চাঁদপুর, সোমবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১১ আশ্বিন ১৪২৯, ২৯ সফর ১৪৪৪  |   ৩১ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতি শিক্ষা স্বাস্থ্য সারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   চাঁদপুরের হাজীগঞ্জের ভাটরায় স্ত্রী হত্যার দায়ে স্বামীর মৃত্যুদন্ড
  •   চাঁদপুর জেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রতীক বরাদ্দ চেয়ারম্যান পদে ওচমান হাজীর মোবাইল, জাকির প্রধানিয়ার আনারস
  •   চাঁদপুর জেলা পরিষদ নির্বাচনে ৩ চেয়ারম্যানের প্রার্থিতা প্রত্যাহার
  •   হাইমচরে বজ্রপাতে নৌকা থেকে পড়ে জেলে নিঁঁখোজ
  •   চাঁদপুরে চুরি হওয়া ৪২ মোবাইল উদ্ধার

প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০২২, ০০:০০

বঙ্গবন্ধুর মতো নেতা এদেশে আর জন্মায়নি একজনও
অনলাইন ডেস্ক

“বাঘা বাঘা নেতা আছে

ইতিহাসে কতো,

বিশ্ব জুড়ে মুজিবের মতো নেতা

খুঁজে পাবে না আর একটাও..”

সেদিন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে এ গানটি গাইলেন কণ্ঠশিল্পী পলাশ লোহ। সবার হৃদয় ছুঁয়েছে এ গান। সত্যিই বিশ্ব ইতিহাসে আমরা অনেক নেতার কথাই জানি, কিন্তু জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্বে একজনই। তিনি কেবল শূন্যহাতে বাঙালি জাতিকে ‘বাংলাদেশ’ উপহার দেননি, বাঙালিকে করেছেন অসীম সাহসী। সেই সাহস আজ কাজে লাগিয়ে বাঙালি জাতি তলাবিহীন ঝুড়িখ্যাত বাংলাদেশকে উচ্চতায় তুলে এনে সারা বিশ্ববাসীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র, বিশ্ব ব্যাংকের ছুড়ে ফেলা পদ্মা সেতুকে পদ্মা নদীর ওপর দাঁড় করিয়ে বাঙালি প্রমাণ করেছে, বাংলাদেশের সক্ষমতা আছে, অনেক সাহস আছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দুঃসাহসিকতায়, দেশের মানুষের সহযোগিতা এবং অংশগ্রহণে পদ্মা সেতু হয়েই গেছে। বাংলাদেশে শিল্পোন্নয়ন হয়েছে। বাংলাদেশের প্রকৌশলী, চিকিৎসক, শ্রমিক ভাইয়েরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দক্ষতা দেখিয়ে এদেশের জন্যে ডলার উপার্জন করছে, সুনাম বইয়ে আনছে, দেশকে সমৃদ্ধশালী করছে। ইতোমধ্যে দেশ গার্মেন্টস্ শিল্পে এগিয়ে গেছে বহুদূর। অস্ত্র আর অর্থহীন জাতিকে বঙ্গবন্ধু যুদ্ধে নামিয়ে দেশ স্বাধীন করেই থেমে থাকেননি। শূন্য থেকে দেশকে নানা পরিকল্পনায় এগিয়ে নেয়ার কাজটি যখন তিনি করছিলেন, ঠিক তখনই এ নিষ্ঠুর জাতির কলঙ্কিত কতক কুসন্তান ১৫ আগস্ট এক রাতে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে বাংলাদেশে অগ্রযাত্রা থমকে দিতে চেয়েছিল। থমকে গেছেও দেশ। সেই জায়গা থেকে সাহসী বাঙালি আর জাতির পিতার কন্যার দুর্দান্ত সাহসে দেশ এক উচ্চামাত্রায় এগিয়ে যায়।

শতবছর আগে ১৭ মার্চ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জন্মগ্রহণ করেন। তেজোদ্দীপ্ত এই মানুষটি গর্জে উঠেন ৭ মার্চ, সেই গর্জনেই অর্জন ১৬ ডিসেম্বর। পৃথিবীর বুকে নাম লেখালো স্বাধীন বাংলাদেশ। একজন সাহসী বঙ্গবন্ধু, একটাই বাংলাদেশ। তাঁর মেধা, প্রজ্ঞা, সততা, সাহস সর্বোপরি দেশপ্রেমেই বাংলাদেশের জন্ম হলো। যিনি দেশটা উপহার দিলেন সেই বঙ্গবন্ধুকে কী করে ভুলে বাঙালি! বাঙালি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে তাঁকে। তিনি ভালোবেসেছিলেন বাঙালি জাতিকে। বীর হতে চাননি যিনি, ভয় পাননি শহীদ হতে। রক্ত দিয়ে যিনি দেশবাসীর ভালোবাসার ঋণ পরিশোধ করতে প্রস্তুত ছিলেন সর্বদা, তাঁকে কী করে স্মরণ না করে বাঙালি? বঙ্গবন্ধু ক্ষমতাকে ভালোবাসেননি, হৃদয় দিয়ে দেশকে ভালোবেসেছেন, দেশের মানুষকে ভালোবেসেছেন। অর্থ লোভ তাঁকে ছোঁয়নি কখনো। দেশের ভালোবাসার কাছে তাঁর কাছে অর্থ ছিলো তুচ্ছ। এমন মানুষ কি আর জন্মাবে কখনো এদেশে? বঙ্গবন্ধু হয়ে আর আসবেন না কখনো কেউ। এক বঙ্গবন্ধু এক বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ। তাঁর মতো করে কেউ বাংলাকে আর ভালোবাসবে না, বাঙালিকে তাঁর মতো করে কেউ আর আগলে রাখবে না, সাহস জোগাবে না।

