃত্যুর পর তাদের পরিবারের সদস্যরা তাদের প্রতিনিধি হয়ে নাম তালিকাভুক্ত করেছেন। তাছাড়া মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বরাদ্দকৃত সেবার তথ্যও পরিকল্পিতভাবে স্থানীয় পর্যায়ে প্রচার না করায় যথাসময়ে তথ্য পান না বলে অভিযোগ রয়েছে বীরাঙ্গনাদের।

গবেষণায় উঠে এসেছে, উপজেলা পর্যায়ে বীরাঙ্গনা বা মুক্তিযোদ্ধাদের গেজেটভুক্তির প্রক্রিয়া পরিচালনার জন্য বিশেষ কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত পদ নেই। উল্টোদিকে অধিকাংশ বীরাঙ্গনা শিক্ষাগত যোগ্যতার ঘাটতি এবং বয়সের কারণে গেজেটভুক্তির জন্য নির্ধারিত কার্যক্রম যথাযথভাবে সম্পাদন করতে জটিলতার সম্মুখীন হয়ে থাকেন। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এমআইএস-এ তথ্যের মধ্যে ভিন্নতা রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট অনুযায়ী এখন পর্যন্ত গেজেটভুক্ত মোট বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা যেখানে ৪৪৮ জন সেখানে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এমআইএস-এ এন্ট্রি রয়েছে ৪০২ জনের। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এমআইএস-এ গেজেটভুক্ত একই ব্যক্তির নাম এবং পিতা/স্বামীর নামের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন বানান, পদবি এমনকি ভিন্ন ভিন্ন নামও রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে থাকা ৪৪৮ জন বীরাঙ্গনার তালিকার মধ্যে ৮৯ বীরাঙ্গনার নামের সাথে এমআইএস-এ উল্লেখিত নামের ভিন্নতা এবং পিতা/স্বামীর নামের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন বানান, পদবি এমনকি ভিন্ন ভিন্ন নাম রয়েছে ২০৭ জনের। এছাড়াও গেজেটে অনেকের নাম, ঠিকানায় ভুল থাকায় আবাসনের জন্য আবেদন করতে পারছেন না তারা।

গবেষণায় আরও দেখা যায়, সরকারি বা স্থানীয় পর্যায়ে কোনো তালিকা না থাকা এবং পারিবারিক, সামাজিক-সাংস্কৃতিক চাপে পরিচয় গোপনের কারণে বীরাঙ্গনাদের খুঁজে বের করা প্রথম ও বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক ক্ষেত্রে, দীর্ঘদিন ধরে আত্মগোপন করে থাকা বা পরিচয় প্রকাশে শঙ্কিত এসব বীরাঙ্গনা ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা পরিচয় গোপন করার চেষ্টা করেছেন। বীরাঙ্গনাদেরকে গেজেটভুক্তির প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় প্রত্যয়নের কিছু কিছু ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধাদের একাংশ, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও জনপ্রতিনিধিদের অসহযোগিতামূলক আচরণের অভিযোগ আছে। এছাড়া বীরাঙ্গনাদের সাথে স্থানীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের যোগাযোগেরও ঘাটতি রয়েছে।

দুঃখজনক হলেও সত্য, গেজেটভুক্তির বিভিন্ন ধাপে বেশিরভাগ আবেদনকারী বীরাঙ্গনাই নানা পক্ষ হতে বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির শিকার। কিছু কিছু প্রত্যয়নের সময় নিয়মণ্ডবহির্ভূতভাবে টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া প্রশাসনিক পর্যায়ে কোনো আবেদন জমা দেওয়ার সময় পিয়ন বা সহকারীদেরকে চা নাস্তা খাওয়ার টাকা দেওয়ার এক ধরনের অলিখিত নিয়ম রয়েছে। আবার, আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য কোনো কোনো পক্ষ থেকে অবৈধভাবে অর্থ দাবি করা হয়। পাশাপাশি, কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিতর্কিত ব্যক্তিদের গেজেটভুক্ত হয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। প্রশাসনিকভাবে অনিয়ম ও দুর্নীতি শনাক্তের ক্ষেত্রে ঘাটতি তো আছেই, পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির জন্যও প্রশাসনের নির্দিষ্ট কোনো ব্যবস্থা নেই।

স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়ে গেলেও এদেশের সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিসরে বীরাঙ্গনাদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব বিদ্যমান। স্বাধীনতার পর বীরাঙ্গনাদের অনেককে পরিবারের আশ্রয় হারাতে হয়েছে বা স্বামী সংসার হতে বহিষ্কৃত হতে হয়েছিল। পরিবারে ফেরা প্রায় সকলেই এতো বছর ধরে আড়াল করে রাখা বীরাঙ্গনা পরিচয় সামনে আনতে অনেকে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। অনেক ক্ষেত্রে স্বীকৃতি নেওয়ার জন্য আবেদন করতে রাজি হওয়া বীরাঙ্গনাদের অনেককেই পরিবার পরিজনের কাছে নতুনভাবে নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিবার ও সমাজের চাপে গেজেটভুক্তির আবেদন জমা দেওয়ার পরও তা তুলে ফেলতে বাধ্য করা হয়েছে।