আমরা সত্যি অকৃতজ্ঞ জাতি। যিনি আমাদের দেশমাতৃকাকে উপহার দিলেন, এই তাকেই কত না নির্মমভাবে হত্যা করা হলো। জাতির পিতার বাসভবনে রক্তের বন্যা বইয়ে দেয়া হলো সেদিন। শিশু রাসেলের কান্না আর আকুতিও ওদের হৃদয় স্পর্শ করলো না। শুধু তই নয়, হত্যাকারীরা তার কবর তিন মাস পর্যন্ত পাহারা দিয়েছে। সেখানে কাউকে আসতে দেয়া হয়নি। এমনকি দীর্ঘদিন বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের ছবি এদেশে নিষিদ্ধ ছিল। বঙ্গবন্ধুর কবর দেখতে না দেয়া, তার হত্যার ছবি প্রকাশের নিষেধাজ্ঞার মূল কারণ ঘৃণ্য হন্তারক ওই সামরিক শাসকরা তাতে ভয় পেত। তাদের ভয়টা ছিল এখানেই যে, তারা নিশ্চিত জানতো, জীবিত বঙ্গবন্ধুর চেয়ে মৃত বঙ্গবন্ধু অনেক বেশি শক্তিশালী। তারা আরো জানতো, সে সময় এসব ছবি প্রকাশ পেলে কোনো কিছুতেই বাঙালিকে দাবিয়ে রাখা যাবে না।

সেই ১৫ আগস্ট। সিঁড়িতে পড়ে আছে বাঙালি জাতির প্রাণপ্রিয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রক্তমাখা নিথর লাশ। সিঁড়ি গড়িয়ে রক্ত চলে এসেছে বাহির আঙ্গিনায়। মহান সেই নেতার রক্ত সোঁদা মাটিতে মিশে গেছে। তিনি তো শুধু এ দেশের প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি ছিলেন না, ছিলেন না দলবিশেষের প্রধান। দীর্ঘ দিবস, দীর্ঘ রজনী, ঝড়-মেঘ ইতিহাসের পথে আমাদের যাত্রায় তিনি ছিলেন সঙ্গী ও পথপ্রদর্শক। তাকে ভুলব কেমন করে? তাকে কি ভোলা যায় কখনো? তাই তো ইতিহাসের এই মহানায়কের উদ্দেশে কবি লিখেছিলেন, “যতদিন রবে পদ্মা, যমুনা/গৌরী, মেঘনা বহমান/ ততদিন রবে কীর্তি তোমার/ শেখ মুজিবুর রহমান”।

অবিসংবাদিত এই মানুষটির জীবন চলার পথ ছিল কণ্টকাকীর্ণ। পাকিস্তানের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তুলে ’৬০-এর দশক থেকেই তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের অগ্রনায়কে পরিণত হন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ লাখো মানুষের উপস্থিতিতে ঢাকার তৎকালীন ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু বজ্রদৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম’। তারই বজ্র নির্ঘোষ ঘোষণায় উদ্দীপ্ত, উজ্জীবিত জাতি স্বাধীনতার মূলমন্ত্র ধারণ করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।

অদম্য সাহস ও অকুণ্ঠ আত্মত্যাগ, সাংগঠনিক শক্তি, নিজের বাঙালিসত্তার গভীর অনুরণন উপলব্ধি করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। কখনো স্বভাবের প্রেরণায়, কখনো সযত্ন উৎসাহে তার উন্মোচন ঘটিয়েছিলেন। দেশবাসীকেও তেমনি অনুপ্রাণিত করেছিলেন সেই সত্তার জাগরণ ঘটাতে। দেশ ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা থেকে এক মোহনীয় স্বপ্ন রচনা করেছিলেন তিনি ধীরে ধীরে, সেই স্বপ্ন সফল করার আহ্বান জানিয়েছিলেন সকলের প্রতি। কী বিপুল সাড়া তিনি পেয়েছিলেন, তার পরিচয় তো আমরা স্বচক্ষে দেখেছি। ১৯৭১ সালে যেভাবে তিনি অসহযোগ আন্দোলন সংগঠিত করেছিলেন, তাতে বিস্মিত হয়েছিল সারা বিশ্ব। ক্ষাত্র শক্তির সঙ্গে নৈতিক শক্তির দ্বন্দ্ব পৃথিবীতে এই প্রথম সংঘটিত হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশের এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে ঐক্য যে শৃঙ্খলা যে দুর্জয় সংকল্পের পরিচয় পাওয়া গিয়েছিল তার তুলনা হয় না।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণ, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। যে শুনেছে সে ভাষণ তারই শরীরে বয়ে গেছে বিদ্যুৎ প্রবাহ। কী ছিল সে ভাষণে? কোনো অজ্ঞাত তথ্য নয়, কোনো অপ্রত্যাশিত ঘোষণা নয়, ভাষার কোনো কারুকার্য নয়, বলবার কোনো পরিশীলিত ভঙ্গি নয়। তাতে ছিলো এ দেশের সর্বশ্রেণীর মানুষের অকথিত বাণীর প্রকাশ, তাদের চেতনার নির্যাস, বক্তব্যের অবিসংবাদিত আন্তরিকতা। বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে এই আন্তরিকতার বন্ধন গড়ে উঠেছিল বলেই তো শত্রুদেশে বন্দী থাকা সত্ত্বেও মুক্তিযুদ্ধে তাঁর প্রেরণা ছিলো সক্রিয়। স্বাধীনতা লাভের জন্য যেমন দৃঢ় সংকল্পবব্ধ ছিলো সকলে, তেমনি প্রবল আকাঙ্ক্ষা ছিলো তার নেতৃত্বে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ গড়ে তোলার। বন্দীদশা থেকে মুক্তিলাভ করে দেশে প্রত্যাবর্তন করেই তিনি বলেছিলেন, যদি দেশবাসী খাবার না পায়, যুবকরা চাকরি বা কাজ না পায়, তাহলে স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়ে যাবে; পূর্ণ হবে না। এই ছিল তাঁর স্বপ্নেরই অংশ। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের আগেই তাকে সপরিবারে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়া হলো।

বঙ্গবন্ধু ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামের এক বিশাল প্রতীক এবং নিরন্তর প্রেরণার উৎস। এসব উপাদানের সমন্বয়েই বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস এবং এই ইতিহাসে সবচেয়ে উজ্জ্বল ও সর্বোচ্চ স্থানটি যে বঙ্গবন্ধুর যুক্তিবাদী, বিচারশীল এবং ইতিহাসবোধসম্পন্ন সকল মানুষই এটা স্বীকার করবেন। এ ব্যাপারে বিতর্কের কোনো অবকাশ নেই। কিন্তু তবুও কিছু লোক অহেতুক বিতর্ক তুলেছেন। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর হত্যা দিবসকে ‘জাতীয় শোক দিবস’ হিসেবে পালনের সরকারি সিদ্ধান্তকে ক্ষমতার জোরে অন্যায়ভাবে বাতিলও করে দিয়েছেন। তাদের এই সিদ্ধান্ত ছিল অদূরদর্শী, জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার বিরোধী এবং ইতিহাসকে অস্বীকার করার নামান্তর।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি নাম, একটি ইতিহাস। বাঙালির ইতিহাসে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তান তিনি। তাঁর জীবন ছিল সংগ্রামমুখর। সংগ্রামের মধ্যেই তিনি বড় হয়েছিলেন। তাঁর জন্ম তৎকালীন বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গীপাড়ায়। ছাত্র অবস্থায় তিনি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ’৫৪-এর যুক্তফ্রন্টের সরকার গঠন, কপ, পিডিপির আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে মহানায়ক হিসেবে ’৭০-এর নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি আওয়ামী লীগকে এদেশের গণমানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীকে পরিণত করেন। অবিসংবাদিত এই নেতার জীবন চলার পথ ছিল কণ্টকাকীর্ণ। পাকিস্তানের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তুলে ’৬০-এর দশক থেকেই তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের অগ্রনায়কে পরিণত হন।

বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশ। উন্নয়নের রোল মডেল। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নের আগেই তাঁকে সপরিবারে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়া হলো। বঙ্গবন্ধুকে হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়ে স্বপ্ন দেখা বাংলার মানুষ গুলো। তিনি চলে গেলেন। আর ফির এলেন না। আফসোস, এমন একটা নেতা এদেশে আর জন্মায়নি একটিও। তাঁর মতো করে বাংলাকে আর ভালোবাসেনি কেউ, দেশের মানুষকে আগলে রাখেনি কেউ। হে মহান নেতা ভালো থাকুন, স্বর্গীয়সুখে থাকুন। হাজারো সালাম আপনাকে।

লেখক- মীর আব্দুল আলীম, সাংবাদিক, সমাজ গবেষক ও কলামিস্ট।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়