অন্যদিকে, গেজেটভুক্তির প্রক্রিয়ায় অন্যতম জটিলতা হচ্ছে যাচাই-বাছাই কমিটির সামনে নির্যাতনের ঘটনা বর্ণনা করা, যা কোনোভাবেই সংবেদনশীল নয়। এছাড়া বীরাঙ্গনাদের স্বীকৃতি প্রদানের এই প্রক্রিয়ায় সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের কারণে সৃষ্ট নেতিবাচক মনোভাব থেকে বীরাঙ্গনা, তাদের পরিবার পরিজন সর্বোপরি সাধারণ মানুষদের উত্তরণের জন্য কোনো পদক্ষেপ নেই। আবার, স্বীকৃতিপ্রাপ্তির পরও বীরাঙ্গনাদের পরিবার ও সমাজের দ্বারা হেনস্তার শিকার হতে হয়। সরকারের সম্মানী ভাতাকে স্থানীয় পর্যায়ে ‘পাঞ্জাবিদের ভাতা’ উল্লেখ করে বীরাঙ্গনাদের অপদস্থ করা হয়। অনেকে এক্ষেত্রে নিজেদের স্বীকৃতি ও ভাতা প্রাপ্তির বিষয়টি এড়ানোর জন্য বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করেন। ভাতার টাকাটি তিনি নিজের স্বামীর অথবা বাবার মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার সুবাদে পাচ্ছেন বলে সন্তানদেরকে বলে থাকেন। আবার, ভাতার টাকা ভাগাভাগি নিয়ে বীরাঙ্গনাদের পারিবারিক চাপের মুখোমুখি হতে হয়। এমনকি ভাতার টাকার অংশ না দেওয়া হলে মেয়েকে তালাক দেওয়ার হুমকির নজিরও রয়েছে।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও অধিকার নিশ্চিতকরণে একদিকে পর্যাপ্ত সরকারি প্রাধান্যের ঘাটতি ও অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ে বিদ্যমান সামাজিক-সাংস্কৃতিক নেতিবাচক মনোভাবের কারণে বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধাগণ প্রান্তিকীকরণের শিকার। বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধাদের চিহ্নিত করা থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সুযোগ-সুবিধা প্রদানের পুরো প্রক্রিয়ায় নানা ধরনের সুশাসনের ঘাটতি বিদ্যমান। বীরাঙ্গনাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও অধিকার প্রাপ্তির এই সংবেদনশীল বিষয়টি যেখানে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে বাস্তবায়ন করা আবশ্যক, সেখানে পরিকল্পনাহীনতা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি, কাঠামোগত জটিলতা, আমলাতান্ত্রিক পদ্ধতি নির্ভরতা, অনিয়মণ্ডদুর্নীতির সুযোগ, জবাবদিহি ব্যবস্থা ও সংবেদনশীলতায় ঘাটতি প্রক্রিয়াটিকে বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অনেক ক্ষেত্রেই হয়রানি ও হতাশাব্যঞ্জক করে তুলেছে। তার সাথে সামাজিক সচেতনতা ও সংবেদনশীলতার ঘাটতিও বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধাদের ন্যায্য স্বীকৃতি ও অধিকার প্রাপ্তিতে প্রবল প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করেছে।’’

তিনি আরো বলেন, ‘‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালেই বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধাদের স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ২০১৫ সাল থেকে গেজেট প্রকাশ এবং অনান্য সুযোগ- সুবিধার বিধান করা হয়, যা দেরিতে হলেও একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ। কিন্তু বীরাঙ্গনাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং সুযোগ-সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে সুশাসনের যেসব ঘাটতি আমাদের প্রতিবেদনে চিহ্নিত হয়েছে, তা পূরণে আমরা আশা করি এই গবেষণায় প্রস্তাবিত সুপারিশসমূহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করবেন।”

সার্বিক বিবেচনায়, এসব চ্যালেঞ্জ উত্তরণে দশ দফা সুপারিশ প্রদান করেছে টিআইবি। উল্লেখযোগ্য সুপারিশসমূহ হলো- বীরাঙ্গনাদের খুঁজে বের করার জন্য নির্দিষ্ট কাঠামো ঠিক করা, উপজেলা পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষদর্শী ও তরুণ প্রজন্মের নাগরিকদের নিয়ে কমিটি গড়ে তোলা, যারা স্থানীয় পর্যায়ে বীরাঙ্গনাদের খুঁজে বের করবে এবং তালিকাভুক্ত করতে সার্বিক সহায়তা করবে; সমাজে বীরাঙ্গনাদের সম্মানজনক অবস্থানের জন্য তাদের অবদানকে পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা; মুক্তিযুদ্ধ ও নারী বিষয়ক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে/কাজে বীরাঙ্গনা বিষয়ক কার্যক্রমসমূহ আরও গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে এবং গণমাধ্যমে বীরাঙ্গনাদের অবদান গুরুত্বের সাথে তুলে ধরা; স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসকেন্দ্রিক বিভিন্ন সরকারি অনুষ্ঠানে বীরাঙ্গনাদের সম্পৃক্ত করা; বীরাঙ্গনাদের সামাজিক স্বীকৃতির জন্য সচেতনতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা, যাতে বীরাঙ্গনারা নিজেদের প্রাপ্য সম্মান গ্রহণের জন্য এগিয়ে আসতে উদ্বুদ্ধ হন ইত্যাদি।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়